।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দিনটিও ছিলো আজকেরই মতো শুক্রবার। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদাররা নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বিশ্ব ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যাটি চালায়। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন সে রাতেই। সঙ্গে দলীয় নেতা-কর্মী ও সাংবাদিকদের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা। সেই কালরাতেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আটক করে বঙ্গবন্ধুকে। জারি করা হয় কারফিউ। ২৬ মার্চ সেই শুক্রবারে ঢাকা ছিলো ফাঁকা। সেনাদের টহল ছিলো রাস্তায় রাস্তায়।

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর, গণপরিষদে সংবিধান বিল গৃহীত  হওয়ার পর এক ভাষণে শেখ মুজিব ২৫শে মার্চ রাতের কথা স্মরণ  করে বলেন, “যখন আমি বুঝতে পারলাম, আমার আর সময় নেই এবং আমার সোনার দেশকে চিরদিনের জন্য ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে, তখন আমার মনে হলো, এই বুঝি আমার সময় শেষ। তখন আমি বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম, কেমন করে বাংলার মানুষকে এ খবর পৌঁছিয়ে দিব এবং আমি তা দিয়েছিলাম তাদের কাছে।”

২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির আশপাশে রেকি করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। এরপর তাঁর বাড়িতে প্রচণ্ড গুলিবর্ষণ শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু পরিস্থিতি বুঝে পুলিশের সাহায্যে ওয়ারলেস ব্যবহার করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে। সিরাজুল আলম খানের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ২৬ মার্চ ভোর ৫টা পর্যন্ত লালবাগ থানার ওসির রুমে ছিলেন এবং সেখান থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা শোনেন। 

বঙ্গবন্ধু সেই বার্তায় বলেন, “এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতে পিলখানার ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরে লোকদের হত্যা করছে। ঢাকা, চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। আমি বিশ্বের জাতিগুলোর কাছে সাহায্যের আবেদন করছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ- দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনাদের পাশে এসে যুদ্ধ করার জন্য পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান। কোন আপোস নাই, জয় আমাদের হবেই। আমাদের পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রুকে বিতাড়িত করুন। সব আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং অন্য দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতাপ্রিয় লোকদের এ সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ আমাদের মঙ্গল করুন। জয় বাংলা।”

বঙ্গবন্ধু-কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেরাতের স্মৃতিকথায় বলেন, “১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা হয়েছিল আমাদের বাড়ি। রাত ১২-৩০ মিনিটে আব্বা স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বার নির্দেশ দেন। আর সেই খবর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে চট্টগ্রাম পৌঁছে দেওয়া হলো পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী। এ খবর পাকিস্তানী সেনাদের হাতে পৌঁছাল। তারা আক্রমণ করল বাড়িটিকে। ১টা ৩০ মিনিটে তারা আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। আজো মনে পড়ে সেই স্মৃতি। লাইব্রেরি ঘরের দক্ষিণে যে দরজা, তার পাশে যে টেলিফোন সেটটি ছিল, ঐ জায়গায় দাঁড়িয়েই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিয়েছেন। যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বার নির্দেশ দিয়েছিলেন।”

স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের চরমপত্রের পরিচালক, লেখক ও কথক এম আর আখতার মুকুলের ভাষ্যমতে, “২৫ মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণের পর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি টেলিফোনে সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফ অফিসে জানান। সেখান থেকে এটি চট্টগ্রামের এম এ হান্নান এর কাছে পৌঁছায়, যা তিনি বেতারে পাঠ করেন।”

২৫ মার্চ সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় কারফিউ। ২৬ মার্চ ঢাকা থেকে সব বিদেশি সাংবাদিকদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়। সোভিয়েত টেলিভিশনের প্রতিবেদক বরিস কালিয়াগিন এবং ইজভেস্তিয়া পত্রিকার প্রতিবেদক ভ. স্কসিরিওভ তাদের স্মৃতিকথায় লিখেছেন-

“সূর্য যখন পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে, তখন ঢাকার রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সেনা প্রহরা নিয়ে রাষ্ট্রপতির কালো ‘মার্সিডিজ’। মুহূর্তের জন্য বিমানবন্দরে ঢোকার দরজার কাছে একটু থামে, তারপর গাড়িটি সোজা চলে আসে রানওয়েতে, পাকিস্তান বিমানবহরের সাদা-সবুজ বোয়িংয়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। প্লেনটি ওড়ার জন্য তৈরি। তেল নেওয়া হয়েছে, প্লেনের স্টাফরা উড়ানোর জন্য প্রস্তুত। গন্তব্য করাচি।

পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তাঁর পূর্বদিকের প্রদেশের এই রাজধানীতে আগেও এসেছেন অনেকবার। এর আগে প্রতিবারই তাঁর বিদায়ের সময় উপস্থিত ছিল স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন। কিন্তু এবার, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে, সেখানে ছিল উর্দিপরা লোকেরা। পুরো রাস্তা দখল করে দাঁড়িয়ে ছিল সৈন্যদল। বিমানবন্দরে তারাই ছিল সতর্ক প্রহরায়। বালুর বস্তা সামনে রেখে নিজেদের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করে তারা রাজধানীর দিকে উঁচিয়ে রেখেছিল তাদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র।

পরিবেশ ছিল অসম্ভব রকম থমথমে। অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মনে তখন আতঙ্ক। এই যাত্রীদের বেশির ভাগই পশ্চিম পাকিস্তানি—পাঞ্জাবি, পশ্তুন। মূলত ঢাকা ও বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে এসেছিলেন ব্যবসা করতে। পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে এখানকার রাজনৈতিক নেতারা অসহযোগ আন্দোলন শুরু করার পর এই ব্যবসায়ীরা পেয়েছেন প্রচণ্ড ভয়, তাঁরা পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে বিমানবন্দরে এসেছেন, প্লেনের টিকিটের জন্য কেরানিদের কাছে ধরনা দিয়েছেন। বিমানবন্দরে প্রেসিডেন্টের আগমন যাত্রীদের উত্কণ্ঠা দূর করল, যাত্রীদের মধ্যে যে ভয়ার্ত ফিসফিস চলছিল, তার অবসান ঘটল। অপেক্ষমাণ ব্যক্তিরা জানালা দিয়ে দেখতে লাগলেন প্রেসিডেন্টকে। আর তখন ঢাকার কেন্দ্রভাগে চলছিল মিছিলের পর মিছিল, অগণিত মানুষ এগারো তলার নির্মেদ ‘ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল’-এর পাশ দিয়ে এগিয়ে চলেছিল ধানমন্ডির ‘৩২ নম্বর’ সড়কের দিকে। সেখানেই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি।

যেদিন ইসলামাবাদে বসে জেনারেল ইয়াহিয়া খান রেডিওতে ভাষণ দিয়ে জানালেন, ১৯৭১ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে বিজয়ী দলের হাতে এখনই ক্ষমতা ছেড়ে দিতে তিনি প্রস্তুত নন, সেই পয়লা মার্চ থেকেই ঢাকায় বিক্ষোভ চলছে, থামছেই না। সামরিক স্বৈরাচার এর আগে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই ঘোষণার সঙ্গে তার কোনো মিল ছিল না। বাংলার কোটি জনতা, যাঁরা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁরা একে প্রেসিডেন্টের ওয়াদার বরখেলাপ হিসেবে চিহ্নিত করলেন। ঢাকায় এর প্রতিবাদে শুরু হলো হরতাল। প্রদেশের রাজধানীর জনজীবন থমকে গেল। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেল, বন্ধ হয়ে গেল দোকানপাট, থেমে গেল যানবাহন। পরদিনই সারা প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ল হরতাল। ইসলামাবাদের নির্দেশ এখানে কোনো কাজেই আসছিল না।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার জন্য মার্চের মধ্যভাগে ঢাকায় এলেও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে এই অসহযোগ আন্দোলন চলতেই থাকল। এই স্বৈরাচারী সেনা সরকার সত্যিই ক্ষমতা হস্তান্তর করবে, বাঙালিরা এ কথা একেবারেই বিশ্বাস করত না। জনসভায় নেতারা সরাসরি বলতে লাগলেন, প্রেসিডেন্ট ঢাকায় এসেছেন শুধুই কালক্ষেপণ করতে, আর তৈরি হচ্ছেন ঢাকায় দেশপ্রেমিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালানোর জন্য।

