।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

দুই রাজার আমুদেপনা আর ভূগোলের মানচিত্র চিড়ে ভারত বিভাজনকালে ছন্নছাড়া হওয়া— ইতিহাসের দুই নির্মম বিদ্রুপের নিষ্ঠুর দৃষ্টান্ত হয়ে তারা ৬৭ বছর ধরে ছিলেন রাষ্ট্রহীন। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থলসীমা বিনিময় সম্পন্ন হলে তারা পান রাষ্ট্রের পরিচয়। ১৬২ ছিটমহলের মধ্যে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অবস্থিত মোট ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের ৩৮,৫২১ জন মানুষের মধ্যে ৯৮৯ জন বেছে নেন ভারতের নাগরিকত্ব। বাংলাদেশে থেকে যাওয়া মানুষগুলোর জীবন তো আমূল বদলে গেছে। কিন্তু যে কজন ভারতে গিয়েছিলেন, তারা কেমন আছেন?

ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানাচ্ছে, ভালো নেই তারা। প্রত্যাশা মাফিক কোনোকিছুই মেলেনি— আইই’র প্রতিবেদক জয়প্রকাশ দাসকে এমন অভিযোগের কথাই জানিয়েছেন তারা। জয়প্রকাশ লিখেছেন, “ছিটমহলের বাসিন্দারা অনেক আশা-ভরসা নিয়েই এসেছিলেন এদেশে। তবে সুখ-শান্তি তো দূরের কথা, বড় দুঃখ-কষ্টেই দিন অতিবাহিত হচ্ছে ৫৮টি পরিবারকে। এখন তাঁদের বড্ড আপশোষ। দুটো লোকসভা(একটা উপনির্বাচন), একটা পঞ্চায়েত, একবার বিধানসভায় ভোট দিয়েছেন। বিধানসভা নির্বাচনের দুদিন আগেই দিনহাটার আবাসনে ৬ বছর আগে এপারে আসা ছিটমহলের বাসিন্দারা জানিয়ে দিলেন, তাঁরা এখানে এসে সব হারিয়েছেন। ফিরে যেতে চান আগের জায়গায়। রাষ্ট্রহীন জীবনে নাগরিকত্ব পেয়েছেন, তবে তাঁরা মনে করছেন ভারতে এসে জীবন বিপন্ন হয়ে গিয়েছে।”

বৃহস্পতিবার (৮ এপ্রিল) জয়প্রকাশ দিনহাটায় গিয়ে মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলেন। নতুন আবাসন লাগছে কেমন? তার এমন প্রশ্নের জবাবে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ওসমান গণি বলেন, “আমাদের ঘরের কোনও কাগজপত্র নেই। সেটেলমেন্ট ক্যাম্পে তবু সরকারি কাগজ ছিল। তাছাড়া কর্মসংস্থান থেকে কোনও প্রতিশ্রুতি রাখেনি সরকার।” ওসমানের বাবা-মা যাননি। তাঁরা থেকে গিয়েছেন কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারিতে। ওসমানের কথায়, “তখন সরকার বলেছিল যা বাজেট রয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। এখানে যাঁরা এসেছে সবাই দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছে।”

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস প্রতিবেদককে ওসমান বলেন, “ভেবেছিলাম ধনী দেশ। এখানে এলে লাভ হবে। এখন মনে হচ্ছে ওখানে ভালই ছিলাম। এসে ভুল করেছি। এদেশে এসে কষ্ট বেড়েছে। সীমান্তে গিয়ে ছেড়ে দিলে ওপারেই চলে যাব।”

জয়প্রকাশ লিখেছেন, পেটের তাগিদে এই ভূমি ছেড়ে কাজের জন্য দিল্লি ও দেশের অন্যত্রও পাড়ি দিতে হয়েছে কিছু যুবককে।

বাংলাদেশে যে দাসিয়ারছড়া পাকা সড়ক-পাকা বাড়ি-বিদ্যুৎ সংযোগসমেত এখন খোলনলচে বদলে গেছে, সেখান থেকে ভারতে যাওয়া বেশ কটি পরিবারের দেখা যান জয়প্রকাশ। তার ভাষায়, সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধি দেখেই ক্ষোভ উগরে দিলেন নারায়ণ চন্দ্র বর্মন, নরেশ বর্মন, কামিনী বর্মন, রঞ্জিত বর্মনরা। কী পেয়েছি এখানে এসে, সব কিছু হারিয়ে গিয়েছে জীবন থেকে। সকলের মুখে একই কথা। বছর তিরিশের কামিনী বর্মনের চারজনের সংসার। তিনি বলেন, “ভারত সরকার ভূমিহীন করে দিল। কোনওরকমে দিন গুজরান চলছে। যা কাজ জোটে তাই করি। পুরনো ছিটমহলে ফিরিয়ে দিলেও আমি চলে যাব। এভাবে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে?” নরেশ বর্মন বলেন, “আমাদের হাজারো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তার একটাও পূরণ করা হয়নি। আমরা একজোট হয়ে জেলাশাসককে (জেলাপ্রশাসক) স্মারকলিপি দিয়েছি। কোনও কাজ হয়নি। এখানে এসে যন্ত্রণার জীবন বয়ে বেরাচ্ছি।”

প্রতিবেদনে জয়প্রকাশ আরও লিখেছেন- অভিযোগ শুধু ঘরের কাগজ, নিজের নামে বিদ্যুৎ বা কর্মসংস্থান নয়। একেবারে যেন নেই রাজ্যের বাসিন্দা হয়ে রয়েছেন অধুনা ছিটমহলের বাসিন্দারা। ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে এই আবাসনে নিয়ে আসা হয়েছিল গত বছর সেপ্টেম্বরে। তারপর থেকে শুধুই হতাশা। জন্ম সার্টিফিকেট নিয়ে সমস্য়া, স্বাস্থ্য সাথীর কার্ডে কোনও সুরাহা হচ্ছে না বলেও তাঁদের দাবি। ৫৯ বছরের গীতা বর্মনের দাবি, “একাধিকবার বিধবাভাতার জন্য আবেদন করলেও মেলেনি।” গৃহবধূ ভারতী বর্মনের কথায়, “এদেশে থেকে কী হবে, ওদেশে ফিরিয়ে দিলেই ভাল হয়।” ৭২ বছরের রজনীকান্ত বর্মনের গলার স্বর যেন রুদ্ধ হয়ে আসে। বৃদ্ধের খেদ, “ওখানে বিঘে ছয় জমিও ছিল। এদেশে এসে পায়ের তলার মাটিটা সরে গিয়েছে।”