তারুণ্যের উদ্দামতায় নিছক আবেগবশত এবং থাকা-খাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে আমার মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংযুক্তি। আগে থেকে ভেবে-বুঝে যুক্ত হইনি। যেমন বুঝে-শুনে ‘জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো’ স্লোগানে সুর মিলিয়ে মিছিলেও যোগ দিইনি। যোগ দিয়েছি মিছিলে ওই দীপ্তিময় শব্দ উচ্চারণের ছন্দ আবেগ আর কৌতূহল থেকে। তারুণ্যে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকে বলতে পারেন, একাত্তরে সেটাই ছিলো আমার খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকার অবলম্বন। একটা ঠিকানা নিশ্চিত করার জেদ আর লক্ষ্য। তখনও রাজনীতিতে পোক্ত হয়ে উঠিনি। ভালো বুঝতামও না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিরুদ্দেশে পাড়ি জমানোর পথে সেই যে এক যুবক কলেজছাত্রকে সঙ্গী পেয়েছিলাম, পথ চলতে চলতে তার কাছেই আমার সরাসরি প্রথম রাজনীতি-পাঠ গ্রহণ। কেবল ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ ইত্যাদি স্লোগান সবার সঙ্গে কণ্ঠ মেলানোটাই যে রাজনীতি নয়, হাঁটতে হাঁটেতে কলেজছাত্রটির আলোচনা শুনে তার খানিকটা বুঝেছি। আবার হাঁটতে হাঁটতে পায়ের ব্যথা পথকষ্টটা ওর কথায় ভুলেছি।  শুধু বুঝিনি কে এই শেখ মুজিব আর কেনই বা তাঁকে বন্দি রাখা হয়েছে এবং কোথায়, কোন্ জেলে—এ  সব কিছুই জানতাম না। সেই জানা খানিকটা পূর্ণ হয় ১৯৭০-এর নির্বাচনের সময়। তখন সবাই ভোট দিচ্ছে, আমি দিতে পারছি না, সে এক ভারী যন্ত্রণা। কেন পাঁচ-ছ’বছর আগে জন্ম হলো না আমার ইত্যাদি নানা প্রশ্ন বুকে জমে উঠছিলো। তবুও ভোটকেন্দ্রে আমাদের নিরঙ্কুশ একাধিপত্য ছিলো দেখার মতো।

একাত্তরে রাজনীতিক কারণেই আমার মা-বাবা আমাকে ফেলেই পশ্চিমবঙ্গের পথে পা বাড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন। এক সন্তানের জন্য সমগ্র পরিবারকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারেননি পরিবারের জ্যেষ্ঠরা। মা কেবল আমাকে ফেলে যাওয়ার যন্ত্রণায় হা-পিত্যেশ করে কেঁদেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসই তিনি কেঁদেছেন। আমি মা-বাবার জ্যেষ্ঠ পুত্র। দিদি চার বছরের বড়ো। তারপর আমি। স্বভাবতই মা-বাবার কাছে আমি ছিলাম অনেক আদরণীয়। হাজার হলেও পুত্র সন্তান! পরিবারে মেয়েদের থেকে আমার শুধু নয়, পুত্রদের স্থান অনেক উঁচুতে। তাদের দাবি অগ্রগণ্য। দিদি আর বোনদের দাবি অধিকাংশ সময়ই হয়েছে উপেক্ষিত। সেকালের পরিবারের অন্দরমহলের কত্রী মা-ঠাকমা। মেয়েরা বেশি খাওয়ায় অভ্যস্থ হলে স্বামীর ঘরে গিয়ে অভ্যেসটা থেকে যাবে। তার শশুড়বাড়ির লোকজন অখ্যাতি করবে। তাই মেয়েদের ইচ্ছে-আশা-স্বপ্নকে অন্দরমহলেই গলা টিপে হত্যা করা হতো। বাড়ির ছেলেরা সব ক্ষেত্রে পেতো অগ্রাধিকার। আমি অনেক সময় দিদিকে মাছের মাথাটা তুলে দিয়ে তার ভাঙা মাছটা নিজের পাতে তুলে নিয়েছি। দিদি খেতে খেতে আমার থালার দিকে কেমন করুণ চোখে দেখতো। দেখে আমার ভারী কষ্ট হতো। তাই দিদিকে দিতাম। মা কিংবা ঠাকমা দেখে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন। বাবা আমাদের সামনে বসেই খেতেন, আমার দিকে প্রশংসার চোখ তুলে আমার কিংবা তার মাকে বলতেন, ওকেও মাথা দেবে ও-ও তো বাড়ির একজন নাকি তোমাদের ছেলেরাই সব। দিদি বাবার সমর্থন পেয়ে আস্তে আস্তে খেতো। আমি দ্রুত খেয়ে আমার জগতে অধিষ্ঠান নিতাম। সে এক সাম্রাজ্য। গাছে ওঠা, ফল খাওয়া কিংবা বিকেল হলেই খেলা। দৌড়-ঝাঁপ। সন্ধেবেলায় পড়তে বসলেই ঘুমে চোখ বুজে যেতো। কাকিমার লাঠির ভয়ে অনেক কষ্ট করে পড়ে যা পেতাম তাই খেয়ে ঘুমিয়ে যেতাম। বাড়ির বেয়াড়া আর অপকাজের শিরোমণি ছিলাম আমি। তাই বড়োদের কড়া ঝাল পেলেও কাকামণি ছিলেন আমার প্রধান সহায়ক। এমন একজনকে দেশে ফেলে নিরুদ্দেশে পাড়ি জমানোয় সবার ভেতরে একটা কষ্ট নিয়ত কাঁটা বিদ্ধ করতো। 

বাবা চোখের জল না ফেললেও অন্তরদহনে জ্বলেছেন। তাঁর বড়ো ও ছোট ভাই আর ঠাকমার কাছে বলতেন, দুষ্টু ছেলেকে লেখাপড়া শেখানোর লক্ষ্যে গ্রাম থেকে দূরে এক ইশকুল হোস্টেলে পাঠানো হলো। সবার ধারণা ছিলো দুষ্টুটা শাসনে-নিয়মের বেড়াজালে মানুষ হবে। সে আজ কোথায়, কে জানে। বাবা মাঝে-মাঝেই তাঁর মা-ভাইদের বলতে, ও বেঁচে আছে। ফাদার ক্যান্টন ওই ছেলেদের ফেলে যাবেন না। ও বেঁচে আছে…

সেখানেই আটকে পড়ি। ফাদার ক্যান্টন ইশকুলের হোস্টেলে যারা থাকতো, তাদের নিরাপত্তার জন্যে কাউকে বাইরে যেতে দেননি। আমরা, মানে আমি আর যদু ফাদারের দৃষ্টি এড়িয়ে এপ্রিলের এক ভোরে প্রাচীর ডিঙিয়ে ঘরছাড়া হাজার হাজার মানুষের সারির মধ্যে মিশে যাই। অনেক কষ্টে পায়ে হেঁটে গ্রামে এসে দেখি মা-বাবা কেউ নেই সবাই ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন। তখন মনটা ভীষণ দমে যায়। রাগ হয় তাঁদের ওপর। আমাকে ছেড়েই চলে গেলেন! আমি কি তাঁদের কেউ নই? গ্রামের তালুকদার পরিবার আমাদের আশ্রয় দেন। সন্তানের আদরে তাঁদের সঙ্গে কয়েকদিন সেখানে অবস্থান করি।  

গ্রামের তালুকদারদের মধ্যে অনেকেই বাবা ও কাকামণির বন্ধু ছিলেন, তাঁদের কাছে অনুপস্থিত আমাকে সমর্পণ করে কাঁদতে কাঁদতে চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে সপরিবার পথে বেরিয়েছিলেন মা-বাবা এবং পরিবারের সবাই। আমি যদি ফিরে আসি, তারা যেন আমাকে নিজের সন্তান মনে করে আগলে রাখেন, সে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। মা নাকি বলেছিলেন, ‘সকলেই যান, বাবু না আসা পর্যন্ত আমি যাবো না। আমি ওকে রেখে কোথাও যেতে পারবো না।’ আমি ছিলাম মায়ের প্রথম পুত্রসন্তান। দিদি আমার বড়ো। পুত্রের প্রতি মায়েদের পক্ষপাতিত্ব বোধকরি একটু বেশি। তাই মায়ের ওই আহাজারি। একাত্তরের আগস্টে আমি দেশের মধ্যে বিচরণ করছি। সে সময় বামিহাল হাট থেকে ইশকুলের প্রধান শিক্ষক রিয়াজউদ্দিন তালুকদার আমাকে ধরে জোর করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। তখন আমাকে দেখার জন্য পাড়ায় মানুষ আবার জমা হয়। তালুকদার পরিবার আমাকে সন্তানের আদরে প্রতিপালন করেছেন। আমি তাঁদের কাছে ঋণী। এবার ফিরে আসা যদুর সঙ্গে বোর্ডিং থেকে পালিয়ে আসা নয়। রীতিমতো সশস্ত্র আগমন আমার। রিয়াজ ভাই সেটা অনুমান করেছিলেন যথার্থ।  

মার্চ থেকে জানি না মা-বাবা কোথায় আর স্বজন-বন্ধুরা কে কোথায়। তাদের কোনো সন্ধান নেই। ঘর থেকে বিতারিতদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে উপস্থিত হই। তখন আমার আর যদুর খাওয়ার অনিশ্চয়তা। কোথায় পাবো চাল-ডাল আর কে দেবে রেঁধে। একটা রেশন কার্ড সংগ্রহ করতে পারলেও রান্না তো করতে পারি না। উপরন্তু কে দেবে স্নেহের পরশ। প্রতিদিন তো আর ডাল-আলু ভর্তা কখনো একটা ডিম অমলেট করে দু’জনে ভাগাভাগি করে খাওয়া। ও দিয়ে আর কতোদিন খাওয়া যায় না। রুচির পরিবর্তন কে না চায়? মুক্তিযোদ্ধা হলে অন্তত ও সবের ঝামেলা পোয়াতে হবে না। তাই ৮/১০ বার লাইনে দাঁড়ানো এবং ছোট্ট সাইজের (উচ্চতা) কারণে বার বার বিয়োগের খাতায় পতিত হই। কিন্তু আমি আশা ছাড়িনি। প্রতিদিন প্রায় সবার আগে গিয়ে লাইনে দাঁড়াই। আর জলিল সাহেবের রোষানলে পতিত হই। ‘আবার তুই?’ শেষের দিন ওই বাস আর ড্রাইভারের সঙ্গে ছোট মানুষের রাইফেল চালনার তুলনা করে পরীক্ষা পাস। মানে আমি বুদ্ধিমান তাই মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করি। তখন সে কি আনন্দ। “জয় বাংলা” বলে আমি তো ছায়াঘেরা আমতলা মুখরিত করে তুলেছিলাম। শেষে মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান ভাই এসে থামান। ‘থাম্ পাগলা, ট্রাকে ওঠ্।’

তিওর ক্যাম্পে এসে চাল-ডালের বস্তা নামাতে সাহায্য করে স্নান শেষে যখন খেতে বসেছি দেখি সিংড়া থানার সাহাদৎ ভাই—পাঞ্জাবিদের মতো ইয়া লম্বা, প্রায় সাড়ে ছয় ফুট উচ্চতা তাঁর। খানিক বাদে দেখি আমাদের প্রতিবেশী গ্রামের শ্রীপদ সাহা। সে-ও বাপে তাড়ানো-মায়ে খেদানো এক ছন্নছাড়া। আমার থেকে বছর তিনেকের বড়ো। শরীরে তার অযুত শক্তি। পেটা শরীর। বিড়ি টানতে টানতে ঠোঁটে কালশিটে পড়ে গেছে। দুর্দান্ত সাহসী। তার সঙ্গে তুই তোকারি সম্পর্ক ছেলেবেলা থেকেই। আমাদের গ্রামের ইশকুলে পড়তো। তার পাস করার ইতিহাস সামান্য। সেজদার সঙ্গে পড়তো। তার ওই বয়সে কলেজে পড়ার কথা। পাসই জোটাতে পারে না আবার কলেজে পড়বে। কিন্তু ভালো খেলোয়ার। সে সুবাদে নবম শ্রেণিতে উঠতেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু। শ্রীপদ মুক্তিযোদ্ধা। কোথায় কন্টাক্টে খেলতে গিয়েছিলো। ধ্যেৎ, বাড়ি ফিরে আর কি হবে, গৃহহীন মানুষের সারির মধ্যে মিশে সে পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। তার শারীরিক গঠনেই জলিল ভাই বোধহয় প্রথম দর্শনে যোগ্য মুক্তিসেনা পেয়েছিলেন। সে এসে পিঠে এক চাপ্পর মেরে, ‘কি রে সরকারের পাঁঠা, পারবি তো? কোনো অসুবিধে হলে জানাস। আমি ১২৩ নম্বর টেন্টে আছি। সন্ধে পর আসিস্, চা খেতে যাবো।’ কিন্তু যদুকে তিওর ইশকুল মাঠে দিনভর খুঁজেও পেলাম না। শ্রীপদকে জিজ্ঞেস করলে জানালো, ‘ওই শালা তো পোলাচে। তিন/চারদিন পর কোথায় পালিয়ে গেছে।‘ শুনে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। আবার একা হয়ে গেলাম। ভাবলাম ক্যাম্পে গিয়ে যদুকে পাবো। উচ্চতার সুবাদে যদু আমার সপ্তাহখানেক আগে তালিকাভুক্ত হয়ে প্রশিক্ষণে এসেছিলো। সে পালিয়েছে? যাক আর কী করা? শ্রীপদর সঙ্গে থাকি। সে-ও এক সপ্তাহ পর শিলিগুড়ি হায়ার ট্রেনিংয়ে গেলো। আমি যে একা সেই একা হয়ে গেলাম।

শ্রীপদ জানায়, ‘আমি কয়েকদিন আগে যদুর ভগ্নিপতি লালু ডাক্তারকে দেখেছিলাম। বোধ হয় ওই শালাই এসে যদুকে নিয়ে গেছে।’ শ্রীপদ এই তথ্যটা ঠিক হতে পারে। লালু ডাক্তার বিত্তবান গৃহস্থ। জমি-জায়গা নিয়ে তাঁর ওপর অনেকের রাগ আছে। তিনি তাদের আক্রমণের সুযোগ না দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। শ্যালকের খবর জেনে তিনি এসে তাকে নিয়ে গেছেন। এটা সত্যি এ জন্য যে ডাক্তার ভারী চতুর। যদুর জন্য করুণা হলো। ভাবলাম, ওর খোঁজ আর করবো না। আমার তো একটা ঠিকানা হয়েছ। আমি এখানেই থাকবো। প্রশিক্ষণ নেবো।  

সন্ধের পর আমাকে যেতে হলো না, শ্রীপদই এলো। হাতের আঙুলের ফাঁকে পাতার বিড়ি। আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, ‘টানবি নাকি?‘ ‘না’ বলতেই সে নাক সিটকে খিস্তি দিয়ে বললো, ‘…আর সতীপানা করিস না, এ মাল টানতেই হবে। না হলে যুদ্ধ করবি কি করে?’ আমি প্রতিত্তোর করলাম না। ওর সঙ্গে আরো দুই মুক্তিযোদ্ধাসহ আমরা প্রায় পনেরো মিনিট হেঁটে গেলাম চা-খানায়। তখন আমি চা কিংবা বিড়ি-কোনোটাতেই অভ্যস্থ ছিলাম না। ওদের সঙ্গে শ্রীপদ পরিচয় করিয়ে দিলো। ওরা একজন বগুড়ার অন্যজন সিরাজগঞ্জের। সবাই মিলে দু’দফা করে চা খেয়ে ছেড়ে আসা বাড়ি-ঘরের সুখ-সুবিধা, স্মৃতি ইত্যাদি হরেক কথা বললো। ক্যাম্পের খাওয়া নিয়েও ওরা খিস্তি করলো। ‘কুত্তার খাওয়া আমাদের দ্যায়।’ শ্রীপদ খুবই সহজভাবে বললো, ‘আমি শালা বেন্ন্যা-ফকিরন্নির ছাওয়াল, ঘরও নাই, কোনো স্মৃতি নাই। যা দ্যায় গিলি। বাঁচ্যা তো আচি।’ বার কয়েক বিড়িতে দম দিয়ে আমাকে দেখিয়ে বললো, ‘এরা হচ্ছে জমিদার-জোতদার, এদের ঘর-বাড়ির স্মৃতি অনেক। দোতলার রেলিং-এ বসে আকাশের চাঁদ দ্যাখে। কোকিলের গান শুনে।’ আমার দিকে ঘুরে গায়ে ঠেলা দিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘তোর বাবা-মা-কুটি? তারা কি জানে, তুই কুটি…?’ আমি বললাম, আমি ইশকুলের হোস্টেলে ছিলাম, ওখান থেকে কিছুতেই আমাকে ছাড়েনি। মা-বাবা-ঠাকমা সবাই আমাকে ছেড়ে চলে এসেছেন এখানে। জানি না তারা কোথায়?’ শ্রীপদ আশ্বস্ত করলো এই বলে যে, ‘ভালোই হচে, মরুক-বাঁচুক ওরা যে যা পারে কোর্যা খাক্, তুই লড়ে যা, দ্যাশ থাক্যা শকুন খেদান লাগবি। শিয়াল-কুত্তা মারতে হোবি। গুলি মিস কোরা চলবে না। গুলির দাম অনেক। বুঝলু?’ হাঁটতে হাঁটতে সে বললো, ‘আমি মোরলে তুই আর তুই মোরলে আমি বাড়িত্ খবর দিবো। ভয় পাস না, আমরা মোরবো না, পাকিস্তানি হারামিকেরে মার্যা তাড়াবো। অ্যার নাম গেরিলা ফাইট। শালারা গেরিলা যুদ্ধ পারে না। আমরা জিতবোই জিতবো। জয় বাংলা…

শ্রীপদর নিশানা ছিলো নির্ভুল। ওর টার্গেট খুব কম মিস হতো। সাহসও ছিলো দুর্দান্ত। হামাগুড়ি দিয়ে কোয়ার্টার কিলোমিটার অতিক্রম করতো, হাঁপিয়ে পড়তো না। জল-কাদায় আরো বলবান। রাইফেল পিঠে নিয়ে কোমরে এক বোঝা গুলি বেঁধে সবার আগে আগে হাঁটতো। আমরা পিছিয়ে পড়তাম, ‘ওই মাগিসব, ঠ্যাঙে বল নাই শালাদের, হাঁট শালারা’ বলে দ্রুত এগোনোর নির্দেশ জারি করতো।

যুদ্ধদিনের স্মৃতি আজো অমলিন হয়ে আছে। দু’দিন ভাত খাইনি। বাঙ্কারে অ্যাম্বুশ করে আছি। সবার গামছায় শুকনো চিড়ে আর গুড়ে মুড়কি বাঁধা। চামড়ার বোতলে জল। কিন্তু বিড়ি টানা নিষেধ। আগুন-ধুয়া দেখে আমাদের পজিশন শত্রুরা জেনে নেবে। অ্যাম্বুশে বসেও ওই দু’মুঠো মুখে দিয়ে কমান্ডারের নির্দেশের কান পেতে থাকতে হয়। ফায়ার… বলতেই দমাদম গ্রেনেড নিক্ষেপ, তারপর পজিশন বদল করে রাইফেল আর স্টেনগানের ত্রিমুখী আক্রমণ। ওরা পরাস্থ হলে “জয় বাংলা” ধ্বনি দিয়ে উৎসুক জনতার মধ্যে মিলে যেতাম। তখন কে যোদ্ধা আর কে নিরস্ত্র মানুষ চেনা দায়।

তিনদিন পর ভাতের সঙ্গে দেখা। সে গল্প আগামী দিনে হবে। ভাতের সঙ্গে দ্যাখা সে যেনো অতি ঘনিষ্ট প্রিয়জনের সঙ্গে “দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী” পর মুখোমুখি হওয়ার আনন্দ আর প্রশান্তির পরশ। কততো দিন ভাত খাইনি…

আজকে ভাবলে সেই কষ্ট উঁকি দেয় স্মৃতি হয়ে। স্বাধীনতার জন্য সমগ্র জাতি এমন কতো রকম কষ্ট করেছে। তাদের কষ্টের মূল্য কে দেবে? আজকের প্রজন্মের সে দায়িত্ব নিতে হবে। শ্রীপদ এখন মাছের ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করে। আমি বাড়ি গেলে ওর সঙ্গে দেখা করি। চা খাই। কিন্তু চায়ের দাম সে আমাকে কিছুতেই দিতে দেয় না। দিলেই ভীষণ রেগে ওঠে। বলে ট্রেনিংয়ের সময়ের একটা কথা তোর মনে আছে? আমি বলি, না। ও বলে সেই যে অগ্নিকন্যা বিপ্লবী বীণা দাস বলেছিলেন—

“বৃটিশদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে

লড়েছি অর্থ বা ক্ষমতার লোভে নয়!”

আর বলেছিলেন—

“দেশ সেবার কোন পেনশন হয় না”

আমরা মুক্তিযোদ্ধারা এখন পেনসন নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। অমুক্তিযোদ্ধারা পর্যন্ত তালিকাভুক্ত হয়েছে। ওরাই সব লুটেপুটে খাচ্ছে। ভাই-নাতির চাকরি নিয়ে ব্যস্ত। আমার ছেলে দুটো বিএ পাস বেকার। আমি মাসিক টাকা নিই না। মাছ বিক্রি করে খাই। ছেলে দুটো একটা ইশকুলের দারোয়ান আরেকটা রাজাকারের অসুধের দোকানের কর্মচারী। ক’ এই জন্যে যুদ্ধ করিছিলাম, এই রাজাকারের দাসত্ব করার জন্য। ওক বাড়িত থাক্যা তাড়ায় দিছি। রাজাকারের টেকা খাবো না। বউ নিয়া বাজারের ওই কোণার ঘরে থাকে। আমি মাছ বেচি আর বউয়ের মাজা বেদনার অসুধ লাগলে অন্য দোকানে কিনি, রাজাকারের দোকানের কোনো জিনিস কিনি ন্যা। বাঁচ্যা থাকা পর্যন্ত কিনবো না, আপোস কোরবো না। ইড্যাই একুন আমার যুদ্ধ। গেরিলা ফাইট…

প্রচ্ছদ রাজিব রায়