হরকাতুল জিহাদ

।। বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী ।।

দুবাই থেকে আসা টাকায় হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশকে (হুজি-বি) সংগঠিত করার কাজ চালাচ্ছেন সংগঠনটির সদস্যরা। নিষিদ্ধ এই জঙ্গি সংগঠনের কারাবন্দি শীর্ষ নেতা আতিকউল্লাহ জেল থেকেই মোবাইল ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন তাদের সঙ্গে। তাদের পরিকল্পনায় নতুন সদস্য সংগ্রহের পাশাপাশি কারাবন্দি নেতাদের ছাড়ানোর প্রচেষ্টাও রয়েছে।

সম্প্রতি হুজি-বির আঞ্চলিক কমান্ডার ইব্রাহিম খলিলসহ রাজশাহীতে আটক দুই সদস্য আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানেই তারা জানিয়েছেন চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য।

চারদিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে জবানবন্দি দেয়ার পর এই মামলাটি পুলিশের এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া ‍শুরু হয়েছে। রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) কমিশনার মো. আবু কালাম সিদ্দিক জানান, মঙ্গলবার মামলাটির ডকেট এটিইউর কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরপর বিষয়টি তারাই তদন্ত করবেন।  

জেল থেকে তৎপর আতিকউল্লাহর আদ্যোপান্ত

রাজশাহীতে আটক হুজি-বি সদস্যরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, কাশিমপুর কারাগারে বন্দি আতিকউল্লাহ মোবাইল ফোনে সংগঠন গোছানোর জন্য নির্দেশনা দিতেন তাদেরকে। পাশাপাশি অর্থ কীভাবে ও কোত্থেকে আসবে সে বিষয়েও পুরো নিয়ন্ত্রণ থাকতো তার।

জানতে চাইলে আরএমপি কমিশনার বলেন, ‘জেলখানার ভেতর থেকে কাদের মাধ্যমে আতিকউল্লাহ যোগাযোগ করতো, সে ব্যাপারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তারা (আটক দুই জন) দিয়েছে। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে বিষয়টি বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়।’

২০১৯ সালে ঢাকায় গ্রেফতারের পর আতিকুল্লাহ যে স্বীকারোক্তিমূল জবানবন্দি দেন, তার সূত্রে সেই সময় সংবাদমাধ্যমের সংবাদে বলা হয়, তিনি হরকাতুল জিহাদের প্রথম সারির নেতা। ১৯৯১ সালে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের কওমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল্ ইসলামিয়ায় পড়ার সময় মাওলানা আব্দুল সালাম, মুফতি আব্দুল রউফ, হাফেজ ইয়াহিয়াদের মাধ্যমে হরকাতুল জিহাদে যোগ দেন তিনি। এরপর তিনি চট্টগ্রাম মহানগরীর সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আতিকুল্লাহ হুজি নেতা মুফতি হান্নানের ১৯৯৬ সালে গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পরবর্তীতে বায়তুল মাল ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দায়িত্বশীল নেতা ছিলেন। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম দিকে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে সৌদি আরব পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করেন। সাংগঠনিক কাজে একাধিকবার তিনি পাকিস্তানেও যান।

আতিকুল্লাহর পরিচিতি রয়েছে বোমা বিশেষজ্ঞ হিসেবে। তিনি আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধেও অংশ নেন। ওই সময় তিনি তালেবান প্রধান মোল্লা ওমর এবং আল কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

২০১৯ সালের গোড়ার দিকে সৌদি আরব থেকে দুবাই যান আতিকউল্লাহ। মার্চে তিনি দুবাই থেকে বাংলাদেশে আসেন। তার দেশে ফেরার মূল লক্ষ্য ছিল কারাবন্দি সদস্যদের মুক্তির জন্য চেষ্টা চালানো। দুবাই থেকে দেশে ফেরার আগে ফেব্রুয়ারিতে সেখানে বসবাসরত মুফতি শহিদুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক হয় আতিকুল্লাহর। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, একটি কমিটির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে হরকাতুল জিহাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা হবে।

দেশে ফিরে কাজ শুরুর সাত মাস পর ২০১৯ সালের অক্টোবরে ঢাকার নিকুঞ্জ এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। আটকের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ দুটি বিষয়কে পুঁজি করে তারা অস্থিতিশীলতার পরিকল্পনা করছিলো।

কে এই মুফতি শহিদুল?

আতিকুল্লাহ তার জবানবন্দিতে আরও জানান, দুবাইয়ে বসে জঙ্গি সংগঠন হুজি-বি-কে সংগঠিত করছেন মুফতি শহিদুল ইসলাম। আশির দশকের শেষ দিকে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে আসেন মুফতি শহিদুল ইসলাম। তিনি ২০০১ সালে উপ-নির্বাচনে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের শরিক দল ইসলামী ঐক্যজোটের (অবিভক্ত) সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৯৮৮ সালে প্রথম আল মারকাজুল ইসলামি বাংলাদেশ নামে এনজিও প্রতিষ্ঠা করেন মুফতি শহিদুল ইসলাম। কিন্তু এর আড়ালে তিনি হরকাতুল জিহাদের জঙ্গিদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতেন। ২০১৯ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুটি এনজিওর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে সরকার। এর একটি মুফতি শহিদের মারকাজুল আল ইসলামী।

মালয়েশিয়াভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে

মুফতি শহিদুলের সহায়তা ও পরিকল্পনায় দেশে ফিরে আটক হওয়া আতিকউল্লাহ যে নির্দেশনা দেন, তার বিস্তারিত বিবরণ রাজশাহীতে আটককৃতদের জবানবন্দিতে রয়েছে। সেখানে তারা জানান, মালয়েশিয়াভিত্তিক একটি এমএলএম মডেলের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আড়ালে তারা দেশে হুজি-বি সংগঠিত করতে কাজ শুরু করেন। দেশে ওই কোম্পানিটি মূলত স্বাস্থ্য বিষয়ক পণ্য ও দ্রব্যের ব্যবসা করে।

জবানবন্দিতে বলা হয়, প্রথমে তারা ওই কোম্পানির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। এরপর সেই পরিচয়েই তারা সাংগঠনিক কাজ শুরু করেন। যদিও প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশ প্রধান সরাসরি এই তৎপরতায় সংশ্লিষ্ট কি না সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য তারা দেননি।

জবানবন্দিতে দেয়া তথ্য বলছে, মূলত দুবাই থেকে হুন্ডির মাধ্যমে তাদের কাছে অর্থ আসতো। জেলের ভেতর থেকে আতিকউল্লাহ নির্দেশনা দিলেও রাজশাহীতে গ্রেফতারকৃত তিনজনের আরেকজন আবদুল আজিজ নোমান এই হুন্ডির অর্থ আনার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতো।

জানতে চাইলে আরএমপি কমিশনার বলেন, ‘তাদের জবানবন্দির ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত করছে। এটিইউর সদস্যরাও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।’

তবে কমিশনার আশা করেন, এই আটকের ফলে হুজি-বির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না আর।