Berger Viracare

।। ঘরে বাইরে ডেস্ক ।।

লালমাটির আঁকাবাঁকা পথ। যেন ছবির মতো সাজানো-গোছানো গ্রাম। মনে হয় কোনো ছবিকর এঁকে গেছেন এ গ্রামের চিত্র। তারপর জীবন্ত হয়ে গেছে সব। ইলা মিত্রের স্মৃতিধন্য নাচোলের টিকোইল গ্রামের মানুষজনও বেশ সহজ-সরল। কেমন তবে সেই গ্রামের কারুকাজ? তারই আদ্যোপান্ত নিয়ে আমাদের এ প্রতিবেদন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের টিকোইল গ্রাম। মানুষ এই গ্রামকে চেনে ‘আলপনা গ্রাম’ হিসেবে। দেশে এবং দেশের বাইরে এই গ্রামের নাম ছড়িয়ে গেছে এখানকার মানুষের অসাধারণ শৈল্পিক কর্মের মাধ্যমেই। এই গ্রামে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে মনে হবে লাল, নীল, আকাশি, সবুজ অজস্র রঙের ছটায় চারপাশ যেন হঠাৎ রঙিন হয়ে উঠেছে। আর পূজা-পার্বণের সময় তো কথাই নেই, যেন রঙ-তুলিতে আঁকা বর্ণিল একটি ছবি! গ্রামের প্রতিটি বাড়ির দেয়াল যেন এক একটি ক্যানভাস। মাটির দেয়ালজুড়ে সবসময় শোভা পায় নানান রঙে আঁকানো নানান কারুকার্যের আলপনা। প্রতিটি বাড়িতেই মেলে গ্রামবাসীর রুচি আর মননশীলতার চিহ্ন। যেকোনো পূজা বা উৎসবে, পহেলা বৈশাখে গ্রামবাসী সবাইকে স্বাগত জানায় নতুন আঁকা আলপনার মাধ্যমে। নিজেদের বাসস্থান তো বটেই, এমনকি তারা ভোলে না রান্নাঘর কিংবা গোয়ালঘরের দেয়ালেও আলপনা আঁকতে।

দেয়ালজুড়ে কেন আলপনা চর্চা?

এই গ্রামের প্রতিটি মানুষের জীবনের একটি অংশ হয়ে গেছে আলপনা। তাই, আলপনা আঁকার তাৎপর্য খুঁজতে গেলে পাওয়া যায় তাদের শিল্পময় জীবনের প্রতিচ্ছবি। তারা দেয়ালে দেয়ালে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলেন আলপনার মাধ্যমে। ফুল, লতা-পাতা, গাছ, নদী, নৌকা, পাখি, আকাশ, মানুষ—কী নেই তাদের আলপনার উপাদানে। তাদের যাপিত জীবন এবং গ্রামবাংলার প্রতিচ্ছবিই যেন চিত্রিত হয় মাটির দেয়ালে। এই গ্রামেরই এক বধূ দেখনবালা বর্মণ। তার ভাষায়, ‘পূজোর আগে বাড়ির দেয়ালে আলপনা আঁকলে দেখতে যেমন ভালো লাগে তেমনি মনও থাকে প্রফুল্ল। আর মন ভালো থাকলে পূজোর আনন্দও বেড়ে যায় বহুগুণে।

কবে থেকে শুরু?

আলপনা গ্রামের এই অসাধারণ সংস্কৃতি কবে থেকে শুরু হয়েছে, সে ইতিহাস সম্পর্কে একেক জনের একেক রকম মতামত। স্থানীয়দের মতে, সুদূর অতীত থেকেই এই গ্রামে আলপনা আঁকার রীতি চলে আসছে। অনেক আগে, বিভিন্ন পূজা-পার্বণে এখানকার হিন্দু পরিবারের বধূরা বাড়ির দেয়ালে সাদা রঙের তিনটি ফোঁটা এঁকে তার নিচ দিয়ে আলপনা টেনে খুব সাধারণ, কিন্তু সুন্দর নকশা আঁকতেন। তবে এখন আর তিন ফোঁটার সাদা আলপনা নয়, কল্পনার সব রঙ আর ছবি উঠে আসে আলপনায়। দাসু বর্মণের স্ত্রী দেখনবালা প্রায় চল্লিশ বছর আগে বধূ সেজে এসেছিলেন এই গ্রামে। তখন থেকেই আলপনা এঁকে যাচ্ছেন তিনি। তিন ফোঁটার আলপনা আঁকার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে তিনিই অগ্রপথিক হিসেবে পরিচিত। অক্ষরজ্ঞান না থাকলেও, শিল্পীমনের প্রকাশ ঘটাতে বেছে নিয়েছিলেন বাড়ির দেয়াল। মনের খেয়ালে বাড়ির দেয়ালে আঁকতে শুরু করেছিলেন তার চারপাশের প্রকৃতির ছবি। এভাবেই চলছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

