।। আলী রেজা ।।

বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জন একাত্তরের স্বাধীনতা। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতা বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার গৌরব এনে দিয়েছে। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে বাঙালি জাতির প্রথম মুক্তি ঘটে একাত্তরে। তাই একাত্তর পরবর্তী বাঙালি বিশ্বের বুকে স্বতন্ত্র পরিচয়বাহী একটি  জাতিসত্তা। একাত্তর পরবর্তী প্রজন্ম পরাধীনতার গ্লানিমুক্ত প্রজন্ম। গল্পকার চন্দন আনোয়ার (জ. ৮ জানুয়ারি ১৯৭৮ খ্রি.) এই একাত্তর পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিনিধি। চন্দন আনোয়ারের জীবনবোধ তাঁর যুগমানসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। স্বাধীন বাংলাদেশ পথচলার অর্ধদশক না পেরুতেই হারায় স্বাধীনতার স্থপতিকে। ফলে জাতীয় চেতনার বাক পরিবর্তন ঘটে। স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য লাভ করে। ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর শরীরে লেপ্টে দেওয়া হয় ধর্ম ও পুঁজিবাদের আলখাল্লা। সংবিধানকে ব্যবচ্ছেদ করা হয় শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থে। সামরিক শাসন আবার ঝেকে বসে বাংলাদেশের জনগণের মাথায়।

পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম দশক না পেরুতেই সামরিক শাসন কায়েম হয়েছিল। সেই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ গণআন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল বাঙালি জাতির কাঙ্ক্ষিত বিজয়। একই কায়দায় বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রথম দশক না পেরুতেই রাষ্ট্রের দণ্ডমুণ্ডের মালিক হয়ে ওঠে সামরিক শক্তি। একযুগের বেশি সময় সামরিক শাসনের অধীনে চলে বাংলাদেশ। জনগণের রাষ্ট্র আবার জনগণের হাতে ফিরে আসে নব্বইয়ের গণআন্দোলনের মাধ্যমে। স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রনীতির এই পালাবদলের কালপর্বে বেড়ে উঠেছেন চন্দন আনোয়ার। তাই তাঁর লেখায় ঘুরেফিরে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সময়ের চিত্র। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীশক্তির উত্থান ও মুক্তিযোদ্ধাদের হতাশার চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে অনেক গল্পে। পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থাকে গভীরভাবে অবলোকন করেছেন চন্দন আনোয়ার। ব্যক্তির আর্থ-সামাজিক অবস্থান যখন পুননির্ধারিত হতে চলেছে শুধু আর্থিক সংগতির মানদণ্ডে তখন শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তা ব্যাহত তথা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে ক্রমশ। ব্যক্তির মুক্তচিন্তা বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন চন্দন আনোয়ার। সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসপ্রসূত সামাজিক শোষণ সমাজদেহের একটি অনিরাময়যোগ্য ব্যাধি। এই ব্যাধি নির্মূলে সামাজিক আন্দোলন চলে যুগ যুগ ধরে। সামাজিক এই ব্যাধি সৃষ্টিকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে চন্দনের গল্পে।

ব্যক্তিচরিত্র নানামাত্রিক চেতনার ধারক। তাই ব্যক্তিচিন্তা নানামুখি। ব্যক্তিচিন্তার এই বৈচিত্র্য ব্যক্তিকে করে তোলে স্বতন্ত্র ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচ্ছিন্ন। ফলে সংকট দেখা দেয় ব্যক্তির যাপিত জীবনে। যাপিত জীবনের এই সংকটের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন চন্দন আনোয়ার। গল্পের চরিত্রগুলো কখনো ব্যক্তিগত সংকটে পতিত হয়েছে আবার কখনো সামাজিক সংকটের শিকার হয়েছে। সামাজিক জীবন যাপন করেও অনেকে হয়ে পড়েছে নিঃসঙ্গ। এই নিঃসঙ্গতা থেকে ব্যক্তিসত্তার বিনাশ দেখিয়েছেন গল্পকার। সংকটাপন্ন মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম ও সম্ভাবনা যখন নিঃশেষ হয় তখন মৃত্যুচিন্তা তাকে গ্রাস করতে থাকে। মৃত্যুচিন্তার এই আগ্রাসন থেকে মুক্ত হতে পারেনি চন্দনের অনেক চরিত্র। অনেক চরিত্র মৃত্যুর সাথে খেলেছেন অবলীলায়। মনস্তাত্ত্বিক সংকট ঘনীভূত হতে হতে অনেক চরিত্রই হয়ে ওঠেছে অস্বভাবী।

