কাজী শাহেদ

।। কাজী শাহেদ ।।

বাংলায় ‘বেহাত বিপ্লব’ টার্মটি মূলত ইতালির দার্শনিক অ্যান্তোনিও গ্রামসির ‘প্যাসিভ রেভুল্যুশন’ টার্মের ভাবার্থ। ভুল না হয়ে থাকলে, সম্ভবত, সলিমুল্লাহ খান বাংলায় এই রূপান্তরিত টার্মটি প্রথম ব্যবহার করেন। ‘বেহাত বিপ্লব ১৯৭১’ নামের বইটি সম্পাদনার মধ্য দিয়ে তিনি গ্রামসির এই টার্মটিকে বাংলায় রূপ দেন।

সলিমুল্লাহ লিখেছেন- “প্রকৃত কোন পরিবর্তন সাধন না করেও জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের আপাতস্বাদ এনে দেয়ার নামই ইতালীয় দার্শনিক আন্তনিয়ো গ্রামসির দৃষ্টিতে বেহাত বিপ্লব। এই বিপ্লবের নাম ইতালি ভাষায় ‘ইল ফাশিসমো’ বা লাঠিতন্ত্র।” 

সলিমুল্লাহ খান মূলত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে কীভাবে ‘বেহাত বিপ্লব’ সাধিত হলো, তা নিয়ে কথা বলেছেন। তার বইয়ে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা’ নামে আহমদ ছফার একটি লেখা গ্রন্থিত হয়েছে। বইটি যখন প্রকাশিত হয় তখন বাংলাদেশে সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক শাসন ও জরুরি অবস্থা চলছে। তখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ পদটি মূলনীতি হিসাবে ফেরত আসেনি। সলিমুল্লাহ খান বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতার একটি সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখেছেন সেই বইয়ে। নাম দিয়েছেন ‘ছফা চন্দ্রিকা: বেহাত বিপ্লব ১৯৭১’। সেখানে তিনি লিখেছেন –

“এদেশের বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা কেন ধর্মনিরপেক্ষ নয়? যারা নিত্য এই নালিশ করেন, তাদের বুকে হাত দিয়ে পোছ করা উচিত: এদেশ কি সত্য সত্য জাতিনিরপেক্ষ? এদেশ কি শ্রেণীনিরপেক্ষ? শেষ কথাঃ এদেশ কি আদৌ গণতান্ত্রিক? ‘গণতন্ত্র’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’ ‘পদ’ দুটি বাংলাদেশের মূলদলিলে এখনো বহাল। তবে তাদের ‘পদার্থ’ এখন অন্য। একই কথা কিন্তু বলা চলছে না ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বা ‘সমাজতন্ত্র’ সম্পর্কে। সেই জায়গায় এখন অন্য পদার্থ মাত্র নয়, অন্য পদও এসেছে। কিভাবে সম্ভব হল এই বিপ্লব? এই চোরা পরিবর্তনেরই অপর নাম ‘প্যাসিভ রেভল্যুশন’, বেহাত বা হস্তান্তরিত বিপ্লব (গ্রামসি ১৯৭৩)। এই পালটা বিপ্লবের গোড়ার কথা অনেক দিগন্তপ্রশস্ত অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে বিশদ করেছিলেন মহাত্মা আহমদ ছফা।”

