আরাফাত রুবেল

।। আরাফাত রুবেল ।।

একটা সময় ছিল যখন ভাবা হতো চাষাবাদ বা গবাদি পশু লালন-পালন কেবল গ্রামের মানুষেরই কাজ। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই ধারণা পাল্টেছে। এখন কেবল গ্রামের মানুষই নন, শহুরে মানুষও কৃষি কাজ ও গবাদি পশু পালন করে জীবন-জীবিকা চালাচ্ছেন।

দারিদ্র্য, ঘনবসতি, নগরজীবনের নানা অনিশ্চয়তা আর জলবায়ু পরিবর্তনের ভেতর বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও টিকে থাকার মূল জায়গাটি হচ্ছে কৃষক সম্প্রদায়। নদীমাতৃক ও কৃষিপ্রধান অঞ্চল হিসেবে প্রাচীনকাল থেকে এই সবুজ বাংলার রয়েছে আলাদা একটা গুরুত্ব। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময় থেকেই এই বাংলাকে শাসককুল ভেবেছে এক শস্যভাণ্ডার হিসেবে। হাজার বছরের ঐহিত্যে লালিত বাংলার মানুষকে নদী, বিল, হাওর লালিত প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থেকে জীবনযাপন কিংবা ক্ষুধা নিবারণের চিন্তায় কখনো ব্যাকুল হতে হয়নি। শাসকদের শত রকমের শোষণের ভেতরও তারা প্রকৃতির দিকে তাকিয়েই টিকে থাকার নিশ্চয়তা পেয়ে গেছেন। প্রকৃতিই তাকে শক্তি ও স্বস্তি দুই-ই দান করেছে।

সময়ের বিবর্তনে আমরা স্বাধীন সত্তায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়কালে ৭ কোটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থার ভেতরে টিকে থাকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না। খেয়ে পরে বেঁচে নিজস্ব ভূখণ্ডে নিজেদের মতো এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ছিল সুনিশ্চিত। সেখানে ছিল জাতিসত্তার পরিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের চিন্তা। নদীমাতৃক উর্বর ভূমির এই দেশে কখনো খাদ্যে সংকট আসবে- এই চিন্তা ছিল না কারোরই।

নতুন দেশের কৃষিসহ সার্বিক উৎপাদন কাঠামো এগিয়ে নেয়ারও ছিল কার্যকর নানা পদক্ষেপ। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের পদক্ষেপগুলো এ জাতির টিকে থাকার ক্ষেত্রে এক বড় আশীর্বাদ হয়ে আছে এখনো। এক্ষেত্রে শুধু একটি উদাহরণই যথেষ্ট ১৯৭১ সালে সদ্য স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশটিতে উৎপাদিত ১ কোটি টন খাদ্যশস্য ৭ কোটি মানুষের খাদ্যের নিশ্চয়তা দিয়েছে, আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে এসে তার চেয়ে কম জমিতে সে সময়ের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদিত হচ্ছে এবং প্রায় ১৬-১৭ কোটি মানুষ সেই খাদ্যশস্যের ওপর নির্ভর করে টিকে আছে। এই টিকে থাকাটিই আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উন্নয়নশীল দেশটিতে এখন প্রায় ১৭ কোটি লোকের বসবাস। যা কিনা সমগ্র বিশ্বে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

এ দেশেই সবচেয়ে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জিত হয়েছে কৃষি খাতে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমির বিপরীতমুখী চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশের বর্তমান খাদ্যশস্য উৎপাদন ১৯৭২-৭৩ সালের তুলনায় প্রায় চার পাঁচ গুণ বেড়েছে। পৃথিবীবাসীর সামনে বাংলাদেশ যতই ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত হোক, যতই উদ্বেগ ছড়িয়ে যাক না কেন, এই একটি সাফল্যই বলে দিতে পারে, আগামীর বাংলাদেশ নিশ্চয়ই যে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সাফল্যের সঙ্গে টিকে থাকার শক্তি রাখে। আমাদের কৃষি খাত এখন যথেষ্ট শক্তিশালী। বিশেষ করে ধান, গম, ডাল, ফল ফলাদি, শাক সবজি পাশাপাশি পুষ্টির জন্য দুধ ডিম মাংস উৎপাদনেও রয়েছে আমাদের বিশাল সাফল্য।