এই আশঙ্কাই সত্য হলো। জেনারেল ইয়াহিয়া শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক চালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবলেন না। ২৫ মার্চের প্রথম অর্ধবেলা কাটালেন সেনানিবাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে এবং তারপর চলে গেলেন বিমানবন্দরে। প্রেসিডেন্টকে বিদায় দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হলো খুব দ্রুত। সাদা-সবুজ বোয়িং বিমানটি আকাশে উড়ে গেল। এই বিমানটি পাকিস্তানে অবতরণ করার চার ঘণ্টা পর করাচির সেনানিবাস থেকে ঢাকায় এল কোড বার্তা। সেই নির্দেশ পেয়ে অপারেশনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করল পাকিস্তানি বাহিনী। পূর্ব বাংলার রাজধানীতে আঁধার নেমে আসতেই সৈনিকেরা অস্ত্র হাতে বেরিয়ে পড়ল, বের করা হলো ট্যাংক। প্রথম অস্ত্রের ঝংকার শোনা গেল রাত ১১টা ৩০ মিনিটের দিকে। রাতের আঁধারের সহায়তায় সামরিক শাসকের দল নির্যাতন চালাতে শুরু করল।

কেউ যেন অভিসন্ধি বুঝতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে সৈন্যদের পরিয়ে আনা হয়েছিল সাধারণ পোশাক। ২৫ মার্চের মধ্যেই প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল আর সে রাতেই সেনারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শান্তিকামী সাধারণ বাঙালিদের ওপর। সেনা স্বৈরাচারের এই পদক্ষেপে শঙ্কিত হয়ে পড়ল পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় সব দেশ। সোভিয়েত ইউনিয়নের সুপ্রিম সোভিয়েতের প্রেসিডেন্ট ন. ভ. পদগোর্নি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে এই মুহূর্তে রক্তপাত ও নৃশংসতা বন্ধ করার ও শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সংকট উত্তীর্ণ হওয়ার আহ্বান জানালেন। এ ধরনের মানবিক আবেদন, যা লেনিনের পররাষ্ট্রবিষয়ক ভাবনার প্রতিফলন, পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বাধানোর আগ পর্যন্ত তা নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন আহ্বান জানিয়ে গেছে। কিন্তু সে ন্যায় ও মানবতার আহ্বান সেনা স্বৈরাচারের কানে ঢোকেনি। ২৬ মার্চেই পাকিস্তান সরকার পূর্ব বাংলা থেকে বিদেশি সব সাংবাদিককে বের করে দেয়। তাই যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহের খবরাখবর বিচ্ছিন্নভাবে নানা মারফতে শোনা যায়। এই বিশাল হত্যাযজ্ঞের খবর কেবল তখনই প্রকাশিত হলো, যখন লাখ লাখ মানুষ নিজের মাটি ত্যাগ করে, ভিটা ত্যাগ করে ভারতে শরণার্থী হলো।”

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী আক্রমণের প্রথম হিটলিস্টে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলো ১৮ নং পাঞ্জাব, ২২ নং বেলুচ, ৩২ নং পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এবং কিছু সহযোগী ব্যাটেলিয়ন। এরা কারফিউ জারি হওয়ার সাথে সাথে ট্যাংক, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, রকেট লঞ্চার, ভারি মর্টার, হালকা মেশিনগান নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে এবং হলগুলোতে গণহত্যা শুরু করে। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, জগন্নাথ হল,এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছিল আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তু।

অসহযোগ আন্দোলন মূলত গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহরুল হক হলের আবাসিক ছাত্র তোফায়েল আহমেদ, আসম আবদুর রব ও শাহ চিশতী হেলালুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হওয়া সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদকে কেন্দ্র করে। তাই অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম লক্ষ্য ছিলো এই হলটি। হলটি নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়। ৭ জন শিক্ষকসহ প্রায় ২০০ জন ছাত্র-কর্মচারীকে পাকবাহিনী হত্যা করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্রলীগ নেতা শাহ চিশতী হেলালুর রহমানকে হলের ২১৫ নম্বর রুমে ঘুমন্ত অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

এরপরে হানাদার বাহিনী জগন্নাথ হলে মর্টার আক্রমণ চালায়। সেই সাথে চলতে থাকে অনবরত গুলিবর্ষণ। জগন্নাথ হলের উত্তর ও দক্ষিণের গেট দিয়ে ঢুকে নির্বিচারে প্রায় ৪১ জন ছাত্র ও ২১ জন কর্মচারীকে হত্যা করা হয়। হানাদার বাহিনী শহিদুল্লাহ হল এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে প্রবেশ করে অগণিত ছাত্র ও কর্মচারীদের হত্যা করে। রোকেয়া হলে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও বিহারীরা আক্রমণ করে হল কোয়ার্টারের ৪৫ জনকে হত্যা করে। ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ১০ জন শিক্ষককে হত্যা করা হয়। অপারেশন সার্চলাইটে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে।

