।। মোজাফফর হোসেন ।।

‘যারা আওয়ামী লীগ করে তারা মুসলমান না’—নুরুল হক নুরের এই কথা সঠিক হলে দেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘু হয়ে যায়। যাই হোক, আমার কথা হলো, নুর এই সার্টিফিকেট দেয়ার কে? এমন নিশ্চিত করে শেষ নবীও তো কাউকে খারিজ করে দেননি। এই কারণেই হয়ত কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ সেদিন বলেছিলেন, ‘আল্লাহ, ইসলামকে তুমি এদেশের মুসলমান থেকে হেফাজত করো’!
নুরের মতো ভণ্ডের সার্টিফিকেট এখন বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। আজকাল বামদের কাছেও সেই সার্টিফিকেটের প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। সম্ভোগ আর ভোগে ব্যস্ত কতগুলো লেবাসধারী ভণ্ড ইসলামধর্মকে ব্যবহার করে লোভ ও ক্ষমতার রাজনীতি করছে, নাম দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। আচ্ছা, ওরা ইসলামকে হেফাজত করার কে? ইসলামকে হেফাজত করবেন স্বয়ং আল্লাহ। আল্লাহর ক্ষমতা তুলে নেয়ার অধিকার তাদের কে দিল? পরস্ত্রীর লোভ সামলাতে পারে না, কথায় কথায় বেদাত বলা সরকারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা চেয়ে বসে, তারা আসছে ইসলামকে হেফাজত করতে? আরেকদল ভণ্ড মুসলমান তাদের সার্টিফিকেট কিনছে। তবে অধিকাংশ মুসলমান কিন্তু কিনছে না। কারণ ভণ্ডের সংখ্যা এখনো কম।

নুরের মতো মানুষদের নিয়ে এর বেশি কথা বলার রুচি আমার নেই। আসছি মূল প্রসঙ্গে। সব সময় বলে এসেছি, আওয়ামী সরকার ইসলামের জন্য শত কাজ করেও হেফাজত নুরদের মুখ বন্ধ করতে পারবে না। কারণ তারা কথা বলছে ধর্মীয় লাইনে না, রাজনীতির লাইনে। ধর্ম তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার। ফলে আওয়ামী লীগ শত চেষ্টা করেও তাদের খুশি করতে পারবে না। অন্তত চেষ্টা তো কম করল না। একসময় তো সরকারের আশ্রয় প্রশ্রয় দেখে মনে হচ্ছিল, হেফাজতে ইসলাম আওয়ামী লীগেরই একটা ধর্মীয় শাখা। ভালো হলো যে হেফাজত নিজেই বের হয়ে এসে আস্ফালন শুরু করল।

ইসলামের জন্য বাংলাদেশে গত দশ বছরে আওয়ামী লীগ যা করছে, তুলনাহীন। মসজিদ মাদরাসার সংখ্যা বেড়েছে, জৌলুস বেড়েছে। দশ লক্ষাধিক মুসলমান রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। আরবদেশে মা-বোনদের পাঠানোর ব্যবস্থা হয়েছে। দেশের মসজিদ উন্নয়নে সৌদি আরবের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই সরকারের আমলেই ‘ধর্মানুভূতি’ শব্দটি জনপ্রিয় ও নিত্য ব্যবহৃত শব্দে পরিণত হয়েছে, মানুষের ধর্মানুভূতি বেড়েছে। এমনকী ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজ, অসাধু লোকজন, ধর্ষক-খুনি সকলের ধর্মানুভূতি প্রশ্নাতীত। অনেক মানুষ ধর্মানুভূতি ইস্যুতে জেলের সাজা পর্যন্ত ভোগ করেছে, করে যাচ্ছে। সম্প্রতি দিনাজপুরে পুলিশ নিজে বাদী হয়ে মামলা দিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে দিপ্তী রানী দাস নামের এক কিশোরীকে গ্রেফতার করেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তিথী সরকারকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কার করার পর সে নিখোঁজ হয়েছিল। আপডেট জানি না। ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে করা মামলায় এক দর্জির সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। চুয়েট থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে এক ছাত্র। পবিত্রগ্রন্থকে অবমাননা ‘সন্দেহে’ মসজিদে একজনকে পিটিয়ে মেরে পুড়িয়েছে সম্মিলিত মুসলিম জনতা। শাল্লায় মসজিদের মাইকে ডেকে হিন্দু গ্রামে হামলা করেছে মামুনুল হকের অনুসারীরা।

