।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

গণটিকাদান কর্মসূচি শুরুর পর রাজশাহীতে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে প্রথম ভ্যাকসিনটি নিয়েছিলেন ফজলে হোসেন বাদশা। দিনটি ছিলো ৭ ফেব্রুয়ারি। রাজশাহী-২ আসনের এই সংসদ সদস্য সেদিন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নিয়ে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে সংবাদমাধ্যমে কথাও বলেন। ৮ এপ্রিল দ্বিতীয় ডোজ নেন যথারীতি। সপ্তা না ঘুরতেই ওয়ার্কার্স পার্টির এই সাধারণ সম্পাদকের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, দুই ডোজ টিকা নেয়ার পরও কীভাবে সংক্রমিত হলেন ১৪ দলের এই অন্যতম শীর্ষ নেতা?

রামেক হাসপাতালে ফজলে হোসেন বাদশার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. খলিলুর রহমান বলেন, “যদ্দূর বুঝতে পারছি, ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ নেয়ার আগেই তিনি সংক্রমিত হয়েছেন। পরে উপসর্গ প্রকাশ পেয়েছে। এমন হলে তো ভ্যাকসিন ইমিউনিটি তৈরির আগে সংক্রমণ হতেই পারে।”

ভাইরোলজিস্ট ডা. সাবেরা গুলনাহারও মনে করেন, টিকা নেয়ার আগেই সংক্রমিত হয়েছিলেন ফজলে হোসেন বাদশা। তিনি বলেন, “করোনাভাইরাস সংক্রমণ করার সাথে সাথেই তো আর লক্ষণ প্রকাশ পায় না। এর ইনকিউবেশন পিরিয়ড আছে ১৪ দিন পর্যন্ত। কাজেই হিসেব করলে দেখা যায়, তাঁর (বাদশা) যে সময় থেকে উপসর্গ প্রকাশ পেয়েছে, তাতে ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ নেয়ার আগেই তার সংক্রমণ ঘটাই স্বাভাবিক।”

তাহলে প্রথম ডোজের পর কি ন্যূনতম প্রতিরোধও তৈরি হয় না? মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মাহবুবুর রহমান খান বলেন, “সহজবোধ্যভাষায় বললে প্রথম ডোজটি আসলে ভাইরাসটিকে পরিপূর্ণভাবে চেনার কাজটি করে প্রতিরোধের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। এরপর দ্বিতীয় ডোজ সম্পন্ন হলে তার থেকে সপ্তা তিনেকের মধ্যে ইমিউনিটি তৈরি হয়। কাজেই এই মধ্যবর্তী সময়ে সংক্রমণ ঘটতে পারে। “

এই তিন চিকিৎসকই জোরালোভাবে মনে করেন যে, ভ্যাকসিনের ডোজ সম্পন্ন করার পর নয়, ফজলে হোসেন বাদশার সংক্রমণ হয়েছে আগেই। ভ্যাকসিন নেয়ার পর উপসর্গ দেখা দেয়ায় নমুনা পরীক্ষা হয়েছে এবং তখনই শনাক্ত হয়েছে।

সংক্রমণের পর নেয়া ভ্যাকসিন কি কাজ করবে?

তাহলে কি ফজলে হোসেন বাদশার শরীরে ওই ভ্যাকসিন কাজ করবে? যে কারো ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটলে তার জন্য কি পরে আবার ভ্যাকসিন নিতে হবে? অধ্যাপক ডা. খলিলুর রহমান জানান, এ ধরনের ক্ষেত্রে সংক্রমণ মুক্ত হওয়াটা জরুরি সবার আগে। করোনামুক্ত হলে এরপর নতুন করে আর ভ্যাকসিন লাগবে না। ওই ভ্যাকসিনই প্রতিরোধ তৈরি করবে।

জানতে চাইলে ডা. মাহবুবুর রহমান খান বলেন, “আমার তো মনে হয় না, এটা কোনো সমস্যা হবে। বরং ভ্যাকসিন আগের সংক্রমণ প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখতে পারে। এটা যদি ভ্যাকসিন নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা তৈরি করতো, তাহলে নিশ্চয়ই তা নেয়ার আগে সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে করোনা পরীক্ষা করানো হতো এবং নেগেটিভ হলেই তবে দেয়া হতো। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়।”

ডা. খলিলুর রহমান বলেন, “এ কারণেই বারবার করে বলা হচ্ছে যে, ভ্যাকসিন নিলেও স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে পুরোপুরি। এছাড়া কোনো উপায় নেই।”