কালিক বিচারে স্বাধীন বাংলাদেশের গল্পকার চন্দন আনোয়ার। একাত্তর পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতি ও অপরাজনীতির চিত্র উঠে এসেছে তাঁর গল্পে। আদর্শবাদী রাজনীতির চেয়ে পেশিশক্তির রাজনীতি, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও পুঁজিবাদী রাজনীতির দিকেই ছিল গল্পকারের দৃষ্টি। কারণ রাজনীতির আদর্শবিচ্যুতি সমাজকে করেছে ক্ষত-বিক্ষত। এই ক্ষত-বিক্ষত সমাজকে প্রতিবিম্বিত করতে গিয়ে চন্দন সচেতনভাবেই দেখিয়েছেন অপরাজনীতিকে। রাজনীতির আদর্শবিচ্যুতি ব্যক্তি ও সমাজকে উলটপালট করে দেয়। বিদ্যমান ব্যবস্থার আদর্শিক পতন ঘটে। দৃশ্যত এই পরিবর্তনকে অপরিহার্য মনে হয় বলে এর বিরুদ্ধে কোনো সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠে না। ব্যক্তিচিন্তার বিকাশ ব্যাহত হয়। এভাবে অপরাজনীতি রাজনীতিকে বিতর্কিত করে তোলে। সমসাময়িক রাজনীতির এই বৈশিষ্ট্য চন্দন আনোয়ারের গল্পের একটি প্রধান বিষয় যা মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির রাজনৈতিক উত্থানের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করেছেন গল্পকার।

যৌনভাবনা ব্যক্তির একান্ত বিষয় হলেও তার প্রভাব পরিবার ও সমাজে নানা অঘটন ঘটাতে পারে। যৌনভাবনা ব্যক্তির একান্ত বিষয় হলেও যৌনক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য ব্যক্তিকে খুঁজে নিতে হয় একজন যৌনসঙ্গী। যৌনক্রিয়া সমাজস্বীকৃত পন্থায় সংঘটিত হলে পরিবার ও সমাজে তার কোনো প্রভাব পড়ে না। যৌনক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিও থাকে প্রভাবমুক্ত। কিন্তু সমাজস্বীকৃত পন্থায় না হলে তা যেমন অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় তেমনি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। দেখা দেয় ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক সংকট। এই সংকট ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যাপিত জীবনকে করে তোলে অসহনীয়। চন্দন আনোয়ার ব্যক্তির এই যৌনজীবনের নানামাত্রিক সংকটকে তুলে ধরেছেন অনেক গল্পে।

চন্দন আনোয়ারের গল্পের ভাষা নানামাত্রিক। গল্পের চরিত্রগুলো যখন নানা সংকটে আবর্তিত থাকে তখন চন্দন সেই চরিত্রের মুখে তুলে দেন অমার্জিত ভাষা। প্রচলিত অমার্জিত ভাষার অনেক যুতসই ব্যবহার চন্দনের গল্পকে করে তোলে জীবন্ত। চরিত্রগুলোকে তখন আর গল্পকারের কল্পনার সৃষ্টি বলে মনে হয় না। কথ্যভাষাকে তিনি কখনো আবৃত করেন না। টোটাল গল্পটাই তখন আবরণমুক্ত হয়ে ওঠে। সংলাপে আঞ্চলিক ভাষার যেমন চমৎকার ব্যবহার আছে তেমনি বর্ণনা অংশে প্রমিত ভাষা ব্যবহারের ব্যত্যয়  ঘটেনি। উপমা ব্যবহারেও চন্দনের রয়েছে দারুণ মুন্সিয়ানা। গল্পের শাখা প্রশাখার বয়ান করতে গিয়ে কখনো মূলধারায় বিচ্ছেদ ঘটেনি। ফলে পাঠকের পক্ষে গল্পে নিবিষ্ঠ থাকা সহজ হয়েছে। চন্দনের গল্পের নানামাত্রিক বিশ্লেষণ সামগ্রিকভাবে করার জন্য যে বৃহৎ পরিসর প্রয়োজন তা একটি মাত্র প্রবন্ধে বিধৃত করা সম্ভব নয় বিধায় আলোচ্য প্রবন্ধে চন্দনের গল্পের কয়েকটি বিশেষ দিক তুলে ধরার প্রয়াস থাকবে।

মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী রাজনীতির নীতি-আদর্শিক বাকবদল, বিরোধীশক্তির সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্থান, মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন কৌশলে আদর্শিকভাবে হত্যাপ্রচেষ্টা, বাকস্বাধীনতা তথা মুক্তচিন্তার কণ্ঠরোধসহ মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক মনোজাগতিক পর্যবেক্ষণ আছে চন্দনের গল্পে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীশক্তির উত্থান       

মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী প্রজন্মের লেখক হয়েও চন্দন আনোয়ার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করেছেন মেধায় ও মননে। চন্দন আনোয়ারের গল্পের মূল বিষয় মুক্তিযুদ্ধ না হলেও ঘুরেফিরে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ এসেছে অনেক গল্পে। খণ্ডযুদ্ধের কাহিনির বদলে চন্দন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রতিফলিত করেছেন গল্পে। মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী রাজনীতির নীতি-আদর্শিক বাকবদল, বিরোধীশক্তির সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্থান, মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন কৌশলে আদর্শিকভাবে হত্যাপ্রচেষ্টা, বাকস্বাধীনতা তথা মুক্তচিন্তার কণ্ঠরোধসহ মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক মনোজাগতিক পর্যবেক্ষণ আছে চন্দনের গল্পে। একজন কবির সারাজীবনের লালিত চেতনা ও বিশ্বাস যা তিনি তার লেখায় প্রকাশ করেছেন সেই নীতি-আদর্শিক বিশ্বাসকে মিথ্যা ও কবিমনের কল্পনা বলে ঘোষণা করতে হবে। হিন্দু কবির লেখা বলে দেশের জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নতুন জাতীয় সংগীত রচনার পক্ষে মত দিতে হবে। তা না হলে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি কবিকে হত্যা করবে। স্ত্রী-সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও কবির নিজের জীবন বাঁচাতে হলে কবিকে এই কাজ করতে হবে (কবি ও কাপালিক)। স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পেয়ে এভাবেই মুক্তচিন্তার কণ্ঠরোধ করতে চায় এবং বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপরিচয় ধ্বংস করতে চায়। তবে গল্প শেষে চন্দন মুক্তচিন্তার জয় দেখিয়েছেন। জীবনকে তুচ্ছ করে কবি শেষ দৃশ্যে যখন গেয়ে ওঠেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি চিরদিন তো…’ তখন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক বিজয়ই ঘোষিত হয়।

রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের দমন-পীড়ন ও নির্বিচারে হত্যার সংস্কৃতিতে কখনো কখনো জনগণ সম্পৃক্ত হয়ে যায়। ‘গণপিটুনি’ যার যুতসই দৃষ্টান্ত। মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আহমদ জামিলের একমাত্র ছেলে বিজয় ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে খুন হয় (মৃত্যু অথবা ঘুম)। অধ্যাপক আহমদ জামিল তার ছেলেকে দেখতে মর্গে যাওয়ার পর হার্ট এ্যাটাকে মারা যান। একজন মুক্তিযোদ্ধার আশা-আকাঙ্ক্ষাও নিঃশেষ হয়ে যায় একই সাথে। চন্দন এখানে আর এক বাংলাদেশকেও দেখিয়েছেন। সাধারণ মানুষ যখন আইনের শাসনের আস্থা হারায় তখনই তারা গণপিটুনিতে অংশ নেয়। আর গণপিটুনিতে অনেক সময় নিরপরাধ লোক মারা যায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর যখন আদর্শিক পরাজয় ঘটে তখন তারা অপরাধ দমনের নামে কিছু নিরপরাধ মানুষকে ঘটনার সাথে জড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার চেষ্টা করে। বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ড মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আর যখন একজন মুক্তিযোদ্ধার পরিবারে এমন বিপর্যয় নেমে আসে তখন পাঠক গল্পে একটি ভিন্নমাত্রা খুঁজে পায়। বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীশক্তির উত্থানেরও ইঙ্গিত দেয়।

স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি নতুন প্রজন্মের চেতনায়ও মিশিয়ে দেয় মানবতাবিরোধী অপরাধের বীজ। তাই সেই একাত্তরের কায়দায় নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যেও নারী নির্যাতন, নারী সম্ভোগ আর নারীলোলুপ মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। যারা স্বাধীনতার চেতনাকে পদদলিত করে তারাই একাত্তরের কায়দায় নারী নির্যাতন ও নারী ধর্ষণ করে। ‘গিরগিটি ও একজন মেয়ে’ গল্পে চন্দন ছাত্র রাজনীতির সেই কুৎসিত চেহারা তুলে ধরেছেন যা একাত্তরের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ভেতর ছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্ম জেগে উঠলে একাত্তরের রাজাকার ও মানবতাবিরোধী অপরাধীরা ভীতিবিদ্ধ হয়ে পড়ে। স্বাধীনতাবিরোধী হয়েও মুক্তিযুদ্ধের পরে যারা বোল পাল্টে সামাজিক সম্মান লুফে নিয়েছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়েছে তাদেরই একজন জমির খাঁ। সোলায়মান মাস্টারের মেয়ে নাসরিন নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে। নাসরিন শহর থেকে সহপাঠি বন্ধুদের নিয়ে এসেছে এলাকায় অবস্থিত গণকবরটি চিহ্নিত করে সেটি সংরক্ষণ করার জন্য। রাজাকার জমির খাঁ এই গণকবরের শহীদদের তুলে দিয়েছিল হানাদার বাহিনীর হাতে। একাত্তরে জমির খাঁ যে সব মেয়েদের নির্যাতন করেছে, জমির খাঁ’র সহযোগিতায় যে সব মেয়েরা পাকবাহিনীর হাতে ধর্ষিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে তারা একে একে সেই গণকবর বা বধ্যভূমি থেকে উঠে আসে। বিষয়টির একটি প্রতীকী ব্যঞ্জনা পাঠককে মুগ্ধ করে।

