নুসরাত নুসিন

।। নুসরাত নুসিন ।।

সত্যিকার অর্থে আমরা নতুন এক গল্পের ভিতরে আছি। যে গল্প এখানে বলবো তা সময়ের ভিতরে থমকে গিয়ে এক ভয়াল ভাইরাসের প্রকোপে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার গল্প। আর এ গল্পের চরিত্রনাম ও শিরোনাম একটাই—তা হলো করোনাভাইরাস।

অনেক পূর্বানুমান নিয়ে মানুষ বসে থাকে, ঘটনা দেখার জন্য প্রস্তুত থাকে। কিন্তু পৃথিবী অথবা পৃথিবীর মানুষ কেউই সম্ভবত ধারণা করতে পারেনি করোনা নামক এমন একটি অপ্রস্তুত ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা, গোলা-বারুদ, পরমাণুযুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, অস্থিরতা এরকম বড় বড় সম্ভাব্য কোনো বিষয়ের সামনে নয়, অসহায় হতে হলো ক্ষুদ্র এক ভাইরাসের কাছে। হাসপাতাল, রোগী, পিপি, আইসিইউ, অ্যাম্বুলেন্স—পৃথিবীব্যাপী হঠাৎ একযোগে শুরু হলো কোনো হরর ফিল্মের মহড়া। চীন, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, স্তূপাকৃত মৃতদেহ, গণকবর সব যেন মিলেমিশে পর্দার গা হিম করা ভৌতিক ছায়াছবি। এর কখন শেষ? আমরা কেউ জানি না। চোখে তখন ঘনিভূত হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তা, শঙ্কা, মন্দাচিন্তা। এক্ষণে স্বাস্থ্য সংস্থা, অর্থ সংস্থা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সংস্থার নিয়মিত গবেষণা-পূর্বাভাস ভবিষ্যত সম্পর্কে আমাদের আরো ভয়ার্ত ও চিন্তিত করে তোলে। করোনা ধাক্কা তবে কতটা পাল্টে দেবে অর্থনীতি, পরিচিত ছবি? পাশাপাশি আমাদের ব্যক্তিগত বিবেচনাবোধ বাড়ে। বুঝি, অন্যসব চাহিদার মতো স্বাস্থ্যসচেতনতা কেমন দরকারি উপলব্ধি। রাষ্ট্র বুঝতে পারে, যে আপাত বড় বড় নীতি-নির্ধারণের পাশাপাশি একটি কার্যকরী স্বাস্থ্যনীতি কতটা আবশ্যক ও জরুরি। নতুবা এর অভিঘাতে অন্যসব কাঠামো হুড়মুড় করে ভেঙে ঘোরসঙ্কট তৈরি করতে পারে সহজেই। তখন যতেœ গড়া পুঁজি, সাজানো গোলাবারুদ, ক্ষমতা, হুঙ্কার কোনো কাজেই লাগবে না। করোনা অন্তত এই বিবেচনাবোধটি জাগ্রত করতে পেরেছে, যে স্বাস্থ্যগত হুমকি মোকাবিলা টিকে থাকার প্রশ্নে যেকোনো রাষ্ট্রের অথবা মানুষের সবচেয়ে জরুরি দায়িত্ব।

দারুণ এক বিচ্ছিন্নতাবোধে তাড়িত মানুষ সবার আগে যাকে অনুভব করে সে কে? মানুষ আসলে সবার আগে একজন মানুষকেই অনুভব করে। মানুষই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানুষের। এ সম্পর্ক আত্মীয়তার, কর্মসূত্রতার, ব্যবসার, আরো বহুবিধ প্রয়োজনীয়তার। কিন্তু ভয়ংকর পরিস্থিতি হলো এই যে, করোনার এই ক্রান্তিকালে মানুষ আপাতত মানুষ থেকে দূরে।

দেশ থেকে আরেক দেশ দূরে, গ্রাম থেকে শহর দূরে, ঘর থেকে পাশের ঘর দূরে, এক মানুষ থেকে আরেক মানুষ দূরে। এ এক সামষ্টিক বিচ্ছিন্নতা। অথবা সমষ্টি থেকে ব্যক্তিক বিচ্ছিন্নতা। প্রিয় মানুষদের সান্নিধ্যে যাবার আকুলতা আছে, কিন্তু উপায় নেই। অতএব জেগে আছে নিঃসঙ্গ চোখ। ভয় আর উৎকণ্ঠায়। পৃথিবীর সব বেঁচে থাকা মানুষদের জন্যই এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। সম্পূর্ণ নতুন নির্মমতা। দীর্ঘসময় ঘরে কাটানো কোনো সুখকর বিষয় নয়। এতে বিচ্ছিন্নতাবোধই জন্মে। সামাজিক দূরত্ব বাড়ে। সামাজিক দূরত্ব থেকে অনিশ্চয়তা জন্মে। অনিশ্চয়তা থেকে ঝুঁকি বাড়ে। সবচেয়ে কষ্টকর সময় কাটাচ্ছে শিশুরা। তাদের শুধু ঘর আছে, বাহির নেই।

