Berger Viracare

।। সুজিত সরকার ।।

জীবনানন্দ দাশ সবাইকে কবি হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। তাঁর সমকালের কবিদের বলেছেন, ‘কেউ কেউ কবি।’ একালেও মনে হয় জীবনানন্দের মূল্যায়ন যথার্থ। সবাই কবি নন, কেউ কেউ কবি। ওয়ালী কিরণ নিশ্চয়ই এই কেউ কেউদের মধ্যে একজন। তার কবিতা পড়ার সুযোগ যাদের হয়েছে, তারা আমাদের এই মূল্যায়নে স্বীকৃতি জানাবেন। অন্তত তাঁর কবিতা সমগ্র (২০১৩) যাদের হাতে আছে, তারা বক্তব্যটির যৌক্তিকতা বিচারে মনোনিবেশ করতে পারেন।

প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে কবি কে? কবি তিনি, যিনি জীবন ও জগতকে ভালোবাসেন, সৃষ্টির সৌন্দর্যের প্রশংসা, অশুভর বিরুদ্ধে শুভশক্তি সংগঠিত করার আহ্বান জানানোর সাহস সঞ্চার করেন, তিনি নিশ্চয়ই কবি। কবিতা লিখলেই তাই অনেকে কবি নন। রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর কিংবা কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল মনসুর আহমদ, সৈয়দ মুজতবা আলী প্রমুখ একচ্ছত্র কবিতা না লিখলেও কবি। কারণ তাঁরা সমাজ ও মনোলোক থেকে অন্ধকার বিতাড়নের লক্ষ্যে আলো উৎসারণের আয়োজন করেছিলেন। লড়াই করেছিলেন অশুভ-অন্যায়-অনৈতিকতার বিরুদ্ধে। তাই তাঁরা কবি। নবজাগরণের বার্তাবাহক। আমাদের আলোচ্য ওয়ালী কিরণও সেই দলভুক্ত। কবিতা রচনার জন্য নয়, কবিতা যে সত্য ও সুন্দরের জয়গান করে, তার বিকাশের তিনি দৃঢ়বদ্ধ বলে। তাই কবি হতে সাহস ও সত্যনিষ্ঠ হতে হয়, হতে হয় সংগঠক ও মানুষের কল্যাণের অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন মানবতার উৎসসূত্র ধরে। ফ্যাসিবাদ বিরোধিতায় ছিলেন স্থিত। তিনি ভারতের ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বিশ্ব মানবতার জয়গানে ছিলেন কেবল প্রজ্ঞাবানই নয়, সাহসী এক সংগঠক। তাই তিনি কবি, মানুষের কবি। তিনি নিজের রচনার সঙ্গে, চিন্তার সঙ্গে কাজের দূরত্ব সৃষ্টি করেননি। কিরণও করেন না। তার চিন্তা ও কর্ম অভিন্ন সত্তায় বিকশিত আলোকধারা। ফুলেল সৌরভ। অতএব কিরণও কবি।

কারণ কবি যুক্তি (Reason) কল্পনা (Imagination)  সংমিশ্রিত চিন্তার সম্পর্ক নির্ধারণ শব্দালঙ্কারে। পি. বি. শেলী কল্পনাকে প্রাধান্য দিলেও কবির হৃদয়াবেগকে অগ্রাহ্য করেননি। কারণ, তিনি মনে করেছেন, To apprehend the true abd the beautiful, in a word, the good which exists in the relation subsisting first between existence and perception and secondly between perception and expression.

হেনরী লে হান্ট তাঁর What is poetry (১৮৪৪) গ্রন্থে কবি ও কবিতা সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, Utterance of a passion for truth, beauty and power, emboding and illustrating its conception by imagination and fancy and modulating its language on the principle of variety in uniformity. Its means are whatever the universe contains and ends pleasure and exaltation. অর্থাৎ কবি হৃদয়াবেগকে প্রকাশ করেন; দ্বিতীয়ত, প্রকাশিত আবেগ তত্ত্ব হিসেবে নয়, বরং কল্পনার সহায়তায়; তৃতীয়ত, কাব্যে বিষয়ভূমি সামগ্রিকতার ইঙ্গিতবাহী, বিশেষ স্থান-কাল ও ব্যক্তির অনুভূতি কেবল নয়; চতুর্থত, কবির প্রকাশ হবে আনন্দ, উদ্দীপনাময় এবং অশুভর বিপরীতে তার সত্যনিষ্ঠ অবস্থানে দৃঢ়তা প্রকাশ। কবি ওয়ালী কিরণ এই তত্ত্বসূত্রের বাইরে নিজের চিন্তা ও কল্পনাকে দাঁড় করান নি। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে তিনি এ ব্যাপারে সচেতন ও সতর্ক। তাঁর কবিতার সচেতন পাঠকমাত্রই সেটা অনুভব করবেন।

কবি ওয়ালী কিরণ সম্পর্কে যে কথাটি আরেকবার বলতে হয়, তা হচ্ছে তিনি মনস্তাত্ত্বিকভাবে মাটির কাছের মানুষের সহজন। শ্রমজীবী প্রান্তিক মানুষের জীবন ঘনিষ্ঠ এক সরলরৈখিক চিন্তার রূপকার। তার কবিতার শব্দমালায় রোম্যান্স কিংবা অতীন্দ্রীয়তার পরশ খুব দুর্লভ নয়। তবে তিনি নিজের পরিপার্শ্বকে সতর্কতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রত্যক্ষণের প্রতিবিম্ব এঁকেছেন উৎকৃষ্ট শব্দাবলিতে। কবির এ-ও এক গৌরবকান্তি-আশ্রয়। সহজ বিষয়টাকে অযথা শব্দের জালে না পেঁচিয়ে স্পষ্ট করে নিজের পর্যবেক্ষণ ও অনুভূতিকে কখনো কল্পনায় কখনো যুক্তি দিয়ে পরিবেশন করার দায়িত্ব নেয়া কবির আত্মপ্রকাশের কৌশল হলে পাঠকের পক্ষে সৃজনশীলতার মানে অনুধাবন নির্বিঘ্ন হয়। তবে কবিতা বলতে সব কবিই একভাবে বোঝেন না। আঙ্গিক ও প্রকরণেরও স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করে তারা বিষেশায়িত হন। নানা জনে এ বিষয়ে নানা মত জানিয়েছেন। আর আঙ্গিক ও প্রকরণেও স্বাতন্ত্র্য নির্ণয় করেন কবি স্বয়ং। তাই কিরণের কবিতা মূল্যায়নেও সে তথ্যভাণ্ডারের সহায়তা নেয়া যেতে পারে। নিখিল বিশ্বসাহিত্য সম্মেলন, খারকভ অধিবেশনে শিল্পের স্বাধীনতা পরিপন্থি যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তা শিল্পের প্রতি অবিচার ও অসম্মানকরও। রক্ষণশীল রাজনীতিকদের মতে, Artistic production is to be systematised, organised, collectivised and carried out according to the plans of a staff any other solidierly work. This is to be done under the careful and yet firm guidance of the Communist Party.  কবি স্বর্ণকার কিংবা চর্মকার নন। কবি কারো নির্দেশ অনুসরণ করলে সেটা নিছক প্রচারপত্রের স্লোগানে পরিণত হয়। শিল্প অন্তর্জাত সম্পদ। অন্তরের গহন থেকে উৎসারিত আলোকধারাই শিল্প, কবিতা। মানুষের সহজাত ও স্বাভাবিক চিন্তার ওপর এই যে খবরদারি শিল্পের মান ক্ষুণ্ন করে। কবিতা তো মাটি নয়, তাকে দিয়ে শিব আর বাঁদর একই সঙ্গে বানানো যাবে? যিনি শিব গড়তে জানেন, তিনি বাঁদরও গড়ে পারদর্শী যেমন সত্য, তেমনি সত্য শিবের প্রত্যাশাই পাঠকের কাছে আদরণীয়, বাঁদরের নয়। যিনি কবি তিনি শিবই গড়েন। অবশ্য চিরকালই সমাজে এমন কিছু কবির উপদ্রব সহ্য করতে হয়, যারা নিজে যা রচনা করেন, ঠিক তার বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিতেও বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধও করেন। লিখছেন বলছেন সাম্রাজ্যবাদ আর মৌলবাদের বিরুদ্ধে, পুরস্কার নিচ্ছেন তাদেরই কাছ থেকে। তার অর্থ তিনি যা লিখছেন-বলছেন, তা নিজে মানেন না, বিশ্বাসও করেন না। বিশ্বাস করারও প্রয়োজন অনুভব করেন না, নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নিজে পেলেই হলো, অন্যে গোল্লায় যাক। আরো কেউ কবি কিংবা লেখক হয়ে উঠুক, সেদিকেও তার মনোযোগ নিরতিশয় মন্দা। যা বলেন ও লেখেন সেটা দয়া ভাবেন। ওয়ালী কিরণ সে জাতের আত্মঘাতী লেখক নন। তিনি যা লিখেন, বলেন তা রক্ষা করতেও ভীষণ সাহসিকতার পরিচয় দেন। তার পেশাগত জীবনের অধঃগতি বা অচলাবস্থা সে তথ্যই ধারণ করে। সুতরাং শিল্প কারো নির্দেশে কিংবা হুকুমের দাস নয়, স্বতঃস্ফূর্ত আবেদনেরই আত্মপ্রকাশ। কিরণের কবিতায় তার অযুত দৃষ্টান্ত মেলে।

যদিও বা কুড়িয়ে পেলাম কয়েকটি রৌদ্রোজ্জ্বল ধুলো,
তবু জানি তার ওপর দাঁড়ানো যাবে না;
কেবলি শাসিত—কেবলই স্ট্যান্ডরিলিজ—পত্রপাঠ বিদায়।
সর্বত্র বিমূর্ত উপমা উৎপ্রেক্ষার মহাসমাবেশ,
সমাবেশে উৎকণ্ঠার জলবৃদ্ধি—কখন শিলাবৃষ্টি হয়,
কখন দ্রুতগামী চিলের পুচ্ছ থেকে ঝরে পড়ে মলের শিরোপা।
কে বলেছে মাছের মা’র পুত্রশোক নেই—কে দেখেছে?
(মগ্ন প্রতীক)

কবির এই আত্মজিজ্ঞাসা, যারা নিরন্তর হুকুমজারিতে অভ্যস্ত সেই অপকর্মীদের বিরুদ্ধেই বিস্ফোরিত। মাটির মানুষেরও যে অমৃতপুত্র হওয়ার কোনো অযোগ্যতা নেই, তার সরল সুস্থ প্রকাশ করেন নির্ভীকভাবে। তাই কবির প্রশ্নবাণ, শরনিক্ষেপ তাদেরই জনবিচ্ছিন্ন অকল্যাণীয় সংরক্ষণের ওপর বর্ষিত হয়। ফলে কবির ভাষায়: ‘জিউসের মতো দয়াদ্র হয়ে যেতে পারেন দেবগণ’, এই দেবগণ সব সময়ই ক্ষুব্ধ-কৃপণ আর অকল্যাণের পক্ষে অবস্থান নেয় রুদ্ররূপে। আত্মঘাতীও হন অসাম্য-অশুভ আর অসম্মানের যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়ে। কবি সংবেদনশীল। লাভ-ক্ষতির অনেক ঊর্ধ্বে তার অবস্থান। কবি দিব্যদৃষ্টির অজেয়, অকুতোভয় প্রেমিক পৌরুষের অধিকারী। শিল্প তার চেতনার বহ্নিশিখা। স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দলোক। চিরকালের সূর্যোদয়। অবিনাশী দুঃখ জয়ের ক্ষণিক পরিতৃপ্তির আয়োজন। দরিদ্র জনকের সন্তানবাৎসল্য। কিরণের এই কাব্যবাৎসল্য কোনো ভাবাবেগ নয়, বস্তু দ্বন্দ্বের ফলে যেমন বৃত্তাকারে রূপান্তরিত হয়, অবিকল সে রকম। কেন্দ্রে স্থিতি নয়, বিস্তার। অনেক পর্যবেক্ষণের সুধাতৃপ্তির মোহভঙ্গ। আর মোহভঙ্গের বিস্ময়াঘাতে কবি নির্লিপ্তভাবে উচ্চারণ করেন:

যে যায় সে চলেই যায়,
হন্তারকের বুকে রেখে যায় তার দীর্ঘশ্বাস।
(আদিগন্ত খুন)

কবি কেবল সুন্দরের সঙ্গেই ওঠ-বোস করেন না, অসুন্দরও তার অন্দরে হানা দেয়। এই অসুন্দর কবিকে নতুন অভিজ্ঞতার পরশে আলোকিত করেন। অসুন্দর না থাকলে সুন্দরের কী গুণ-বিচার হতো? হতো না। অসুন্দরের অভিজ্ঞতার আলোকেই সৌন্দর্যের গৌরব নির্ণিত হয়। জীবন যেমন একমাত্র সত্যি নয়, মৃত্যুটাও রূঢ় হলেও সত্যি। মৃত্যু আছে বলেই জীবনের সত্যি স্পষ্টতর হয়। সাহিত্যালোচকরা তাই সানন্দে বলেছেন, art so far as it is devoloped is entirely detached from any theory of the beautiful a separation which is characteristic of all ancient aesthetic criticism. সুন্দরের সঙ্গে শিল্পের যোগাযোগের কথা এ্যারিস্টটল স্বীকার করেন না। এ্যারিস্টটলের এই মন্তব্যের বিপরীতে বুচার ভিন্ন কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, He makes beauty a regulative principle of art but he never says or implies that the manifestation of beautiful is the end of art. মানুষের স্ব-সত্তার প্রকাশই যদি শিল্পের উপজীব্য হয়, তাহলে সুন্দর-অসুন্দর—সবই স্বীকৃতির দাবিদার। সুন্দর-অসুন্দর তত্ত্ব ব্যক্তির মানসিক পরিচয়ে বৃত্তাবদ্ধ। এ তত্ত্ব তাই আপেক্ষিক, ব্যক্তির রুচি সাক্ষ্য মেলে। দুধ কারো বদহজম ঘটায় বলে দুধ অপাঙ্ক্তেয় নয়, বরং অধিকাংশের স্বাদে উপভোগ্যও। ওয়ালী কিরণ এই তাত্ত্বিক ধারণার বাইরে তার অভিজ্ঞতার নির্যাসে পাঠককে অংশীদার করেন।

আর সেই ছবিটার নাম দিই ময়লাওয়ালী।
এবং অবাক হয়ে দেখি—শেষাংশে আমারই নাম।
(ময়লাওয়ালী)

অথবা

অ-ভাবের এই দেশে, আত্মনিগ্রহের ক্লেশে—
অপ্রতুল খাদ্য পাই, সুপ্রচুর পাব হয়তো আগামী শতকে