স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধারা কেমন আছেন? ক্ষমতার পালাবদলে মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদেরকে গুটিয়ে নিয়েছেন। স্বাধীনতাবিরোধীরা রাজনৈতিক আনুকূল্য পেয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উচ্চাসন লাভ করেছে। ফলে মুক্তিযোদ্ধারা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে, প্রচারবিমুখ হয়ে পড়েছে। সরকার মাঝে মাঝে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক বাহক হতে চায়। কিন্তু এটা সরকারের উদ্দেশ্যমূলক কাজ। তাই এতে মুক্তিযোদ্ধাদের যথার্থ সম্মান দেওয়া হয় না। পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা রহম আলি ৩৩ বছর যাবৎ ডিম বিক্রি করে অতি কষ্টে সংসার চালালেও কেউ তার খোঁজ নেয়নি। এ সময়ের মধ্যে রাজাকার ছানা মিয়ারা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তাই মুক্তিযোদ্ধা রহম আলিরা নিজেকে আরও গুটিয়ে নিয়েছে। তাই সরকার যখন রহম আলিকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য দিন ঠিক করে এলাকায় ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে তখন রহম আলি এটাকে প্রহসন মনে করে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে চায়। মুক্তিযুদ্ধে ত্যাগ এবং অবদানকে কারো কাছে এমনকি রাষ্ট্রের কাছেও বিক্রি করতে চায় না রহম আলি। তাই একদিকে যখন তার সংবর্ধনার আয়োজন চলছে তখন সে সপরিবারে পালিয়ে যাচ্ছে বাড়ি থেকে। আজকাল মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ব্যবহার করে এক শ্রেণির মুক্তিযোদ্ধারা যেভাবে যশ, খ্যাতি ও অর্থপ্রাপ্তির দিকে ছুটছে সে বিষয়টিকেও কটাক্ষ করা হয়েছে গল্পে রহম আলি চরিত্রের মাধ্যমে। মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহার করে কেউ যেন সুবিধা নিতে না পারে সে বিষয়টিও প্রতিফলিত হয়েছে ‘পালিয়ে বেড়ায় বিজয়’ গল্পে।

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির প্রতিনিধি রাজাকার জমির মৃধার শোষণের শিকার আব্দুর রহিমের পরিবার। মুক্তিযুদ্ধের সময় আব্দুর রহিমের মাকে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিয়েছিল জমির মৃধা। জমির মৃধা এখন টানা তিনবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। কিন্তু আটত্রিশ বছরেও ভেতরের পশুটা মরেনি তার। তাই নতুন প্রজন্ম আব্দুর রহিমের মেয়ের দিকে জমির মৃধার কুদৃষ্টি পড়েছে। আটত্রিশ বছর আগে সমূলে ধ্বংস করতে পারেনি এই জমির মৃধা নামক ইঁদুরদের। তাই এখন বংশবিস্তার করে নতুন শক্তি নিয়ে ছোবল মারছে। শেষ দৃশ্যে আব্দুর রহিম ধরে ফেলে জমির মৃধা নামক বড় ইঁদুরটিকে। এভাবেই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পতন দেখিয়েছেন চন্দন আনোয়ার ‘আপাতত এই বিচার’ গল্পে।

‘পোড়োবাড়ি ও মৃত্যুচিহ্নিত কণ্ঠস্বর’ গল্পটিও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির আখ্যান। গল্পে দৃশ্যের পর দৃশ্য পড়তে পড়তে এক সময় মনে হয় নৃপেন বিশ্বাসের পোড়োবাড়িটাই যেন বাংলাদেশ। রাজাকার সাদুল্যাহ মৃধারাই একাত্তরে পুড়িয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশকে। জুলমত বয়াতি ও জৈনুদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি। বিজয়ের মাসে পোড়োবাড়ির মেজাজ পাল্টে যায়। অর্থাৎ পোড়োবাড়ির সাপগুলো (মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি) প্রশস্ত ফণা তুলে দাঁড়ায়। দল বেঁধে রাস্তায় নামে। যুদ্ধংদেহী হয়ে ওঠে। কিন্তু জুলমত বয়াতি নিজেই যখন সাদুল্যাহ মৃধার বিচারের রায় দিয়ে শেখের গান ধরে তখন চারদিকে নীরবতা নেমে আসে। মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষশক্তির শায়েস্তা করার বিষয়টি প্রতিফলিত হয়ে গল্পে যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই জাগ্রত করে।

রাজাকার তথা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষশক্তির উত্থান হলে মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন হয়ে ওঠে দূর্বিষহ। যুদ্ধের সময় সওদাগর আলি এক রাজাকারের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিল তার বোনকে বিয়ে করার শর্তে। পরে সওদাগর আলি পূর্বনির্ধারিত পাত্রীকেও বিয়ে করে। দুই বউয়ের সংসারে সন্তান আসে। সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে রাজনীতিতে  পুনর্বাসিত হয়ে সেই রাজাকার ফিরে এলে সওদাগর আলির সংসারে সংকট দেখা দেয়। পুকুরের মালিকানা নিয়ে দুপক্ষের দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো একদিন পুকুরটাই মরে যাবে বলে সওদাগর আলির আশঙ্কা হয়। এই হলো ‘একটি পুকুর মরে যাচ্ছে’ গল্পের বিষয়। গল্পে মুক্তিযোদ্ধা সওদাগর আলির জীবনের সংকট ও রাজাকারের রাজনৈতিক উত্থান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূলেই আঘাত হানে।

মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার, স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি, যুদ্ধাপরাধ- এ সব ইস্যুগুলো স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরেও শেষ হয়ে যায়নি। সাধারণ ক্ষমা আর রাজনৈতিক পালাবদলের সুযোগ নিয়ে  রাজাকার তথা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এই পরস্পরবিরোধী দুটি শক্তি এখনো অনেক হিসেব মেলাতে পারেনি। রাজাকারদের উত্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষোভ ও হৃদয়ের ক্ষত যেমন বেড়েছে তেমনি অপকর্মের ষোলকলা পূর্ণ না করতে পেরে রাজাকাররাও আজ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই বিষয়গুলো চন্দন আনোয়ারের গল্পে অত্যন্ত নিখুঁত ও নির্মোহভাবে ফুটে উঠেছে।

