।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গণ্ডামারায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য এসএস পাওয়ার লিমিটেডের সঙ্গে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চুক্তি হয় ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সেই সময় থেকেই স্থানীয়ভাবে দুটি পক্ষ এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পক্ষে-বিপক্ষে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেয়। এপ্রিলে সেই দুপক্ষের সংঘাতে ৪ জন নিহত হন। এর মাত্র এক বছরের মাথায় ২০১৭ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে মতবিনিময় সভা চলাকালে সংঘর্ষে নিহত হন একজন। সবশেষ শনিবার (১৭ এপ্রিল) শ্রমিক অসন্তোষের জের ধরে আবারও পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে ৫ জন নিহত হয়েছেন।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোপুরি স্থাপন না হতেই পাঁচ বছরের মধ্যে সংঘাতে ১০ জনের প্রাণহানির পর প্রশ্ন উঠেছে, কী কারণে বারবার বাঁশখালীর এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে এমনটি ঘটছে?

ডয়েচে ভেলে শ্রমিকদের অভিযোগ উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, “তাদের বেশ কয়েক মাস ধরে নিয়মিত বেতন দেয়া হচ্ছিল না৷ সেই সঙ্গে তারা বেতন বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন৷ রোজার মাসে কাজের সময় পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছিলেন তারা, তাও মানা হচ্ছিল না৷ এছাড়াও শ্রমিকদের অভিযোগ সেখানে পানি ও টয়লেটের সংকট রয়েছে৷ আট ঘণ্টার পরিবর্তে ১০ ঘণ্টা কাজে বাধ্য করা হয়৷ তাদের সাথে সবসময় খারাপ ব্যবহার করা হয়৷ এনিয়ে তারা ১১ দফা লিখিত দাবি দিয়েছিল৷ শুক্রবারও তাদের কাজ করতে হয়৷ এনিয়ে শুক্রবার তারা বিক্ষোভ করেন৷ শনিবার সকালে তারা আবার বিক্ষোভ করলে তা দমনে গুলি চালানো হয়৷”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘‘শ্রমিকদের মধ্যে বেতন  ও কর্মঘণ্টা নিয়ে অসন্তোষ ছিলো৷ তবে শনিবারের বিক্ষোভে শ্রমিক ছাড়াও স্থানীয় লোকজন অংশ নেয়৷ তারা গাড়ি পোড়ায়, ভাঙচুর করে৷ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে৷’’

২০১৬ সালে যখন প্রথম বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে-বিপক্ষে স্থানীয় জনমত বিভক্ত হয়, তখন বিপক্ষে থাকা লোকজনকে সংগঠিত করেন লিয়াকত আলী। এখন তিনি ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন তিনি। ২০১৬ সাল থেকেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সংঘাতের পেছনে কর্তৃপক্ষ এই লিয়াকত আলীকেই দায়ী করে আসছে।

এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টের চিফ কো-অর্ডিনেটর ফারুক আহমেদ দাবি করেন, স্থানীয় একটি গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে শনিবারের ঘটনা ঘটিয়েছে। আরেক কর্মকর্তা আকিজ উদ্দিন একই অভিযোগ করে বলেন, “শ্রমিকদের হাতে অস্ত্র থাকার কথা নয়। এর পেছনে নিশ্চয় কোনো ষড়যন্ত্র আছে।” বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা আগেরগুলোর মতো সবশেষ সংঘাতের পেছনেও লিয়াকত আলীকে দায়ী করেন। তাদের দাবি, শ্রমিক সরবরাহের কাজটি তিনি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই কাজ তিনি না পাওয়ায় নতুন করে আবারও অস্থিরতা তৈরি করছেন।

তবে লিয়াকত আলী বিবিসিকে শনিবার ঘটনার পর বলেছেন, “বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে শ্রমিক সরবরাহ করে বাইরের কোম্পানি। তাদের সাথে শ্রমিকদের টাকা পয়সা নিয়ে অনেকদিন ধরেই সমস্যা চলছিলো। ঘটনাটি কম্পাউণ্ডের ভেতরে। আমাদের সেখানে প্রবেশও করতে দেয়া হয় না।”

স্থানীয় সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলেও মনে করেন। তার দাবি, এর পেছনে স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের তৎপরতা রয়েছে। তাদের কারণেই বারবার এখানে ঝামেলা হচ্ছে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) চট্টগ্রামের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী প্রশ্ন তোলেন পুলিশের গুলি চালানোর যৌক্তিকতা নিয়ে।

তবে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, ”পুলিশ সেখানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। চারপাশ থেকে ইটপাটকেল মারা হচ্ছিল। তাদের সামনে পিছনে যাওয়ার মতো কোন অবস্থা ছিল না।” এঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের কথাও জানান তিনি।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান বলেন, “আমাদের কাছে ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ আছে। সেগুলোর ভিত্তিতে আমরা তদন্ত করে এর পেছনের মূল কারণ উদ্ঘাটন করবো।”

চীনের সাথে যৌথ উদ্যোগে দেশের বৃহৎ শিল্প গ্রুপ এস আলম-এর কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপনের প্রাথমিক কাজ শুরু হয় প্রায় আট বছর আগে৷ এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৪০ হাজার কোটি টাকা৷ ২০২২ সাল নাগাদ কেন্দ্রটি উৎপাদনে যাওয়ার কথা৷ এই প্রকল্পে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানে ৩০ ভাগ বিনিয়োগ রয়েছে বলে জানা গেছে৷ বাঁশখালীর প্রত্যন্ত এলাকায় সমূদ্রের তীরে এর অবস্থান৷ ফলে সাংবাদিকরা বা প্রশাসন ওখানকার খোঁজ খবর তেমন পান না৷ পুলিশ ফাঁড়ি ছাড়াও কেন্দ্রটিতে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে৷ প্রায় তিন হাজার শ্রমিক সেখানে কাজ করেন৷ ব্যবস্থাপনায় চীনা নাগরিকরাও আছেন৷