বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা আমরা সবাই জানি। গঠনের ইতিহাস কিংবা টুকিটাকিও খুব একটা অজানা নয়। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে পুরোদস্তুর রাজনৈতিক একটি নেতৃত্বের অধীনে ১৯৭১ সালে প্রকৃতপক্ষে একটি জনযুদ্ধ পরিচালিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে অনেক সময় নানা এজেন্ডার কারণে মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অস্বীকার করতে চেয়েছেন অনেকে। অথচ মুজিবনগর সরকারের নথিপত্র থেকে স্পষ্ট হয় যে, সেই সময় সামরিক বাহিনীর সদস্যসহ প্রত্যেকে রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারের অধীনেই যার যার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এর মধ্যে অনেক নথি রয়েছে, যেগুলো সেই সময় ‘সিক্রেট’ বা ‘কনফিডেন্সিয়াল’ হিসেবে ক্ল্যাসিফায়েড ছিলো। নথিগুলো নিয়ে লিখেছেন রাশেদ আনোয়ার

১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক করে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করা হয়। এই সরকার সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপ্রধান এবং বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর অস্থায়ী সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করে। তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী,ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে অর্থমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদকে পররাষ্ট্র, আইন এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী, এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্র, কৃষি, ত্রাণ এবং পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা হয়। চার জন মন্ত্রীকে ১২টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হয়।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্তের এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবায়নের। প্রথমে ১৯৭০ এর নির্বাচনে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ৩ মার্চে জাতীয় পরিষদ বৈঠক অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা। ২৫ মার্চ থেকে নির্বিচারে গণহত্যা ও বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা এবং জনপ্রতিনিধিদের গণপরিষদ গঠন এবং  জনগণের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করতে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী রূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা দৃঢ় সমর্থন এবং  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ, জাতিসংঘের সনদ মেনে চলার প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছিল। এই ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্র ৭১ এর ২৬ মার্চ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি ও উপ-রাষ্ট্রপতির শপথ পরিচালনার জন্য অধ্যাপক ইউসুফ আলীকে প্রতিনিধি নিয়োগ করার কথা বলা হয়।

১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক এম ইউসুফ আলী। এই ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের মুক্তির জন্য যা যা করণীয় তা করবে বাংলাদেশ সরকার সেই ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এই ঘোষণাপত্র কার্যত মুজিবনগর সরকার কর্তৃক অলিখিত সংবিধান ছিল।

স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ঘোষণাপত্র ও এর পরিপ্রেক্ষিতে সদ্য ঘোষিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন ১১ এপ্রিল বাংলাদেশ বেতারে মন্ত্রিপরিষদ গঠনের ঘোষণা দিয়ে ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তিনি গোটা দেশব্যাপী সর্বাত্মক প্রতিরোধ যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের পরিকল্পনা তুলে ধরেছিলেন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সিদ্ধান্ত ও এর ধারাবাহিকতায় ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতোলায় মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

শপথ গ্রহণের পর থেকেই পুরোদস্তুর দাফতরিক কাজকর্ম শুরু করে এই সরকার। মুজিবনগর সরকারের চিঠিপত্র ও দলিল থেকে বোঝা যায়, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম সরকার যে ধরনের কাজ করে থাকে, তার সবগুলোই তারা করতেন। সঙ্গে বাড়তি যোগ হয় দখলদারদের সরাতে যুদ্ধ পরিচালনা।

মুজিবনগর সরকারের বেশিরভাগ ‘গোপন’ নথিই লেখা হতো টাইপরাইটারে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাতে লেখা নথিরও হদিস পাওয়া যায়। যেমন ক্যাপ্টেন গিয়াসকে লেখা এই চিঠিটি। হাতে লেখা হলেও এই চিঠির ওপর ‘টপ সিক্রেট’ লেখা রয়েছে। চিঠিটি লিখেছেন কোনো একজন সংসদ সদস্য।