সমাজবাস্তবতা রাজনীতি

সাহিত্যে সমাজবাস্তবতার চিত্র প্রতিফলিত হয়। সমাজে সংঘটিত ঘটনা, বিভিন্ন সামাজিক সংকট, সমাজস্থ মানুষের যাপিত জীবনের নানা অনুষঙ্গই সাহিত্য সৃষ্টির প্রধান উপাদান। দেশ-কাল ও ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত মানব জীবন কথাসাহিত্যে রূপায়িত হয়। এই রূপায়ণ করতে গিয়ে যিনি রূপকার তিনিও হয়ে ওঠেন দেশ-কাল, মানুষ ও ঘটনা সংলগ্ন। এই সংলগ্নতাই একজন সাহিত্যিকের সফলতা এনে দেয়। সাহিত্যিক সংলগ্ন হন সমাজবাস্তবতার সাথে, চলমান সময়ের সাথে। সমাজনিরীক্ষণ করতে গিয়ে একজন কথাসাহিত্যিক সামাজিক শোষণ ও বৈষম্যকেই সবচেয়ে বেশি আমলে নেন। শোষক আর শোষিতের দ্বন্দ্ব-সংঘাত সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়, সামাজিক প্রগতির পথ তৈরি করে।

বর্তমান সমাজবাস্তবতার একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হয়ে উঠেছে বিচারবহির্ভূত শাস্তি বা হত্যাকাণ্ড। এটি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হতে পারে, হতে পারে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে। সামাজিক শোষণের শিকার মানুষ, রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত মানুষ হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে সবকিছুর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে। এই অনাস্থা থেকে কখনো কখনো মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয় এবং চিহ্নিত কিংবা সন্দেহজনক ব্যক্তিকে সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করে। এই আক্রমণেরই প্রচলিত নাম ‘গণপিটুনি’। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি রাষ্ট্র ও সমাজ বের হতে না পারলে সাধারণ মানুষ গণপিটুনির মাধ্যমে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। এ ক্ষেত্রে গুজব কাজ করে কখনো কখনো। তবে প্রকৃতই গুজব হলে গণপিটুনিতে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য সেটা বিরাট দুর্ভাগ্য। ‘মৃত্যু ও ঘুম’ গল্পে এরকমই একটি দুর্ভাগ্যজনক গণপিটুনির চিত্র তুলে ধরেছেন চন্দন।

