Berger Viracare

মহাশ্বেতার বিনয় ভাষ্য ‘ইলিয়াসের পায়ের নখতুল্য কিছু লিখতে পারলে আমি ধন্য হতাম।’ এবং তাঁর মূল্যায়নে পশ্চিমবাংলা ও বাংলাদেশ মিলিয়ে ইলিয়াসই শ্রেষ্ঠ উপন্যাস লেখক। এক মহান ব্যক্তিত্বের প্রতি আরেক মহান ব্যক্তিত্বের প্রথাসিদ্ধ বিনয় বৈ আর কিছুই নয়। এতে যুক্তি হয়তো সামান্যই। এই বিশ্বাস ছিল বহু বছর। বয়স এখন চল্লিশের বাউন্ডারি অতিক্রম করেছে; নিজের মধ্যে প্রচলিত মূল্যবোধগুলো খুঁটিও আগের মতো আর মজবুত নেই, ভীষণ নড়বড়ে। ইলিয়াসের দুটো মহাকাব্যিক উপন্যাস এবং  সবগুলো ছোটগল্প বহু পাঠেও পড়া হয় নি বলে যখন তৃষ্ণা জেগে থাকে, যখন ‘খোয়াবনামা’র তুল্য আর একটি উপন্যাস খুঁজে পাই না বাংলাদেশের আট দশকের উপন্যাস সাহিত্যে, তখন মনে হয় এবং বিশ্বাস প্রবল হয়ে ওঠে, শুধু বিনয় বা যুক্তিহীন উচ্ছ্বাস নয়, মহাশ্বেতা দেবী ইলিয়াসের প্রাপ্য স্বীকৃতিটাই দিয়েছেন।

বাংলাদেশের কথাশিল্পের নতুন ভবিষ্যত নির্মাণ হয়েছিল বাংলা কথাশিল্পের এই আচার্যের হাত ধরে বা নেতৃত্বে যেটিই বলি কেন। ষাটের দশক থেকে শূন্যের দশকের তরুণ লেখকদের পথ-মত নির্মাণে ইলিয়াস গুরুর আসনে অধিষ্ঠিত। জীবনভাষ্য বিনির্মাণে,  চিন্তার বুনন  ও  ঋজুতায়, লেখার জন্য শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক হতেই দীর্ঘ প্রস্তুতি বলে দেয়, কি ভয়ানক রকমের রক্তপাত ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছে ইলিয়াসের শিল্পীসত্তা। সাহিত্যিক হিসেবে নিজের দায় সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। তাই, সত্যিকার জীবন-ই পাই তাঁর গল্পে, যেখানে সামান্য পরিমাণও অসততা, ফাঁক-ফাঁকি নেই, বরং কড়ায়-ক্রান্তিতে জীবনের পুরোমূল্য শোধ করতেই লিখে গেছেন এমন প্রথাবিরোধী লেখা। জীবন যে বিষ উগড়ে ফেলে, সেই বিষ গলাধঃকরণ করে বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের জীবনের চালু ছবিটাই এঁকে গেছেন ইলিয়াস।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জন্মের বছরেই (১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩) মন্বন্তরের ভয়াল ছোবলে বাংলার জনপদ ও জনজীবনের প্রচলিত ব্যবস্থা  প্রায় সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছিল। দেশভাগ থেকে শুরু করে পরের পাঁচ দশকের ইতিহাসের উত্থান-পতনের সব আলেখ্যই এই শিল্পীর চৈতন্যকে শুধু ছুঁয়েই যায়নি, রীতিমত রক্তপাত ঘটিয়ে গেছে। দ্বি-জাতিতত্ত্বের কালোপথ ধরে আগত অসুস্থ ও পঙ্গু স্বাধীনতার সঙ্গে আসে দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ ও কোটি কোটি উদ্বাস্তু মানুষের হিড়িক। ‘স্বাধীনতা যে মানুষের মুক্তিকে সঙ্গে করে আনেনি তা বুঝতে বেশিদিন লাগল না’, নতুন রাষ্ট্রে ক্ষমতার হাতবদল ঘটে বন্দুকের নলের মাথায়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণবিদ্রোহসহ উত্তাল দুই দশক ধরে তুমুল সংঘাত-সংঘর্ষ ও প্রাণপাত এবং শেষে একাত্তরে বিপুল জনগোষ্ঠীর জনযুদ্ধে ‘ফের স্বাধীনতা আসে। এবার স্বাধীনতা নম্বর ২।’ স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই জাতিরজনকে স্বপরিবারে নিশ্চিহ্ন করে নবাগত স্বাধীনতাটাকে পরিণত করে প্রহসনে। এরপইে নতুন পতাকার দণ্ড হাতে নিয়ে ট্যাঙ্কে চড়ে আসে রাষ্ট্রের ‘ঠ্যাঙাড়ে’বাহিনী এবং ‘ট্যাঙ্কের ওপর বসে গণতন্ত্র বিলি করে।’ বস্তুত; অর্ধ-শতাব্দি ধরে বন্দুকের নলার মুখে দফায় দফায় রাষ্ট্রের ক্ষমতার হাতবদল ঘটে, যেখানে ব্যক্তির বিকাশও বন্দুকের নলার মুখে কুঁকড়ে থাকে। ইলিয়াসের শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও প্রৌঢ়ত্বের প্রায় সবটুকু সময় জুড়েই এই বাস্তবতার শিকার। তাই প্রচলিত মূল্যবোধের উপরে তাঁর আস্থা নেই। প্রেম-প্রণয়ের অমৃতে আত্মহারা হতে তাকে কখনই দেখি না। তাঁর ব্যক্তিচৈতন্যে, তাঁর সমাজ ও সময়ের মুক্তাঙ্গনে  ব্যক্তির স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতিময় অতীত ও নির্দয় বর্তমান, জীবনের ক্লেদ, রুগ্ণতা, ব্যর্থতা ও সম্ভাবনার নতুন ব্যাখ্যা নিয়ে উপস্থিত। সমষ্টির অজুহাতে ব্যক্তিকে করে ফেলা হয়েছে খেলু পুতুল। মানুষের দেখভালের দায়িত্ব এখন বিজ্ঞানের। ফলে ব্যক্তির আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন-বিশ্বাস সবই গবেষণাগারে কেমিক্যালে পরিণত হয়েছে। অসীম নৈঃসঙ্গ্যবোধে আক্রান্ত মানুষের আর্তস্বরের শৈল্পিক বুনন ইলিয়াসের সৃষ্টিকর্ম। আর যে কারণেই, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মনোরম জীবন নয়, মনোটোনাস তথা অসুস্থ ও বিকারগ্রস্ত মানুষেরাই ইলিয়াসের মনোজগতের অধিবাসী। ইলিয়াস একেবারে নেমে এসেছেন সেই জীবনে যেখানে ‘মানুষ, মেয়েমানুষ, কুকুর, মেয়েকুকুরের অহিংস’ অবস্থান। স্বপ্ন ও সুন্দরের  পোশাক খুলে জীবনকে ন্যাংটো করে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়েছেন ইলিয়াস-যেখানে জীবন অসহ্য বৈরিতা ও নিষ্ঠুরতার শিকার। পচনধরা সমাজের পুরোটাই পাল্টে নতুন করে ব্যক্তির অনুকূল সুস্থ একটি সমাজ বিনির্মাণ ইলিয়াসের শিল্পচৈতন্যের প্রধান প্রয়াস। এইক্ষেত্রে, ভীষণ সাহসী ও বৈপ্লবিক শিল্পীপুরুষ ইলিয়াস বাস্তববাদী লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও অতিক্রম করে গেছেন।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস স্বল্পপ্রজ লেখক। তিন দশকের লেখক জীবনে লিখেছেন মাত্র দু’টি উপন্যাস ও পাঁচটি গল্পগ্রন্থভুক্ত গোটা তেইশেক গল্প ও কিছু অগ্রন্থিত গল্প। এর বাইরে কিছু প্রবন্ধ ও কবিতা লিখেছেন। তাঁর ‘চিলেকোঠার সেপাই’ (১৯৮৬) ও ‘খোয়াবানাম’ (১৯৯৬) উপন্যাসদুটি বাংলা কথাসাহিত্যে বিরল সংযোজন। কথাসাহিত্যের চালু চিন্তার ভিতকে কাঁপিয়ে নয়, রীতিমত উপড়ে ফেলার জন্য টান মারে, বিপন্ন করে, মুখোমুখি দাঁড় করায়  নতুন এক অস্তিত্বের সংকটের। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ঊনসত্তরের গণজাগরণের পটভূমিতে লেখা, যেখানে তৈরি হয় গর্জমান বাস্তবতা, ধর্মের ভিত্তিতে তৈরি রাষ্ট্রের ফাটল নয়, তীব্র ভাঙনের প্রবল চাপে কেঁপে ওঠে রাইফেলের শাসন। অন্যদিকে, ‘খোয়াবনামা’য় সেই গর্জন নেই, আছে প্রত্যান্তিক কয়েকটি গ্রাম, বিল, গ্রামের মানুষদের সংস্কার, ঘুমের মধ্যে হাঁটাচলাসহ একটি সার্বিক সমাজবাস্তবতা, যেখানে আছে স্বপ্ন গড়ার প্রত্যয়, স্বপ্নভাঙার দহন, মানবীয় দ্বন্দ্ব-সংঘাত-প্রতিঘাত।

ইলিয়াসের গল্পগ্রন্থগুলো হচ্ছে ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ (১৯৭৬) ‘দুধভাতে উৎপাত’ (১৯৮৫)’, ‘খোঁয়ারি’ (১৯৮৯), ‘দোজখের ওম্’ (১৯৮৯) ও ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ (১৯৯৭)। তাঁর প্রত্যেকটি ছোটগল্পে-ই জীবনকে নিয়ে এক প্রকার খেলায় মেতে উঠেছিলেন, যা বাংলাসাহিত্যে সম্পূর্ণ নতুন। কুকুর-মানুষের মৈথুনের সুখকর দৃশ্য ও পুরান ঢাকার জীবনচিত্র, স্বাধীনতা উত্তর সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অধঃগতিত ছাত্র রাজনীতি, ছাত্র নেতাদের ছিনতাই ও ময়দানে নিয়ে গিয়ে মাগি লাগানো, নিজের যৌন অতৃপ্তির জন্য খিস্তি-খেউড় এবং নিজের মরদ সন্তানের অনৈতিক সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেওয়া, জীবিত অবস্থায় পুত্রস্নেহ বঞ্চিত ছেলে মৃত পিতার উপর নির্মম প্রতিশোধ, মধ্যবিত্তের কৃত্রিম খোলসে টেন্ডার পাবার লোভে আত্মজার হত্যাকারী নব্য পুঁজিপতিকে প্রশ্রয় দেওয়া ও এর প্রতিবাদ করতে না পেরে এক যুবকের মৃত্যুর দাঁত দিয়ে পুঁজিবাদকে কামড়ে ধরা, অভিজাত বাড়ির কুকুরের বাউয়েলস ক্লিয়ারের সুখ খায়েশি মধ্যবিত্তের মানুষের শরীরে চালিত হওয়া, বৃদ্ধ বয়সে পরিবারের নির্মম উপেক্ষা থেকে মুক্তি পেতে জীবনের সকল অর্জনের বিনিময়ে মৃত্যু কামনা, শ্রেণিশোষণ ও ছিন্নমূলের শেষ আশ্রয় সরকারি বাঁধ থেকে উচ্ছেদের প্রচেষ্টা, একমুঠো দুধভাত নিজের ও সন্তানের মুখে তুলে দেবার জন্যে মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের তীব্র আবদার এবং শেষে অপূর্ণ সাধ নিয়েই চলে যাওয়া, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জেগে ওঠা, সংখ্যালঘু হিন্দুজনগোষ্ঠীর উপর নির্যাতন-শোষণ ও ঠাকুর ঘরে মূত্রত্যাগ, সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের সময় লুটপাট, নরহত্যা, নারী ধর্ষণের শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতা, যুদ্ধবিরোধী শক্তির পুনরুত্থান ও তাদের উপরে এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ছেলের মূত্রত্যাগ ইত্যাদি বিচিত্র বিষয় ও চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটেছে ইলিয়াসের গল্পের খোলা জমিনে। বিষয়বৈচিত্র্যের ফর্দ দেখেই বলা যায়, মানবিকতা বিলাসি ন্যাকা মুখোশধারী বুদ্ধিজীবী বা সমাজপতিদের বা রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের অথবা ধর্মের পোশাক পরিহিত সনাতন মানুষের চিন্তায় ইলিয়াস নির্দয়ভাবে চালিয়েছেন।