১৯৭১ সালের ২১ অক্টোবর লেখা ওই চিঠিতে ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহমেদকে যুদ্ধের স্থান ও কৌশল নিয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। শুরুতেই সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়েছে, ক্যাপ্টেন গিয়াসের বাহিনী হোমনা, দাউদকান্দি আর গজারিয়ার সাধারণ মানুষের মন জয় করতে পেরেছেন, সে কারণে। তাদের জন্য অপেক্ষাকৃত ভালো অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চালানোর কথাও জানানো হয় চিঠিতে।

চিঠিতে জানানো হয়েছে যে, পত্রদাতা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর (তাজউদ্দিন) পক্ষে কিছু ‘টপ সিক্রেট’ কাজে ব্যস্ত আছেন। কাজ শেষ হলেই ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে এলাকায় ফিরে আসবেন বলেও আশাবাদ প্রকাশ করেন।

ভালো অস্ত্র পাওয়ার আগ অবধি সম্মুখ লড়াই এড়ানোর কথাও বলা আছে চিঠিতে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, পুরো প্রস্তুতি না থাকলে এর প্রতিশোধ হিসেবে এলাকার সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার চালানো হতে পারে। পাশাপাশি ৩০০ জন প্রশিক্ষিত তরুণ সেক্টরে যোগ দেয়ার অপেক্ষায় আছে উল্লেখ করে আপাতত স্থানীয়ভাবে নতুন প্রশিক্ষণ বন্ধের কথা বলা হয়।

এই ‘টপ সিক্রেট’ নথি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, শুধু মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরাই নন, যুদ্ধের পরিকল্পনার সঙ্গে জনপ্রতিনিধি পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও সম্পৃক্ততা ছিলো। এমনকি তাদের নির্দেশনাও সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে আসতো।

প্রতিটি যুদ্ধ শেষের পর তার বিস্তারিত বিবরণ ঊর্ধ্বতনদের কাছে পাঠানো হতো। ‘সিক্রেট’ ট্যাগ লাগানো সেসব রিপোর্ট টাইপরাইটারে দাফতরিক ভাষায় প্রতিবেদন আকারে তৈরি করে পাঠিয়ে দেয়া হতো মন্ত্রিপরিষদের কাছে। সেইসব প্রতিবেদন লেখা হতো ইংরেজিতে।

এমন অনেক ‘গোপন’ নথিতে দেখা যায়, যুদ্ধজয়ের পর যেসব অস্ত্র-গোলাবারুদ বা সরঞ্জাম উদ্ধার হয়েছে, সেগুলোর হিসাব তুলে ধরা হতো। সেগুলো তালিকা আকারে পাঠানো হতো সরকারের কাছে।

যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও দেয়া থাকতো এসব নথিতে। নিজেদের পক্ষের নিহত সৈনিকের সংখ্যার পাশাপাশি আহতদের তালিকা থাকতো। আবার কাউকে আটক করা হলে, সেই বিবরণও দেয়া থাকতো। এসব প্রতিবেদন মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে পর্যালোচনা করা হতো। তার পরিপ্রেক্ষিতে আবার নতুন নতুন নির্দেশনাও দেয়া হতো। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন ও আহতদের কোথায় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে, সেসব নির্দেশনাও থাকতো।

মাঠ পর্যায় থেকে প্রতিদিন আসা যুদ্ধের বিবরণ থেকে প্রতিবেদন তৈরি করতো সেক্টর সদর দফতর। সেই প্রতিবেদন নির্দিষ্ট ছকে তথ্য দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হতো সরকারের কাছে। এসব প্রতিবেদনের কোনো কোনোটিতে জরুরিভাবে কোনো তথ্য সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে অবহিত করার অনুরোধ থাকতো।

