।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

১৯৯১ সালের ১৯ আগস্ট। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে অভ্যুত্থানের প্রথম দিন। সেদিন বরিস ইয়েলেৎসিনপন্থিদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছিলো তাদের বক্তব্য দুনিয়াজুড়ে সম্প্রচারের। কিন্তু রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে তা সম্ভব ছিলো না।

তাদের একজন ওয়াশিংটনে বসে থাকা এক ব্যক্তির কাছে একটি ফ্যাক্সবার্তা পাঠান। তাতে লিখা ছিলো- “বরিস ইয়েলেৎসিন সেনাসদস্যদের উদ্দেশে একটি বার্তা দিয়েছেন, যা শিগগির সম্প্রচার হওয়া প্রয়োজন। আপনি এটা দয়া করে ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন এজেন্সির (ইউএসআইএ ) কাছে দিয়ে দিন। এটা সম্প্রচার করুন। মনে হয় ‘ভয়েস অব অ্যামেরিকা’ এটা পারবে। জরুরি!” এরপর সেই ফ্যাক্সবার্তা অনুসারেই কাজ হয়।

যে ব্যক্তির কাছে ফ্যাক্সটি পাঠানো হয়, তার নাম অ্যালেইন ওয়েনস্টেইন। আশির দশকে ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি (এনইডি) নামের সংস্থার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন তিনি।

রাশিয়ার সেই অভ্যুত্থানে মার্কিন তৎপরতার এই তথ্য আলোচনায় আনে ওয়াশিংটনপোস্ট। ১৯৯১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মার্কিন সংবাদমাধ্যমটিতে ডেভিড ইগনাসিয়াসের সেই লেখা কূটনৈতিক মহলে দারুন আলোচনার জন্ম দেয়। লেখার শিরোনাম ছিলো ‘দ্য নিউ ওয়ার্ল্ড অব স্পাইলেস ক্যু’। ইগনাসিয়াসের মূল কথা ছিলো- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ দুনিয়াজুড়ে যেসব গোপন তৎপরতা চালিয়ে এসেছে, তার বদলে নতুন একটি ধারার সূচনা হয়েছে, যা সিআইএ’র প্রোপাগান্ডা প্রক্রিয়াকে তথ্যপ্রক্রিয়ায় বদলে দিতে পারে। এবং আরও সুনির্দিষ্টভাবে তা প্রকাশ্য তৎপরতার মাধ্যমেই পরিচালিত করা সম্ভব।

সেই সময় ওয়াশিংটন পোস্টকে এনইডির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ওয়েনস্টেইন বলেছিলেন, “আমরা (এনইডি) আজ যা করছি তার অনেককিছুই ২৫ বছর আগে সিআইএ গোপন তৎপরতার মাধ্যমে করতো।”

এনইডি নিয়ে এমন বক্তব্য অবশ্য এরও বছর পাঁচেক আগে ছাপে নিউই্য়র্ক টাইমস। ১৯৮৬ সালের জুন মাসের প্রথম দিন এক প্রতিবেদনে তারা এনইডি’র প্রেসিডেন্ট কার্ল গেরশম্যানের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। সেখানে গেরশম্যান বলেন, “বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক গ্রুপগুলোর জন্য সিআইএ’র কাছ থেকে টাকা নেয়ার বিষয়টি ভয়ানক হয়। ষাটের দশকে আমরা বিষয়টি দেখেছি। সে কারণে কৌশলটা থামানো হয়। এরকম কাজ (সরাসরি সিআইএ’র অর্থায়ন) আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। সে কারণেই এনডাউমেন্ট (এনইডি)-এর জন্ম।”

প্রায় ৪০ বছর ধরে এনইডি বিশ্বজুড়ে কাজ করছে। বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের কাজের ধরন, অর্থের যোগান ও এর সঙ্গে মার্কিন স্বার্থ জড়িত থাকার বিষয়ে নানা তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, গণতন্ত্র সংহত করার নামে মার্কিন স্বার্থের পক্ষে দেশে দেশে সংস্থাটি সরকারবিরোধী তৎপরতায় মদদ জুগিয়ে থাকে। ল্যাতিন অ্যামেরিকার বিভিন্ন দেশে তাদের তৎপরতার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চিলি, হাইতি, লাইবেরিয়া, নিকারাগুয়া, পানামা, ফিলিপাইন, পোল্যান্ড এবং সুরিনামে তাদের সরকারবিরোধী দীর্ঘ ভূমিকা সমালোচিত হয়েছে। ভেনিজুয়েলায় সরকারবিরোধী তৎপরতায় অর্থ ও প্রশিক্ষণ দেয়ার অভিযোগ আছে মার্কিন সংস্থাটির বিরুদ্ধে। মিশরসহ মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্তের নেপথ্যেও এনইডির উল্লেখযোগ্য তৎপরতা ছিলো। ২০১৫ সালে ইউক্রেনে বিক্ষোভের জন্য এনইডিকে দায়ী করা হয়। একই বছর রাশিয়া এনইডির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। হংকং বিক্ষোভের পেছনে এই সংস্থার অর্থায়ন ও সহায়তাকে সরাসরি দায়ী করে চীন। ২০২০ সালে চীন সেদেশে সংস্থাটির প্রেসিডেন্টের ওপর অবরোধ আরোপ করে। একই বছর সংস্থাটির বিরুদ্ধে থাই বিক্ষোভের পেছনে মদদের অভিযোগ আনে দেশটি।  

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লিন্ডে এ ও’রউর্ক জানান, বর্তমানে বিশ্বের নব্বইটিরও বেশি দেশে এনইডির কাজ চলছে। তার মতে, শীতল যুদ্ধকালের তুলনায় সংস্থাটি বর্তমানে স্বল্প আগ্রাসী কৌশলে কাজ করে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন দিয়ে শুরু হলেও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অনুসরণ করে ল্যাতিন অ্যামেরিকা, ইউরেশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা হয়ে গত কয়েক বছর ধরে এনইডির সিংহভাগ তহবিল ব্যয় হচ্ছে চীন ও দক্ষিণ এশিয়ায়। ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে ব্যয় করা হয়েছে সংস্থাটির তহবিলের একটি বড় অংশ।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘নেত্র নিউজ’ এই এনইডির অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। তাসনিম খলিল এর প্রধান সম্পাদক। এর একটি ইংরেজি সংস্করণ রয়েছে, যার সম্পাদক ডেভিড বার্গম্যান।

নেত্র নিউজ-এর ওয়েবসাইটে এনইডির অর্থে এটি পরিচালনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ নিউজ নেটওয়ার্ক নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হয় বলেও সেখানে জানানো হয়েছে। তবে একে সুইডেন-ভিত্তিক বলা হয়ে থাকলেও এনইডির তহবিল সহায়তার তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সুইডেনের কোনো নাম নেই।

এনইডির তহবিল সহায়তার তালিকা পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে, ২০১৯ সালে তারা বাংলাদেশে ‘প্রমোটিং ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন অ্যান্ড অ্যাক্সেস টু ইন্ডিপেন্ডেন্ট জার্নালিজম’ নামের একটি প্রকল্প শুরু করে। ওই বছরই সেই প্রকল্পে ১ লাখ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮৫ লাখ) অর্থ ছাড় করে। প্রকল্পের সারসংক্ষেপে বলা হয়, এটি ‘মানবাধিকার এবং দুর্নীতিসহ সমসাময়িক বিষয় নিয়ে একটি স্বাধীন মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম স্থাপন করবে। এ লক্ষ্যে সংস্থাটি একটি স্বতন্ত্র ও নির্দলীয় মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে যা বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করবে। এটি বিভিন্ন মিডিয়া ওয়েবসাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কনটেন্ট সবরাহ করবে।’

এনইডি বাংলাদেশকে নিয়ে প্রকল্পটি নেয়ার পর একই বছরের ২৬ ডিসেম্বর ‘নেত্র নিউজ’ তার প্রকাশনা শুরু করে। তাদের তথ্যে বলা হয়েছে, এর একটি পরিচালনা পরিষদ রয়েছে। সেখানকার তিন সদস্য হলেন সভাপতি সুইডিশ সাংবাদিক কার্স্টিন ব্রুনবার্গ, সাধারণ সম্পাদক অস্ট্রেলিয়ান একাডেমিক বীনা ডি’কস্টা ও কোষাধ্যক্ষ মার্কিন সাংবাদিক ডেন মরিসন।

এনইডি নিজেদের বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের উন্নয়নে কর্মরত সংস্থা হিসেবে দাবি করে থাকে। কখনও কখনও একে বেসরকারি সংস্থা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে বছরে এর প্রধান তহবিল আসে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস থেকে। আগামী পর্বগুলোতে এ নিয়ে আরও বিস্তারিত থাকবে।

পরের পর্বে: সিআইএ’র পর কীভাবে এনইডি মার্কিন স্বার্থের পক্ষে দেশে দেশে অর্থ সহায়তা দেয়, কীভাবে সরকার-বিরোধী তৎপরতা চালায়?