টোকাইদের রাজনৈতিক অপকর্মে ব্যবহার করা এক অপরাজনৈতিক কৌশল। বর্তমান সময়ে এই রাজনৈতিক অপকৌশলের আশ্রয় নেয় অনেক রাজনৈতিক কর্মীরা। টোকাইরা যেহেতু বেশিরভাগই শিশু, তাই তারা নির্বিচারে অপরাধ করে। অনেকের জীবনও ঝুঁকিপূর্ণ হয়। আইনা, শাকু ও জামাল নামের তিন টোকাই হরতালের আগের রাতে নেতাদের কাছ থেকে ককটেল নেয়। সকালে ককটেল ফাটিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে হরতাল সফল করা ওদের উদ্দেশ্য। বিনিময়ে সামান্য টাকা পায় ওরা। এ কাজে কখনো ওদের জীবনও যায়। বস্তিতে বসবাসকারী এসব টোকাইদের জীবনের সুখ-দুঃখ, অভাব-অভিযোগের চিত্র উঠে এসেছে ‘মা ও ককটেল বালকেরা’ গল্পে। রাজনৈতিক দলের একজন সাধারণ সমর্থক কীভাবে রাজনৈতিক কর্মী হয়ে ওঠে এবং এই রাজনৈতিক কর্মীরা কীভাবে নেতার ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসী অস্ত্রবাজ হয়ে ওঠে সে কাহিনিই আমরা দেখি ‘করোটির ছাদে গুলি’ গল্পে। গল্পে ডাক্তারদের অর্থলিপ্সা ও নেতার সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে মকুর প্রতি ডাক্তারের পরিবর্তিত আচরণ ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরে। পাঁচ’শ টাকার বিনিময়ে মকু নেতার হয়ে কাজ করে। এতে রাজনীতিতে টাকার খেলার বিষয়টিও উন্মোচিত হয়েছে। মকু মিছিলে গেলে মায়ের টেনশন হয়। তাই মিছিলের দিন অসুস্থতার ভান করে মা। এটা ছেলের জীবনের নিরাপত্তার জন্য মায়ের ব্যাকুলতার চিরন্তন প্রকাশ। ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির এক অন্ধকার দিক তুলে ধরা হয়েছে ‘গিরগিটি ও একজন মেয়ে’ গল্পে। দিনের বেলায় যে ছাত্রনেতারা নীতি-আদর্শের স্লোগান দেয় তারাই রাতের বেলা মদ ও মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করে। ছাত্র রাজনীতির এই কদর্য রূপ বর্তমান সময়ে দেখতে পাওয়া যায়। সন্ত্রাসী ছাত্রনেতাদের হাত থেকে কৌশলে রক্ষা করে বাড়িতে নিয়ে এলে জামালের বাড়িতে যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় তা গ্রামীণ জীবনের বাস্তব অবস্থা এবং গ্রামীণ নারী সমাজের মনস্তত্ত্ব তুলে ধরে। গল্পে ছাত্র রাজনীতিতে সন্ত্রাস ও যৌনসম্ভোগের বিষয়টি সমকালীন জাতীয় রাজনীতিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে খুন হওয়া ছেলেকে মর্গে দেখতে গিয়ে হার্ট এ্যাটাকে বাবার মৃত্যু যে সমাজবাস্তবতাকে নির্দেশ করে তা বিদ্যমান রাজনীতিকেও কটাক্ষ করে (মৃত্যু অথবা ঘুম, অসংখ্য চিৎকার)। কারণ রাজনীতি ব্যর্থ হলে সমাজবাস্তবতার স্তরে স্তরে যে অন্যায়-অবিচার চর্চিত হয় তা সর্বাত্মক গণআন্দোলন ছাড়া ঠেকানো সম্ভব নয়। অপরাজনীতি এখন সমাজের স্তরে স্তরে বিস্তার লাভ করেছে। সমাজের নিম্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ, ভাসমান ছিন্নমূল মানুষ ও টোকাইদের বিভিন্ন কৌশলে রাজনৈতিক অপকর্মে ব্যবহার করা হচ্ছে। এরা সামান্য টাকার বিনিময়ে ককটেল-বোমা মেরে মানুষ হত্যা করে নির্দ্ধিয়। নির্দেশদাতা অপরাধীরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে (মা ককটেল বালকেরা, অসংখ্য চিৎকার)। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্ম জেগে উঠলে রাজাকার তথা যুদ্ধাপরাধীরা ভীতিবিদ্ধ হয়ে পড়ে এবং তাদের মুখোশ খুলে যায়। বাজার অর্থনীতির একটি বৈষম্যমূলক চিত্র উপস্থাপনের মাধ্যমে সামাজিক শোষণের স্বরূপ তুলে ধরেছেন চন্দন তার গল্পে। নগরায়ণের ফলে গ্রাম থেকে শহরে চালান হয় সবজিসহ নানা ভোগ্যপণ্য। কৃষক পর্যায় থেকে সামান্য দামে সবজি কিনে এনে শহরের আরতদাররা দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে তা বিক্রি করে। এতে উৎপাদনকারী কৃষকরা যেমন বঞ্চিত হয় তেমনি স্থানীয় পাইকারদের লাভের ভাগও হয় সামান্য। বাজার অর্থনীতির এই অসঙ্গতিপূর্ণ পরিস্থিতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে ‘মতি পাইকারের তিন প্রশ্ন’ গল্পে। বাঙালি সংস্কৃতি লালন করা আমাদের জাতিগত দায়িত্ব। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতি লালনের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব পহেলা বৈশাখে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া একদল বখাটে যখন উৎসবে আসা একটি মেয়েকে জনসম্মুখে শ্লীলতাহানি করে তখন সেটা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয় নির্দেশ করে (দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ১৪২২)। বর্তমান সময়ে নারীবাদী চেতনা দানা বেধে উঠলেও নারী আজও নিরাপদ নয় পুরুষের কাছে। নারীর সম্ভ্রম সুরক্ষার কাগজে আইন নারীকে নিরাপদ রাখতে পারছে না। এটাই সমাজবাস্তবতা। আবার উগ্রপন্থাও নারীর প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করে না (নারীশ্বরের খেলাধুলা)। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো এই শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে মানবিক করে তুলতে পারছে না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার সুফল পাওয়ার জন্য এবং সেই সুফল টেকসই হওয়ার জন্য প্রয়োজন মানবিক শিক্ষা। এই মানবিক শিক্ষা শুধু একাডেমিক নয়; এই শিক্ষা পারিবারিক ও সামাজিক। এই শিক্ষার অভাবে ব্যক্তির আদর্শবিচ্যুতি ঘটে। ব্যক্তির আদর্শবিচ্যুতি সমাজব্যবস্থার অবক্ষয় ডেকে আনে। চন্দন আনোয়ার বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার অলিগলি সন্ধান করেছেন এবং সমাজের সর্বস্তরে লুকিয়ে থাকা অসঙ্গতি অত্যন্ত খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছেন। সমাজবাস্তবতার মুখোশ উন্মোচন করতে গিয়ে চন্দন কখনো কোনো রূপক বা লুকোছাপার আশ্রয় নেননি। ফলে তার গল্পগুলো হয়ে উঠেছে মেদহীন ও আবরণমুক্ত।

ব্যক্তিচিন্তা ব্যক্তির নানামাত্রিক সংকট

একজন সার্থক গল্পকারের গল্পের চরিত্রগুলো প্রধানত তার সময় ও সমাজ থেকে নেওয়া হয়। গল্পকার সন্ধান করেন তার যুগধর্মের মোটিভ। ফলে চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সব সময় চলমান সময়কে নির্বাচন করেন। চলমান সময়ে ব্যক্তির যাপিত জীবন এবং যাপিত জীবনে ঘটে যাওয়া নানা সংকটকে প্রতিফলিত করেন গল্পে। ব্যক্তিচিন্তার ভিন্নতা একজন ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে। এই বিচ্ছিন্নতা থেকে সৃষ্টি হয় নানা সংকট। চন্দনের গল্পের চরিত্রগুলো চিন্তার ভিন্নতা নিয়েই পরস্পরের সাথে সম্পৃক্ত। তাই এই সম্পৃক্ততা সত্ত্বেও চরিত্রগুলো স্বতন্ত্র বা বিচ্ছিন্ন। সংকটগুলো নিজস্ব বলে চরিত্রগুলো দুর্দান্তভাবে গতিশীল। সংকটাপন্ন চরিত্রগুলো সব সময় সংকট উত্তরণের জন্য মরিয়া উঠেছে প্রতিটি গল্পে। অনেক চরিত্র সংকট তৈরি করতেও সিদ্ধহস্ত। চরিত্রগুলোর নানামাত্রিক অনভূতি ও নানামাত্রিক সংকট নিয়ে খেলেছেন চন্দন। খেলতে খেলতে পাঠককেও সম্পৃক্ত করে ফেলেছেন বিদ্যমান সংকটের সঙ্গে। পাঠক কাহিনির সঙ্গে একাত্ম হয়ে নিজেকেও মিলিয়ে নেন গল্পের চরিত্রের সঙ্গে।

জ্ঞাতিসম্পর্কের অবনতি পরিবারস্থ ব্যক্তির মনস্তত্ত্বকে আমূল বদলে দিয়েছে। ব্যক্তি নিজেকে নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত হয়েছে যে পারিবারিক বন্ধনের দিকে ফিরে তাকানোর সময় ও মানসিকতা কোনোটাই ব্যক্তিচিন্তায় স্থান পাচ্ছে না। তাই বৃদ্ধ বাবার মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয় প্রবাসী সন্তানেরা। অসুস্থ বাবাকে দেখতে আসার সময় নেই সন্তানদের। বাবার মৃত্যুই শুধু পারে সন্তানদের দেশে আনতে। তাই নিশ্চিত মৃত্যুর সংবাদেই তারা দেশে আসতে চায় (জীবনপাঠের সারাংশ, প্রকাশিতব্য)। ব্যক্তিচিন্তার এই অবনতি ও বিচ্ছিন্নতাবোধ ব্যক্তিকে করেছে দারুণভাবে সংকটাপন্ন। এই জীবনসংকট চন্দনের গল্পের একটি প্রধান উপাদান। জীবনসংকট নিয়ে খেলেছেন চন্দন আনোয়ার। ছিন্নমূল টোকাই থেকে শুরু করে বিত্তবান, শিশু-কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ সকলের জীবন নিয়েই খেলেছেন গল্পকার। সকলের জীবনের সংকটকেই তুলে ধরেছেন মেদহীন ভাষায়। সামাজিক অসঙ্গতিকে নির্মোহভাবে নিরীক্ষা করেছেন বলেই ব্যক্তিসংকটের স্বরূপ দেখাতে পেরেছেন চন্দন। ব্যক্তির সাথে সমাজের সম্পর্কও নানামাত্রিক। সমাজস্থ ব্যক্তি কি শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, নাকি শুধু অন্যকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, নাকি ব্যক্তি নিজের ও সমাজের কথা সমহারে ভাববে? এসব প্রশ্ন সমাজস্থ ব্যক্তির সামনে সব সময় ঘুরপাক খায়। ব্যক্তি স্থির করতে পারে না নিজের অবস্থান। ব্যক্তির ভূমিকা যাই হোক সেটা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে সমাজের কারো কারো পক্ষ থেকে। তাই সামাজিক মানুষ সব সময়ই আপসমুখি। ব্যক্তি এই আপসকামিতার আশ্রয় নেয় সংকট থেকে মুক্ত থাকার জন্য। কিন্তু এতেও ব্যক্তির মনোজগতে দেখা দেয় নতুন সংকট। এভাবেই এগিয়ে চলে চন্দনের গল্পের চরিত্রগুলোর যাপিত জীবন। অবশ্য কেউ কেউ পিছিয়েও যায়। আর্থিকভাবে নয়; মানসিকভাবে। মনোবিকলন ঘটে সংকট থেকে মুক্ত হতে না পেরে। ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে যাওয়া এ সব মানুষের স্বরূপ সন্ধান করেছেন চন্দন অনেক গল্পে।

চন্দনের গল্পে দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন খুব একটা নেই। কিছু গল্পে সাংসারিক অভাবজনিত কারণে এবং কিছু গল্পে যৌনক্রিয়ায় অতৃপ্তির কারণে দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। তবে সেটা কখনো চরম সংকটের কারণ হয়নি।

যৌনভাবনা দাম্পত্য সম্পর্কের জটিলতা

যৌনভাবনা মানুষের আদিম ও অকৃত্রিম ভাবনা। ব্যক্তিজীবনের একটি প্রধান অংশ জুড়ে যৌনচিন্তা। মানুষের যৌনজীবনকে ঘিরে বিভিন্ন সামাজিক প্রথা যেমন থাকে তেমনি থাকে কিছু বিধি-বিধান। এ সব মেনে নিয়ে ব্যক্তি যদি তার যৌনজীবন ধারণ করে তবে তা স্বাভাবিক হয় সমাজের দৃষ্টিতে। কিন্তু ব্যক্তি যদি সামাজিক প্রথা বা বিধিবদ্ধ নিয়ম না মেনে তার নিজ যৌনাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে চায় তবে সেটা সমাজের দৃষ্টিতে হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক। এই অস্বাভাবিক যৌনচিন্তা ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে। এ ধরনের অস্বাভাবিকতা যদি বিবাহিত নরনারীর মধ্যে দেখা দেয় তবে সেটা দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে জটিলতার সৃষ্টি করে। যৌনসঙ্গী তখন হয়ে ওঠে প্রতিদ্বন্দ্বী। বিবাহ ও বিবাহবহির্ভূত উভয় প্রকার যৌনজটিলতা চিত্র খুঁজে পাওয়া যায় চন্দনের গল্পে।

