।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গী করে যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তারা দেশের উন্নয়নে আন্তরিক ছিল না বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘যে দেশের ক্ষমতা, স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী আর খুনিদের হাতে থাকে, সে দেশের উন্নতি কখনও সম্ভব না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও জাতির পিতার খুনিরা দেশের ক্ষমতায় আরোহণ করে। এই শক্তি দেশের স্বাধীনতা চায়নি, এরা দেশের উন্নয়নে আন্তরিক ছিল না। তাই উন্নয়ন করতে পারেনি।’

সোমবার (১৫ মার্চ) বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিলের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ‘বিআইডিএফ’-এর উদ্বোধন করেন। অন্যদিকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর মূলত স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়। যে চেতনা, চিন্তা ও আদর্শ নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেখান থেকে বাংলাদেশে দূরে সরে যায়। মূলত স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী জাতির পিতার খুনিরাই রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেনি তারা এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন বা উন্নয়নের কাজ করবে কেন? তারা তা পারেনি। এ দেশে ধারাবাহিক গণতন্ত্র চলেনি। মিলিটারি ডিক্টেটররা সময় সময় কখনও অভার্টলি কখনও কভার্টলি অর্থাৎ কখনও দৃশ্যমান হয়ে কখনও অদৃশ্যভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সরকার প্রধান বলেন, বর্তমান সরকারের উন্নয়ন চিন্তা, আন্তরিকতা এবং দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এখন আমরা নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রা তহবিল করে আমাদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে নিজস্ব অর্থায়নে সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবো। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ জাতির পিতা গড়ে তুলেছিলেন এবং অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু করেছিলেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে যাত্রা শুরু করেন, দুর্ভাগ্য যে সেটা তিনি শেষ করে যেতে পারেননি।

তিনি আরও বলেন, ২১ বছর পর যখন আওয়ামী লীগ সরকার আসে, তখন থেকে আমাদের প্রচেষ্টা এ দেশটাকে এগিয়ে নেয়ার। প্রথম পাঁচ বছর চেষ্টা করেছিলাম, অনেক দূর এগিয়েছে। তারপর আট বছর ক্ষমতায় থাকতে পারিনি। দ্বিতীয়বার যখন ক্ষমতায় এলাম তারপর থেকে এ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে সরকারে আছি বলেই আজকে দেশের উন্নয়ন দৃশ্যমান হচ্ছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই যে তারা ভোট দিয়ে আমাদের তাদের সেবা করার সুযোগ দিয়েছে। আসলে উন্নয়নটা তখনই হবে দেশটাকে যদি কেউ চিনতে পারে, জানতে পারে, দেশের মানুষকে ভালোবাসতে পারে এবং উন্নতি যে অপরিহার্য, সেটা যদি কারও চিন্তা-চেতনায় থাকে তখনই সে দেশে উন্নতি সম্ভব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সীমিত সম্পদ কিন্তু ভৌগোলিক সীমারেখার তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। এদেশে ধারাবাহিক গণতন্ত্র চলেনি। মিলিটারি ডিক্টেটররা সময় সময় কখনও অভার্টলি কখনও কভার্টলি অর্থাৎ কখনও দৃশ্যমান হয়ে কখনও অদৃশ্যভাবেই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। যে দেশের ক্ষমতা যুদ্ধাপরাধী আর খুনিদের হাতে থাকে সে দেশে উন্নতি হওয়া কখনও সম্ভব না।

সরকার প্রধান বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আমরা অনেক পদক্ষেপ নিয়েছি। যেটা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব করতে চেয়েছিলেন। আমাদের আশু করণীয় মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। এভাবে যথাসাধ্য পরিকল্পনা নিয়ে পদক্ষেপ নিয়েছি বলেই আজকের বাংলাদেশ উন্নয়নশীল বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া অতীতে যারা ক্ষমতায় এসেছিল, পঁচাত্তরের পর তাদের একটা প্রবণতা ছিল বিদেশিদের কাছে হাত পেতে চলা, ভিক্ষা চাওয়া। ঠিক নিজের মর্যাদা নিয়ে চলতে হবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, এই চিন্তাটাই তাদের ছিল না। এটা হলো বাস্তবতা।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার যখন আসছে, আমাদের চিন্তা হলো আত্মমর্যাদা নিয়ে চলতে হবে, দেশকে উন্নত করতে হবে। আমাদের উন্নয়নের মূল পরিকল্পনা হচ্ছে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত পর্যাপ্ত অর্থ সরবরাহ করে একেবারে গ্রামের মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা।

আজকের বাংলাদেশ সারা বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, অনেকে অনেক সময় জিজ্ঞেস করেন ম্যাজিকটা কি? আমি বলি ম্যাজিক কিছুই না, ম্যাজিকটা হচ্ছে দেশপ্রেম। দেশের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধই উন্নয়নের পেছনে চালিকাশক্তি হয়। যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি, সেই স্বাধীনতাকে সুসংহত করা আর স্বাধীনতার সুফল যেন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের হাতে পৌঁছায়, সেজন্যই আমাদের শত চেষ্টা।

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সব হারিয়েও দেশে আসতে পারিনি। ছয় বছর ধরে আসতে দেওয়া হয়নি। যখন আমাকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী করলো, তখন একরকম জোর করে দেশে ফিরলাম। এমন জায়গায় ফিরেছিলাম, খুনিরা যারা আমার বাবা-মা-ভাইদের হত্যা করেছে তারা রাষ্ট্রক্ষমতায়। তারা বিদেশি দূতাবাসের কূটনীতিক হিসেবে কাজ করছে। দেশের ভেতরে কেউ প্রেসিডেনসিয়াল ক্যান্ডিডেট হয়, কেউ আবার কাউকে ভোট চুরি করে পার্লামেন্টে বসায়। যুদ্ধাপরাধী যাদের বিচার জাতির পিতা শুরু করেছিলেন তারাও বিচরণ করছে। সেই পরিবেশে দেশে ফিরেছিলাম। একটা চিন্তা মাথায় নিয়ে, যে স্বপ্ন নিয়ে বাবা দেশ স্বাধীন করেছিলেন, সেটা পূরণ করতেই হবে।

দেশের মানুষের মুখে খাবার তুলে দেয়া, উন্নত বাসস্থান, উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা, সার্বিকভাবে এ দেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা করে তোলাই সরকারের লক্ষ্য বলে জানান তিনি।