শহীদ ইকবাল

।। শহীদ ইকবাল ।।

কোনো ডিসটোপিয়া নয়; যোদ্ধা যুদ্ধজয়ের পর ফিরে এলো, তারই অর্জিত জয় স্বচক্ষে দেখবার জন্য—কেমন আছ তুমি? যে মাটি, মৃত্তিকা; সমতলভূমির শস্যক্ষেত, বনবৃক্ষ, গাছালি, ভোরের কৃষক, নৈসর্গিক গ্রাম, পাশের নদী, উন্মুক্ত আকাশের মেঘ—সব কেমন আছে? ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ, পাপ-পুণ্য জীবনের ছায়াপথে অহরহ আসে-যায়। কাছে-দূরে আক্ষেপ থাকে; তবুও সবটা মেনে তো সত্যটাই জেগে ওঠে। যে সত্যটা ৫০ বছর পরে একদিন ওই আত্মত্যাগী যুদ্ধজয়ী জানতে চাইতেই পারে। সে জানতে চায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেমন আছে? আটষট্টি হাজার গ্রাম কেমন আছে? বিশ্ববিদ্যালয়ে তো ‘সম্পদ’ তৈরি হয়। তারাই তো দেশে মানবসম্পদ সরবরাহ করে—তাই তার দাবি ওটা কেমন আছে! মরণাপন্ন, মনখারাপকরা হাসপাতালগুলো কেমন আছে? একদিন যেখানে বাঙালি বলে ঢোকা যেত না, সেই সচিবালয়ের প্রাচীরের ভেতর ‘ব্যুরোক্র্যাসি’ কেমন চলছে? ৫০ বছরে তো সব বদলানোর কথা। সেজন্য তো যুদ্ধজয়ীর ছিল যুদ্ধের বেশ! এখন তা কেমন? প্রমিথিউস দেবতাদের ঘর থেকে আলো চুরি করে যেভাবে মানুষদের দিয়েছিল, সেই আলোর ফল জানতে চায় যুদ্ধজয়ী। কারণ, এ আলো তো শুধু আলো নয়, সমস্ত অন্ধকার তাড়িয়ে সবকিছু সকলের করে তোলার অকৃপণ প্রচেষ্টা; সে অর্থ-পণ্য, ভোগ-স্বেচ্ছাচার, ক্ষমতা-শোষণ, ধর্মবাজী সরিয়ে মানবিক স্বর্গ বানাবে সেখানে—এই তো সত্য! আলো তো তাই। সে আলোর যাত্রারথ এখন কেমন—তাই দেখতে এসেছে যুদ্ধজয়ী। ৫০ বছর পর আজ একদিন তার দেখার সময়। অনেক বিহ্বলতায় সে সবটুকু দেখে আত্মতৃপ্তি পেতে চায়।