এইরকম প্রচুর দৃষ্টান্ত দেয়া যাবে। ব্লগারদের প্রকাশ্যে গলাকেটেছে ইসলামরক্ষাকারী দাবিদাররা। পুলিশের ভূমিকা যেন এমন: খুন করা যাবে কিন্তু নাস্তিক হওয়া যাবে না। না হলে পুলিশ কেন নিজে বাদি হয়ে ধর্মানুভূতিতে আঘাত হানার মামলা করে?

রাজনীতিভিত্তিক ইসলামী দল জামায়াত ইসলামকে কোণঠাসা করলেও মাদরাসাভিত্তিক ইসলামী গোষ্ঠী হেফাজত ইসলামের বহু দাবিদাওয়া মেনে নিয়েছে বর্তমান সরকার। হেফাজতের একটা জাতীয় পরিচিতি দিয়েছে। কওমি সনদের স্বীকৃতি দেয়ায় শোকরানা মাহফিলে প্রধানমন্ত্রীকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেয়া হয়েছে। কওমি মাদরাসার উন্নয়নে এই সরকার রেলওয়ের ৩২ কোটি টাকার জমি উপহার দিয়েছে। শফির হুজুরের দাবিতে হাইকোর্টের সামনে গ্রিক থেমিসের মূর্তি অপসারণ করা হয়েছে। এর আগে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে নির্মাণাধীন লালনসহ বাউলদের ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। শরিয়ত বাউলকে আইসিটি আইনে গ্রেফতার করে জেলখানায় রাখা হয়। বাউল রিতা দেওয়ান কদিন আগে মুক্তি পেল। যাদের জন্য এত করা হচ্ছে তারাই স্বাধীনতার পঞ্চাশ এবং মুজিববর্ষ উদযাপনকালে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যে হাত তুলেছে; ভাবা যায়? দেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, জাতীয় সংগীত আমাদের এসব জাতীয় অনুভূতি নিয়ে যা ইচ্ছা বলে নিয়ত পার পেয়ে যাচ্ছে ওয়াজিরা। শুধু ইসলামি লেবাসের কারণে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আওয়ামী সরকার আসলে কার কাছে নিজের ‘ইসলামি ভাবমূর্তি’ তুলে ধরতে চাচ্ছে? নুরের কাছে যে কিনা ঘোষণা দেয়, আওয়ামী লীগ যারা করে তারা মুসলমান না? হেফাজতের কাছে, যারা কিনা রাতদিন আওয়ামী লীগকে ইসলামবিরোধী বলে যাচ্ছে?

