।। আসাদুজ্জামান রাসেল ।।

সাদিকুর রহমানের লেখা ‘রাজশাহীর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ১৯৬২: দারুশার নির্মমতা’ প্রসঙ্গ নিয়ে প্রকাশিত বইটি উপমহাদেশের নিকৃষ্ট রাজনৈতিক পরিণামের চাপা দেয়া এক চরমপত্র বা দলিল। ধর্মীয় বাতাবরণকে ঢাল করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় এক বিশেষ শ্রেণির স্বার্থসিদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ ছিলো রাজশাহীর দাঙ্গা প্রসূত দারুশার নির্মম হত্যাকাণ্ড।

এ ঘটনাকে উপনিবেশিক শাসনামলের সাম্প্রদায়িকতার সামগ্রিক আধার থেকে আলাদাভাবে দেখার কিছু নেই; বরং এ ঘটনা উপমহাদেশে ব্রিটিশ উপনিবাদের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে সম্পৃক্ত।

এখানে লেখক সাকিকুর রহমান তার গবেষণায় চাপা পড়ে থাকা এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড‌ উন্মোচন করেছেন। ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নিকৃষ্ট পর্যায়ের হত্যাকাণ্ড ছিলো রাজশাহীর দাঙ্গা প্রসূত দারুশার হত্যাকাণ্ড।

লেখক এ হত্যাকাণ্ডকে কেন দাঙ্গা হিসেবে অভিহিত করেছেন তার ব্যাখ্যা খুবই পরিস্কার। তিনি তার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সংজ্ঞায়নে তা পরিস্কার করেছেন। রাজশাহীর দারুশার মতো গ্রামীণ সমাজে ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে যে নির্মম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার হত্যালীলা সংগঠিত হয়েছিলো এবং স্থানটির দূরত্ব রাজশাহী শহর থেকে মাত্র আট কিলোমিটার; নিহতের মানুষের সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে গবেষক প্রায় চৌদ্দশত হবে বলে লিখেছেন। উপমহাদেশের দাঙ্গার ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় তা এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড হিসেবেই চিহ্নিত করে। অন্তত ভৌগোলিক স্থানের পরিসর বিবেচনা করলে।

সাদিকুর রহমান রচিত এ বইটিতে উপনিবেশিক শাসন আমলের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের অস্থিরতা এবং এর সঙ্গে ব্রিটিশ শোষণ-শাসন ও বিভেদ নীতির কৌশল কীভাবে সম্পৃক্ত তার ব্যাখ্যাও করেছেন।

উপমহাদেশের ‘রাজনৈতিক ত্রান্তিকাল’ অর্থাৎ দেশভাগ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ। কারণ ব্রিটিশ শাসন এদেশের সামাজিক সম্প্রীতিকে কীভাবে সংঘাতময় ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িকতায় রূপায়িত করেছিলো তার অখণ্ড সম্পৃক্ততার উদাহরণ হলো রাজশাহীর দাঙ্গা প্রসূত দারুশার নির্মমতা। বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দীর্ঘলালিত ঐতিহ্যের মধ্য থেকে কীভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উন্মেষ ঘটেছে তার এক নাতিদীর্ঘ পর্যালোচনা এবং বিষয়গত ও বিষয়ীগত অবস্থার আলোকে তৎকালীন পূর্বপাকিস্থান বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহীর দারুশা অঞ্চলের দাঙ্গার যোগসুত্র স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্র-প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদ ও সহযোগিতা ছাড়া ঘটতে পারে না। প্রায় চৌদ্দশত মানুষকে হত্যা করে, তাদের মাটিচাপা দেয়া হয়। এসবে রাষ্ট্র-প্রশাসন জড়িত সে ক্ষেত্রে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে না। এসব কিছুই বিভিন্নভাবে তুলে ধরার হয়েছে গবেষণার পদ্ধতিগত নীতি মেনে। রাজশাহীর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ১৯৬২ সালের এপ্রিল মাসের তেইশ তারিখে শুরু হলেও তা চলে ওই মাসের শেষ অবধি এবং মে মাসের প্রথম দিকেও।

দীর্ঘ এ সময় দারুশার মানুষকে পুড়িয়ে-কেটে হত্যার স্থানীয় নামকরণ ছিলো ‘হেন্দুকাটা’। বাস্তবিক অর্থে এটা কোনো জেনোসাইড হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে কিন্তু লেখক-গবেষক তার গবেষণাতে যে ন্যারেটিভ উপস্থাপন করেছেন সেটির সঙ্গে উপনিবেশিক আমলে লালিত পালিত ও দেশভাগের মাধ্যমে পরিণতিপ্রাপ্ত রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতার বিষকেই এ দাঙ্গার ও নির্মমতার মুখ্য কারণ হিসেবে তুলে এনেছেন। এর ছোবল থেকে বাংলাদেশ, ভারত কিংবা পাকিস্থান মুক্ত নয়, এর সঙ্গে পুরো বিশ্বের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দৃশ্যমান।

রাজশাহীর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ১৯৬২: দারুশার নির্মমতা । সাদিকুর রহমান । দ্যু প্রকাশনী । একুশে বইমেলা ২০২০ । মূল্য ২০০ টাকা