।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

ছোট মাঠ, উইকেটও ব্যাটসম্যানদের জন্য নয় ভয়ঙ্কর কিছু। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটিং তো আত্মঘাতী, এই দলকে রক্ষা করবে কে। রান প্রসবা মাঠেই রানের জন্য হাপিত্যেশ করলেন ব্যাটসম্যানরা। বোলিংও তথৈবচ। সব মিলিয়ে নিউ জিল্যান্ডের সামনে দাঁড়াতেই পারল না বাংলাদেশ। সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশকে ৮ উইকেটে হারিয়ে আইসিসি ওয়ানডে সুপার লিগে যাত্রা শুরু করল নিউ জিল্যান্ড।

ডানেডিনে শনিবার টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে বাংলাদেশ ৪১.৫ ওভারে গুটিয়ে যায় ১৩১ রানে। কিউইদের জিততে লাগে মোটে ২২.২ ওভার।

আগে ব্যাট করে গত ৩ বছরে বাংলাদেশের সর্বনিম্ন স্কোর এটি। কিউইদের বিপক্ষে আগে ব্যাট করে ২০০৭ সালের পর সর্বনিম্ন।

ইউনিভার্সিটি ওভালের উইকেটে ছিল একটু বাড়তি বাউন্স। নিউ জিল্যান্ডে তা কিছুটা থাকেই। রোদের দেখা ছিল না বলে পেসারদের জন্য শুরুতে সহায়তাও কিছুটা ছিল। কিন্তু বিপজ্জনক কিছু নয়। দলকে ডোবায় ব্যাটসম্যানদের বাজে শট নির্বাচন। দলের ৬ ব্যাটসম্যান স্পর্শ করেন দুই অঙ্ক। কিন্তু সর্বোচ্চ মাত্র ২৭।

শুরুতে আর শেষে জোড়ায় জোড়ায় উইকেট নিয়ে নিউ জিল্যান্ডের বোলিং নায়ক ট্রেন্ট বোল্ট। আইসিসি ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ের সেরা বোলার এই ম্যাচেরও সেরা ২৭ রানে ৪ উইকেট নিয়ে। এমনকি জিমি নিশামের মিডিয়াম পেস, মিচেল স্যান্টনারের বাঁহাতি স্পিন, যে ধরনের বোলিং খেলতে বাংলাদেশ খুবই অভ্যস্ত, তাদেরকেও সামলাতে ব্যর্থ ব্যাটসম্যানরা।

বোল্ট বাংলাদেশকে ভড়কে দেন একতম শুরুতেই। ম্যাচের প্রথম বলটি করেন তিনি দুর্দান্ত আউটসুইঙ্গিং ইয়র্কার। অল্পের জন্য রক্ষা পান তামিম ইকবাল। বাংলাদেশ অধিনায়ক পাল্টা জবাব দেন তৃতীয় বলেই, স্ল্যাশ করে পয়েন্টের ওপর দিয়ে ছক্কা।

তবে সেই লড়াই বেশিক্ষণ জমতে দেননি বোল্ট। বাঁহাতি এই পেসারের অসাধারণ স্কিলের জবাব ছিল না তামিমের।

বাংলাদেশের টপ অর্ডার ও লেজে ছোবল দেন ট্রেন্ট বোল্ট। ছবি: টুইটার।বাংলাদেশের টপ অর্ডার ও লেজে ছোবল দেন ট্রেন্ট বোল্ট। বোল্টের কয়েকটি আউট সুইঙ্গার অল্পের জন্য তামিমের ব্যাটের কানা নেয়নি। আউট হওয়া বলটি সুইং করবে ভেবেই খেলেছিলেন তিনি। কিন্তু সেটি সুইং করেনি, সোজা গিয়ে লাগে প্যাডে। ১৫ বলে ১৩ রানে এলবিডব্লিউ তামিম।

দুই বল পরই বাজে শটে উইকেট বিলিয়ে ফেরেন সৌম্য সরকার (০)। অভিষিক্ত ডেভন কনওয়ে নেন নিজের প্রথম ক্যাচ। বাংলাদেশের বিপদ তখনই বাড়তে পারত আরও। নিউ জিল্যান্ডে আগেরবারের সফরে ৩ ওয়ানডে মিলিয়ে ৩ রান করা লিটন কুমার দাস এবার ৩ রানে দেন ক্যাচ। কিপার টম ল্যাথাম ঝাঁপিয়ে বলের নাগাল পাননি, অভিষিক্ত ড্যারিল মিচেল প্রথম স্লিপে সরাসরি হাতে পেলেও জমাতে পারেননি বল।

লিটন এরপর সময় নিয়ে থিতু হওয়ার চেষ্টা করেন। প্রথম বাউন্ডারির দেখা পান একাদশ ওভারে। যখন মনে হচ্ছিল তিনি দলকে এগিয়ে নিতে প্রস্তুত, তখনই হতাশাজনক বিদায়। নিশামের প্রথম ওভারেই শর্ট অব লেংথ বলে আলতো ক্যাচ তুলে দেন মিড অনে। ইনিংস শেষ হয় ৩৬ বলে ১৯ রান করে।

মুশফিকুর রহিমের গল্পও লিটনের মতোই। অস্বস্তিময় শুরুর পর কিছুটা লড়াই, আশা দেখানো ও আলগা শটে বিদায়। নিশামের বলে কাট করার জায়গা না থাকলেও সেই চেষ্টা করতে গিয়ে ক্যাচ দেন তিনি গালিতে (৪৯ বলে ২৩)।

নিশাম আর সৌভাগ্য মিলিয়ে ধরা দেয় পরের উইকেট। মাহমুদউল্লাহর জোরালো ড্রাইভে বোলার নিশামের হাত ছুঁয়ে লাগে নন-স্ট্রাইক প্রান্তের উইকেটে, মোহাম্মদ মিঠুন (২৭ বলে ৯) তখন ক্রিজের বাইরে। পেসারদের ভূমিকা শেষে এরপর দৃশ্যপটে স্যান্টনার। এই বাঁহাতি স্পিনারের লেগ স্টাম্পের বলে শাফল করে বোল্ড মেহেদী হাসান মিরাজ।

অভিষিক্ত মেহেদি হাসান নিজের আগমনী বার্তা জানিয়ে দেন দ্রুতই। ওয়ানডে ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করেন দ্বিতীয় বলেই ছক্কায়, স্যান্টনারকে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে ইনসাইড আউট শটে ৯৪ মিটার লম্বা ছক্কায় আছড়ে ফেলেন মাঠের বাইরে।

তার রোমাঞ্চকর অভিযান শেষ হতেও সময় খুব লাগেনি। স্যান্টনারকে আরেকবার বেরিয়ে এসে উড়িয়ে মারতে গিয়ে ধরা পড়েন মিড অনে। 

এরপর খানিকটা লড়াই করেন কেবল মাহমুদউল্লাহ। বোল্টকে পুল করে বাউন্ডারি আদায় করেন, ক্রিজ থেকে বেরিয়ে ছক্কায় ওড়ান কাইল জেমিসনকে। ইনিংসের সর্বোচ্চ ২৭ রান করে তার বিদায় আগ্রাসী শট খেলেই। ম্যাট হেনরির বলে পুল করেন সজোরে, শর্ট মিড উইকেটে লাফিয়ে দারুণ রিফ্লেক্স ক্যাচ নেন স্যান্টনার।

ইনিংসের বাকিটা শেষ করতে আর বেশি সময় নেননি বোল্ট। গাপটিল যেভাবে রান তাড়া শুরু করেছিলেন, ম্যাচও খুব দ্রুত শেষের পথে এগোচ্ছিল। প্রথম ওভারে মুস্তাফিজুর রহমানের বলে চার-ছক্কার পর হাসান মাহমুদকে বুঝিয়ে দেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কতটা কঠিন। তরুণ এই পেসারকে এলোমেলো করে দেন দুই ওভারে তিন চার দুই ছক্কায়।

অতি আগ্রাসী হতে গিয়েই গাপটিল ফেরেন ৪ ছক্কায় ১৯ বলে ৩৮ রান করে। চাপহীন রান তাড়ায় হেনরি নিকোলস ও ডেভন কনওয়ে এগিয়ে যান অনায়াসেই। ব্যাটিং অনুশীলন সেরে নেন দুজনই।

এই জুটিতেই যখন জয়ের কাছে নিউ জিল্যান্ড, আচমকাই তেঁড়েফুড়ে মারতে গিয়ে হাসানকে উইকেট উপহার দিয়ে ফেরেন কনওয়ে (৫২ বলে ২৭)। কনওয়ে আউট হওয়ায় আরেক অভিষিক্ত উইল ইয়াং খানিকটা ব্যাটিংয়ের স্বাদ পান। নিজের ৫০তম ওয়ানডেতে নিকোলস অপরাজিত থাকেন ৪৯ রানে।

নিজের শততম ওয়ানডেতে ব্যাটিং পাননি কিউই অধিনায়ক টম ল্যাথাম। তাতে তার অভিযোগের কারণই নেই। জয়ের হাসি তো তারই।

গাপটিলের উইকেট নেওয়ার পর নিজের মতো লড়ে যান তাসকিন। কিউই ব্যাটসম্যানদের কিছুটা ভোগাতে পারেন কেবল তিনিই। ব্যাটিংয়ে ছোট্ট ঝলকের পর নিয়ন্ত্রিত বোলিং করেন অভিষিক্ত মেহেদি। এসবকে অবশ্য এই পর্যায়ের ক্রিকেটে প্রাপ্তি বলা দায়। সিরিজের পরের ওয়ানডে মঙ্গলবার ক্রাইস্টচার্চে, দিবা-রাত্রির ম্যাচ শুরু বাংলাদেশ সময় সকাল সাতটায়।