দেশের সাধারণ মুসলমানের কাছে তো মোটেও না। কারণ দেশের সাধারণ মুসলমান আওয়ামী লীগকে এই প্রশ্ন কখনোই করে না। হুজুররা যে কারণে আওয়ামী লীগকে অজনপ্রিয় করতে চাচ্ছে সেই কারণেই আওয়ামী লীগ জনপ্রিয়, এখনো। মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব, বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা, শেখ হাসিনার প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তা, দলটির সাংস্কৃতিক ও অসাম্প্রদায়িক ভিত্তি—এসব দিয়েই অতীতে ক্ষমতায় এসেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে যে দল তরুণদের ভোটে ব্যাপক ব্যবধানে জিতে ক্ষমতায় আসে, আক্ষরিক অর্থেই উন্নয়নে মাইলফলক তৈরি করে, সেই দলকে কেন মুসলমানদের বিভিন্ন তরিকার মধ্যে মাত্র এক তরিকার নেতা তেঁতুল হুজুরের সঙ্গে আপস করতে হবে? যে হুজুরকে দেশের সাধারণ মুসলমানই গ্রহণ করেনি কন্যাবিদ্বেষী এবং মধ্যযুগীয় বর্বর কথাবার্তার কারণে। সাধারণ মুসলমান তো এদের নিয়ে হাসাহাসি করে, তাহলে তাদের গুরুত্ব দেয়া কেন? হাসাহাসি করে না কারা? যারা রাজনৈতিকভাবে ইসলামকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় যেতে যায়। সাধারণ জনগণের একটা অংশও যে এই রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলছে, তাতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। তারা হয় বিকৃত নয়ত বিক্রিত। রাজনীতিতে কোনো শাসকই শতভাগ সমর্থন পাবে না। একসঙ্গে সাম্প্রদায়িক এবং অসাম্প্রদায়িক মানুষের সমর্থন পাওয়া যায় না। সংস্কৃতিপ্রাণ এবং সংস্কৃতিবিরোধী—দু’পক্ষেরই আদর্শ হওয়া যায় না। আওয়ামী লীগের পরিচয় ঐতিহাসিকভাবে খোদাই করা। সুতরাং সেই পরিচয় দৃঢ়তার সঙ্গে ধরে থাকতে হবে। এর জন্য ক্ষমতা কখনো গেলে যাবে৷ কোনোদিক থেকেই ক্ষমতা চিরস্থায়ী না। কিন্তু আত্মপরিচয় চিরস্থায়ী। বৈশ্বিকভাবেই প্রতিটি ধর্মে যে ধর্মীয় মৌলবাদ ও সন্ত্রাসের উত্থান সেটি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। ইতিহাস বলে, শেষ পর্যন্ত মানুষ তার অস্তিত্বের স্বার্থেই অন্ধকারে আলো জ্বালে, আবার স্বার্থের খেলায় প্রয়োজনীয় অন্ধকারটুকু ধরেও রাখে। তাই সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগকে নিতে হবে। আমরা চাই আওয়ামী লীগ স্বরূপে থাকুক, দৃঢ়তার।

এদেশের সাম্প্রদায়িক পাকিপন্থী লোকের ভোট ও সমর্থন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু পাননি। সত্তরের নির্বাচনেও না। বর্তমান আওয়ামীও শতচেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে।

মন্ত্রীরা প্রায়ই হাইলাইট করেন, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নামাজ পড়েন এবং পবিত্র কুরআন তিলওয়াতের মধ্য দিয়ে দিন শুরু করেন। নিয়মিত তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েন। ইত্যাদি ইত্যাদি। সেদিনই গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে তাঁর আগের মন্ত্রীসভার দুইজন সদস্য বামপন্থী নেতা হিসেবে যাদের পরিচিতি রয়েছে তারাও হজ করে এসেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইসলামের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।’

এইসব কথা কাদের উদ্দেশ করে বলা? ধর্মপালন ব্যক্তিগত বিষয়। রাষ্ট্রের জনগণকে খুশি করতে হবে সুশাসন দিয়ে, দুর্নীতিপরায়ণ না হয়ে, এটাই হোক আওয়ামী লীগের রাজনীতি। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময় সেটাই ছিল মূল লক্ষ্য। বঙ্গবন্ধুর সুহৃদ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ বলছেন: ‘রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতার মূল কথাটি হলো: খাঁটি মুসলমান, খাঁটি হিন্দু, খাঁটি খ্রিস্টান বা খাঁটি বৌদ্ধ তৈরি করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয়। তার দায়িত্ব সুনাগরিক তৈরিতে সাহায্য করা। রাষ্ট্রচর্চা একটি সম্পূর্ণ ইহলৌকিক ব্যাপার যার সঙ্গে ধর্মকে জড়িত করা বিপজ্জনক।’

ফলে আওয়ামী লীগ একটা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা বিরোধী দলকে তৈরি হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। বিএনপির বিকল্প হেফাজত বা কোনো ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠী কখনোই না।

ওবায়দুল কাদের দেরিতে হলেও কথাটি বলেছেন: ‘সরকারি দলের পাশাপাশি একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার শক্তিশালী বিরোধী দল অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। শক্তিশালী একটি বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে একদিকে যেমন উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সবল হওয়ার উর্বর ক্ষেত্র খুঁজে পায়, তেমনি সরকারি দলেরও একটি অংশের স্বেচ্ছাচারী হওয়ার অবকাশ থেকে যায়।’

তাঁর কথা যেন দলীয় উপলব্ধি হয়ে ওঠে, এই কামনা।

মোজাফফর হোসেন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক