তামিম শিরাজী

।। তামিম শিরাজী ।।

ইতিহাসের পরিক্রমায় পঞ্চাশ বছর তেমন কিছুই নয়, তবে বছরের হিসেবে অনেকটা সময়। স্বাধীন বাঙ্গালি জাতি এই পঞ্চাশ বছরে কতটা এগুলো বা পেছালো, তা নিরূপণ করা ঐতিহাসিক পরিক্রমায় অযৌক্তিক হলেও সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে আমরা বোধহয় তা করতে পারি। আজকের এই লেখার মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের মৌলিক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে সময়গত কী কী পরিবর্তন হয়েছে তা খুঁজবার চেষ্টা করবো। আমি আমার লেখাটিকে দুই ভাগে ভাগ করতে চাই- ক) জনজীবনে বাংলাদেশ ও খ) রাষ্ট্রীয় জীবনে বাংলাদেশ। জনজীবনে বাংলাদেশ অংশে আমি আলোচনা করবো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে মৌলিক বিষয়গুলোর পরিবর্তন, উন্নতি-অবনতি নিয়ে এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে বাংলাদেশ অংশে আলোচনা করবো রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের মৌলিক বিষয়গুলো কী কী ছিল, তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিনা বা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের মৌলিক বিষয়গুলোর রূপরেখা কেমন হওয়া উচিৎ সেসব বিষয়ে।

জনজীবনে বাংলাদেশ

হেনরি কিসিঞ্জারের তলাবিহীন ঝুড়ি আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে নিজেকে সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত করেছে। বাংলাদেশ আজ সেই ঝুড়িতে পরিণত হয়েছে যার তলা আছে ঠিকই, কিন্তু সেই তলার গভীরতা নির্ণয় করা বেশ কঠিন।তাইতো বাংলাদেশ একের পর এক সাফল্য আর উন্নয়নকে নিজের ঝুড়িতে সমবেত করে চলেছে।এই পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে যার মূলে আছে অর্থনৈতিক পরিবর্তন। যদিও একথা সত্য যে দেশের মোট সম্পদের বেশীরভাগ অংশ এখনও জনাকয়েক লুটেরার হাতে জমা হয়েছে তবুও মানুষের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা অনেকটাই বেড়েছে। দেশে একেবারে হতদরিদ্র, ছিন্নমূল কিংবা অর্থাভাবে অনাহারী মানুষের সংখ্যা এখন কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে।

এই সেদিন, আমার ছোটবেলায়ও আমি দেখেছি, আমাদের বাসায় মানুষ শুধু তিনবেলা খাওয়ার জন্য কাজ করেছে। এখন সেই দৃশ্য বদলেছে। সেসব মানুষ এখন গার্মেন্টসে কাজ করছে, অটো রিক্সা চালাচ্ছে, বিভিন্ন সড়ক ইমারত নির্মাণে কাজ করছে। কেউ কেউ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হচ্ছে। যদিও বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে এসব যুক্ত, তবুও এতে বাঙালির নিজস্বতা আছে। এই উন্নয়নে নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষ এবং সরকারের প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে। গ্রামগুলোতে এখন উন্নত সড়ক, বিদ্যুৎসংযোগ, স্কুল হাসপাতাল এমনকি প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতেও বর্তমানে পৌঁছে গেছে ইন্টারনেট সেবা। কৃষক ইন্টারনেটের মাধ্যমে কৃষির অবস্থা, বীজ সার সম্পর্কে তথ্য পাচ্ছে। একাত্তরে এগুলো কি ভাবাও গিয়েছিলো?

বাংলাদেশকে ডিজিটালাইজেশনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শহরগুলোতে হয়েছে, গ্রাম পর্যায়ে খানিকটা বাকি। মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা। বাংলাদেশ খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্নতা অর্জন করেছে। আগেই বলেছি দেশে একবেলা না খেয়ে আছে এমন মানুষ নেই বললেই চলে। গৃহহীন ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যাও পূর্বের তুলনায় অনেক কম। চিকিৎসা ও শিক্ষাতেও বাংলাদেশ অভাবনীয় সফলতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন প্রায় ৭২ বছর যা ১৯৭২-৭৩ সালে ছিল ৪৭ বছর। মানব উন্নয়ন সমীক্ষা-২০২০ মতে মানব উন্নয়নে বাংলাদেশ বর্তমানে ১১৩তম দেশ। দক্ষিণ এশীয় ৮টি দেশের মধ্যে যা পঞ্চম অবস্থান। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৯০-২০১৯ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়েছে ১৪ দশমিক ৪ বছর, গড় শিক্ষাকাল বেড়েছে ৩ দশমিক ৪ বছর এবং প্রত্যাশিত শিক্ষাকাল বেড়েছে ৬ বছর। মাথাপিছু আয় বেড়েছে প্রায় শতকরা ২২০ দশমিক ১ ভাগ। দেশের বর্তমান সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ।

এছাড়াও দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এবং নারীশিশুর ক্ষেত্রে দশম শ্রেণি পযর্ন্ত অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে। এছাড়াও মাধ্যমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে বই বিতরণ করা হচ্ছে প্রতিবছর। এসব মৌলিক বিষয় ছাড়াও নারীর ক্ষমতায়ন, সমুদ্র বিজয়, নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু, রেকর্ড পরিসাণ ব্যাংক রিজার্ভ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটসহ অনেক অনেক সফলতা নিজের দখলে নিয়েছে বাংলাদেশ। সেসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না। তবে বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের অবস্থান একটু দেখে নেওয়া দরকার।

  • মাথাপিছু আয়: বাংলাদেশ ২০৬৪ মার্কিন ডলার-পাকিস্তান ১১৩০ মার্কিন ডলার
  • জিডিপি প্রবৃদ্ধি: বাংলাদেশ ৫.২ – পাকিস্তান ০.৪
  • ব্যাংক রিজার্ভ: বাংলাদেশ ৪২ বিলিয়ন ডলার – পাকিস্তান ২০.৮ বিলিয়ন ডলার
  • গড়আয়ু: বাংলাদেশ ৭২ বছর – পাকিস্তান ৬৭ বছর
  • শিশু মৃত্যুর হার: বাংলাদেশ ২৫ (প্রতি হাজারে) – পাকিস্তান ৫৯ (প্রতি হাজারে)
  • প্রাথমিক শিক্ষা: ৯৮ শতাংশ – পাকিস্তান ৭২ শতাংশ
  • প্রাইভেট ব্যাংক সংখ্যা: বাংলাদেশ ৪৪টি – পাকিস্তান ২২ টি     

এই পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায় কতোটা এগিয়েছি আমরা। বাঙালির জাতীয় জীবনে অনেক অনেক সমস্যা আছে যা নিয়ে মাঝে মধ্যেই লিখতে হয় তাই আজ বিশেষ কিছু অপ্রাপ্তির কথা ঘটা করে আর বলতে বসলাম না। চলুন, এবার যাওয়া যাক লেখার দ্বিতীয় ভাগে।

রাষ্ট্রীয় জীবনে বাংলাদেশ

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্য দিয়ে অজস্র রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত দেশ এই বাংলাদেশ। সে মহান মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হল কিনা তা কিন্তু দেখবার বিষয়। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন তো দূরের কথা আমাদের দেশের সূর্য সন্তানদের ঠিকমতো সম্মানটুকুও বোধয় দিতে পারিনি আমরা। এটি অত্যন্ত লজ্জার বিষয় যে, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরে এসে এখনো মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা করতে পারিনি আমরা। তালিকা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে আমার শহর রাজশাহীতেও এবং এনিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বেশ অসন্তোষ এবং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া চলমান। চলছে রাস্তায় প্রতিবাদও।