আলপনা গ্রামের চিত্রশিল্পী কারা?

চারুকলার শিক্ষার্থীরা বা কোনো পেশাদার চিত্রশিল্পী না; আলপনা গ্রামের আলপনার রূপকার মূলত এই গ্রামের নারীরা। প্রথমদিকে আলপনা আঁকার কাজটি প্রধানত তারা করে থাকলেও, দিনে দিনে এই গ্রামের সবাই হয়ে উঠেছেন আর্টিস্ট। নারী-পুরুষ তো বটেই, গ্রামের শিশুরাও খেলাচ্ছলে মেতে ওঠে রঙ নিয়ে। আলপনা আঁকতে যেন এই গ্রামের মানুষের কোনো ক্লান্তি নেই। ঝড়-বৃষ্টি-রোদ সব মৌসুমেই গ্রামের দেয়ালে দেয়ালে ফুটে থাকে আলপনা। শরীরে বয়সের ভার, কিন্তু মন যেন সেই শৈশবের মতোই রঙিন। বাড়ির দেয়ালে আঁকা আলপনা যেন বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে না যায়, তাই ঘরের চাল থেকে পলিথিন বেঁধে রাখেন অনেকেই। বৃষ্টি এলেই খুলে দেন, আবার বৃষ্টি চলে গেলে পলিথিন গুটিয়ে রাখেন। গ্রামের সবাই আলপনার কারিগর। বংশপরম্পরায় তারা আলপনার ঐতিহ্যকে এতদূর নিয়ে এসেছেন, টিকিয়ে রেখেছেন। বধূরা, জননীরা তাদের হাতের মমতাময় ছোঁয়ায় এই ঐতিহ্যকে চলমান রেখেছেন যুগের পর যুগ।

কেমন রঙের ব্যবহার হয়?

আলপনায় প্রকৃতিকে তুলে ধরতেই এই গ্রামের বধূরা সুপ্রাচীন কাল থেকেই প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার করে আসছিলেন। খড়িমাটি বা লালমাটি ভিজিয়ে ‘আখির’ বের করে তারা লাল রঙ তৈরি করতেন গ্রামবাসীরা। সাদা রঙ তৈরিতে সাধারণত ব্যবহার করা হতো আতপ চালের গুড়া। এছাড়া টিকোইল গ্রামটি যেখানে অবস্থিত, সেই বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি পানিতে ভিজিয়ে রাখলে সাদা স্তর পড়ে। এই সাদা স্তর দিয়েও সাদা রঙ তৈরি করতেন তারা। তবে কৃষিকাজের জন্য জমিতে ইউরিয়া সারের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার ফলে, এখন মাটি এখন আগের মতো সাদা হয় না বলে গ্রামবাসীরা জানান। তারা মাটি থেকে তৈরি আলপনার আঁকার রঙকে স্থায়িত্ব দেয়ার জন্য আরও কিছু প্রাকৃতিক পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। শুকনো বড়ই চূর্ণের আঠা, আমের আঁটির শ্বাস চূর্ণ, গিরিমাটি, মানকচু এবং কলাগাছের আঠার সঙ্গে রঙের মিশ্রণ কয়েকদিন ভিজিয়ে রেখে আলপনা আঁকার রঙ প্রস্তুত করতেন তারা। এই রঙ সাধারণ মাটি থেকে পাওয়া রঙের চাইতে বেশিদিন স্থায়ী হয়। তবে প্রাকৃতিকভাবে বানানো সকল রঙই দীর্ঘস্থায়ী নয়, খুব সূক্ষ্ম কারুকাজও করা যায় না তা দিয়ে। ফলে গত বেশ কয়েকবছর ধরেই প্রাকৃতিক রঙের পাশাপাশি কৃত্রিম রঙও ব্যবহার হচ্ছে আলপনা অংকনে। কৃত্রিম রঙ ব্যবহার শুরুর পর থেকে টিকোইলজুড়ে আলপনার পাশাপাশি দেয়ালে স্থান পাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্য থেকে শুরু করে বিচিত্র সব প্রাণবৈচিত্র্য। কৃত্রিম রঙ অনেক সূক্ষ্ম কাজে ব্যবহার করা যায় বলে গত কয়েক বছরে আলপনার নকশাতে বেড়েছে বৈচিত্র্য।