শিল্প নির্মাণে শিল্পীর সকল শর্ত ও বন্ধন থেকে মুক্ত রাখাটাও তার চিন্তা ও কাজের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়া। সেই স্বীকৃতি যদি শিল্পীর না থাকে, শিল্প বিকাশে বাধাগ্রস্ত হয়। হয় রোগাক্রান্ত। বিশ্বের দেশে দেশে অতীতে এবং এখনো শিল্পীর স্বাধীনতা প্রশ্নে আঙুল উঁচিয়ে থাকে স্বার্থান্বেষী শাসকসমাজ। ধর্মীয় ও রাজনীতিক মৌলবাদীরা। শিল্পীর সার্বভৌমত্ব শর্তহীন। কিরণ এমন দেশের নাগরিক, যেখানে আইন করে শিল্প-রাজ্যের সীমানা ক্রমাগত ছোট করে দেয় শাসক ও শাসকের তল্পিবাহকেরা। মুক্তবুদ্ধি ও চিন্তার অনুশীলনকে তারা ভয় পায়, তাই বাধাগ্রস্ত করে। তারা যার দিকে আঙুল তোলে অভিযোগে সুরে, তার রচনা না পড়েই বিরোধিতায় সামিল হয়, করে মুরতাদ, কাফের ঘোষণা। দাউদ হায়দার কিংবা তসলিমা নাসরিন অথবা চেক লেখক মিলান কুন্ডেরা, সলমান রুশদি প্রমুখ স্বার্থান্বেষী মহলেরই আক্রমণের লক্ষ্যে পরিণত হন। স্বার্থন্বেষী কেউ কারো লেখা পড়ে বিকল্প চিন্তার সংবাদ দেন না লিখে কিংবা গেয়ে। তারা মসীর চেয়ে অসীকেই বেশি স্বচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাই পরাস্ত হলেই সেটা শাণিত করে, আক্রমণে অংশ নেয় নির্বোধের মতো। তাই সভ্যতা আর সামাজিক শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ অর্জন, সম্প্রীতি-সৌজন্যকে, দেশপ্রেম অবিচল রাখতে হলে কবিই হয়ে যান সেই হ্যামিলনের বাঁশিঅলা। কবি-শিল্পীই গড়ে তোলেন ভ্রাতৃত্বের রাখীবন্ধন। আনন্দমেলা।

ব্যক্তিমানস আর বুদ্ধির সংমিশ্রণের যে নির্যাস বিতারিত হয়, তার স্বাদ আবার সকলেই গ্রহণে অভ্যস্তও নয়। রঁমা রঁলা এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, I dream of nothing more than to do a little good to men and draw them away from the nothingness that kills them. জীবনের এই শূন্যতা ভরিয়ে তুলতে পারে একমাত্র ন্যায় ও সত্যের প্রতি নিষ্ঠাবান যারা। কবিতা হচ্ছে সেই সত্য, যার প্রকাশ বস্তু-সত্য, কল্পনা বিলাসিতা নয়। যেখানে সত্যের অভাব, সেখানে কল্পনাও শিল্প সৃষ্টিতে অসফল। বস্তু-সত্য নির্ণয়ে আনন্দ আর কষ্ট সমভাবে ব্যঞ্জিত। কবিচিত্তের সেই ব্যঞ্জনা পাঠককে মুগ্ধ করে। ‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায়, আছে যার ভুড়ি ভুড়ি’…এই সত্যের বিপরীতে কবির অবস্থান নয়। কবি ওয়ালী কিরণের অবস্থানেও এই সত্যনিষ্ঠতা আনন্দধ্বনি তোলে। তাঁর কবিতা থেকে একটি উদাহরণ দিলে বোধকরি বক্তব্য স্পষ্ট হবে।

সংঘ ও রাষ্ট্রকাঠামোতে
প্রকৃতির রাজ্য তা’দেখে
নির্বিকার পাশ ফিরে শুলো…

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে এবং এই তো ক’দিন আগে গাজার ইসরাইলি বর্বরতা দেখেও জাতিসংঘসহ বিশ্বের গণতান্ত্রিক ও ধনপতি আর সভ্য-ভব্যের দাবিদার রাষ্ট্রগুলো পাশ ফিরেই শুয়েছে। তারা মানুষের বিরুদ্ধে মানুষে বর্বরতা-নিষ্ঠুরতা দেখে বরং উল্লসিত হয়েছে। নিঃশব্দে আরো হত্যা-ধর্ষণ আর বাস্তুভিটে ছাড়তে হিংস্রদের উৎসাহ জুগিয়েছে। এভাবেই সভ্যতা এগোচ্ছে, বিকশিত হচ্ছে বলে যারা নিরবধি আস্ফালন করে, কবি ওয়ালী কিরণ তাদের প্রতি তীব্র ঘৃণা উৎসারিত করে লিখেন—

আমি ও আমরা ঠিক জোড়কলমের মতো—শেকড়বিহীন চলমান
আর দ্যাখো বৃক্ষসম জল এবং হাওয়া খেয়ে বাঁচি
আমার কি জন্ম আছে—মৃত্যু তথৈবচ—ছিল বীজ
বীজ হতে বেড়ে ওঠা…প্রবৃদ্ধি, বিভক্ত খণ্ডিত শুধু
অতিশয়োক্তির মতো আমি বেড়ে বেড়ে চলি বনে…
আর সে গোপন বীজ অকিঞ্চিতকর ক্ষুদে এক যৌথকলম
সেই কোন অতীতের অসীম ক্ষুদ্রের অভিনয়।
(জোড়কলম, দরিদ্র সর্প ইত্যাদি)

কিরণের কবিতায় শুধু নয়, তার গল্প ও উপন্যাসেও পল্লিজীবন ও জীবিকা নিয়ে উৎসাহ পাঠককে নতুন দিগন্তের দিকে তাকাতে সহযোগিতা করে। ‘দাসযুগের দিনলিপি’ (‘ইঁদুর’ শিরোনামে প্রথম ‘এবংবিধ’ নামে ছোটকাগজে প্রকাশিত হয় নব্বইয়ের দশকে) উপন্যাসে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধোত্তর দেশে দেশবিরোধীদের পুনর্বাসন এবং সুযোগ সন্ধানীদের অপতৎপরতার চিত্রের সমান্তরালে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক আর উৎপাদনক্ষদের বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর গল্পও সেই নিরিখে রচিত। ‘কবিতা সমগ্র’র  কভারপাতায় কবি নিজে থেকেই সে দেশপ্রীতি তার ভালোবাসার তথ্য পরিবেশন করেছেন। পল্লিগ্রামে তার জন্ম না হলেও পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত গ্রাম্য পরিবেশ, ধুলোমাখা পথ, জনজীবন ইত্যাদির প্রতি তার গভীর মমতা, ভালোলাগা অসংখ্য কবিতার ছত্রে ছত্রে পরিবেশিত হয়েছে। পল্লিকে ভালোবাসার জন্যে পাঠককে উৎসাহিতও করেন।

এলাম অনেক দিন পর আবার দেশে,
সাতপুঁতি বানাও দেখি ভাবি।
মতিনের বাপ কই?
বাকশিমল হাটে গেছে পাট নিয়ে।
(ফ্রেমবন্দি)

তারপর কৃষিজীবীদের উৎপাদিত ফসলের মূল্য নেই সে তথ্যটিও কবি অকপটে তুলে ধরেন:

পাটের দাম নাই, কি (কী) খাওয়াব ভাইজান,
আর কি সে দিন আছে, সার নাই, বীজ নাই,
সারের গণ্ডগোলে আপনার ভায়ের (ভাইয়ের) নামে
সরকার মামলা দিয়েছে।
ও মাতিন, যা না দেখি বাবা,
ধলাদের বাড়ি থেকে এক জোড়া কৈতর নিয়ে আয়,
কৈতরের সুরা দিয়ে সাতপুঁতি খেতে বেশ লাগে।
(ঐ)

