।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

সম্প্রতি রাজশাহীতে দলের বিভাগীয় জনসভায় দেয়া যে বক্তব্যে রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে, সে ব্যাপারে আপাতত ক্ষমা চাইছেন না বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু। বরং পুরো পরিস্থিতি রাজনৈতিক কৌশল দিয়ে মোকাবেলার পরিকল্পনা করছেন তিনি।

মঙ্গলবার (২ মার্চ) রাজশাহীতে বিএনপির বিভাগীয় জনসভায় মিজানুর রহমান মিনু তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, “আজ রাত, কাল আর সকাল নাও হতে পারে। ৭৫ সাল মনে নাই?” সাবেক এই মেয়র ও সংসদ সদস্যের বক্তব্যকে ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মতো আরও একটি হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত’ বলে দাবি করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ।

বুধবার (৩ মার্চ) দুপুরে এর প্রতিবাদে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার এক যৌথ বিবৃতিতে মিনুর প্রতি তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। সন্ধ্যায় বিক্ষোভ মিছিল শেষে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন তাকে ৭২ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন ক্ষমা চাওয়ার জন্য। অন্যথায় মামলা করার কথা জানান।

একই দিন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী-২ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা এক বিবৃতিতে মিনুর বিরুদ্ধে সরাসরি আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। বৃহস্পতিবার (৪ মার্চ) সকালে স্থানীয় ওয়ার্কার্স পার্টি বিক্ষোভ মিছিল শেষে ‘বারবার মিজানুর রহমান মিনু এমন ধরনের বক্তব্য রেখে পার পেয়ে যাচ্ছে কেন’- সে প্রশ্ন তোলে।

খায়রুজ্জামান লিটনের দেয়া ৭২ ঘণ্টা সময়সীমা শেষ হচ্ছে শনিবার (৬ মার্চ) সন্ধ্যায়। এখনও পর্যন্ত এ ব্যাপারে মিজানুর রহমান মিনু কোনো কথা বলেননি। বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতার একাধিক ঘনিষ্ঠ সূত্র উত্তরকালকে নিশ্চিত করেছে, আপাতত তিনি ক্ষমা চাইছেন না। বরং বিষয়টিকে রাজনৈতিক কৌশলে মোকাবেলা করার কথা ভাবছেন।

সূত্র জানায়, জনসভার পরদিন মিনু ঢাকা চলে যান। সেখানে একটি দলীয় কর্মসূচিতেও অংশ নেন। আগামী ৯ মার্চ আরও একটি কর্মসূচি রয়েছে। সে কারণে তিনি এর মধ্যে রাজশাহীতে ফিরছেন না, তা এক প্রকার নিশ্চিত। জনসভায় দেয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গেও মিনুর কথা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ওই সূত্র।

জানতে চাইলে মিজানুর রহমান মিনু বলেন, “এই বিষয় নিয়ে আমি এখন কোনো কথা বলতে চাই না। মোবাইল ফোনে তো একদমই নয়। ঢাকায় আমি দলের অন্য কাজে ব্যস্ত আছি। সে কারণে আগামী ১০ তারিখ (১০ মার্চ) পর্যন্ত আমি বিষয়টি নিয়ে কোনো কথাই বলতে পারবো না।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বিএনপির মধ্যম সারির এক নেতা দাবি করেন, শুধু মিজানুর রহমান মিনু নয়, ওইদিনের জনসভায় আরও একাধিক নেতা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। ওই নেতা বলেন, “পলিটিক্যাল মিটিংয়ে এসব তো হয়ই। সেরকম করেই সব নেতাই কমবেশি বলেছেন। অথচ শুধু মিনু ভাইয়ের একটা কথা নিয়ে লাফালাফি শুরু হয়েছে।”

বিএনপির ওই নেতা আরও বলেন, “ওই মিটিংয়ে আমাদের এক নেতা বলেছেন যে আমাদেরকে যুদ্ধ করতে হবে। তার মানে কি সত্যি সত্যি উনি যুদ্ধ করতে বলছেন নাকি? আবার একজন বলেছেন, ২১ সাল হাসিনার শেষ সাল। এর মানে কী? এখন আপনি যদি পলিটিক্যাল মিটিংয়ের এসব বক্তব্য ধরেন, তাহলে একা মিনু ভাইয়ের ওপর দোষ আসবে কেন?”

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার অবশ্য মিনুর এই বক্তব্যকে শুধুই ‘মাঠ গরম করার’ কথা বলে মনে করছেন না। তিনি বলেন, “পলিটিক্স আমরাও করি। আমরাও জানি কোনটা কী ধরনের কথা। কিন্তু উনি (মিনু) সেদিন যা বলেছেন, তা কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য হতেই পারে না। শিষ্টাচার তো দূরের কথা, তিনি ষড়যন্ত্রকারীর ভাষায় কথা বলেছেন।”

জানতে চাইলে ডাবলু বলেন, “আমাদের সভাপতি লিটন ভাই (খায়রুজ্জামান লিটন) তাকে সময় বেঁধে দিয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা না চাইলে মামলা হবে। উনি (মিনু) যদি এই সময়ের মধ্যে ক্ষমা না চান, তাহলে অবশ্যই আমরা বসে থাকবো না।”

আওয়ামী লীগের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির মহানগর সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ প্রামাণিক দেবুও মনে করেন মিজানুর রহমান মিনুর কথাগুলোকে ‘নিছক পলিটিক্যাল প্রোগ্রামের কথার কথা’ হিসেবে নেয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “এটা কিন্তু প্রথম নয়। এর আগেও তিনি (মিনু) এ ধরনের কথা বলেছেন। আবার মাফও চেয়েছেন। কিন্তু বারবার এভাবে তাকে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।”

অবশ্য মহানগর বিএনপির আরেক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেন, মিজানুর রহমান মিনুর সেদিনের বক্তব্যে তারাও বিস্মিত হন। ওই নেতা বলেন, “পলিটিক্যাল মিটিংয়ে অনেক কথা হয় এটা সত্য। কিন্তু ওইদিন মিনু ভাই ৭৫ সাল নিয়ে, বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থাকে জড়িয়ে যেভাবে কথা বলেছেন, সত্যি বলতে, আমি নিজেও অবাক হয়েছি।”

মিজানুর রহমান মিনুর মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার এমন বক্তব্যের কারণ কী? জানতে চাইলে মহানগর বিএনপির ওই নেতা বলেন, “ঠিক বলতে পারবো না, কারণটা কী? তবে তার মতো একজন নেতা অকারণে এমন কথা বলবেন বলে মনে করি না।” ওই নেতা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির দুয়েকজন নেতা রাজশাহীর রাজনীতিতে অতিমাত্রায় সক্রিয়তা দেখানোর চেষ্টা করেন। এই বিষয়টি মিনু ভালোভাবে নেন না। নগর বিএনপির ওই নেতা বলেন, “সেদিনের জনসভায় এমন দুয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা খুব কঠোর বক্তব্য রাখেন। সে কারণেই হয়তো উনি (মিনু) আরও কঠোর বক্তব্য রেখেছেন।”

মিনুর ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইস্যুটি নিয়ে আপাতত চুপ থাকবেন মিজানুর রহমান মিনু। কারণ, এই মুহূর্তে জাতীয় রাজনীতির যে পরিস্থিতি, তাতে ক্ষমা চাইতে গেলে দলের মধ্যে কোনঠাসা হয়ে পড় পারেন তিনি। সেক্ষেত্রে মিনু ইস্যুটি কেন্দ্রীয়ভাবে সামলানোর পরিকল্পনা করেছেন।

এদিকে বিভাগীয় জনসভার এই বক্তৃতা নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়েও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শুক্রবার (৫ মার্চ) দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জনসভায় দেয়া সেই বক্তৃতা প্রসঙ্গে বিএনপি নেতাদের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, “ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা এবং রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলেও বিএনপির পক্ষ থেকে এর কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য দেয়া হয়নি৷ তাহলে কি ধরে নেব, এটি বিএনপির দলীয় বক্তব্য?”