।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

ভারতে করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। প্রতিদিনই শনাক্তের নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। রাজধানীসহ প্রতিটি রাজ্যেই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় দিল্লিতে নতুন করে আরও ২৫ হাজার ৪৬২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দিল্লিতে সোমবার রাত থেকে এক সপ্তার জন্য লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল জানিয়েছেন, দিল্লিতে হাসপাতালে ১০০টিরও কম আইসিইউ বেড খালি আছে।

প্রথমে সাত দিনের কারফিউ জারির ঘোষণা করা হলেও পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে লকডাউনের কথা জানান কেজরিওয়াল। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য পরিষেবা যাতে ভেঙে না পড়ে তার জন্য এই ছোট লকডাউন। যেভাবে সংক্রমণ মাত্রা ছাড়াচ্ছে তার জন্য এর প্রয়োজন ছিল।’

দিল্লির বাইরে মহারাষ্ট্র, উত্তর প্রদেশ, কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যগুলোতেও ব্যাপক হারে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। প্রতিটি রাজ্যেই অক্সিজেনের অভাব দেখা দিয়েছে। মহারাষ্ট্র বারবার কেন্দ্রের কাছ থেকে অক্সিজেন চাইছে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও জানিয়েছেন, অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিটি রাজ্য থেকে একই রিপোর্ট আসছে। তারপর কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ২২ এপ্রিল থেকে শিল্প ক্ষেত্রে অক্সিজেন ব্যবহার করা যাবে না। সেই অক্সিজেন হাসপাতালে সরবরাহ করা হবে। তবে ওষুধ, পরমাণু চুল্লির মতো নয়টি জরুরি জায়গায় আগের মতোই অক্সিজেন ব্যবহার করা যাবে।

করোনার এই বাড়বাড়ন্তে হাসপাতালগুলোতে বেড পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া যাচ্ছে না জীবন রক্ষাকারী বিভিন্ন ওষুধ। সব হাসপাতালেই আইসিইউ ভর্তি হয়ে আছে। এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থার হাসপাতালগুলো সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেয়া হবে। সেগুলোকে পুরোপুরি করোনার চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হবে। তাতে অসুবিধা থাকলে একটা বড় অংশে করোনা রোগীদের চিকিৎসা হবে।

করোনা রোগীদের অনেক হাসপাতালে রেমডেসিভির দেয়া হয়। কিন্তু সেই ইঞ্জেকশনও পাওয়া যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে অনেক রাজ্যই সমানে তা চাইছে। এর মধ্যে মহারাষ্ট্রে প্রচুর পরিমাণ রেমডেসিভির উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে তারপরই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী থানায় হাজির হয়ে বলেন, এটা দলীয়ভাবে সংগ্রহ করে পাঠানো হচ্ছিল।

এবার কেন্দ্রীয় সরকার লকডাউন বা কোনও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করছে না। তারা রাজ্যগুলোকে বলছে, কড়া ব্যবস্থা নিতে। প্রায় প্রতিটি রাজ্যই এখন রাতে কারফিউ জারি করছে। বিহার, রাজস্থান, তামিলনাড়ু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সব স্কুল, সিনেমা হল, ধর্মস্থান, শপিং মল বন্ধ থাকবে। রাজস্থানে ৩ মে পর্যন্ত লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।

মহারাষ্ট্র সরকার জানিয়েছে, দিল্লি, কেরালা, তামিলনাড়ু, গোয়ার মতো রাজ্য থেকে তাদের রাজ্যে এলে ১৪ দিন বাড়িতে কোয়ারান্টিনে থাকতে হবে। প্রত্যেক যাত্রীর হাতে তার জন্য বিশেষ ছাপ মেরে দেওয়া হবে। করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট ছাড়া কাউকে রাজ্যে ঢুকতে দেয়া হবে না। তবে রাজ্যগুলির আশঙ্কা, করোনা-সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারেন কুম্ভমেলা ফেরত লোকজন। মহারাষ্ট্র সরকার এরইমধ্যে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। অন্য রাজ্যগুলোও এ নিয়ে চিন্তিত।

শনাক্ত মৃত্যুর রেকর্ড

১৯ এপ্রিল সোমবার সকালে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও দুই লাখ ৭৩ হাজার ৮১০ জনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে এক হাজার ৬১৯ জনের। ভারতে করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত এটিই একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত ও মৃতের ঘটনা।

গত ৫ দিন ধরেই দেশটিতে নতুন শনাক্তের সংখ্যা দুই লাখেরও বেশি। এর জেরে দেশটিতে মোট শনাক্তের সংখ্যা এরইমধ্যে দেড় কোটি ছাড়িয়েছে। মোট শনাক্তের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পরই ভারতের অবস্থান।

আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ওয়ার্ল্ডোমিটারস-এর হিসাব অনুযায়ী, ভারতে এখন পর্যন্ত এক কোটি ৫০ লাখ ৬১ হাজার ৯১৯। এর মধ্যে এক লাখ ৭৮ হাজার ৭৯৩ জনের মৃত্যু হযেছে। বর্তমানে সক্রিয় রোগীর সংখ্যা ১৯ লাখ ২৯ হাজার ৩০৫।

এতো বেশি সংখ্যক সক্রিয় রোগী এর আগে আর দেখা যায়নি। রোগী বৃদ্ধির জেরে হাসপাতাল, নার্সিংহোমগুলিতে শয্যা প্রায় ভর্তি। একই শয্যায় দুই রোগীকে শুয়ে থাকার দৃশ্য দেখা গিয়েছে বেশ কয়েকটি রাজ্যে। এমনকি অক্সিজেন না পেয়ে কোভিড রোগীর মৃত্যুর খবর আসছে।

দৈনিক মৃত্যু এই পর্যায়ে চলে যাওয়ায় হাসপাতালের মর্গের বাইরে, শ্মশানে এবং কবরস্থানে মরদেহের সারি পড়ে থাকছে। সব মিলিয়ে যে পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে তা দেখা যায়নি করোনার প্রথম পর্বেও। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, করোনার প্রথম তরঙ্গের মতো এর দ্বিতীয় ঢেউকেও পরাজিত করতে সক্ষম হবে ভারত। কোভিড পরিস্থিতি এবং টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে এক পর্যালোচনা সভায় এমন মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, কঠোরভাবে করোনাবিধি পালনের মাধ্যমে আরও দ্রুত গতিতে সমন্বয় সাধন করে কোভিডকে মোকাবিলা করা সম্ভব।

সংক্রমণের গতি রুখতে কোভিড পরীক্ষা, সংক্রমিতের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং তাদের চিকিৎসার ওপর জোর দিয়েছেন মোদি। তিনি বলেন, ‘কোভিড পরীক্ষা, সংক্রমিতের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের সন্ধান করা এবং তাদের চিকিৎসার কোনও বিকল্প নেই।’

কোভিড রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পর্যাপ্ত আইসিইউ বেডের ব্যবস্থা করারও তাগিদ দেন মোদি। পাশাপাশি রোগীদের জন্য রেমডেসিভির-সহ অন্যান্য ওষুধের সরবরাহ ব্যবস্থাও পর্যালোচনা করেন তিনি। সূত্র: ডিডাব্লিউ, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।