প্রার্থনা আর রীতিতে আলপনা

মানুষের সবচাইতে আত্মিক ব্যাপার হচ্ছে তার প্রার্থনা এবং রীতিনীতি। জীবনের প্রধান এই দু’টো অনুষঙ্গের সঙ্গে যেন মিশে আছে আলপনা গ্রামের আলপনা। গ্রামের পরিবারগুলো বিভিন্ন পুজায় বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দেবতার সুদৃষ্টি আর আশীর্বাদ কামনা করে আলপনা আঁকেন। আগের দিনে ছেলের জন্য পাত্রী দেখার সময় পাত্রীর বাড়িতে আলপনার সৌন্দর্যও দেখতেন মুরুব্বিরা। তারা এখন অন্যান্য নিত্যনৈমিত্তিক গৃহস্থালি কাজের মতো আলপনা আঁকার কাজটিকে তাদের নিয়মিত কাজ হিসেবেই করে থাকেন। তাই আলপনার প্রতি তাদের মায়া কাজ করে, আলপনার রঙে ফুটে থাকে থাকে মমতার ছাপ।

আলপনা তাদের বাড়িকে করেছে জলবায়ু সহিষ্ণু

মাটির ঘরের দেয়ালে আঁকা আলপনা যে শুধু তাদের বাড়ির সৌন্দর্য বর্ধন করছে তা নয়, তাদের ঘরকে করেছে জলবায়ু সহিষ্ণু। টিকোইলে জলবায়ু পরিবর্তনের উপর একটি গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করেছিল বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বারকিক (বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইনডিজিনিয়াস নলেজ)। গবেষণায় দেখা যায় আলপনা আঁকার ফলে মাটির দেয়ালে তারা যে রঙের লেপন ব্যবহার করে তা এসব বাড়ির স্থায়িত্ব বৃদ্ধিতে এবং জলবায়ু সহিষ্ণু হতে সহায়তা করে।

আলপনার গ্রামের পরিচয় এখন বিশ্বজুড়ে

আলপনার গ্রাম টিকোইল এখন আর অপরিচিত কোনো নাম নয়। দেশের গ-ি ছাড়িয়ে টিকোইলের পরিচিতি এখন বিশ্বজুড়েই। দূরদূরান্ত থেকে প্রতিনিয়তই পর্যটকরা ভিড় করছেন এই গ্রামটিতে। এই গ্রামেরই বাসিন্দা দাসু বর্মণের বাড়িতে দর্শনার্থীদের জন্য রাখা আছে পরিদর্শন খাতা। এই গ্রামের সৌন্দর্য দেখতে আসা দর্শনার্থীরা তাদের মুগ্ধতার কথা লিখে রেখে যান পরিদর্শন খাতায়। এর উল্টালেই চোখে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন কোণ থেকে আসা মানুষের শুভেচ্ছা বার্তা। সুইজারল্যান্ড থেকে আসা এক আলোকচিত্রী লিখেছেন ‘অসাধারণ আতিথেয়তা, চমৎকার মানুষ আর দূর্দান্ত সব আলপনায় বিস্ময়কর এক গ্রাম’। টিকোইলের এই অনন্যতায় মুগ্ধ হয় সকলেই। বরেন্দ্র অঞ্চলের এই মৌলিক শিল্পচর্চার দিকটি কখনো যেন হারিয়ে না যায় সেদিকে সচেষ্ট হওয়া উচিত বলে মনে করেন পর্যটকরা।