এই নিরালঙ্কার স্বভাবোক্তি কখনও কাব্যসত্য হিসেবে স্বীকৃত হয়। এতদ্বিষয়ে এ কথাও বলতে হবে যে, মনোধর্মের গভীরে অলঙ্করণ প্রবণতা সুপ্রতিষ্ঠিত, এমন দাবিও আবার যথার্থ নয়। কবি আর মনোবিজ্ঞানীর ভাষা স্বতন্ত্র। তাই অলঙ্কারহীন বাক্য কাব্য নয়, এটাও মেনে নেয়াও কী যৌক্তিক? আমাদের বরং এই মর্মে সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে, নিছক শিল্পহীন আত্মপ্রকাশ কাব্য নয়। আজকের সংবাদপত্রে, ছোটকাগজে এবং কিছু কিছু হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কবির রচনা শেষোক্তকেই সমর্থন করে। পাঠককে প্রতারণাও করে। কাব্য করতে অনুশীলন ও অধ্যয়ন আবশ্যক। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ দাশ বোধকরি এই পথরেখা বেয়েই কবিত্বের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। কিরণ ইংরেজির ছাত্র। অনেকের তুলনায় মাতৃভাষাসহ পাশ্চাত্যসাহিত্য অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছেন। তার গ্রামে ফেরা ‘দাও ফিরিয়ে সেই অরণ্য’ আকুতির ব্যঞ্জনা তাই মূর্ত হয়ে উঠেছে। মূর্ত হয়েছে বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের খতিয়ান। ‘জেগে আছে নাচোলের মাঠ’ কবিতাটি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

নাচোলে আগুন, পোড়া পুরানপাখির পাখসাট,
ভেবো না সকলই মৃত, জেগে আছে নাচোলের মাঠ।

ইলামিত্র কৃষকদের অধিকার নিয়ে গত শতকের পঞ্চাশের দশকের সূচনা ক্ষণে তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। শত শত কৃষক ভূমি আর ফসলের দাবির আন্দোলনে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের পুলিশের নিপীড়নে করে আত্মাহুতি দেন। সে আন্দোলন আজ অগ্নিঝরা ইতিহাস। এখনো কৃষক উৎপাদিত শস্যের মূল্য পান না। কৃষি উপকরণ সংগ্রহে নির্বাচিত প্রতিনিধি, পুলিশ আর আমলাতন্ত্রের নানামুখী বাধার সম্মুখীন হন। সারের দাবিতে, ফসলের উৎপাদন ব্যয়ের দাবিতে আন্দোলন করে জেলায় জেলায়। আন্দোলনের এই গণতান্ত্রিক প্রশিক্ষক তেভাগা আর ইলামিত্রের নেতৃত্বে নাচোলের সেই মহাবিদ্রোহ। বিদ্রোহের অগ্নিরেশ আজো জেগে আছে মানুষের মনে।

বাংলাদেশে পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট পর বারবার রাজনীতিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনায় সমৃদ্ধ। ২১ আগস্ট বিএনপি-জামাত জোটের রাষ্ট্র পরিচালনাকালে তাদের কতিপয় নেতার গভীর ষড়যন্ত্রে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। সেদিনের গ্রেনেড হামলায় শেখ হাসিনা আতঙ্কিত ও আহত হলেও যারা সেই জনসভায় উপস্থিত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ২২ জন তাৎক্ষণিক নিহত হন। আহত হন শত শত। রাজনীতির মানে এই স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতিহিংসার ভয়াবহতার চিত্র কবির দৃষ্টি এড়ায়নি। কবি বলেছেন:

যেদিন সভা ও সঙ্গীতের ভেতর হতাহতের আহাজারি শুনেছি
প্রতীকী লাশের মতো ছড়িয়ে থাকতে দেখেছি অসংখ্য জুতো স্যান্ডেল
আর তাদের পাশে কারো কারো খণ্ডিত পায়ের পাতা,
যেদিন থেকে জুতোর সাথে অনেকেরই পায়ের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে,
সে দিন থেকেই আমি আর সভ্য মানুষ নেই,
আমি আর স্বাভাবিক মানুষ নেই।
(রক্তপাতের ব্যাকরণ)

