।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

দলীয় পদ আর স্থানীয় নির্বাচনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে ‘কতিপয় কেন্দ্রীয় নেতা’র বিরুদ্ধে টাকা নেয়ার অভিযোগ তুলেছেন রাজশাহীর এক আওয়ামী লীগ নেতা। শনিবার (৬ মার্চ) বিকেলে ‘সেন্টার ফর পিপলস অ্যান্ড পলিসি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান আয়োজিত অনুষ্ঠানে ঘণ্টাব্যাপী বক্তৃতায় ওই নেতা বিস্ফোরক সব অভিযোগ আনেন দলের নানা স্তরের দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে।

আসাদুজ্জামান আসাদ নামের রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক দাবি করেন, আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী ও সুসময়ে জোটা নেতারা দুঃসময়ের ও পুরনো নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করছেন না। তিনি নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “শেখ হাসিনাকে একা হতে দেয়া যাবে না। আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে শেখ হাসিনার হাত ধরেই চলতে চাই।”

নগরীর শহিদ কামরুজ্জামান মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আসাদের বক্তৃতার সময় অন্যদের মধ্যে সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য অধ্যাপক জিনাতুন নেসা তালুকদার, রাজশাহী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকার, আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য এবং কাঁকনহাট পৌরসভার মেয়র আতাউর রহমান খান, তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম রাব্বানী, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন, বাঘা পৌরসভার সাবেক মেয়র আক্কাস আলী, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি বদরুজ্জামান রবু, জেলা যুবলীগের সভাপতি আবু সালেহ, সাধারণ সম্পাদক আলী আজম সেন্টু, জেলা কৃষক লীগের সভাপতি রবিউল আলম বাবু, মহানগর সেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক জেডু সরকার, রাজশাহী বার অ্যাসোসিয়েশসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট একরামুল হক, তানোর পৌরসভার মেয়র ইমরুল হক ও মুন্ডুমালা পৌরসভার মেয়র সাইদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

নেতারা কেন ‘স্যার’?

নিজের ৩৮ বছরের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আসাদুজ্জামান আসাদ প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকেই বলতে শুনেছি আমি দলের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করতে চাই। আপনি যে কর্মীকে যেখানেই পান, তার খোঁজ নেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। সাথে সাথে বলে উঠেন, কী খেয়েছো? কোথায় উঠেছো? কী করছো? আপনি এত বড় রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের পরও এই কাজটি করেন। কিন্তু আপনার পাশের নেতারা কি সেই কাজটি করে? আওয়ামী লীগের কিছু কেন্দ্রীয় নেতাকে এখন স্যার বলতে হয়। স্যার না বললেই নয়।”

আসাদ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যারা আওয়ামী লীগে এসেছেন সেই সমস্ত বেয়াদবদের স্যার বলতে প্রবীণ নেতারা কষ্ট পায়। আওয়ামী লীগে আমরা কাউকে স্যার বলতে আসিনি। আওয়ামী লীগ গণমানুষের দল। আমি এইসব দেখি আর বার বার বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী আপার কথা মনে পড়ে।” এসময় আসাদ বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার সঙ্গে তৃণমূলের মানুষের নিবিড় যোগাযোগ ও হৃদ্যতার কথা তুলে ধরেন।

তৃণমূলের কষ্টগাথা

আসাদ তৃণমূলে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “আমার যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে রাজনীতি করি, তারা কোনো কাজে গ্রামে গেলে সেখানে যদি কোনো গরীব আওয়ামী লীগের কর্মী থাকে, সে পাগল হয়ে যায়। তার বাড়িতে যদি খাবার না থাকে, সে পাশের বাড়িতে থেকে চাল ডিম নিয়ে এসে ওই নেতাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। এটি আমরা খুব উপভোগ করি। আর তারা শহরে এলে এক কাপ চা খাওয়ানো তো দূরের কথা, তাদের আমরা চিনতেও পারি না। আতাউর রহমানরা (আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতা) ফারুক চৌধুরীর (সাবেক শিল্পপ্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাংসদ) বাড়িতে গিয়ে গলা ধাক্কা খায়। ৭৫ এর পরে রাজনীতি করা মানুষ তারা। ওরা যখন বাইরে এসে কাঁদে, তাদের চোখের পানির দাম কি আল্লাহ দিবে না? আবার সিটি কর্পোরেশনে গিয়ে মেয়র খায়রুজ্জামানের কাছে যদি আওয়ামী লীগের মুরব্বিরা অপমানিত হয়ে ফেরত আসে, সেটিও কষ্টের বিষয় হয়। আবার হঠাৎ করে আসা মন্ত্রী শাহরিয়ারের কাছে যখন প্রবীণ নেতারা যায়, সে তখন বলে আপনি কে? তাকে যখন পরিচয় দিতে হয়। আওয়ামী লীগের নেতাদের আজ কেন পরিচয় দিতে হবে?”

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের উদ্দেশে আসাদ বলেন, “আপনি যত বলেন, হাইব্রিড কাউয়াদের দলে জায়গা হবে না, হাইব্রিডদের প্রভাব ততই বৃদ্ধি পায়।”

আসাদ আরও বলেন, “প্রবীণ নেতারা বলতো শেখ হাসিনাকে নিয়ে ক্ষমতায় যাবো কিন্তু রাজশাহীতে এমপি করা যাবে না। কেনো এমপি করা যাবে না ব্যাখ্যা দিতো না। প্রবীণ নেতারা কেনো এইসব কথা বলতো আমি বুঝতে পারতাম না। ৯৬ থেকে ২০০১ সালে আমি যুবলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। তখন প্রশাসনের কাছে গেলে সবাই সম্মান করতো। এখন কোন মন্ত্রী গেলেও ডিসি আর দাঁড়ায় না। ২০০৮ এরপর যখন ক্ষমতায় আসলাম তখন রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হই। প্রশাসন তখন পাত্তাও দেয়নি। তখন ওই মুরব্বিদের কথা মনে হতো। সাড়ে তিন বছরে এমপির ঠ্যালায় আমাদের নেতারা বাঁকা ছিলো। এখনতো ১৫ বছরের এমপিদের নির্যাতন। এই নির্যাতনের পর আওয়ামী লীগ রাজশাহীতে মাঠে কত দিন টিকবে সেটিই বিবেচ্য বিষয়।”

আসাদুজ্জামান আসাদ তৃণমূলের নেতাদের নাম ধরে ধরে তাদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরে বলেন, “৭৫ এর পর কয়টি বাড়ি ছিলো আমাদের যাওয়ার? অথচ আজ তারা কেন পিছিয়ে পড়ছে?”

মনোনয়নে টাকা, পদেও টাকা!

আসাদুজ্জামান আসাদ দলীয় প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলেন, “মাননীয় নেত্রী, আপনার কাছে করজোরে মিনতি করে বলছি, যারা বলে সব ঠিক আছে, তারা মিথ্যা বলে। আমি বলছি, নেত্রী, সারা বাংলাদেশে আপনার এক হাজার প্রশিক্ষিত আওয়ামী লীগের কর্মী নেই, যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বোঝে এবং জানে। এটা আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি। মাননীয় নেত্রী, আপনাকে বিনয়ের সঙ্গে বলি, আপনার ৭৪টি জেলা কমিটির ৫০টির নেতাও গঠনতন্ত্র পড়েনি, বোঝে না, জানে না।”

আসাদ আওয়ামী লীগে একটি প্রশিক্ষণ সেল তৈরির আহ্বান জানিয়ে বলেন, “প্রিয় নেত্রী, এটা জরুরি। কারণ, আপনি তো চিরকাল থাকবেন না। তখন আপনার বিদায়ের সাথে সাথে আওয়ামী লীগের মৃত্যুঘণ্টা বেজে যাবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে এতো সস্তা করে দেয়া যাবে না। সে জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি অনুরোধ রাখতে চাই, আওয়ামী লীগ আর এমপিলীগকে দয়া করে এক করেন না। রাজনীতিবিদ আর রাজনীতিজীবীকে দয়া করে এক করেন না।”

দীর্ঘ বক্তৃতায় এই নেতা প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে আরও বলেন, “মাননীয় নেত্রী, ওরা আপনাকে জানতে দেয় না। মাননীয় নেত্রী, আপনি যে মনোনয়নগুলো দেন তৃণমূলে সেখানে বিদ্রোহীরা বিজয়ী হয়। কেন বিদ্রোহীরা বিজয়ী হয়? কেনই বা সাহস দেখায়? আপনার নেতারা টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন বাণিজ্য করে মাননীয় নেত্রী। আপনাকে জানতে দেয় না, বুঝতে দেয় না। আরও অনেকে হয়তো এর সাথে জড়িত আছে। না হলে আপনি তো বলেন, নেত্রী, যে আপনি রিপোর্ট দেখে, দলের পদ পদবী দেখে মনোনয়ন দেন। সবাইকে তো এক হলে চলবে না। কাউকে না কাউকে তো সত্য উচ্চারণ করতে হবে। সেটা আমিই না হয় করলাম। কারণ আমি আওয়ামী লীগের পদের জন্য নয়, আওয়ামী লীগের আদর্শের জন্য রাজনীতি করি। আওয়ামী লীগ যদি জীবিত থাকে, আমি মাথা উঁচু করে থাকতে পারবো। আর আওয়ামী লীগ না থাকলে যত বড় পদেই থাকি, সে থাকায় কোনো লাভ হবে না।”

শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও সাফল্যের কথা তুলে ধরে আসাদ বলেন, “মাননীয় নেত্রী, আপনার কাছেই আমাদের প্রত্যাশা। সেটি হলো এই যে, মাননীয় নেত্রী, যাদেরকে আপনি কেন্দ্রীয় নেতা করে বিভিন্ন সাংগঠনিক জেলার দায়িত্ব দিয়েছেন, তারা টাকা ছাড়া কমিটি করে না। সেই জায়গা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।”

ক্ষুব্ধ কণ্ঠে আসাদ বলেন, “আমরা করবো দল আর ওরা শত শত কোটি টাকার মালিক হবে। আর, মাননীয় নেত্রী, আপনি নির্বাচনের আগে এসে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে ওই চোরদের জন্য ক্ষমা চাইবেন, বঙ্গবন্ধু-কন্যা, আপনার ক্ষেত্রে আমরা আগামীতে আর এটি হতে দেবো না। আপনি যেটা বলেছেন, চোরদের ঠিকানা জেলখানাতে। তাদেরকে ওখানেই পাঠাতে হবে।”

ঘরে শত্রু, পাশেও শত্রু!

ছাত্রলীগ ও যুবলীগের রাজনীতি থেকে মূল দলে আসা আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, “এখন মিছিলেও যেতে সাহস হয় না। কারণ আমার পেছনেই হয়তো জামায়াত আছে। তা তো আছেই, আমার পাশে তো ফারুক চৌধুরীরা আছেই। আজ আপনারা দেখবেন, আমরা আগে আমাদের সমাবেশে হাততালি দিতাম। এখনও দিই। এটাই আমাদের অভ্যাস। আর ওই জামাতীরা দেখবেন, কথায় কথায় বলে ওঠে ‘ঠিক’ আর ‘মারহাবা’। এখন আমরা দেখি, আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় প্রোগ্রামে ‘মারহাবা মারহারা’ রব ওঠে। ওরা কারা? ওরা আওয়ামী লীগের কেউ নয়। ওরা আওয়ামী লীগ ধ্বংস করতে আমাদের মধ্যে ঢুকেছে। ওদেরকে চিহ্নিত করে বিদায় করে না দিলে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সংকটে পড়বে। আর সেই দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে। পদ-পদবী বড় কথা নয়। আমাদের পদ না থাকলেও আমরা আওয়ামী লীগ। আজ পদওয়ালা নেতারা আমাদের সঙ্গে হেঁটে দেখুক। কত মানুষ আমাদের পেছনে আসে আর তাদের পেছনে কজনকে গোনা যায়।”

সম্প্রতি মহানগর ছাত্রলীগের সম্মেলনের দৃষ্টান্ত টেনে আসাদ বলেন, “এই সম্মেলনে একজন প্রার্থী ছিলো, তার সবকিছু ঠিকঠাক। কিন্তু সমস্যা একটাই। কী সেটা? ও আমার সাথে কথা বলে। কে সেটাকে সমস্যা বলে মনে করছেন? কেন করছেন? আমি এই শহরে ছাত্রলীগ-যুবলীগ করে আওয়ামী লীগে এসেছি। তারপরেও আমি মাননীয় নেত্রীকে বলেছিলাম, আমি মহানগরে রাজনীতি করতে চাই না। আমাকে জেলায় দেন। আমি সেভাবেই রাজনীতি করে এসেছি। কিন্তু দয়া করে কেউ বাধ্য করবেন না, আমাকে মহানগরের রাজনীতি করতে।”

আসাদুজ্জামান আসাদের পুরো বক্তব্যটি ইতোমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। দলের তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী মন্তব্যও করছেন।