কোলাজ ফরাসি শব্দ অর্থাৎ আঠা দিয়ে কোনো কিছু লাগানো কিংবা জোড়া দেয়া। ১৯০৬ সালে আধুনিক পাশ্চাত্য শিল্পের জনক সেজানের মৃত্যুর পর ১৯০৭ সাল থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত বিপ্লবী আন্দোলন ‘কিউবিজম’ এর বিকাশ পিকাসো, ব্রাক এবং স্পেনীয় চিত্রকর জুয়াঁ প্রি-র তুলির ভেতর দিয়ে।

পিকাসো ১৯১২ সালে একটি জড় জীবনের ছবি আঁকলেন। নাম বেতের তৈরি চেয়ার। ছবিটির প্রধান বৈশিষ্ট ছিল চেয়ারে বসার স্থানটি রংতুলিতে আঁকার পরিবর্তে বাস্তবকে অনুকরণের উদ্দেশ্যে হুবহু বেতের নকশা ছাপা অয়েল ক্লথ কেটে আঠা দিয়ে সেঁটে দেয়া। কিউবিজমের ঐতিহাসিকদের মতে বিশ্বে এটিই প্রথম কোলাজ। রং ও চিত্রপট সংক্রান্ত প্রচলিত ধ্যান-ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে সমতল পটে রং ছাড়াও বাইরের অন্য পদার্থ বা উপকরণ দিয়ে তৈরি এটিই প্রথম ছবি। সমসাময়িক সময়ে পিকাসোর সহকর্মী ব্রাক আঁকলেন একটি ফল রাখবার পাত্র, সেই সঙ্গে একটি গ্লাস যার পশ্চাৎপটে রং তুলির ব্যবহার কাঠের প্যানেল আকার পরিবর্তে ঐ রূপ হুবহু ছাপা তিনটি টুকরো ওয়াল পেপার সরাসরি ক্যানভাসে ব্যবহার করলেন। এইটিই হলো কাগজ সেঁটে দেয়া প্রথম ছবি। দু’জনের ধরন একই হলেও একটিতে ছাপা হলো অয়েল ক্লথ আর অপরটিতে ওয়াল পেপার। উদ্দেশ্য ঠিক রেখে নিতান্ত বুদ্ধিভিত্তিক কিউবিস্ট ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে বাহ্যিকবাস্তবের সম্পর্ক ছিন্ন করলেন না তাঁরা। তাই কাল্পনিক অবয়বে পিকাসো সত্যিকারের কোটের বোতাম, গোঁফ ইত্যাদি সাঁটা শুরু করলেন সমতল চিত্রপটের সঙ্গে ত্রৈমাত্রিক বাস্তব পদার্থের মিলন ঘটিয়ে। অপরদিকে তৈরি করলেন কিউবিস্ট ভাবনায় স্বয়ং সম্পূর্ণ গঠনমূলক বস্তুসমূহ। এই গঠন পদ্ধতিই কিউজমের একটি বিশিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাছাড়া এই প্রথম এলো ছবিতে নানারকম টেক্সচারের ভূমিকা। শুরু হলো আন্দোলন। শিল্পীরা এবার বালি মিশিয়ে কাগজের টেক্সচার ছাড়াও চিত্রপটে সমতল জমির পাশে খসখসে জমির বিরোধিতা তৈরি করে রীতিগত তৈলচিত্রের প্রথা ভাঙলেন। চিত্রকলায় এলো আমূল পরিবর্তন। যে ছবি এতোদিন রং ক্যানভাসের মিলন ক্ষেত্র বলে পরিচিত ছিল তার সঙ্গে নানা জাতীয় কাগজ ও বস্তুর ব্যবহারের ফলে চিত্র পেল নতুন পেলবতা। পরবর্তীকালে কোলাজের নাম করণ হলো ‘আর্ট অব এসেমব্লেজ’। অর্থাৎ চিত্রপটে দ্বিমাত্রিক বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার উপযুক্ত জিনিসকে একত্র করা।      

কোলাজ, পেপিয়ে, কোলে কিংবা দেকুপাজ এ তিনটি প্রথার মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। এ তিনটি প্রথার উদ্দেশ্য একই না হলেও আঠা দিয়ে সেঁটে দেবার ব্যাপারটা সাধারণ।

কোলাজের যৌক্তিক উপসংহার হলো-কিউবিজমের পরবর্তী আন্দোলন ‘দাদাইজম’। কোলাজের নান্দনিক তাৎপর্য যে খুবই ব্যাপক ছিল এবং এ আবিষ্কার বিংশ শতাব্দীর শিল্পের বহুমুখী বিকাশকে যে নানাভাবে প্রভাবিত করেছিল তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। মহান শিল্পী আঁরী মাতিসের দেকুপাজ অর্থাৎ রঙিন কাগজ টুকরো টুকরো করে কেটে ক্যানভাসে সেঁটে ভিন্ন লক্ষ্যে ব্যবহার। যদিও তা পিকাসো, ব্রাক এবং জুঁয়াগ্রীর কিউবিস্ট কোলাজ থেকে আলাদা। মাতিস দ্বিমাত্রিক চিত্রপটে রঙিন কাগজের নানা মূর্ত ও বিমূর্ত আকার এবং রঙ্গের পারস্পরিক এবং সমন্বয়পূর্ণ সর্ম্পক গড়ে তোলায় আজ তার ব্যাপকতা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। কোলাজ হয়ে উঠেছে সর্বগ্রাহী।

আদিম গুহাচিত্র থেকে যে শিল্পকলার ইতিহাস শুরু, কার্টুন শিল্পের ইতিহাসও বলা চলে সেদিন থেকেই। কার্টুন মানুষের মনের তীর্যকরূপ রেখা, ব্যঙ্গ-শ্লেষাত্মক আর প্রতিবাদী চিন্তার শৈল্পিক রূপায়ণ। আনন্দ, কৌতুক আর ক্ষোভের প্রকাশভঙ্গি ছাড়াও যুগ যন্ত্রণাকে নান্দনিক রেখার মাধ্যমে চিত্রকল্পে পরিণত করাই কার্টুন। রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা, অর্থনৈতিক পরস্থিতি বিভিন্ন দেশীয় লোকজ চরিত্রের চমৎকারভাবে প্রতিফলন ঘটে কার্টুনে। একটা বা দু’টো শব্দ অথবা কোনরূপ শব্দ বা বাক্য ব্যবহার না করেই অনেক কথা অব্যর্থভাবে বলে দেয় কার্টুন। ছবির সাহায্যে ব্যঙ্গ করার ইচ্ছার ধারাবাহিকতার কোনো ইতিহাস আজ অবধি পাওয়া যায়নি। কোনো কোনো পণ্ডিতের মতে লিউনার্ন্দো দ্য-ভিঞ্চিই চিত্রে ব্যঙ্গ সৃষ্টির প্রথম প্রয়াস চালিয়েছেন।

পরবর্তীতে উত্তর ইউরোপের পিটার ব্রুখেল গ্রাম, উইলিয়াম হোগ্রার্থ ছাপচিত্রে কার্টুনের স্বর্ণযুগ এনে দেন। ঐসব মহান শিল্পীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সমাজ-সংসারের বিভিন্ন অনিয়মগুলোর বিরুদ্ধে সমালোচনায় কার্টুনকে ব্যবহার করেন পরবর্তী শিল্পীরা।

মূলত কার্টুন হাস্যরস-নির্ভর। কার্টুনিস্টরা যাদের জন্য কার্টুন তৈরি করে তাদের রসবোধকে গ্রাহ্য করে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছেন। অর্থাৎ মানুষের নিত্যদিনের সুখ-দুঃখকে নিয়ে সংক্ষিপ্ত যে ঠাট্টা-মশকরা করেন তা সবার রসবোধকে উপজীব্য করেই। মানুষের ঘটনাবহুল জীবনের উপলব্ধি আর অনুভূতিগুলোকে নাড়া দেয়ার ব্যাপারটি কার্টুনে মোক্ষম উদ্দেশ্য। ভাবনা-চিন্তাকে শানানোই কার্টুনের কাজ। চিন্তা-চেতনার সুপ্ত আগুনকে উস্কে দেওয়াও বলা যেতে পারে। এক কথায় কার্টুন সমাজের দর্পণ।

রেনেসাঁর মতো ঊনবিংশ শতাব্দীটা সর্বক্ষেত্রে নতুন কিছু খোঁজার যুগ, চিরায়ত নিয়ম ভাঙার যুগ হিসেবে বিবেচিত। ব্যঙ্গচিত্রও তার নিজস্ব একটি ছাপ পড়ল। ড্রইং-বক্তব্য সবকিছুতে ব্যঙ্গচিত্র ইম্প্রেশনিজমের পাশাপাশি শিল্পকলার অন্যান্য অংশ থেকে আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠা পেল। কার্টুনে আসক্তি শিল্পীদের দিয়েই শুরু হলো কার্টুনের জয়যাত্রা। ব্যঙ্গচিত্র বা ‘ক্যারিকেচার ড্রইং কার্টুন’ নাম পেয়ে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে গণমাধ্যমে নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠলো।

অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতীয় চিত্রকলায় কার্টুনের গোড়াপত্তন হয় গগণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাধ্যমে। বলা চলে তিনিই বাংলায় কার্টুনের গোড়াপত্তনকারী। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর রাষ্ট্রীয় সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদির ভুল-ত্রুটি নিয়ে ব্যঙ্গ করার চেষ্টা কার্টুনে করেছেন। পরবর্তীতে চলচ্চিত্র জগতেও কার্টুনের প্রভাব এসে যায়। শিশু মনস্তত্ববিদরা বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে কাল্পনিক রূপকথার জগত নিয়ে সমন্বয় ঘটিয়ে নতুর ভাবনার সৃষ্টি করছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। সমাধান খুঁজছেন প্রশ্নের। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের শিল্পীরা ভাষা আন্দোলনের নানা পর্যায়ে কার্টুন এঁকে আন্দোলনকে শানিত করেছেন সংবাদপত্রে প্রতিবাদমুখী কার্টুনের সাহায্যে। তাছাড়া মিছিলের ফেস্টুনে, পোস্টার, মিনি পত্রিকা, লিফলেট, পাম্পলেট-এ কাজ করেছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানসহ সবাই কোনো না কোনো ভাবে। বায়ান্নতে মুর্তুজা বশীর, বিজন চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী, এমদাদ হোসেন, আমিনুল ইসলাম, আবুল কাশেম সবাই কার্টুনধর্মী চিত্রে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। কামরুল হাসানের ‘ভিমরুল’ আর আবুল হাশেম ‘দো-পেঁয়াজা’ নামে কার্টুন চর্চা করেছেন দীর্ঘদিন।

পঞ্চাশ দশক থেকে আমাদের গণমাধ্যমগুলোয় কার্টুনের ব্যবহার  বৃদ্ধি পেতে থাকে। শিল্পী মিজান ও জামীর সচিত্র সন্ধ্যানীতে, মীতাজী, চিত্রপরিচালক সুভাষ দত্তের ষাটের দশকে ইত্তেফাকে, শিল্পী হাশেম খান এবং সিরাজুল হক ‘সারদা’ নামে কার্টুনচর্চা করেছেন। সত্তর দশকের গোড়ার দিকে দৈনিক বাংলায় অরূপের কার্টুন, সাপ্তাহিক বিচিত্রায় নজরুল ইসলাম কার্টুনকে সরাসরি রাজনৈতিক মূল্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সংবাদপত্রে শুধু কার্টুনকে উপজিব্য করে আশির দশকে ‘উন্মাদ’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। শিল্পী রফিকুন নবী টোকাইকে নিয়ে নতুন ভাবনায় কার্টুনকে আরো জনপ্রিয় করে তুলেছেন। র’নবীর রাজনৈতিক কার্টুনের সঙ্গে শিশিরের কার্টুন সংবাদ জগতে এক অভূতপূর্ব সমন্বয়। মুক্ত চিন্তার প্রতীক হিসেবে প্রায় প্রতিটি সপ্তাহিক, দৈনিক ইত্যাদি পত্রিকায় কার্টুন এখন পত্রিকার শেকড়ের গভীরে প্রোথিত। ঢাকার বাইরেও ইদানীং পত্রিকাগুলো নিয়মিত কার্টুন পাঠকের স্বাদকে পরিবর্তন করছে। কার্টুনের জনপ্রিয়তা এখন আলতামিরা, লা-মতের সেই গুহা থেকে বেরিয়ে সর্বত্রই।

প্রচ্ছদ রাজিব রায়