‘গিরগিটি ও একটি মেয়ে’ গল্পে ছাত্রনেতাদের নারীলিপ্সা ও অস্বাভাবিক যৌনক্রিয়ার বিষয়টি এক ধরনের মনোবিকলন। অনুরূপভাবে ‘রুগ্নতার গলি-ঘুপচি’ ‘বাড়ন্ত বালিকার ঘর-সংসার’ ‘দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ-১৪২২’ ‘রক্তখেকো সাপ ও আমাদের নপুংসকত্ব’ ‘বারবনিতা এসোসিয়েশন’ ‘রাত পোহালে অন্ধকার’ ‘একটি শবদেহের সৎকার’ ‘সাওতাল মেয়ের ঈশ্বর’ ‘আদিম কাব্যকার’ ইত্যাদি গল্পে নানামাত্রায়, নানা পরিস্থিতিতে পাত্রপাত্রীগণ কোনো না কোনোভাবে অস্বাভাবিক যৌনাচার বা যৌনক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত। চন্দন আনোয়ার ব্যক্তির যৌনভাবনাকে তুলে ধরতে গিয়ে কোনো সাংকেতিক বিষয়ের আশ্রয় নেননি। যৌনজীবনকে উন্মুক্ত করতে গিয়ে অত্যন্ত নির্মোহভাবে নির্মেদ ভাষা ব্যবহার করেছেন। ভাষার মারপ্যাঁচে বিষয়কে আবরণযুক্ত করার চেষ্টা করেননি বলেই ঘটনার বর্ণনা হয়েছে সাবলিল। শব্দের ব্যবহারে সতর্ক থেকেও প্রয়োজনে অমার্জিত ভাষা ব্যবহার করতেও দ্বিধা করেননি। ফলে গল্পের কৃত্রিমতা পরিহার করা গেছে।

চন্দনের গল্পে দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন খুব একটা নেই। কিছু গল্পে সাংসারিক অভাবজনিত কারণে এবং কিছু গল্পে যৌনক্রিয়ায় অতৃপ্তির কারণে দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। তবে সেটা কখনো চরম সংকটের কারণ হয়নি। কখনো স্বামীর যৌনসক্ষমতার অভাব আবার কখনো স্ত্রীর যৌনশীতলতার কারণে দাম্পত্য সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। তবে তেমন গল্পের সংখ্যা খুব বেশি নয়।

মৃত্যুচিন্তা

চন্দনের কিছু গল্পের প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে মৃত্যুচিন্তা। নানা কারণে মানুষের মনে মৃত্যুচিন্তা দেখা দেয়। চরম সংকটে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়লে আত্মহত্যাও করে অনেকে। বিশেষত বার্ধক্যে মানুষের মনে মৃত্যুচিন্তা ভর করে। মানুষ যখন বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন খুঁজে পায় না তখন সে মৃত্যুচিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে পারে। ‘স্কাইপে ও দুটি মৃত্যুমুখ’ ‘মৃত্যুবিষয়ক কবিতাপ্রেমী’ ‘সিদ্ধিকাব্য’ ইত্যাদি গল্পে মৃত্যুকে নিয়ে খেলা করেছেন চন্দন। মৃত্যুর মতো অনিবার্য বিষয় নিয়ে খেলতে খেলতে চন্দন মুত্যুকেও খেলো বিষয়ে পরিণত করতে পেরেছেন। তাই চন্দনের গল্পের মৃত্যুচিন্তা পাঠককে আহত করে না। পাঠক নিজেও মৃত্যুর আবেশ নিয়ে গল্পকেই উপভোগ করে।

বিষয়বৈচিত্র্যে চন্দনের গল্পগুলো ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে। ‘হার্ট ফাউন্ডেশনের লটারি’ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যাপিত জীবনের কাহিনি। ‘একটি গ্রাম পত্তনের গল্প’ ভাগ্যাণ্বেষী জীবনসংগ্রামী মানুষের প্রতিষ্ঠা লাভের গল্প। ‘অনিরুদ্ধ টান’ গল্পে দেশভাগজনিত বাস্তুচ্যুত লোকদের পুনর্মিলনের কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। ‘ফসলি মাঠে লাশ’ নির্বাচনী সহিংসতা ও লাশের রাজনীতির গল্প। ‘অন্তর্গত শূন্যতা’ হিজড়াদের হয়রানি নিয়ে লেখা হলেও শেষে হিজড়াদের প্রতি মানবিক আচরণের ইঙ্গিত আছে। ‘আমৃত্যু শ্বাসকষ্ট’ গল্প বর্তমান সময়ের প্রশ্নফাঁস বিষয়টিকে তুলে ধরেছে। এভাবে চন্দনের প্রতিটি গল্প পাঠকের সামনে ভিন্ন ভিন্ন সমাজচিত্র তুলে ধরে।