এই ‘বেহাত বিপ্লব’ নিয়ে ভাবতে গিয়ে দেখছি, বাংলাদেশের বামপন্থিদের একটি বড় অংশ তাদের ‘বিপ্লবী’ সংগ্রামের বেশিরভাগই শেষাবধি হারিয়ে ফেলেন। তা সে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক ছাত্র আন্দোলন হোক, কিংবা নানা ইস্যুর গণআন্দোলন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এমন দৃষ্টান্ত নতুন নয়। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে আমাদের বামপন্থিদের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই এই ‘বেহাত বিপ্লব’ যেনো নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রতিটি ‘বেহাত বিপ্লব’ই বাংলাদেশের উত্তরণের বদলে এই রাষ্ট্রটিকে ক্রমাগতভাবে বিপদের ঝুঁকিতে ফেলেছে। সংগ্রামী হন বামপন্থিরা, আর শেষ বেলায় তার সুফল চলে যায় প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে। তখন বামপন্থিরা হন ‘না ঘর-কা, না ঘাট-কা’। রাষ্ট্র তখন পুরোদমে চলে যায় বাংলাদেশ-বিরোধীদের দখলে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের যে নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড, তার দায় হয়তো আমরা গুটিকয় সামরিক বাহিনীর পথভ্রষ্ট সদস্যের ওপর দিয়েই হাঁফ ছাড়ি। কিন্তু সেই ঘটনার আগে দেশে বামপন্থি অনেক সংগঠনের যে তৎপরতা, তাও  পটপরিবর্তনের দুঃসাহস জুগিয়েছিলো কি না, সে বিতর্কের মীমাংসা কিন্তু এখনও হয়নি। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের মাঝের এই সময়টাতে বামপন্থিদের অনেকেই তাদের ‘কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ’ না পেয়ে নানা কায়দায় মাঠে নেমেছিলেন। কিন্তু কতটা বিকল্প তৈরি রেখেছিলেন তারা? যদি রাখতেনই, তাহলে পঁচাত্তরের পর বাংলাদেশ-বিরোধী শক্তির হাতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কি যেত?

যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই, সেই সময়টাতে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে অনেককিছুই ঘটেছিলো প্রত্যাশার বাইরে, তাহলে সেই তর্কের সূত্র ধরে পাল্টা প্রশ্ন করতেই হয়, পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের চাকা কোন পথে ঘুরেছিলো? কেন দীর্ঘকাল এদেশে পাকিস্তানপন্থিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছিলো। জাগোদল কিংবা হক-তোয়াহাদের ভূমিকা বিশ্লেষণের কাজে না নেমেও স্পষ্ট বোঝা যায়, বামপন্থিদের সেই কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র তো আসেই নি, উল্টো সব চলে গিয়েছিলো দেশবিরোধীদের কব্জায়। বহু বছর পর আমরা সেইসব ‘বিপ্লবী’দের উত্তরসূরিদের দেখতে পাই ফের সেই দেশবিরোধীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। কিন্তু মাঝখানের এই যে সময়টা, যে সময়ে সাম্প্রদায়িক শক্তি রাষ্ট্রের আনুকূল্যে ফুলেফেঁপে উঠেছিলো, তা কি ফেরানো সম্ভব হয়? ‘বেহাত বিপ্লব’-এর ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে?

আমরা ছোটখাটো সংগ্রামেও দেখেছি সবকিছু ‘বেহাত’ হয়ে যেতে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর আন্দোলন-সংগ্রামের সুফল নিয়ে জামায়াতে ইসলামী নামের দেশবিরোধী সংগঠনটির ছাত্র সংগঠনকে মোটাতাজা হতে দেখেছি। হ্যাঁ, প্রকাশ্যে অনেকেই স্বীকার করেন না বটে। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলুক দেখি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ধিত বেতন-ফি আন্দোলনের সুফল কাদের হাতে গিয়েছে? কিংবা ইয়ার সেমিস্টার আন্দোলনের মূল ফলটা কারা ভোগ করেছে? সবশেষ ভর্তি ফি আন্দোলনেও তো আমরা দেখেছি, বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর ডাকা কর্মসূচির সুযোগে ছাত্রশিবিরের তাণ্ডব।

ছোট ছোট এসব সংগ্রামের ফলটাই যখন নিজেদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারেননি, তখন কীভাবে আরও বড় সংগ্রামকে যুক্ত করবেন নিজেদের সঙ্গে? এই প্রশ্নের জবাব মেলানোর ধারেপাশেও না গিয়ে বারবার একই চক্রের মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে আদতে কোনো ফলাফল কি আসছে? নাকি ‘বেহাত বিপ্লব’-এর গোলকধাঁধায় ঘুরে মরতে হচ্ছে?

একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখছি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফর নিয়ে। তার বিরুদ্ধে যত যত অভিযোগ, সেগুলো অবশ্যই বিচার্য। বিশেষ করে ভারতের মতো একটি রাষ্ট্রকে ধর্মভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পরিচালিত করার প্রবণতা মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু একথা অস্বীকার করি কী করে যে, তিনি বাংলাদেশে এসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। ভারত নামক রাষ্ট্রের জনগণেই তাকে সেই ম্যান্ডেট দিয়েছেন।

সেই মোদীর আগমনের বিরুদ্ধে আমাদের দেশের কিছু বাম সংগঠন ভীষণ সরব। তাদের সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরও বেশি সরব। কিন্তু তাতে লাভটা কী হলো? শেষ বিচারে এসে এই পুরো বিষয়টির নিয়ন্ত্রণ তো চলে গেলো হেফাজতে ইসলামের মতো একটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হাতে। এই হেফাজতের পেছনে যে জামায়াতে ইসলামও সক্রিয় তা বুঝতে রকেট সায়েন্স পাঠ করার দরকার নেই। কিন্তু এমন অনিবার্য পরিণতির শঙ্কা কেন যে সেইসব বামপন্থি দলগুলোর মাথায় এলো না, বুঝে ওঠা দুস্কর।

এখন এর ফলাফল কি তাদের অনুকূলে যাবে, নাকি বাংলাদেশের জনগণের অনুকূলে? যদি ধরেও নিই যে, সাকি-নূরের এই মিথস্ক্রিয়ায় সিপিবি-বাসদের একাংশের যোগসূত্রকে সমর্থনের হাতিয়ার বানিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার বদল ঘটলো। তারপর? তারা কি পারবেন রাষ্ট্রটাকে জনগণের কাছে নিতে? তারা কি বিকল্প তৈরি করেছেন কোনো? বাংলাদেশের একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে তাদের কতজন কর্মী আছেন? সমর্থক? না, নেই। সেই পরিস্থিতি তারা তৈরিই করতে পারেননি। কাজেই সেই সুফল তাদের হাতেই যাবে, যারা ধর্মের নামে ভুলিয়ে ভালিয়ে প্রান্তিক মানুষকেও নিজেদের খপ্পরে আনতে চান। সেক্ষেত্রে লাভটা কাদের হবে? এদেশের ইতিহাসের চাকাটা উল্টোপথে ঘোরার ব্যাপারটাকে তারা ঠেকাবেন কী দিয়ে? নাকি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল অবধি তাদের পূর্বসূরীদের কর্মফল থেকেও তারা শিক্ষা নেননি?

মোদীর এই সফর নিয়ে ভারতেও, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে মোদী-বিরোধী বলয়ের অনেকে উল্টো কথা বলছেন। কিন্তু তারাও কি ভেবে দেখেছেন যে, এই ডামাডোলের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশে যে ধর্মকে পুঁজি করে রাজনীতি করা শক্তিগুলো সক্রিয় হচ্ছে, তার সুফল আসলে কার ঘরে যাবে? নাকি আবেগের বন্যায় সবাই নিজেকে ভাসিয়ে পুরো অঞ্চলটাকেই প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে তুলে দেয়ার আয়োজন সম্পন্ন করছেন?

ইতিহাস সাক্ষী, এই উল্টো পথে যাত্রা শেষাবধি কারো জন্যই সুখকর হয়নি। ‘বেহাত বিপ্লব’ ফিরে আসেনি হাতে কোনোকালেই। সেই বিবেচনাটুকু বেমালুম গায়েব করে দিয়ে, বিকল্প কোনো রাজনৈতিক দিশা না দেখিয়ে শুধুই প্রতিক্রিয়াশীলদের শক্তিশালী করার, তাদের হাতে ইস্যু-অস্ত্র আর জনসমর্থন তুলে দেয়ার এই প্রক্রিয়া ইতিহাসের বিচারে সেই অপ্রস্তুত ‘বিপ্লবী’দেরকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।

কাজী শাহেদ রাজশাহীতে বসবাসকারী একজন সংবাদকর্মী ও সাংবাদিক নেতা