সুজিত সরকার

।। সুজিত সরকার ।।

বাঙালির হাজার বছরের উৎসব নববর্ষ। এ দেশের সকল ধর্ম-সম্প্রদায়ের মানুষ এই উৎসবের আয়োজনে মেতে ওঠে। পণ্ডিতেরা মনে করেন দেশের রাজস্ব সংগ্রহের সময় বৈশাখ। এ সময় কৃষকদের ঘরে চৈতালি ফসল, বোরো ধান ওঠে। ঘরে খাদ্যাভাব অনেকটাই কমে যায়। কৃষকদের কাছ থেকে ফসল সংগ্রহের মধ্যে দিয়ে রাজস্ব কোষাগার পূর্ণ করার সুবিধা হয়। এই রাজনীতিক কৌশল শাশ্বত কালের। জমিদারি আমলেও একই কৌশলে সংগ্রহ করা হতো। সম্প্রতি রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রশাসনিক রূপান্তরের ফলে সারা বছরই রাজস্ব সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু সারা বছর বর্ষ বিদায় ও বরণ হয় না। শেষ চৈত্রে যেমন বাঙালি নদীতীরে কিংবা লোকালয়ে বর্ষ বিদায় ও বরণের আয়োজন করে, তেমনি করে মেলার আয়োজন। গ্রামে নববর্ষে নানা ধরনের খেলাধুলা এবং নদী অঞ্চলে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা হতে দেখেছি। সম্প্রতি মানুষের ইলেক্ট্রনিক্স বিনোদনের ফলে এই উৎসব অনেকটা কমে গেছে। গত বছর থেকে কোভিড ১৯-এর ফলে তার আয়োজন স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার কারণে একেবারেই পরিবারের চৌহদ্দির মধ্যে প্রবেশ করেছে। কোভিড ১৯ জনজীবনের স্বাভাবিক ব্যবস্থাকে তার একক ক্ষমতাবলে প্রতিহত করছে। ফলে বছর শেষে বর্ষ বিদায় ও বরণের জন্যে যে অধীর অপেক্ষা তা গত বছর থেকে আক্রান্ত হচ্ছে।

বাঙালির অন্যতম অসাম্প্রদায়িক উৎসব নববর্ষ। কৃষিপ্রধান দেশের অধিকাংশই নাগরিক কৃষক। তারা এককভাবে হিন্দু বা মুসলমান নয়। শ্রেণি বিচারে খাদ্য উৎপাদনশীল কর্মী। গার্মেন্ট বলা হোক আর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স যা-ই বলা হোক, এ দেশের অর্থনীতিক চালিকাকাঠি কৃষি। খাদ্য হচ্ছে বেঁচে থাকার একমাত্র ও মৌলিক পণ্য। মানুষ উলঙ্গ থাকতে পারে, কিন্তু অনাহারে থাকতে পারে না। সারা দেশে যে পরিমাণ খাদ্য প্রতিদিন প্রয়োজন হয়, তার যে অর্থমূল্য, সেটা বাৎসরিক রেমিটেন্স আর গার্মেন্টস থেকে আয় হয় না। বিধায় কৃষিপণ্যের মূল্য অনেক বেশি। নাগরিক জীবন ব্যবস্থার প্রচার অধিক হওয়ায় কৃষিপণ্যে এবং কৃষকদের শ্রমলব্ধ আয়ের মূল্য নির্ধারণ করতে পরিসংখ্যানবিদরা উৎসাহী হন না। তাই নববর্ষ কিংবা বসন্ত উৎসব এখন নাগরিকদের দখলিভুক্ত। ফলে তার আয়োজন নাগরিক স্পর্শে রঙিন হয়ে উঠেছে। না হলে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কহীন সঙ্গীতাসরের আয়োজন হয় কী করে! সে আসরে আয়োজকেরা যে গান পরিবেশনের আয়োজন করে, তার কথা ও সুর, তার নৃত্য সবই দিবসের আয়োজনকে ব্যঙ্গ করে। গ্রামে সেটা হয় না। আলকাপ গান কিংবা গম্ভীরা দিবসের মূল চেতনার সঙ্গে ভীষণভাবে সম্পৃক্ত। দিনের অর্থ ও জনজীবনের প্রতিনিধিত্ব করে। হাস্যরসের মাধ্যমে জনজীবনকে এতো শিল্পীতভাবে দর্শকদের প্রত্যক্ষ করাতে সক্ষম যে তা আর কিছু দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। শেষ চৈত্রের চড়ক পূজো কিংবা সিদ্ধিসেবী হিসেবে প্রচারিত শিব পূজো ও সে উপলক্ষে মেলা একটি জনপদকে উৎসবমুখর করে তোলে। ঘরে ঘরে নাইয়রি (শশুরবাড়ি থেকে আসা মেয়ে) এবং আত্মীয়-স্বজন আসে। তখন গ্রাম উৎসবের আমেজে মুখরিত হয়ে ওঠে। আজকে কোভিড সে আয়োজনেও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। উপরন্তু ইলেক্ট্রনিক্স প্রচার মাধ্যম বিকৃতভাবে হলেও তাদের রঙিন পর্দায় বৈশাখের যে আয়োজন করে তার আনন্দেও গৃহবন্দি গৃহবাসী উপভোগ করে ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটা’য়। বিকল্প নেই।

কর্পোরেট পুঁজি জনজীবনকে এই ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো’রই আয়োজন করেছে। সবকিছুর নিয়ন্ত্রক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। আজকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যারা বিশ্বাসী এবং ধর্মান্ধ যারা পদে পদে বিজ্ঞানকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিপক্ষ মনে করে, তারাও কর্পোরেট পুঁজির করতলে বন্দি। এর বাইরে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা তারাও করতে পারেনি। পারলে কবে বিশ্বের নানা দেশে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তিত হতো কিংবা ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা হতো। যে কারণে অর্থাৎ পারেনি বলে যে পুরোহিত শ্রেণির কুপরামর্শে কপারনিকাশ-ব্রুনো-ওমর খৈয়াম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, সেই তারাই ঘোষণা দিয়ে বিজ্ঞানকে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। না হলে তাদের ঘরে এসি-ফ্রিজ-ওভেন ইত্যাদির সেবা কী করে তারা নিতো?

সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন ঘটছে। বিজ্ঞান সব কিছুর আয়োজন। নববর্ষ যে মাত্রিকতা আমরা ভাবছি, তারও পরিবর্তন, অর্থ-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, সেটাও আপ্তবাক্য উচ্চরণ করে সান্ত্বনা খোঁজা মাত্র। ডিম একবার অমলেট হলে তাকে আর ডিমে রূপান্তর করা যায় না। বরং অমলেটটাকে স্বতন্ত্র ব্যঞ্জন হিসেবে প্রস্তুত করা যায়। এই অমলেটকে আমরা জীবন-বহির্ভুত সাংস্কৃতিক ধারায় রূপান্তর করেছি। সেটা সম্রাট আকবরের সভাপণ্ডিত আবুল ফজল কিংবা তারও আগে চাণক্য প্রমুখের সময়কালের বৃত্তে আবদ্ধ করতে কেউই সম্মত নয়। বরং নতুনকে জীনব-ঘনিষ্ট করতে সবার আগ্রহ ও উদ্দীপনা বড়ো কথা। যা জীবনের সঙ্গে যুক্ত নয়, তার কতোটা উৎসব ও শিল্প সেটাও আমাদের ভেবে দেখতে হবে। কোভিড ১৯ নিরন্তরভাবে থাকলেও তার আক্রমণ প্রতিরোধ ও প্রতিহত করে কীভাবে আমাদের নানা উৎসব আনন্দমুখর করা যায়, আজকে সে ভাবনা গুণী ও বিদ্বানদেরই ভাবতে হবে। তবেই কোভিড ১৯ শুধু নয়, সকল প্রতিবন্ধকতা উতরে আমরা নতুন করে নববর্ষের আয়োজন করতে পারবো। সেটাও হবে নববর্ষের নব চমক। সবাইকে সববর্ষের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।

সুজিত সরকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠক