।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের এবারের দামামায় সব থেকে উচ্চারিত হচ্ছে মতুয়া সম্প্রদায়ের নাম। তবে এবারই প্রথম নয়, বাংলার মসনদের গণিত অনেকাংশেই এই সম্প্রদায়ের ভোটব্যাঙ্কের উপরে নির্ভর করে।

পশ্চিমবঙ্গে মতুয়া ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ। বাংলার ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৪০টি আসনে মতুয়া ভোটের প্রভাব রয়েছে। এই আসনগুলি মূলত উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা কেন্দ্রিক। এছাড়া ২০টি এমন আসন রয়েছে, যেখানে মতুয়াদের প্রভাব পরোক্ষ ভাবে। এই আসনগুলি হুগলি জেলা ও উত্তরবঙ্গের কোচবিহার ও আশপাশের এলাকায় রয়েছে।

আর সে কারণেই এবারের নির্বাচনে মতুয়াদের ভোট টানতে জোর তৎপর বিজেপি, তৃণমূল ও কংগ্রেস-বাম জোট। নানাভাবে এই তৎপরতা চালাচ্ছে তিন পক্ষই। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এবার আলোচনার কেন্দ্রে মতুয়াদের আদি পীঠস্থান বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সম্ভাব্য সফর।

বিবিসি বাংলা বলছে, ওড়াকান্দি হচ্ছে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা কয়েক কোটি মতুয়ার কাছে সম্প্রদায়টির প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের ‘লীলাক্ষেত্র’। সে রকম একটি ধর্মীয় স্থানে মোদী এমন একটা সময়ে যেতে পারেন, যার একদিন পর থেকেই শুরু হবে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন। তিনি মতুয়াদের মন জয় করতেই সেখানে যেতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর সফর চূড়ান্ত না হলেও সম্ভাব্য সফরের তালিকায় ওড়াকান্দি রয়েছে। ইতোমধ্যে সেখানে গিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দল পরিস্থিতি দেখে এসেছেন। জরুরি কিছু অবকাঠামো ও আনুষাঙ্গিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তারা কাজও করেছেন।

মতুয়া-কাহন

মতুয়ারা আসলে হিন্দু ধর্মাবলম্বী নমঃশূদ্র গোষ্ঠীর মানুষ। গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে হরিচাঁদ ঠাকুর এবং গুরুচাঁদ ঠাকুর এই সম্প্রদায়ের সূচনা করেন। ভারতের স্বাধীনতার পরে তারা নিজেদের বড় সংখ্যক শিষ্যদের নিয়ে ভারতে চলে যান এবং উত্তর ২৪ পরগণার ঠাকুরনগরে নিজেদের ধর্মীয় কেন্দ্র গড়ে তোলেন।

কিন্তু মতুয়ারা কি পশ্চিমবঙ্গের ভোটে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে প্রধানমন্ত্রীকেও বিদেশ সফরে গিয়ে তাদের আদি ধর্মস্থানে যেতে হবে? কেন মতুয়াদের এতটা গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে?

বিশ্লেষকরা বলছেন যে রাজনৈতিকভাবে অতি সক্রিয় এই সম্প্রদায় পশ্চিমবঙ্গের অনেকগুলি আসনেই নির্ণায়ক শক্তি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বজিত ভট্টাচার্য বলেন, পশ্চিমবঙ্গের কিছু কিছু এলাকায় মতুয়াদের ভোট হারজিত নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, “বনগাঁ এবং বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত অন্তত ১৪টা বিধানসভায় মতুয়া ভোটই ঠিক করে দেয় যে কে জিতবে। এছাড়া নদীয়া, উত্তর ২৪ পরগণার মতো জেলাগুলির প্রতিটি বিধানসভা ক্ষেত্রেই কোথাও পাঁচ, কোথাও দশ হাজার করে মতুয়া আছেন। এবারের ভোট যেহেতু খুব হাড্ডাহাড্ডি হবে, তাই ওই পাঁচ-দশ হাজার ভোট কিন্তু নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। সেজন্যই মতুয়া ভোট নিশ্চিত করা অতি জরুরি।”

মতুয়া যাদের, রাজ্যে সরকার তাদের

মতুয়া সম্প্রদায় এবং তাদের ধর্মগুরুরা অনেক দিন ধরেই রাজনীতিতে সক্রিয়। এক সময়ের সঙ্ঘাধিপতি প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর ছিলেন কংগ্রেস দলের সংসদ সদস্য। তার ছেলে, পুত্রবধূ এবং নাতিরাও সক্রিয় রাজনীতিতে রয়েছেন।

একটা সময়ে এই মতুয়ারা প্রায় সবাই ভোট দিতেন বামফ্রন্টকে। সেটা ছিলো বামফ্রন্টের রমরমার সময়। ২০১১ সাল থেকে মতুয়ারা ভোট দিতে শুরু করলেন তৃণমূল কংগ্রেসকে।

আর ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে মতুয়া মহাসংঘে চিড় ধরল – একটা অংশ তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে রইল, আর অন্য অংশটির প্রধান শান্তুনু ঠাকুর বিজেপির টিকিটে জিতে সংসদ সদস্য হলেন।

এবার মতুয়াদের ভোট নিতে বিজেপি ও তৃণমূলের সরাসরি প্রচেষ্টার বাইরে বাম-কংগ্রেস জোটও এক নতুন পন্থা নিয়েছে। আব্বাস সিদ্দিকির দল ‘ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট’কে (আইএসএফ) জোটসঙ্গী করে তারা সংখ্যালঘুদের পাশাপাশি মতুয়াদের আসনগুলিতেও লড়তে চায়।

নাগরিকত্ব আইন নিয়ে মতুয়াদের মানভঞ্জন হবে?

বিজেপি এবারের নির্বাচনে যে মতুয়াদের এতোটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তার একটা বড় কারণ নাগরিকত্ব আইন নিয়ে এই সম্প্রদায়ের ক্ষোভ। ভারতে প্রথম নাগরিকত্ব আইন নিয়ে এই সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ ছিলো। কিন্তু সেই উদ্বেগ কাটানোর হাতিয়ার হিসেবে বিজেপি সামনে আনে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ)। তবে সেই আইন কার্যকর না হওয়ায় যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা গত ডিসেম্বরেও বিজেপি সাংসদ শান্তনু ঠাকুর দলের হাইকমান্ডকে জানান।

সিএএ দিয়েই ২০১৯ সালে বিজেপি লোকসভা নির্বাচনে বনগাঁ আসনটি জিতে নেয়। কিন্তু সেটি কার্যকর না হওয়ায় তাদের যে ক্ষোভ, তা প্রশমিত করতেই এই সম্প্রদায়ের আবেগের জায়গা ‘ওড়াকান্দি’ সফরে যাচ্ছেন খোদ নরেন্দ্র মোদি।

সাংসদ শান্তনু ঠাকুর যদিও মনে করেন যে ওড়াকান্দিতে মোদীর সফর পশ্চিমবঙ্গের ভোটে একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে তার দলের ওপর, তবে তৃণমূল কংগ্রেস-পন্থী মতুয়া মহাসঙ্ঘের কার্যকরী সভাপতি সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাসের এক্ষেত্রে দ্বিমত রয়েছে।

শান্তনু বলেন, “প্রধানমন্ত্রী কেন, কোনও স্তরের মন্ত্রীই ওড়াকান্দিতে কোনোদিন যাননি। ওড়াকান্দি মতুয়াদের কাছে একটা আবেগের জায়গা। আর সে কারণেই তিনি যদি আমাদের আদি পীঠস্থানে যান, তার একটা প্রভাব তো এখানকার রাজনীতিতে পড়বেই।”

অন্যদিকে সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাসের দাবি, বিজেপির ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন মতুয়াদের আদি ধর্ম-পীঠে গিয়ে সেই ক্ষতি পূরণ করা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সম্ভব না।

তিনি বলেন, “এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তারা নাগরিকত্ব আইন চালু করার প্রতিশ্রুতি একাধিকবার দিয়েছে – এমনকি প্রধানমন্ত্রীও এসে বলে গিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তো কবে আইন চালু হবে, তা নিয়ে কোনও নিশ্চয়তা নেই। ঠাকুর হরিচাঁদ গুরুচাঁদের আদি লীলাক্ষেত্রে গিয়ে সেই ড্যামেজ কি আর কন্ট্রোল করতে পারবে বিজেপি?”