।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

মুজিবনগর সরকার গঠনের পরপরই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে লেখা বার্তা পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে কৌশলগত কারণে ওই বার্তা পাওয়ার কথা স্বীকার না করার সিদ্ধান্ত নেন ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র দপ্তরের তৎকালীন নীতিনির্ধারকরা। ১৯৭২ সালে তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়ার অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের ওপর ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব কমানো। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোও দ্বিপক্ষীয় (যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান) স্বার্থে বাংলাদেশকে দ্রুত স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের বলেছিলেন।

ভুট্টোর ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাদের ফিরে যাওয়া ত্বরান্বিত করবে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অবমুক্ত করা ‘গোপন নথি’ থেকে এসব কথা জানা যায়। উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। এরপর বাংলাদেশকে স্বীকৃতির অনুরোধ জানিয়ে ২৪ এপ্রিল পাঠানো একটি বার্তা তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি হয়ে মে-জুনের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছায়।

এরপর ১৯৭১ সালের ২২ জুন ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে জরুরি তারবার্তা (টেলিগ্রাম) পাঠান তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম পি রজার্স। ওই তারবার্তার বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশকে স্বীকৃতির বিষয়ে যোগাযোগ’। তারবার্তায় বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ করে লেখা একটি বার্তা পেয়েছে পররাষ্ট্র দপ্তর। ওই বার্তায় স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে অবিলম্বে স্বীকৃতি এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। বার্তাটিতে আরো বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের আগে পূর্ব পাকিস্তান নামে যে ভূখণ্ডটি পরিচিত ছিল, তা এখন পূর্ণ সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং তাতে বাংলাদেশ সরকারের পূর্ণ আইনি কর্তৃত্ব আছে।

পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে পাঠানো তারবার্তায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ওয়াশিংটনে পাঠানো বার্তায় স্বাক্ষর করেছিলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ। ওই বার্তার সঙ্গে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’, পূর্ব পাকিস্তানের আইনগুলো বাংলাদেশে বহাল থাকার বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির ঘোষণা এবং রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যদের তালিকা সংযোজন করা ছিল। সাধারণ আন্তর্জাতিক বিমান ডাকযোগে পশ্চিম বার্লিন থেকে আসা ওই বার্তায় ১৯৭১ সালের ২৬ মে তারিখের সিল ছিল।

ওয়াশিংটন থেকে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে পাঠানো জরুরি তারবার্তার দ্বিতীয় অংশে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুরোধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। এতে বলা হয়, ‘বার্তা পাঠানোর ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে যদি ওই বার্তাটি আসল হয়ে থাকে (আসল মনে না করার কোনো কারণ নেই আমাদের) তাহলে এটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের স্বীকৃতির জন্য বাংলাদেশ আন্দোলনের কর্মীদের পক্ষ থেকে প্রথম আনুষ্ঠানিক অনুরোধ। আর এর স্পর্শকাতর রাজনৈতিক প্রভাব আছে।’

ওয়াশিংটন থেকে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে পাঠানো জরুরি তারবার্তায় আরো বলা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে যাবে, যেটি আমরা স্বীকার করি। পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আমরা কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখি এবং বর্তমান সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে আমরা পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাব।’

জরুরি বার্তায় আরো বলা হয়, বার্তাটি যুক্তরাষ্ট্রকে সমস্যায় ফেলেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র কখনো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুরোধ পায়নি, এটি বলা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

ওয়াশিংটনের জরুরি তারবার্তায় তৃতীয় অংশে বলা হয়, ‘‘পররাষ্ট্র দপ্তর নিম্নোক্ত উদ্যোগগুলো নিচ্ছে : (ক) বার্তা (বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুরোধ) পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা হবে না; (খ) পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠানো সব বার্তা নিয়মিত নিবন্ধন করে রেকর্ড সার্ভিসেস ডিভিশন, ওপিআর/আরএস। সেটিই ওই বার্তা (বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুরোধ) নিবন্ধন করবে। ওই প্রক্রিয়ায় বার্তাটির ধরন নির্ধারণ করা হবে না। (গ) এনইএ/পিএএফ (পররাষ্ট্র দপ্তরের নিকট প্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ব্যুরোর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানবিষয়ক দপ্তর) তার দাপ্তরিক ফাইলে বার্তাগুলো রাখবে; (ঘ) আমরা অব্যাহতভাবে বলতে থাকব- ‘পূর্ব পাকিস্তান অঞ্চলকে আমরা পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ মনে করি।’ (ঙ) বাংলাদেশকে স্বীকৃতির অনুরোধ পেয়েছি কি না সে বিষয়ে যদি আমাদের প্রশ্ন করা হয় তাহলে আমরা উত্তর দেব : ‘আন্তর্জাতিক বিমান ডাকের মাধ্যমে আমরা বার্লিন থেকে একটি চিঠি পেয়েছি। সেখানে ফেরত পাঠানোর কোনো ঠিকানা ছিল না। ওই চিঠিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।’ যেহেতু আমরা পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ মনে করি তাই ওই অনুরোধের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া আমাদের জন্য যথার্থ হবে না।’’

ওই জরুরি তারবার্তার শেষাংশে প্রেরক হিসেবে তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম পি রজার্সের নামের সংক্ষিপ্ত রূপ ‘রজার্স’ লেখা ছিল।

১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বীকৃতির অনুরোধ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও চিঠি পাঠান। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয় ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল। ওই সপ্তাহেই ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের মুখ্য কর্মকর্তা হার্বার্ট স্পিভাক প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বার্তা পৌঁছে দেন। ওই বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। ৯ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে পাঠানো এক চিঠিতে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। ১৯৭২ সালের ১৮ মে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ঢাকায় আমেরিকান দূতাবাস স্থাপিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের অবমুক্ত করা নথি থেকে জানা যায়, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার তিন দিন আগে এ বিষয়ে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোকে জানানোর জন্য ওয়াশিংটন থেকে ইসলামাবাদে বার্তা পাঠিয়েছিল পররাষ্ট্র দপ্তর। এতে পাকিস্তানে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতকে বলা হয়েছিল, ‘প্রেসিডেন্ট ভুট্টোকে আপনি শিগগিরই জানাবেন যে আমরা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করেছি। স্বীকৃতি দেওয়ার সময় হিসেবে তাঁর (ভুট্টোর) পরামর্শকে আমরা সতর্কভাবে পর্যালোচনা করেছি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে আমাদের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। ভুট্টোকে জানাতে চাই যে আমরা ৪ এপ্রিল স্বীকৃতির বিষয়ে ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা করছি। তাঁকে (ভুট্টো) আপনার (রাষ্ট্রদূত) সতর্ক করা উচিত যে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার আগে অবশ্যই খবরটি গোপন রাখতে হবে।’

এরও আগে ১৯৭২ সালের ৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে পাঠানো এক চিঠিতে রজার্স বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। ভারতীয় সেনাদের বাংলাদেশ ত্যাগের দুই সপ্তাহ পর ২৫ মার্চ স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি।

নিক্সনকে চিঠিতে তিনি আরো লিখেন, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভুট্টো এর আগে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে উৎসাহিত করেছিলেন। ভুট্টো মনে করেন, দেরি না করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া হলে তা উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে। তিনি আরো মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির বিষয়ে সিদ্ধান্তের ওপর ভারতের সেনাদের বাংলাদেশ ছাড়া নির্ভর করছে।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে রজার্স প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে লেখেন, ১২ মার্চের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। দৃশ্যত ১৭ মার্চ তাঁর ঢাকা সফরকে সামনে রেখে তিনি ওই ঘোষণা দেন।

রজার্স লিখেছেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের মূল লক্ষ্য ওই অঞ্চলের দেশগুলোর স্থিতিশীল স্বাধীনতা। আমরা এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই যাতে কোনো একক শক্তি (যেমন ভারত) তার প্রতিবেশীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো বহির্শক্তি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারে।’

তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশকে ভারতের আগেভাগে স্বীকৃতির পর সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইন্দোনেশিয়াসহ ৪০টি দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় ও সোভিয়েতরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এ সপ্তাহে মুজিবের মস্কো সফরে এবং মুজিব ও গান্ধীর সফর বিনিময়ের মধ্য দিয়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা মিলেছে।

নিক্সনকে চিঠিতে রজার্স লিখেছেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি যে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে মুজিবের ভালো ঝোঁক আছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতিকে জোরালোভাবে স্বাগত জানাবেন এবং সোভিয়েত বা ভারতীয়দের ওপর থেকে তাঁর ব্যাপক মাত্রার নির্ভরতার বিকল্প খোঁজার সুযোগ পাবেন।’ তিনি আরো লিখেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, সময় এসেছে (স্বীকৃতি দেওয়ার), দেরি করলে ইতিবাচক মনোভাব বিনষ্ট হতে পারে এবং ঢাকায় আমেরিকান কর্মকর্তাদেরও বিপন্ন করে তুলতে পারে। কারণ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি আমাদের কনস্যুলেট জেনারেলের স্ট্যাটাস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।’

এরপর ১৯৭২ সালের ২৮ মার্চ হোয়াইট হাউস থেকে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক সহকারী হেনরি কিসিঞ্জার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রজার্সকে পাঠানো বার্তায় জানান, প্রেসিডেন্ট ৩ এপ্রিলের পর যেকোনো দিন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।