ডিসটোপিয়ান শর্তে এখন তার উত্তরে বলা যাবে, এদেশে আর বদ্বীপ বলে কিছু নেই, সকলের হাতে সেলফোন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফার্মে পরিণত হয়েছে, হাসপাতাল আর জেলখানার পার্থক্য নেই, সকলেই নিজ নিজ বিচ্ছিন্নতায় ছিন্নমস্তা, ব্যুরোক্র্যাসি ক্ষমতা আর ভোগের লাঠিয়াল, খেটে খাওয়া অবুঝ মানুষগুলোর বস্ত্র নেই প্রশ্ন নেই, নারীরা নিজের নয়, গ্রাসাচ্ছাদনের বস্তুসকল। ৫০ বছর পর প্রচুর জৌলুস রপ্ত করে ভুঁইফোঁড়রা দেশে বিদেশে মালিকানা প্রস্তুত করেছে—বিপরীতে বেকার-কর্মহীনরা নেশার ফাঁদে পা দিয়ে নেশা সরবরাহকারীদের ভোক্তায় পরিণত হয়েছে, যোগাযোগের ছায়ায় ক্রাইম আর ক্লিশে মন সর্বস্বান্ত। সার্ভিলেন্স আর সিসিটিভির পাগলা কুকুর সব প্রশ্ন ছিনতাই করে নিয়েছে। প্রচুর রেমিট্যান্স আসে, তার ঘোরে—হীরক রাজা হাসে। কতো মানুষ স্বপ্নরাজ্যের জন্য যুদ্ধজয়ীর মৃত্তিকাকে ঘৃণাভরে পায়ে ঠেলে জাহাজের খোলে বা বিমানের ডানায় পালায়, তখন লিবিয়ায় কেউ বেঘোরে মারা পড়ে, কেউবা বসনেয়ার জঙ্গলে শেয়ালের খাদ্য হয় আবার কেউবা ভূমধ্যসাগরের জলরাশিতে খাবি খেতে খেতে হারিয়ে যায়। ওসব ক্ষমতাসীনদের কার্নিশে কোনো অনুভূতি তৈরি করে না। অনুভূতিসমূহও নিজস্ব থাকে না। সেটিরও কেনাবেচা চলে। বা কেউ কাউকে ধারকর্জ দেয়। মোটা মোটা বস্তাভরা সব অনুভূতি এখন। হাইব্রিড অনুভূতি। বড়লোকগুলোও হাইব্রিড। সৌদি হাজীও হাইব্রিড। মন্দিরের পুরোহিতও হাইব্রিড। ফলে, মানবিক যা কিছু তা কাউকে আঘাত করতে পারে না। বিপরীতে নির্বিকার আর মোটা বোধের তাৎক্ষণিক সুরসুরির জন্ম দেয়। সংস্কৃতিটা এখন এই যে, বিনীত নিবেদনের সুযোগ কম। যথাবিহিত সম্মান কাগজে আছে, অন্তরে নির্বাসিত। এই পঞ্চাশের পর, এই দেশে যখন বই পড়বো—তখন মানুষ বোকা ভাবে, ওসব কেউ পড়ে না, মুখস্থ করে— উগরে দেয়, ডিস্টোপিয়ায় কোনোকিছু ম্যানুয়াল চলে না, বুঝি আপনার হাগাটাও এখন ডিজিটালাইজড। লাইব্রেরি নেই—কোনো লাইব্রেরি নেই কোথাও আজ; হ্যাঁ, আছে বড়লোকের ঘরে টানানোর জন্য—সোনার আলোতে প্রদর্শনের জন্য, সেটা ‘ক্লাস’। প্রজন্ম এখন ক্লাসমুখি। রোবট। রিপুগুলো, চোখগুলো অ্যপস-এ হ্যাঙ। ফলে, দলবাঁধা কোরাস নেই, শহীদমিনার, স্মৃতিসৌধ ফাঁকা। যুদ্ধজয়ী ৫০ এ এসে তাই স্মৃতিকাতর হয়। পুরনো ম্যানুয়াল দিনগুলো করোটির ছাদে ধাক্কায়, হানা দেয়। কাজের ব্যস্ততায় স্মৃতিকথা কেউ শোনে না। ম্যাজিক জীবনের ম্যাজিক রিয়্যালিটি শুধু হেলায় আর দোলায়, ফসকে যায় নরোম রোদ আর বৃষ্টিতে ভেজা পাতার কাঁপুনি।