ডা. মাহবুবুর রহমান খান বলেন, “আমাদের এই ভ্যাকসিন প্রথম দফার যে কোভিড নাইনটিন, তা প্রতিরোধে সক্ষম। কিন্তু এখন তো আরও নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট আসছে। সেগুলোর ক্ষেত্রে কিন্তু আরও সতর্কতা প্রয়োজন। এর বাইরে ভ্যাকসিন নিলে হয়তো আপনি নিরাপদ থাকলেন। কিন্তু আপনি স্বাস্থ্যবিধি না মানলে ছড়ানোর কাজটা করতেই পারেন। সে কারণে ভ্যাকসিন নিলেও স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মানা এখন একমাত্র উপায়।”

বাদশার শারীরিক অবস্থা এখন কেমন?

বৃহস্পতিবার (১৫ এপ্রিল) দুপুরে ১৪ দলের এই নেতাকে যখন রাজশাহী শাহমখদুম বিমানবন্দর থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নেয়া হয়, তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি কাজী শাহেদ। তিনি জানান, ফজলে হোসেন বাদশা নিজে হেঁটেই গাড়ি থেকে নামেন। তার সঙ্গে টুকটাক কথাও হয়। এসময় তিনি শাহেদকে জানান, করোনার সাধারণ উপসর্গের বাইরে খুব বেশি শারীরিক অসুস্থ্যতা তিনি বোধ করছেন না।

তাকে ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় রামেক হাসপাতালের ১৪ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড। সেই বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. খলিলুর রহমান জানান, ফজলে হোসেন বাদশার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও উন্নত চিকিৎসার সুযোগ থাকায় তাকে ঢাকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ড।

জানতে চাইলে ডা. খলিলুর বলেন, “এখানে আমরা যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি, তাতে খুব সামান্য একটা অস্বাভাবিকতা আছে, যেটা শুরু থেকে পরিপূর্ণ চিকিৎসা পেলে ভয়ের কিছু নেই।”

বোর্ডের দুই সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওয়ার্কার্স পার্টির এই নেতার সিআরপি বেশি ছিলো। সেই সঙ্গে ডি-ডাইমেন পরীক্ষায় খানিকটা উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে। সাধারণ পাঠকের বোধগম্য করতে তারা জানান, সাধারণত ফুসফুসে সংক্রমণের ক্ষেত্রে সেখানে রক্ত জমাট বাধে। এই ডি-ডাইমেন পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায়, কী পরিমাণ রক্ত জমাট বেঁধেছে। দশমিক ৬ অবধি এই মাত্রা স্বাভাবিক মনে করা হয়। তার বেশি হলেই বুঝতে হবে, ফুসফুস সংক্রমিত হয়েছে। ফজলে হোসেন বাদশার ক্ষেত্রে এই মাত্রা ২ এর কিছু বেশি। অর্থ্যাৎ কিছুটা সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা আছে, যা শুরু থেকেই চিকিৎসার মাধ্যমে ঠিক করা সম্ভব।

ওই দুজনের একজন জানান, সাংসদের ডায়াবেটিস ও অ্যাজমার সমস্যা আছে আগে থেকেই। সে কারণে মূলত এমন পরিস্থিতিতে তাকে ঢাকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় ফজলে হোসেন বাদশাকে বিমান বাহিনীর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার সঙ্গে থাকা একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, এরই মধ্যে তার সিটিস্ক্যান করা হয়েছে। তার অবস্থা এখন স্থিতিশীল। অক্সিজেন স্তর ভালো আছে বলেও সূত্রটি জানিয়েছে।

সন্ধ্যায় তার সবশেষ পরিস্থিতি জানাতে তার ব্যক্তিগত সহকারী কামরুল হাসান সুমন ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, “জননেতা ফজলে হোসেন বাদশা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। করোনা শনাক্ত হওয়ার পর সংক্রমণের সাধারণ উপসর্গ আছে। তবে এখনো তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল আছে। অক্সিজেন স্যাচুরেশনও ভালো। আশা করি, শিগগির তিনি করোনামুক্ত হয়ে ফিরবেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে দয়া করে কেউ অনাহূত তথ্য দেবেন না কোথাও। আর এই সময়ে আমাদের প্রিয় নেতার চিকিৎসার সুবিধার্থেই তাঁকে কিংবা তাঁর সঙ্গীদের ফোন দেয়া থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করছি। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী-২ আসনের সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা আপনাদের সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, উদ্বিগ্ন না হয়ে নিজ নিজ স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ও মাস্ক পড়তে।”