।। আসাদুজ্জামান সরদার, বাংলা ট্রিবিউন ।।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাংলাদেশ সফরে আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সফরকালে আগামী ২৭ মার্চ সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুরে যশোরেশ্বরী কালীমন্দির পরিদর্শন করবেন তিনি। সেখানে মাত্র ২০ মিনিট অবস্থান করবেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এই সরকারপ্রধান। তার আগমনকে ঘিরে নতুন রূপে সাজতে শুরু করেছে সুন্দরবনের কোলঘেঁষা উপজেলা শ্যামনগর। সবখানে চলছে সাজ সাজ রব। ইতোমধ্যে মোদির আগমনের খবরে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে মতুয়াদের মধ্যে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। মোদিকে স্বাগত জানাতে কোনও কিছুর যাতে কমতি না হয় সেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সফরসূচিতে জানানো হয়েছে, নরেন্দ্র মোদি আগামী ২৬-২৭ তারিখে বাংলাদেশ সফর করবেন। এসময় তিনি বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে সাতক্ষীরা ও গোপালগঞ্জ সফর করবেন। ২৭ তারিখ সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে তিনি শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুরে অবস্থিত যশোরোশ্বরী দেবি মন্দির পরিদর্শন করবেন। ১০টা ১০ মিনিটে সাতক্ষীরা ত্যাগ করবেন তিনি। ১০টা ৫০মিনিটে গোপালগঞ্জে অবস্থিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধ পরিদর্শন ও পুষ্পস্তবক অর্পন ও চারাগাছ রোপণ করবেন। এরপর ১১টা ৩৫ মিনিটে তিনি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানির ওড়াকান্দি মন্দির পরিদর্শন করবেন।

ইতোমধ্যে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল জেলার বিভিন্ন বিভাগের প্রধান ও প্রতিনিধিদের নিয়ে সমন্বয় সভা করেছেন। এর আগে তিনি ২৭ ফেব্রুয়ারি ঈশ্বরিপুর কালি মন্দির পরিদর্শন করেন।

ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তা ও নরেন্দ্র মোদির নিরাপত্তা দলের সদস্যরা গত সপ্তাহেই সাতক্ষীরায় সরেজমিন ঘুরে দেখেছেন। মন্দিরের অবকাঠামো, যাতায়াত পথ, নিরাপত্তাসহ সবকিছু রেকি করে গেছেন তারা। বর্তমানে সাতক্ষীরা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পক্ষ থেকে ওই মন্দির এলাকায় নিরাপত্তার ব্যাপারে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে যশোরেশ্বরী কালীমন্দির ও এর আশপাশ এলাকা বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারিতে আনা হয়েছে। এরই মধ্যে সেখানে তিনটি হেলিপ্যাড প্রস্তুত করা হচ্ছে। সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন স্থানে মতুয়া সম্প্রদায়ের ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ রয়েছেন। তাদের মধ্যে কেবলমাত্র শ্যামনগর উপজেলায় রয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ।

যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরের পুরোহিত দিলীপ মুখার্জী মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। তিনি জানান, এ মন্দিরে প্রতি বছর শ্যামা কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া প্রতি শনি ও মঙ্গলবার এ মন্দিরে পূজা অর্চনা হয়ে থাকে। এসব পূজা অর্চনায় শত শত ভক্তের সমাগম ঘটে বলে জানান তিনি।

জেলা মতুয়া সম্প্রদায়ের সভাপতি ও শ্যামনগর উপজেলা সভাপতি কৃষ্ণান্দ মুখার্জী জানান, নরেন্দ্র মোদির আগমন উপলক্ষে মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে।

প্রসঙ্গত, শ্যামনগরে যশোরেশ্বরী কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে ইতিহাস থেকে বিভিন্ন রকম তথ্য জানা যায়। ‘যশোহর খুলনার ইতিহাস’ প্রণেতা সতীশ চন্দ্র মিত্র এ মন্দির স্থাপনা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য উল্লেখ করেছেন। তাতে বলা হয়, ১৫৬০-৮০ সাল পর্যন্ত রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বকালে তিনি স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে ঈশ্বরীপুর এলাকায় একটি মন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরটি নির্মাণের পর সেটি বন্ধ রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে মন্দিরটি জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে ওঠে। সে সময় শ্যামনগরের ধুমঘাট ছিল বাংলার ১২ ভূঁইয়ার এক ভূঁইয়া রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজধানী। রাজা প্রতাপাদিত্য এ সময় দেখতে পান ওই জঙ্গল থেকে এক আলোকরশ্মি বেরিয়ে আসছে। তিনি তখন মন্দিরটি খোলার নির্দেশ দেন।

এরই মধ্যে মন্দিরটি খুলেই সেখানে দেখা মেলে চন্ডভৈরবের আবক্ষ শিলামূর্তি। তখন থেকে সেখানে পূজা-অর্চনা শুরু হয়। ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী আরও জানা যায়, দক্ষ রাজার কনিষ্ঠ কন্যার নাম ছিল সতীবালা। তিনি জন্ম থেকে মহাদেবের পূজারিণী ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি স্বেচ্ছায় মহাদেবকে বিবাহ করেন। এতে দক্ষ রাজার ঘোর আপত্তি ছিল। এক অনুষ্ঠানে দক্ষ রাজার উপস্থিতিতে মহাদেব আসেন। কিন্তু মহাদেব দক্ষ রাজাকে তার শ্বশুর বলে পরিচয় দেননি। এতে তিনি চরম অপমানবোধ করেন। পরে শুরু করেন দক্ষযজ্ঞ। এতে সতীবালা ও মহাদেব নিমন্ত্রিত ছিলেন না। এতে অপমান বোধ করেন সতীবালা। কিছুক্ষণ পরেই সতীবালা দেহত্যাগ করেন।

এ খবর পেয়ে কৈলাস থেকে দ্রুতবেগে নেমে আসেন মহাদেব। তিনি দক্ষ রাজার মুন্ডু কর্তন করে বলির জন্য নিয়ে আসা ছাগলের মুন্ডু কেটে সেখানে বসিয়ে দিয়ে দক্ষযজ্ঞ লণ্ডভণ্ড করে দেন। পরে তিনি মৃত স্ত্রী সতীবালাকে কাঁধে নিয়ে কৈলাস পাহাড়ে চলে গিয়ে ক্ষোভে ও দুঃখে ব্রহ্মান্ড ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেন। এ খবর পেয়ে ব্রহ্ম ও নারায়ণ সিদ্ধান্ত নিলেন মহাদেবকে ঠান্ডা করতে হলে তার কাছ থেকে সতীবালার মৃতদেহ সরিয়ে নিতে হবে। সে অনুযায়ী ত্রিশূল দিয়ে সতীবালাকে ৫১ খণ্ড করে ত্রিশূলে ঘোরানো হয়। এর এক খণ্ড এসে পড়ে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে। সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয় যশোরেশ্বরী কালীমন্দির। অপর খণ্ডগুলো পশ্চিমবঙ্গের কালীঘাট, আফগানিস্তান, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।