ফলে বিপর্যস্ত সংস্কৃতি। এই মতে এটা পরিষ্কার যে, বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমান গড়ে উঠতে উঠতেই ধসে চূর হয়ে গেছে। ঝুর ঝুর করে চুয়ে পড়ছে স্বপ্ন দেখা মন। দ্বিতীয় প্রজন্ম দাঁড়াতে দাঁড়াতেই, ডিজিটালাইজড কাক সব ঠোক্কর দিয়ে নিয়ে পড়ল শকুনের হাতে। ফলে, মন্ত্রী-আমলা-শিক্ষক-প্রজন্ম ‘বড়’ হওয়ার সুযোগ পেল না। তবে মনে পড়ে, এ সুযোগ একবার হয়েছিল, ষাটে—একাত্তরে। একটু হলেও আলোর শক্তির আলিঙ্গন ঘটেছিল। স্বপ্নটাও তখনই তৈরি হয়। বড় হওয়ার—বড় করার স্বপ্ন। তারপর তা ক্রমশ গর্তে সেধিয়ে এখন এক গহ্বরে পরিণত হয়েছে। যা কিছু করি, বুঝি—প্রাপ্তির লোভে। রেজাল্টের জন্য। প্রেমও করি ভোগের জন্য। রিপুর পরিতৃপ্তির জন্য। নাম দেই ‘প্রেম’। পড়ি, গ্রেড পাবার জন্য। মানুষ হওয়া বা দায়িত্ব—দেশপ্রেম, সেটা নয়। অর্থ-যশের নিমিত্ত পড়ি। সুখের নিমিত্ত পড়ি। সেখানে মিলিটারি, এসপি, সিভিল অফিসার হওয়াই কাম্য—অন্তত না খেয়ে মরা ‘বুদ্ধিজীবী’ হওয়ার চেয়ে। যদিও বুদ্ধিজীবী—অর্থজীবীর তফাৎ কোথায়—বর্তমান রাষ্ট্রে সে নেই, খেয়ে গেছে। হওয়ারও সুযোগ নেই। এসবের কারণ কী? ড্রিম নেই—ড্রিম নেই যে! তাই এখন হতে চাওয়া ডান্ডাবাজ কিছু। ডান্ডাতে ক্ষমতা থাকে—যা ক্ষমতা তা সম্মান— সেখানে সর্ব-দখলদারি জায়েজ। কিচ্ছু বলে না কেউ সেখানে। সেজন্য তাদের এজেন্ডা সব মানুষগুলোকে ‘গড়-মানুষ’ বানিয়ে ফেল। জি-সিনেমা দেখাও, অ্যপস-এ ঘুরুক সর্বদা। ব্রেইনটা ডিস্টোপিয়প্রবণ হলে—শক্তির সুষমা সুবিধায় ললিতলোভন হয়! সুবাস ঘন হয়। মিষ্টিটা জমে। দাস বানিয়ে তোলা সহজ হয়। তখন নির্বিচারে যা ইচ্ছে তাই করা যায়। সেই ফুয়েল তৈরি করে ব্যুরোক্র্যাসি, সামরিক-বেসামরিক এমনকি এলিট সিভিল অংশও। একাকার। তাই যুদ্ধজয়ীর যে স্বপ্ন ছিল ‘বনরাজির ছায়া’ নেওয়া—তা এখন কোথায়? সে চেয়েছিল, স্বপ্ন দেখেছিল—সেখানে থাকবে বাড়ন্ত মানুষ, অবাধ-উন্মুক্ত অরণ্যের মতো বৃক্ষলতার বেপরোয়া সুখ, আর সকলের আনন্দে ভরা জীবন—তা কই? নিজের মতো বাড়বে সব—কেউ হবে উঁচু, কেউবা লম্বা, পুবে-পশ্চিমে বাড়ন্ত, বটবৃক্ষের মতো ঝুরি-শিকড়ে বিস্তৃত। জন্ম হবে তার লোভনীয়। সব অন্ধকার ছাড়িয়ে সেখানে বৃষ্টির মতো রোদ আর কিরণপাত ঘটবে। মেধা-মস্তিষ্ক হবে বেপরোয়া, সক্কলেই হবেন সমান অংশীদার। তাই তো পাকিস্তান তাড়ানো! পোদে লাত্থি মেরে ওঁদের বিতাড়ন করা। পাঞ্জাবীদের দেখিয়ে দেওয়া যে, কতোটা জোর এই বাঙালির! সেই দেশ আর আজ এই দেশ! ঝাড়ে-বংশে বাড়ার স্বপ্ন ছিল। এই স্বপ্নভূমিতে নবপ্রজন্মকে বাড়তে দেওয়ার যুদ্ধ ছিল সেটা। তাইতো যুদ্ধজয়ীর আজ এতো প্রশ্ন! যেমনটা ছিল সেই সুখ—১০ই জানুয়ারি বাহাত্তরে। শেখ সাহেবের সেই চশমা আর কালো কোটের ভেতরে বুকভরা মন উজাড় করা স্বপ্ন—কিন্তু অতঃপর?

প্রশংসার ