।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই প্রথম ভূমিপুত্র হিসেবে দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই বাংলার মাটি হাজার বছরের পরাধীনতার গ্লানি বয়ে বেড়িয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গ বলেন বা পূর্ববঙ্গ বলেন, কিংবা পাকিস্তান আমলে সেই পূর্ব পাকিস্তানই বলেন, এ দেশের শাসনভার কিন্তু এই ভূমিপুত্র বা ভূমির সন্তান একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই প্রথম এই মাটির সন্তান, যিনি এই দেশকে স্বাধীন করেছেন। এ দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন এবং এরপর প্রধানমন্ত্রিত্ব পান। যার কারণে এ দেশের মানুষের প্রতি সব সময় তাঁর একটি আলাদা ভালোবাসা ছিল। একটা দায়িত্ববোধ ছিল। তিনি সৌভাগ্যবান ছিলেন যে তাঁর পিতামাতা সব সময় পাশে ছিলেন। তাকে সহযোগিতা করেছেন।’ স্বাধীনতার পর জাতির পিতাকে হত্যার পর যারা ক্ষমতায় এসেছে, তাদের কারও জন্ম কিন্তু বাংলাদেশের মাটিতে হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শুক্রবার (১৯ মার্চ) জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ১০ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের ‍তৃতীয় দিনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে গত বুধবার ১৭ মার্চ জাতির পিতার জন্মবার্ষিকীর দিনে রাজধানীর প্যারেড স্কয়ারে ‘মুজিব চিরন্তন’ প্রতিপাদ্যে বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ১০ দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠান শুরু হয়।

শুক্রবার তৃতীয় দিনের অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত রয়েছেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শুক্রবার বাংলাদেশে এসেছেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী। তার সঙ্গে ২৮ সদস্যের প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসেছে। এরমধ্যে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন।

তৃতীয় দিনের অনুষ্ঠান বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে। তৃতীয় দিনের আয়োজনে প্রথম পর্বে আলোচনার পর থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধীরা ইশারা ভাষায় জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ, মুজিববর্ষের থিম সংগীত, ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা’ শীর্ষক ভিডিও প্রদর্শন এবং সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদের স্বাগত বক্তব্যের পর থিমভিত্তিক আলোচনায় অংশ নেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।

আলোচনার সময় রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ভি লাভরভের ভিডিওতে ধারণ করা শুভেচ্ছা বার্তা প্রদর্শন করা হয়। এরপর সম্মানিত অতিথি শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে বক্তব্য দেন। তারপর রাজাপাকসেকে ‘মুজিব চিরন্তন’ শ্রদ্ধা-স্মারক প্রদান করেন জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আলোচনা পর্ব শেষ হবে।

সংগ্রামের পথ ধরে বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন উল্লেখ করে অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, ‘গোপালগঞ্জের অজপাড়াগাঁ টুঙ্গিপাড়া। সেই গ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম। সেখানেই পড়াশুনা করেছেন। পরে তিনি কলকাতায় পড়াশুনা করেন। তখন থেকেই স্বাধীনতার চেতনা বা দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও দুর্দশা দেখে তা লাঘব করার জন্যই যেন তিনি সব সময় ব্যস্ত ছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘এই বাংলার মানুষ একবেলাও একমুঠো ভাত পেতো না। রোগে চিকিৎসা পেতো না। থাকার জায়গা ছিল না। ছিন্নবস্ত্র, শোষিত বঞ্চিত মানুষ। সেই মানুষগুলোর ভাগ্য পরিবর্তন করার জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তার নিজের জীবনে কোনও চাওয়া পাওয়া ছিল না। তাঁর ওপর দিনের পর দিন অত্যাচার নির্যাতন চলেছে। কিন্তু তিনি দমে যাননি। তিনি এটা লক্ষ্য স্থির করেছিলেন। তা হলো— দেশকে স্বাধীন করা। এজন্য তিনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দল গোছানোর জন্য দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। মন্ত্রিত্ব ছাড়েন দলকে শক্তিশালী করার জন্য। কারণ, তিনি জানতেন কোনও কিছু অর্জন করতে হলে শক্তিশালী সংগঠন দরকার। বিশ্বের অনেকে মন্ত্রিত্বের লোভে দল ছেড়ে দেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু দলকে সুসংহত করা জন্য মন্ত্রিত্ব ছেড়েছিলেন। এই দৃষ্টান্ত আসলে খুব কমই পাওয়া যায়। কিন্তু এর জন্য তাকে অনেক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এই সবকিছুই তিনি মেনে নিয়েছিলেন।’

বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসেকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘আজকের অনুষ্ঠানে বন্ধুপ্রতিম শ্রীলঙ্কার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে এই উদযাপনকে মহিমান্বিত করেছেন।’ এ সময় তিনি অনুষ্ঠানে বার্তা পাঠানোর জন্য রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকেও ধন্যবাদ জানান। এছাড়া যেসব বিশ্বনেতৃবৃন্দ বার্তা পাঠিয়েছেন, তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের সকলের বার্তা আমাদের অনুষ্ঠানকে মহিমান্বিত করেছে। তাদের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কের দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়েছে।’

শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কা বিভিন্ন আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুতে একই ধরনের মনোভাব পোষণ করে এবং আমরা পরস্পরকে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে থাকি। প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে বাংলাদেশের একজন অকৃত্রিম বন্ধু এবং তিনি সব সময়ই বাংলাদেশের পাশে অবস্থান করেন। আমিও চেষ্টা করি সেই বন্ধুত্বের প্রতিদান দিতে।’

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী অংশগ্রহণ করায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসের যোগদান তাঁর নিজের এবং শ্রীলঙ্কার জনগণের আর আমাদের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কেরই প্রতিফলন। আমি আশা করি আমাদের দুই দেশের জনগণের মধ্যকার এই বন্ধুত্বের সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় হবে।’

পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন কন্যা শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী পচাঁত্তরের ১৫ আগস্ট নির্মমভাবে হত্যার শিকার পিতা বঙ্গবন্ধু, মা বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিবসহ পরিবারের সদস্যদের কথা বলতে গিয়ে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘জাতির পিতাকে হত্যার পর বাংলাদেশের ইতিহাসকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল। তবে, সত্যকে যে মুছে ফেলা যায় না, তার প্রমাণ আজকের এই অনুষ্ঠান। শেখ হাসিনা এ সময় ভাষা আন্দোলন থেকে পরবর্তী প্রতিটি আন্দোলনে জাতির পিতার ভূমিকা তুলে ধরেন। আর বাঙালির অধিকারের কথা বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ওপর বারবার আঘাত নেমে এসেছে বলে শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন।

বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন সম্পর্কে বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৪৮ সালের এই মার্চ মাসের ১১ তারিখে তিনি মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বপ্রথম কারাগারে অন্তরীণ হন। তিনি বারবার কারাবরণ করেছেন। তিনি মুক্তি পেয়েছেন। আবারও গ্রেফতার হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশের একমাত্র ভূমিপুত্র। এ দেশের সন্তান হিসেবে তিনি সংগ্রাম করেছেন। দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।’

মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ পাকিস্তানি শাসকদের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা করেন—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা।’ এর সপ্তাহ আড়াই পর ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সমগ্র জাতিকে নির্দেশ দেন প্রতিরোধ যুদ্ধের। মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার।’’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ একসময় নিষিদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু আজকে এই ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্যে স্থান পেয়েছে। একুশটা বছর তারা সব নিষিদ্ধ করে রেখেছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দল তাঁরই আদর্শ নিয়ে চলেছে। সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসেছে। সকলের সহযোগিতায় ক্ষমতায় এসে আমরা বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করেছি। ক্ষমতায় থেকে জাতির পিতার জন্মবার্ষিকী ও সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠান করতে পারছি।’