একক অনুভূতির মুখোমুখি

কবি মজনু শাহ ইতালিতে বসে লিখেছেন, ‘বিপদের দিনে কাণ্ডারি হয়ে এখানে অনেক চীনা ডাক্তার এসেছেন। সঙ্গে করে আনা চিকিৎসা সরঞ্জামাদির বড় বড় বাক্সে তাঁরা লিখে এনেছেন রোমান দার্শনিক সেনেকার একটি উক্তি, ‘We are waves of the same sea, leaves of the same tree, flowers of the same garden.’ এই বার্তায় পৃথিবীর সমস্ত মানুষের আর্তি যেন জ্বলজ্বলে হয়ে উঠেছে।’

করোনা অভিজ্ঞতা পৃথিবীব্যাপী অভিন্ন অনুভূতিতে পরিণত হয়েছে। রিখটার স্কেলে এই সংবেদনার মাত্রা একই। কবি, গায়ক, মন্ত্রী, ভিলেন, শ্রমিক, ডাক্তার, ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া সবার কাছেই এর অনুভূতি এক। দুঃশ্চিন্তা আমাদের ক্রমাগত গিলে খাচ্ছে। সবকিছু স্তব্ধ করে দিয়ে করোনাকে সঙ্গী করে সময় তরতর করে সামনে চলেছে। সকল নিশ্চয়তা বেঁকে যাচ্ছে। সাজানো পরিকল্পনা, স্বপ্ন, সম্ভাবনা।

প্রাকৃতিক কারসাজি

কেন নেমে এলো এমন দুর্যোগ? মানুষ কি খুব বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল? প্রকৃতি কি তার ভারসাম্য সংকটে পড়েছিল? এটা কি সেই ভারসাম্য পুষিয়ে নেয়ার কোনো পাঁয়তারা? যেহেতু মানুষের সময় নেই প্রকৃতির দিকে অত নজর দেয়ার। এই যান্ত্রিক সময়ে সমস্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে উতরে মানুষ কেবল যন্ত্রের প্রয়োজনীয়তাকেই অনুভব করতে শিখেছে। এই পরিস্থিতির জন্য মানুষের কি কোনো দায় নেই? যদি থাকে তাহলে তো সে আজ নিজেই নিজের শত্রু হবে! প্রকৃতি কি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, ভুলে গেলে খুব ক্ষতি হতে পারে যে, আমরা সকলে একটি বৃহৎ ইকোসিস্টেমের অংশ। পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র অদৃশ্য কণাটির সঙ্গেও আমরা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এ সম্পর্ক ভারসাম্য রক্ষার সম্পর্ক। বিনিময়ের সম্পর্ক। তাকে আঘাত করা হলে কোনো না কোনোভাবে আঘাত ফিরে আসবে। প্রকৃতি সমতায় বিশ্বাস করে।

সাবানফেনায় পুড়ে যাচ্ছে নরম দেহ

এখন কথা হলো, মানুষ নিজেকেই কি অনুভব করে? তার মন, শরীর, স্বাস্থ্য, রোগ, অদৃশ্য জীবাণু? এইসব বিবিধ প্রশ্ন মনে এলে বোঝা যায়, সুস্থতা অনেক দরকারি উপলব্ধি। খাদ্য উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন, পুঁজি, কর্তৃত্ব, ক্ষমতা উৎপাদনের চেয়েও জরুরি বিষয়। মানুষ বুঝলো, এবার তাহলে শরীরের দিকে কিছুটা নজর দেয়া যাক।

হন্তদন্ত হয়ে সাবান খুঁজে নিচ্ছে, বারবার হাত পরিষ্কার করছে, জীবাণুনাশক ছিটাচ্ছে। বাড়ির দরজা বন্ধ করে ফেলছে। এর অর্থ—মানুষ সত্যিই নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠছে। আর হেলাফেলা নয়, এবার নিজের দিকে খেয়াল রাখার সময় এসেছে। একটু ভাববার অবকাশ পাওয়া গেছে, যে জীবনের সমস্ত প্রয়োজনীয়তাকে কীভাবে ব্যালান্স করতে হবে। উদাম, নচ্ছাড়, অমিতব্যয়ী জীবনটাকে কীভাবে সঞ্চয়ী ও যতœ করতে শিখতে হবে। কিন্তু সবার আগে এখন সুস্থতা চাই। নখের ডগায় বসে আছে রোগ, সন্দেহ বসে আছে শরীরজুড়ে। এখন তাই ভরসা শুধু সাবান আর ফেনা।

খাদ্য চাই, কর্ম চাই

খাদ্য ও টাকা সবার ঘরে মজুদ থাকে না। যাদের থাকে না তারা লকডাউনে বিপদে পড়েছে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কোনোভাবে চলে গেছে আজকের দিন। কিন্তু কতদিন! আগামীকালকের খাবার চাই। আগামীকাল কাজ চাই। যারা ছোট চাকরি করেন তাদের ক্ষেত্রেও একই দশা। চাকরিটা থাকবে তো? কোনো দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হবে না তো? সবার আগে খাদ্যের নিশ্চয়তা চাই। কর্মের নিশ্চয়তা চাই।

এক্ষণে তাই স্বাভাবিকতায় ফিরে যাওয়ার চেয়ে আর কোনো আকুলতা নেই।

নুসরাত নুসিন রাজশাহীতে বসবাসরত কবি ও সাংবাদিক