।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

জাতীয় সংসদে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ত্রুটিপূর্ণ ভাষণ শোনানোর ব্যাখা জানতে চেয়েছেন রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা। সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সোমবার (০১ ফেব্রুয়ারি) তিনি এর কারণ জানতে চান।

এ সময় করোনাকালে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাটকল ও চিনিকল বন্ধ করে দেয়ার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা। এছাড়া তিনি তার বক্তব্যে দুর্নীতি ঠেকাতে দুর্নীতি দমন আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন।

বাদশা বলেন, ‘একটা বিতর্ক কিছু দিন আগে খবরের কাগজে এসেছিল। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সংসদে বাজানো হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত লজ্জার বিষয়- ভাষণে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যটি অনুপস্থিত ছিল। এ সম্পর্কে আমাদের সংসদ এবং সরকার কোন বক্তব্য রাখেনি।’

বঙ্গবন্ধুর চেতনা বিকৃত করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে উল্লেখ করে বাদশা বলেন, ‘আমি যতটুকু শুনেছি, ইউটিউবে যে সকল কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলো দিয়েছে সেখানে অনেক জায়গায় শব্দ পরিবর্তন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং চেতনাকে লালন করার জন্য যখন মুজিববর্ষ পালন করা হচ্ছে তখন বঙ্গবন্ধুর চেতনাকেই বিকৃত করার একটা ষড়যন্ত্র এবং অপচেষ্টা চলছে। এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ সরকার গ্রহণ করবে কিনা এবং সংসদে যে ত্রুটিপূর্ণ ভাষণ শোনানো হলো এ ব্যাপারে মাননীয় স্পিকার কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন কি না সেটা আমি জানতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘এই মুজিববর্ষে আমাদের সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ওপর আঘাত হানা। আমার কাছে মনে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে হেয় প্রতিপন্ন করার এটা একটা অপচেষ্টা। এই ঔর্দ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। তবে যাদের উস্কানিতে এই বিতর্ক ও সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি হয়েছিল, আজও দেখি ফেসবুক-ইউটিউবে তাদের বক্তব্য অনর্গল প্রচারিত হচ্ছে এবং তাদের উস্কানি এখনও পর্যন্ত অব্যহত আছে। আমি জানি না আমাদের তথ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে কিনা।’

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে ঊর্দ্ধৃত করে ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ‘পৃথিবীর একজন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তিনি আমাদের পাশের দেশের মানুষ। কয়েকদিন আগে তিনি একটা কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, “রাজনীতির সাথে ধর্মকে ব্যবহার না করার সাথে বঙ্গবন্ধুর শক্তিশালী স্বতন্ত্র ধর ছিল। বর্তমান বিশ^ তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।” আজকে যখন অন্য দেশের লোক বঙ্গবন্ধুর এই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করার কথা উচ্চরণ করছেন, তখন আমরা দেখছি- আমাদের দেশে এই সমস্ত বিষয়গুলো ঘটে যাচ্ছে।’

‘আমি আজ আহ্বান জানাচ্ছি- যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, যারা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ^াসী, আমরা যারা চার মূলনীতি বিশ^াস করি, তারা যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি অনুগত থাকি। বঙ্গববন্ধু যখন সংবিধান পাশ করেছিলেন, তখন বলেছিলেন- “এই চার মূলনীতি হলো বাংলাদেশের মূলভিত্তি। আমার জীবদ্দশায় চার মূলনীতি যদি বাস্তবায়িত না হয়, আমার মৃত্যুর পরও যদি বাস্তবায়িত হয় তাহলে আমার আত্মা শান্তি পাবে।” আজকে চার মূলনীতি নিয়েই যদি বিতর্ক তোলা হয় তাহলে ভেবে দেখতে হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, দর্শন, দৃষ্টিভঙ্গি আমরা ধরে রাখতে পারছি কিনা, সংবিধানকে ধরে রাখতে পারছি কিনা সেটা আমাদের ভেবে দেখা দরকার।’-বলেন বাদশা।
চিনি ও পাটশিল্প বন্ধ করে দেয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদে রাকসুর সাবেক ভিপি ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ‘করোনাকালে দুটো শিল্প আমাদের ধ্বংস হয়ে গেল। একটা পাটশিল্প এবং আরেকটা চিনিশিল্প। ৫৪ হাজার শ্রমিককে তার পেশা পরিবর্তনের কথা বলা হলো। এটা যুক্তিযুক্ত হয়েছে কিনা তা জানতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘বন্ধ করার পেছনে আমাদের পাটশিল্প এবং চিনিশিল্পে প্রযুক্তিগত পশ্চাদপদতার কথা বলা হয়েছে। তাহলে আমাদের বিজিএমসি এবং চিনিশিল্প কর্পোরেশন এতদিন বসে কি করেছিল যে তারা এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন করে এ দুটি শিল্পকে আধুনিকায়ন করেনি? আজ শাস্তি দেয়া হলো শ্রমিকদের। কর্পোরেশনের আমলাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হলো আমার জানা নেই। আমি জানতে চাই- এইভাবে যে সাধারণ মানুষের ওপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে আমলারা ভালোই আছেন, সুখেই আছেন আর গরীব মানুষদেরকে পেশা পরিবর্তনের কথা বলছেন এটা যথাযথ হয়েছে কি?’

আলোচনায় অংশ নিয়ে দুর্নীতি দমন বিধিমালার দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেন বাদশা। বলেন, ‘কোভিড পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে দরিদ্র ৪২ শতাংশ হয়েছে। অতিদরিদ্র বেড়ে গেছে। কিন্তু অতিধনীর সংখ্যা বাড়ছেই। দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন বিধি একটা দুর্বলতা। দুর্নীতি দমনের জন্য যে সংস্থা রয়েছে তারাও একটা দুর্বল সংস্থা। আইনও দুর্বল, সংস্থাও দুর্বল। ফলে যারা দুর্নীতি করে দেশ থেকে অর্থ পাচার করছে তাদেরকে ধরার ক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছি না।’

সরকার এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে আশা প্রকাশ করে সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ‘দুর্নীতি দমন বিধিতে দুর্নীতির কোন সংজ্ঞা নেই। কী করলে দুর্নীতি হয়, সেটাও কিন্তু লেখা নেই। অনেক ফাঁক আইনের মধ্যে রয়েছে। এসব দুর্বলতা কাটাতে হবে।’