‘কনফিডেন্সিয়াল’ ট্যাগ দিয়ে সাধারণত অপারেশন পরবর্তী মূল্যায়ন প্রতিবেদন পাঠানো হতো। অপারেশনে কোনো ত্রুটি থাকলে সেই মূল্যায়নও থাকতো এসব প্রতিবেদনে। পাশাপাশি অস্ত্রশস্ত্রের চাহিদা পাঠানো হতো কনফিডেন্সিয়াল প্রতিবেদন লিখে। এসবে অস্ত্রের বিবরণসহ চাহিদার পরিমাণ উল্লেখ থাকতো। মুজিবনগর সরকারের অনুমোদনের পর এসব অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করা হতো।

মুজিবনগর সরকারের গোপন নথিপত্রের মধ্যে এমন অনেক নথির সন্ধান পাওয়া যায়, যা থেকে বোঝা যায়, এই সরকারের একটি ইন্টেলিজেন্স ইউনিটও সক্রিয় ছিলো। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতো এসব ইন্টেলিজেন্স তথ্য। সেগুলো প্রতিবেদন আকারে বাংলাদেশ ফোর্সের সদর দফতর থেকে সরাসরি চলে যেতো রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দফতরে।

এসব ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টের অধিকাংশই থাকতো, কোথায় পাকসেনাদের কী অবস্থা, তা নিয়ে। রাজাকার ও আলবদরদের তৎপরতা ও তাদের কর্মকৌশলও উল্লেখ থাকতো এসব প্রতিবেদনে।

ইন্টেলিজেন্সের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকতো, দেশের বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিবাহিনীর অপারেশনের পর আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য পাঠানো। রংপুর সাবসেক্টর থেকে পাঠানো এমন একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ২৭ আগস্ট ভুরুঙ্গামারী থেকে পাকবাহিনী বজলুর রহমান নামের এক রাজাকারকে পাঠায় মুক্তিসেনাদের খোঁজ খবর সংগ্রহে। কিন্তু সে আটক হয় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার পুরো বিবরণ প্রতিবেদন আকারে পাঠানো হয় সেপ্টেম্বরের ১ তারিখে।

শুধু প্রতিপক্ষের গোপন তথ্য সরবরাহ করাই নয়, মুজিবনগর সরকারের কাছে নিজেদের পক্ষের ইন্টেলিজেন্স প্রতিবেদনও যেতো নিয়মিত। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো আচরণ বা কাজ করছেন কি না- সে ব্যাপারে নিয়মিত তথ্য যেতো রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে।

এমনই এক গোপন তথ্যের প্রতিফলন দেখা যায় রাষ্ট্রপতির দফতর থেকে ‘সিক্রেট’ হিসেবে ক্ল্যাসিফায়েড একটি নথিতে। ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধানকে উদ্দেশ করে এক গোপন আদেশ পাঠান।

সেখানে বলা হয়, ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের বিরুদ্ধে তার আওতায় স্বাধীন হওয়া এলাকার সাধারণ মানুষের ওপর চাঁদা আদায় ও নিপীড়নের অভিযোগ এসেছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করার নির্দেশ দেয়া হয় এবং খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়।

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির এই গোপন পত্রের অনুলিপি প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রীর কাছেও পাঠানো হয়।

স্বাভাবিকভাবেই এসব গোপন নথিপত্র আনানেয়ার কাজে বিশ্বস্ত বাহক ব্যবহৃত হতো। তারপরেও এসব নথিপত্রের যথার্থতা শনাক্তের জন্য নির্ধারিত প্যাড ও সিলমোহর ব্যবহার করা হতো।

এসব নথিপত্র থেকে বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না যে, মুজিবনগর সরকার সংগঠিতভাবেই কাজ করেছে ১৯৭১ সালে। যদিও এসব নথি নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন আছে। ধারাবাহিকভাবে এসব নথি নিয়ে গবেষণা করা হলে, মুক্তিযুদ্ধের আরও অনেক বিচিত্র দিক উঠে আসতে পারে।