এরপর পাকিস্তানী সেনারা রাজারবাগ পুলিশলাইনে আক্রমণ করে অগণিত পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে। সেখান থেকেই পাকিস্তানী আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ শুরু হয়। কিন্তু রাজারবাগ পুলিশলাইনের পুলিশেরা বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেনি পাকিস্তানীদের আধুনিক অস্ত্রের অনবরত আক্রমণের মুখে।

পুরো ঢাকা শহরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তাণ্ডবলীলা চালায়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পুরো ঢাকাকে মৃত্যুপুরীতে রূপান্তরিত করে। তারা ঢাকা শহরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা উড়িয়ে দেয়। এতে হাজার হাজার নিরীহ বাঙালি শহীদ হয়। ব্রিটিশ পত্রিকা ডেইলি টেলিগ্রাফের তত্কালীন সাংবাদিক সাইমন ড্রিংয়ের মতে, “২৫শে মার্চ রাতে ইকবাল হলের ২০০ ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় শিক্ষক ও তাদের পরিবারের ১২ জন নিহত হওয়ার সংবাদ পরিবেশিত হয়। পুরোনো ঢাকায় পুড়িয়ে মারা হয় ৭০০ লোককে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সূত্র থেকে যে বিবরণ পাওয়া যায়, তাতে ঐ রাতে শুধু ঢাকায় ৭ হাজার বাঙালি নিহত হয়।”

সেই সময়ের কারাবন্দি ড. মাহবুব উল্লাহর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ২৫ মার্চ রাত ও ২৬ মার্চ সারাদিন পাকিস্তানি সেনাদের অন্যতম টার্গেট ছিলো খাকি পোশাকের বাঙালিরা। তার ভাষ্যমতে, “

২৫ মার্চ রাতে ১১-১২টার দিকে ইনসেনডিয়ারি বোমা নিক্ষেপ করে আকাশ আলোকময় করে তোলা হচ্ছিল এবং থেমে থেমে গুলিবর্ষণের আওয়াজও শোনা যাচ্ছিল। সামরিক বাহিনী রাতের বেলা যদি অপারেশন চালায় তাহলে অন্ধকার ঘোচানোর জন্য এ বোমাটি ব্যবহার করে। কারাগারের ১৮ ফুট প্রাচীর অতিক্রম করে ফর্সা আকাশ দেখা গেছে। এমন সময় জেলার নির্মল রায় রাউন্ডে এসেছেন।

তার সঙ্গে জেল হাসপাতালের কম্পাউন্ডার এবং একজন সিপাহি, জেলখানার ভাষায় যাদেরকে মিয়া সাহেব বলা হয়, লণ্ঠন হাতে নিয়ে ছিলেন। জেলার সাহেবকে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, বাইরের পরিস্থিতি কেমন? উত্তরে তিনি খুব সংক্ষেপে নিচু গলায় বললেন, ভালো নয়। তিনি জানতেন, আমাদের বোঝার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। রাত ৩টার দিকে আইজি প্রিজনকে জগন্নাথ কলেজে অবস্থিত সামরিক ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, মার্চ মাসের প্রথম দিকে যে জেল বিদ্রোহ হয়, তার সঙ্গে বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের কোনোরকম ইন্ধন ছিল কিনা। তিনি স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন, এ ব্যাপারে তিনি আদৌ অবহিত নন। তাকে সকাল ৮টার দিকে পাকিস্তান বাহিনী তার বাসায় পৌঁছে দিল। সেই সময় খাকি পোশাক পরা বাঙালিরা ছিল পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর প্রধান টার্গেট। ২৫ মার্চ রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে অনেক পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে। দীর্ঘ কারাদণ্ডপ্রাপ্ত একজন কয়েদি মিটফোর্ড হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের জন্য ভর্তি হয়েছিল। সে হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে আমাকে বলেছিল, সে পুলিশের অনেক লাশ স্তূপীকৃত অবস্থায় দেখতে পেয়েছিল। ২৬ মার্চ সকাল ৯-১০টার দিকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল জেলের সিপাহিদের ডরমিটরি ঘেরাও করল।

তাদের লাইন ধরে দাঁড়াতে নির্দেশ দিল। তারা সবাই কলেমা পড়ে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিল। এখন শুধু স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে গুলিবর্ষণ করা হবে। কারণ তাদের পোশাকও খাকি। তারা শত্রু। এ সময় পাকিস্তানি সৈনিকদের কমান্ডার জেলে সিপাহিদের কাছ থেকে জানতে চাইল তাদের বস কে। তারা বললেন, তাদের বস হলেন আইজি প্রিজন। তাকে রাত ৩টায় গ্রেফতার করে সকাল ৮টায় ছেড়ে দিয়েছে। তবুও কমান্ডার একটু আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ওয়াপেস দে দিয়া?

সিপাহিরা সবাই বলল, ইয়ে সাচ্চা বাত হ্যায়। তারপর কমান্ডার বলল, ঠিক হ্যায়। আপলোগ আচ্ছা আদাম হ্যায়। আপনা আপনা ডিউটি খাস কারকে করো। এদিকে জেলের অভ্যন্তরে যেসব সিপাহি ডিউটি করছিল তারা ভয়ানক ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। তাদের মনে শুধু একটিই ভয়, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী খাকি পোশাক দেখতে পেলে রেহাই নেই। তাই তারা প্যান্টের ভেতরে গোঁছ মেরে লুঙ্গি পরেছিল। যেই মাত্র শুনতে পেল জেলগেটে আর্মি এসেছে, সেই মুহূর্তেই খাকি প্যান্ট শার্ট খুলে কেবল লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরে দাঁড়াল এবং থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। পড়তে থাকল নানারকম দোয়া দরুদ।”

২৫ মার্চের সেই রাতে রেহাই পায়নি পত্রিকা অফিসও। ২৬ মার্চ কোনো পত্রিকা তাই প্রকাশিত হয়নি। আবদুল গাফফার চৌধুরী ২৫, ২৬ ও ২৭ মার্চের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন-

“রাত যত বাড়ছিল, জয় বাংলা স্লোগানের আওয়াজ তত বাড়ছিল। মনে আশা জাগছিল, পাকিস্তানের সেনারা এবারও জয়যুক্ত হবে না। সম্ভবত রাত এগারো কি বারোটার দিকে রাজপথ থেকে আসা জয় বাংলা স্লোগান ক্রমেই স্তিমিত হয়ে এলো। তার বদলে রাইফেল, বন্দুক, কামানের গোলার শব্দ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। এবার ভয় পেলাম। থাকি সেন্ট্রাল ঢাকার কাছাকাছি হাটখোলা রোডের একটা বাই লেনে। ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলাম।

হঠাৎ টেলিফোন বেজে উঠল। রিসিভার তুলতেই শুনি মাহবুবুল হকের গলা। ‘পূর্ব দেশে’র সম্পদক। আমার বস। বললেন, ‘আর্মি তো রাস্তায় নেমেছে। কারফিউ জারি করা হয়েছে। শুনলাম, ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট খালি। পাখি কি উড়ে গেছে?’ মাহবুবুল হক বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির বাড়িকে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট আখ্যা দিয়েছিলেন। আর পাখি বলতে বোঝাছিলেন বঙ্গবন্ধুকে। তাঁর জিজ্ঞাসার অর্থ ছিল, বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বর ছেড়ে সরে গেছেন কি না? আমি জবাব দিলাম, মাহবুব ভাই, আমি বাসায়। বাইরের খবর কিছু রাখি না। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কেও কিছু জানি না। তিনি টেলিফোন রেখে দিলেন।

বাইরে তখন কী ভয়াবহ অবস্থা চলছে তা আমি অনুমান করতে পারিনি। রাত দুইটার দিকে ট্রাংকল এলো চট্টগ্রাম থেকে। এবার রিসিভার তুলতেই ড. আনিসুজ্জামান। তিনি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। ডক্টর এ আর মল্লিক তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। আনিসুজ্জামান আমার বন্ধু। তিনি বললেন, ড. এ আর মল্লিকের বাসায় তাঁরা আছেন। চট্টগ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে, ঢাকায় আর্মি নেমেছে। গুলিগোলা চলছে। খবরটা কি সত্য? আমি জবাব দিতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ খট করে টেলিফোন লাইন কেটে গেল। আমি ঘণ্টাখানেক ধরে চেষ্টা করেছি, টেলিফোন লাইন আর পাইনি। পরের দিন জানতে পেরেছি, ওই রাতেই ঢাকার সব টেলিফোন লাইন কেটে দেওয়া হয়েছিল।

সে রাতে আর ঘুমুতে পারিনি। মনে মনে আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা জানালাম। এই সময় স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে আমার সঙ্গে ঢাকায় নেই। টেলিফোন লাইন কাট। বাইরে কারফিউ। কারো খোঁজ-খবর নিতে পারব, তার উপায় নেই। ২৭ মার্চ ঘরে বসে আছি। বাইরে বেরোনোর সুযোগ নেই। ২৪ ঘণ্টার জন্য কারফিউ জারি করা হয়েছে। রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ শূন্য। সম্ভবত দুপুরের দিক। হঠাৎ দেখি, আগুনের লেলিহান শিখা। আমার বাসার পেছনের খোলা বারান্দা থেকে রামকৃষ্ণ মিশন রোডের বাড়িঘর দেখা যায়। অনুমান করলাম, ইত্তেফাক অফিসে আগুন লেগেছে। তখন ইত্তেফাক অফিস একতলা দালান। দোতলায় টিনের ঝুপড়ি বেঁধে নিউজ ডিপার্টমেন্ট করা হয়েছিল। দেখি, সেই দোতলা থেকে কাপড় ও দড়ি বেঁধে ঝুলে ঝুলে সিরাজুদ্দীন হোসেন ও হাবিবুর রহমান মিলন নামছেন। দোতলায় তাঁরা অনেকেই ছিলেন। আগুন লাগার ফলে সামনের সিঁড়ি দিয়ে নামার উপায় ছিল না। তাই ছাদের পেছন দিক দিয়ে দড়ি বেঁধে এই বিপজ্জনক পন্থায় জীবন বাঁচানোর চেষ্টা। পরে তো জেনেছিলাম, প্রেস ক্লাব ভবনে কামান দাগার পর পাকিস্তানের সেনারা ইত্তেফাক অফিসেও আগুন দিয়েছিল। ইচ্ছা ছিল সবাইকে পুড়িয়ে মারার।

শাহ আবদুল হালিম ছিলেন তরুণ শ্রমিক নেতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী ছিলেন। ২৭ ও ২৮ মার্চ দিন-রাত কারফিউ। ২৮ মার্চ সকালে চার ঘণ্টার জন্য কারফিউ বিরতি ঘোষিত হতেই সে তাঁর স্ত্রী ও শিশুকে নিয়ে আমার বাসায় হাজির। আমার বাসার কাছেই এক দোতলা ফ্ল্যাটে সে থাকে। সেই ফ্ল্যাটে কামানের গোলা এসে পড়েছে। দিনকয়েক আমার বাসায় সে থাকতে চাইল। বললাম, থাকো। এই বিপদের দিনে কাকে না বলব।

প্রায় একই সময় অবজারভারের পিয়ন এসে হাজির। হামিদুল হক চৌধুরীর হুকুম, সবাইকে অফিসে যেতে হবে। কোনো রকমে ব্রেকফাস্ট সেরে একটা রিকশা নিয়ে অবজারভারে ছুটলাম। রাস্তায় দেখি, ছেঁড়া রক্তমাখা ড্রেস পরা একদল পুলিশ যাচ্ছে। রাজারবাগে বাঙালি পুলিশ বিদ্রোহী হয়ে সারা রাত যুদ্ধ করেছে। পরাজিত হওয়ার পর অত্যাচারিত পুলিশদের বন্দি শিবিরে নেওয়া হচ্ছে।

অবজারভার হাউসে পৌঁছতেই দেখি, অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালাম, পূর্বদেশ সম্পদক মাহবুবুল হক এবং দুই পত্রিকার কিছু স্টাফ নিয়ে হামিদুল হক চৌধুরী মিটিং করছেন। উত্তেজিত কণ্ঠে বলছেন, নরমারলসি, দেশে এখন নরমালসি রেস্টোর করতে হবে। শেখ মুজিবের পাগলামিতে দেশ ধ্বংস হতে দেওয়া যায় না। আর্মি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে নরমালসি রেস্টোর করার কাজে সমর্থন দিতে হবে। যদি আপনাদের কারো এই ব্যাপারে অমত থাকে, তাহলে কাল থেকে এই অফিসে আসবেন না।”