এখন আর আমাদের খাদ্যের জন্য অন্য কারও দিকে চেয়ে থাকতে হয়না, আমরা নিজেরাই স্বয়ংসম্পূর্ণ। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্য মতে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয়। গেল কয়েক বছর যাবৎ তা ধরে রেখেছে বাংলাদেশের কৃষকরা। ২০০৬ সালে যেখানে সবজি উৎপাদন ছিল ২০ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। সেখানে গেল ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে দেড় কোটি মেট্রিকটন সবজি উৎপাদন হয়েছে। দেশের উত্তর এবং দক্ষিণাঞ্চলে সবজি চাষে সবচে বেশি সাফল্য এসেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাফল্য ছিল অভাবনীয়। বর্তমান সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং ভিশন ২০২১ এর আলোকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক কার্যকরী ও ফলপ্রসূ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে বিগত ২০১৩-১৪ অর্থবছর শেষে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন বেড়ে যথাক্রমে ৬০.৯০ লাখ মেট্রিক টন, ৪৫.২০ লাখ মেট্রিক টন ও ১০১৬.৮০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ সুপেয় পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে এবং ইলিশ মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রথম স্হানে রয়েছে।

বলা যায়, কোভিড-১৯ এর দুঃসময়ে কঠিন বাস্তবতাই দেশের নির্ধারণে অবদান রাখা প্রত্যেকটি মানুষের চোখকেই টেনে এনেছে কৃষির দিকে। দেশের নীতিনির্ধারক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ি, অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের বড় অংশটি এখন ভাবতে শুরু করেছে কৃষির উন্নয়ন ছাড়া এই দেশটিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। সরকারও বর্তমান ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলোকে সামনে এনে আগামীর কৃষি পরিকল্পনাকে রাখছে উন্নয়ন পরিকল্পনার শীর্ষবিন্দুতে। গোটা পৃথিবীর আজকের খাদ্য উৎপাদন প্রেক্ষাপট, আমাদের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ, বিশ্ববাজার, বিশ্বের উন্নত কৃষি প্রযুক্তি ও ফর্মুলাগুলোর অনেকাংশই এখন সরকারের নীতিপরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এগুলো অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক চিত্র। আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ জনসংখ্যার চাপ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণই এখন সকল পক্ষের প্রধান তাগিদ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণের স্বার্থেই কৃষির দিকে বহুমুখী দৃষ্টিপাত এখন সময়েরই চাহিদা। পৃথিবীর কৃষি উন্নত দেশগুলো যেভাবে তাদের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থেই কৃষির জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, কলাকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে, এই দৌড়ে এগিয়ে চলেছি আমরাও। আমাদের কৃষিক্ষেত্রে ফসল উৎপাদন পূর্ববতী প্রায় শতভাগ যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে। কিন্তু ফসল উৎপাদন পরবর্তী যান্ত্রিকীকরণে আমরা পিছিয়ে আছি।

বিভিন্ন ফল ফসলের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এখনো গড়ে ওঠেনি। কয়েকটি কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেশকিছু কৃষিপণ্য শিল্পপণ্যে রূপ দিচ্ছে এবং দেশে বিদেশে ব্যবসার প্রসার ঘটাচ্ছে। এটি কৃষি অর্থনীতির জন্য অনেক ইতিবাচক দিক। কিন্তু এই ধারাবাহিকতায় সারা দেশেই বহুসংখ্যক কৃষি শিল্প গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আজকের কৃষির গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম আগ্রহী হচ্ছে কৃষিতে বিনিয়োগে। দেশের অধিকাংশ এলাকায় এক দুইজন করে শিক্ষিত তরুণ যুক্ত হচ্ছে কৃষির সঙ্গে। তারা বিনিয়ো

আজকের কৃষির গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম আগ্রহী হচ্ছে কৃষিতে বিনিয়োগে। দেশের অধিকাংশ এলাকায় এক দুইজন করে শিক্ষিত তরুণ যুক্ত হচ্ছে কৃষির সঙ্গে। তারা বিনিয়োগ করছেন কৃষিতে। দেশ বিদেশ হতে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে অনেকেই কৃষিকাজে উৎসাহিত হচ্ছে। দ্রুত সাফল্যের উদাহরণও গড়ছে। এই শিক্ষিত তরুণদের উৎসাহকে ধরে রাখার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কিছু উদ্যোগ থাকতে হবে। বিশেষ করে, তাদের ঋণ সুবিধা, কৃষি আবাদে প্রযুক্তিগত পরামর্শ প্রদান এবং কৃষির টেকসই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের ধারণা দেয়া। কৃষিতে বিনিয়োগ কখনো দ্রুত লাভের মুখ দেখালেও অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারের মন্দা পরিস্থিতি, রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ ইত্যাদি কারণে সব সময়ই লোকসানের ঝুঁকি থেকে যায়। এ বিষয়গুলো মোকাবেলা করার মতো অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা এসব শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রদান করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবেই আসবে সাফল্য।  

আরাফাত রুবেল রাজশাহীতে বসবাসকারী একজন তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা