Berger Viracare

আগের পর্বে: একদিন যা ছিলো সিআইএ’র গোপন তৎরপতার অংশ, আজ তা প্রকাশ্যে করে আরেক মার্কিন সংস্থা এনইডি। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম হিসেবে তাদের টাকায় চলে নেত্র নিউজ।


।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

ভেনিজুয়েলা। ক্যারিবিয়ান সাগরের তীরে দক্ষিণ অ্যামেরিকার এই রাষ্ট্রের কারাকাস অঞ্চলে এক রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান লিওপদো লোপেজ। আশির দশকে স্কুলজীবনে শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে তোলেন এক সংগঠন। নাম তার ‘অ্যাকটিভ স্টুডেন্টস হেলপিং দ্য আর্থ সারভাইভ’।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে স্নাতক শেষ করে পাবলিক পলিসি নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিতে তিনি পাড়ি জমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্ট থেকে ১৯৯৬ সালে মাস্টার্স করে দেশে ফেরেন এই তরুণ। দেশে ফিরে তিনি রাজনীতিতে নামেন। তখন হুগো শ্যাভেজের আমল। ২০০২ সালে এক ব্যর্থ অভুত্থানে শ্যাভেজকে উৎখাতের চেষ্টা হয়। লোপেজ ততোদিনে শ্যাভেজ-বিরোধীদের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা।

এ পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক। কিন্তু ভেতরের এক বড় ষড়যন্ত্রের ঝাপি খুলে যায় ২০০৪ সালের মে মাসে। নিউইয়র্কের ইভা গোলিনজার তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পাওয়া কিছু তথ্য প্রকাশ করেন সেদিন। সেখানে দেখা যায়, ‘রাজনীতিক’ লোপেজ যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল এন্ডোমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির (এনইডি) কাছ থেকে তার দলের প্রশিক্ষণের নামে অর্থ তহবিল পেয়েছেন। সেই সময় দুদফায় ৪ লাখ ১৬ হাজার ডলার সহায়তার প্রমাণ ইভা উপস্থাপন করেন।

এখানেই শেষ নয়। শ্যাভেজের বিরুদ্ধে ২০০২ সালের সেই ব্যর্থ অভ্যুত্থানে নেপথ্যের সব কারিগরদের কাছেই নানা প্রকল্পের নামে এনইডির টাকা যাওয়ার তথ্য তুলে ধরেন ইভা। অভ্যুত্থানটি ব্যর্থ না হলে তাদের সবাই মন্ত্রী হতেন! ইভা সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে যে তথ্য দেন, তা হলো, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ২০০২ সালের এপ্রিলে ১ মিলিয়ন ডলার দেয় এনইডিকে। সেই অর্থ ‘বিশেষ ভেনিজুয়েলা সহায়তা তহবিল’ নামে এনইডি যাদের হাতে তুলে দেয়, তারা সবাই ওই মাসেই ভেনিজুয়েলার ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের নেপথ্য কারিগর ও নেতা ছিলেন।

তেল উৎপাদক ভেনিজুয়েলার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট বিবাদ আজ আর বিশ্বরাজনীতিতে অজানা নেই। শ্যাভেজ-উত্তর রাষ্ট্রটিতে প্রেসিডেন্ট মাদুরোর বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান খুবই পরিস্কার। এমনকি এই সেদিনও ট্রাম্প প্রশাসন ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টসহ সরকারপন্থি গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার মতো অভিযোগ তুলেছে। মাদুরোর বিরুদ্ধে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল অবধি ভেনিজুয়েলায় নানা আন্দোলন হয়েছে। উত্তরকাল এই চার বছরের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এই সময়ে দেশটিতে নানা চেহারায় এনইডি’র কাছ থেকে ৯৩ লাখ ৭৪ হাজার ১৮০ মার্কিন ডলার সহায়তা এসেছে, বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটি টাকা। এর বেশিরভাগই ব্যয় হয়েছে ভেনিজুয়েলায় সরকারবিরোধী তৎপরতায়।

এই আশঙ্কার কথা শ্যাভেজের জীবদ্দশাতেই জানিয়েছিলেন মার্কিন সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের (সিইপিআর)সহপরিচালক মার্ক ওয়েসব্রুট। ২০০৪ সালের জুনে মর্কিন সিনেটের এই উপকমিটির শুনানিতে তিনি ভেনিজুয়েলায় অস্থিতিশীলতা তৈরির জন্য মার্কিন প্রশাসন কীভাবে এনইডিকে ব্যবহার করে, তা সবিস্তার তুলে ধরেন।

তিনি সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, “মার্কিন প্রশাসন এনইডির মাধ্যমে ভেনিজুয়েলায় এমন সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দিয়েছে (২০০২ সালে), যারা নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি এবং ভাইস প্রেসিডেন্টকে পদচ্যুত করে এবং সাধারণ পরিষদ, সুপ্রিম কোর্ট এবং সংবিধান বাতিল করে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে।”

ওয়েসব্রুট প্রশ্ন রাখেন, “এই লোক এবং তাদের সংস্থাগুলি কি মার্কিন করদাতাদের পয়সা পাবার যোগ্য? এটি কি গণতন্ত্রের জাতীয় অনুদানের যথাযথ কাজ? কংগ্রেসের এই প্রশ্নগুলি জিজ্ঞাসা করা উচিত। আমি মনে করি যে বেশিরভাগ মার্কিন এই জাতীয় তহবিল সমর্থন করবেন না।”

শুনানিতে সিইপিআর সহপরিচালক সেই সময় লসঅ্যাঞ্জেলস টাইমসের একটি প্রতিবেদন তুলে ধরেন, যেখানে অধিকাংশ মার্কিন সংবাদমাধ্যমের জনমত জরিপকারী সংস্থার কর্তা জোসে অ্যান্টনিও জিল সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারে জিল বলেছিলেন, শ্যাভেজকে মরতে হবে। এটাই একমাত্র সমাধান। প্রতিবেদনটি উদ্ধৃত করে সিনেটের উপকমিটির শুনানিতে ওয়েসব্রুট প্রশ্ন রাখেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরণের বিরোধিতার কথা কল্পনা করা যায়? তাদের সম্ভবত এখানে ‘সন্ত্রাসী’ হিসাবে চিহ্নিত করা হবে। অথচ ভেনিজুয়েলায় এমন লোকদের সাথে আমাদের সরকার গাটছড়া বেঁধেছে। ভেবে দেখুন যে আমাদের এবিসি, এনবিসি, সিবিএস, সিএনএন, ফক্স নিউজ কীভাবে সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতা ছেড়ে মার্কিন স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দুমাস আগে ভেনিজুয়েলার সংবাদমাধ্যম মার্কিন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে খবর প্রচার করে যে, শ্যাভেজ সরকার মাদ্রিদ সন্ত্রাসী বোমা হামলায় জড়িত ছিল। অথচ এই খবরটিও তারা (ভেনিজুয়েলা সরকার) সেন্সর করেনি। আর আমাদের প্রশাসন তাদের দেশের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে প্রশ্ন তোলে!”

এই শুনানি ও বিষয়টি নানা মহলে আলোচিত হবার পর ২০০৪ সালের ২০ নভেম্বর ১০৮তম মার্কিন কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রতিনিধি পরিষদ এনইডির বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সিদ্ধান্ত নেয়।

মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএর গোপন মিশনগুলোর কৌশল বদল করে মার্কিন স্বার্থের পক্ষে দেশে দেশে কাজ করার ক্ষেত্রে এনইডিকে দেশটি কীভাবে ব্যবহার করে, তার আরও অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। সেগুলোর ব্যাপারে আগামী পর্বগুলোতে আলোকপাত করা হবে।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.