।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

দুই দশক আগে শরীয়তপুরে আওয়ামী লীগ নেতা হাবীবুর রহমান ও তার ভাই মনির হোসেনকে হত্যার ঘটনায় ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. শওকত হোসাইন রোববার আলোচিত এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন।

এছাড়া মামলার জীবিত ৫২ আসমির মধ্যে তিনজনকে দুই বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন বিচারক। অপরাধে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় রায়ে ৩৯ জনকে খালাস দেয়া হয়েছে।

শরীয়তপুরের সাবেক সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা কে এম হেমায়েত উল্লাহ আওরঙ্গসহ তিন আসামি বিচার চলাকালেই মারা যান।

তবে রায়ে বাদী ও আসামি উভয়পক্ষই অসন্তোষ প্রকাশ করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা বলেছেন।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ছয় আসামি হলেন, শাহিন কোতোয়াল, শহীদ কোতোয়াল, শফিক কোতোয়াল, শহীদ তালুকদার, মো. মজিবুর রহমান তালুকদার এবং মো. সলেমান সরদার।

আর সরোয়ার হোসেন বাবুল তালুকদার, ডাবলু তালকুদার, বাবুল খান ও টোকাই রশিদকে যাজ্জীবন কারদণ্ড দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি তাদের ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে, অনাদায়ে আরও ৬ মাস করে তাদের জেল খাটতে হবে।

আসামিদের মধ্যে দুই বছর করে কারাদণ্ড হয়েছে মণ্টু তালুকদার, আসলাম সর্দার ও জাকির হোসেন মঞ্জুর। জীবিত আসামিদের বাকি সবাই খালাস পেয়েছেন।

এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শহীদ তালুকদার, শাহীন কোতোয়াল, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বাবুল তালুকদার, টোকাই রশিদ এবং দুই বছর কারাদণ্ডপ্রাপ্ত মজনু সরদার সহ পাঁচজন পলাতক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

সংসদ নির্বাচনের উত্তেজনার মধ্যে ২০০১ সালের ৫ অক্টোবর শরীয়তপুরের জেলা জজ আদালতের সাবেক পিপি হাবীবুর রহমান এবং তার ভাই মনির হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

ওই নির্বাচনে পালং-জাজিরা এলাকা নিয়ে গঠিত শরীয়তপুর-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন জাজিরা উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মোবারক আলী সিকদার। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন কে এম হেমায়েত উল্লাহ আওরঙ্গ জেব। আওরঙ্গের পক্ষে অবস্থান নেয় স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ।

তবে পহেলা অক্টোবর নির্বাচনের দিন সংঘর্ষের কারণে ১২টি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত হয়ে যায়। এ নিয়ে ৫ অক্টোবর শহরের পালং উত্তর বাজার এলাকায় হাবীবুর রহমানের বাসভবনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে একটি সভা চলছিল। সেখানে হামলায় হাবীবুর রহমান এবং তার ভাই মনির হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

হাবীবুর রহমান ছিলেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এবং জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তার ভাই মনির হোসেন ছিলেন পৌরসভা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।

ওই হত্যাকাণ্ডের পর হাবীবুর রহমানের স্ত্রী জিন্নাত রহমান বাদী হয়ে সাবেক সাংসদ আওরঙ্গসহ ৫৫ জনকে আসামি করে এ হত্যা মামলা করেন।

পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, পুলিশ তদন্ত শেষে তৎকালীন সংসদ সদস্য আওরঙ্গের নাম বাদ দিয়ে ২০০৩ সালে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। মামলার বাদী তাতে আদালতে নারাজি দেন। আদালত এ আবেদন নামঞ্জুর করলে বাদী জিন্নাত রহমান উচ্চ আদালতে রিট করেন।

আসামি সাংসদ আওরঙ্গ নানাভাবে মামলায় প্রভাব বিস্তার করছিলেন বলে অভিযোগ ছিল বাদীর। তবে ২০১৩ সালের ৩ অগাস্ট এক সড়ক দুর্ঘটনায় আওরঙ্গ মারা যান।

এরপর পুলিশকে মামলাটি পুনরায় তদন্ত করে অভিযোগপত্র দাখিলের নির্দেশ দেয় উচ্চ আদালত। পুলিশ ২০১৩ সালের অক্টোবরে আদালতে ৫৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

সাবেক সংসদ সদস্য আওরঙ্গ ছাড়াও এজাহারভুক্ত আসামি শাহজাহান মাঝি এবং স্বপন কোতোয়াল মারা যান।

পিপি মীর্জা মো. হযরত আলী জানান, এ রায় ঘিরে রোববার সকাল থেকেই আদালতপাড়ায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সকাল ৯টা থেকে সবাইকে তল্লাশি করে আদালত ভবনে ঢুকতে দেয়া হয়।

কারাগার থেকে ২৬ জন আসামিকে আদালতে আনা হয় এবং জামিনে থাকা ১৩ জন রায়ের আগে উপস্থিত হন।

দীর্ঘ শুনানি ও ২৮ জন সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ১৩৩ পৃষ্ঠার রায়ের বিশেষ বিশেষ অংশ পড়ে শোনান বিচারক।

নিহতের ছেলে ও শরয়িতপুর পৌরসভার মেয়র পারভেজ রহমান জন বলেন, “আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। মামলার মূল আসামিদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সাজা হয়নি। তাই আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।”

আসামিপক্ষের আইনজীবী মাসুদুর রহমান বলেন, মামলায় আসামিরা ন্যায় বিচার পাননি। তারাও উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।