রাষ্ট্রজীবনে বাংলাদেশের পদযাত্রা থমকে যায় ৭৫-এর কলঙ্কিত অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে। সপরিবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ছিল মূলত বাংলাদেশের যাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার প্রয়াস, যা দেশি বিদেশি চক্রান্তে সংঘটিত হয়। তবে থামিয়ে দেওয়া যায়নি বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা। বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে বারবার নিজের অবস্থান জানান দিয়েছে। দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, দেশের মৌলিক রাজনৈতিক চরিত্রের রূপরেখা আজ অবধি নিরূপণ হয়নি। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত হলেও মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা, শহিদের সংখ্যা নিয়ে আজও বিতর্ক করে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। লজ্জার বিষয় হলেও সত্য, মৌলিক এই বিষয়গুলো আজো আমরা সমাধান করতে পারিনি। পঞ্চাশ বছর পরেও মুক্তিযুদ্ধের সময় সমাধান হয়ে যাওয়া এই মৌলিক বিষয়গুলো আজও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয় ইচ্ছাকৃতভাবেই। দেশে আজও মুক্তযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি রাজনীতিতে সক্রিয়। বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভোট রাজনীতির কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি।

বাংলাদেশ হবে একটি অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র-এমনটাই কথা ছিল। দেশের কৃষক, শ্রমিক, মজুর এবং সাধারণ মানুষ আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচবে, শ্রমের মূল্য পাবে তারাই হবে দেশের সর্বেসর্বা। মুক্তিযুদ্ধ এসব ভিত্তিতেই হয়েছিল। তবে দুঃখের বিষয় সেসব খুব একটা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আজো মানুষ জিম্মি। সাধারণ মানুষের প্রকৃত মুক্তি এখনো আসেনি। বাংলাদেশের সংবিধানে আনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার যে চার মূলনীতির কথা উল্লেখ আছে তা যথাক্রমে ১) জাতীয়তাবাদ ২) সমাজতন্ত্র ৩) গণতন্ত্র ৪) ধর্মনিরপেক্ষতা- যা আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ৭২-এর সংবিধান বিভিন্ন সময় সুবিধামতো কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। অথচ, এই চার মূলনীতিই বাংলাদেশের মূলভিত্তি। প্রকৃত অর্থে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে এই চার মূলনীতির বাস্তবায়নের কোনই বিকল্প নেই। এই চার মূলনীতির মধ্যেই নিহীত আছে বাঙালির প্রকৃত মুক্তি, বাঙালির আকাঙ্ক্ষা আর বাংলাদেশের মৌলিক চরিত্র। তাই এই চার মূলনীতির বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

জাতির কলঙ্ক দূর করতে এই সরকারের দুটি পদক্ষেপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার অন্যটি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার।এই দুটি পদক্ষেপ মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে আরো মজবুত করেছে তবে ব্যর্থতার বিষয় এই, মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দল, দেশে সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রমৌলবাদ আর জঙ্গিবাদের জনক সেই জামায়াতে ইসলামীকে আজো নিষিদ্ধ করা যায়নি। একাত্তরে তারা আল বদর,রাজাকার,আল শামস গঠন করে যেমন নিরীহ বাঙালিদের উপর অত্যাচার করেছে, আজও ঠিক একইভাবে ছাত্র শিবির, জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাহিনী, হেফাজতে ইসলাম ইত্যাদি নাম নিয়ে ধর্মের বাতাবরণে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। বাংলাদেশের প্রধানতম শত্রু এরাই। এদের রাজনীতি আইন করে বন্ধ করতে হবে। 

আমাদের পঞ্চাশে এসে বলতে চাই. অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। অনেক জায়গায় অনেক ঘাটতি আছে, রাষ্ট্রীয় এবং জনজীবনে অনেক অনেক সমস্যা আছে, তারপরও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ, এগিয়ে যাবে। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ-এটিই আমাদের চাওয়া। সুবর্ণজয়ন্তীর এই আনন্দক্ষণে দেশের জন্য কাজ করার প্রত্যয় হোক আমাদের আগামীর অঙ্গীকার। জয়বাংলা।

তামিম শিরাজী রাজশাহীতে বসবাসকারী একজন ছাত্রনেতা