মানুষ নিজের মতো করে ভোগ করে জীবনকে। এই ভোগ-বিলাস আবার কখনো অভিন্নতা হয়ে ওঠে। ক্ষুধা নিবৃত্তি, যৌনক্রিয়া, আনন্দ-দুঃখ, উল্লাস—সবই অভিন্নতারই সাক্ষ্য দেয়। কবি কিরণ এসবের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন জানিয়েছেন, কখনো তা নিয়ে ব্যঙ্গও করেছেন। তার একটি দৃষ্টান্ত তার ‘আপেক্ষিকতাবাদ’ কবিতা থেকে দেয়া যায়।

এ-ই তো জীবন, যতদিন বাঁচা—
আনন্দশিৎকার আর শিল্পের সুন্দর।

আর যত প্রভাবসঞ্চারী বাহাদুরী।
যোগ্যতার প্রমাণের অপচেষ্টা যত!

তার বিজ্ঞানভাবনার পরিচয় মেলে ‘গণিত’ কবিতায়। কবি কিরণ কেবল বিজ্ঞান ভাবনায়ই উৎসাহী নন, তিনি বিজ্ঞানমনস্কও। তার পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানমনস্কতার আলোকেই প্রতিফলিত হয়েছে কবিতায়। যুক্তি এবং তথ্য মিলিয়ে তিনি সমাজকে বিচার করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের দারিদ্র্য, অসচেতনতা, অশিক্ষা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদসহ বিশ্বের অনেক ধনী ও ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্রে সজ্জিত আগ্রাসনবাদী দেশ প্রভুত্ববাদী-কর্তৃত্ববাদী মনোভাব ব্যক্ত করছে। আমাদের মানব ও খনিজ সম্পদ প্রায় বিনামূল্যে নিয়ে যাচ্ছে তাদের  দেশে। সে সম্পর্কে কবির বক্তব্য স্পষ্ট।

আর তাই আমাদের মিশ্রিত শরীর আজ
এলোমেলো ভাবনায় রত।
আমাদের মাথার ওপর ঘোরাচ্ছে ছড়ি
বন বন চরকির মতো…।
(সিংহভাগ ঘুমে আছে)

‘উৎকৃষ্ট শব্দের সুসম বিন্যাসই কবিতা’ সংজ্ঞাটি সবার জানা। কিরণ সব শব্দকে কবিতায় যুক্ত করেননি। সৌন্দর্য সৃষ্টি এবং সত্য উপস্থাপনে যে শব্দ সহযোগীর দায়িত্ব গ্রহণ করতে সক্ষম কবি কিরণ সে শব্দমালাকেই তার কবিতায় চয়ন করেছেন। তার আরেকটি দৃষ্টান্ত দিয়ে এ লেখার শেষ টানতে চাই।

ব্যক্ত হয়ে আছ ভাষা নীরবতা কাঠামোর মাঝে
ব্যক্ত হয়ে আছে ভাষা দৃশ্যকল্পদের ভাঁজে ভাঁজে
… … … ….
ব্যক্ত হয়ে আছে গল্প অস্তিত্বের এই প্রসারণে
ব্যক্ত হয়ে আছে ছন্দ রহস্যের এ অবগুণ্ঠনে।
(ব্যক্ত হয়ে আছ ভাষা)

কবির অন্তরে ভাষা নীরবতার ছায়ায় জেগে ওঠে। গড়ে তোলে মূর্তিমান কল্পতরু বৃক্ষ। পাঠক চিত্তে সেই ভাষাই এনে দেয় আনন্দ-বেদনার ছবির দৃশ্যাবলি। এখানেই কবির কৃতিত্ব। তার সঙ্গে পাঠকের আন্তঃযোগ গড়ার সোপান। সেখানেও কিরণ কালজয়ী, বিজয়ী শব্দসৈনিক।

প্রচ্ছদ রাজিব রায়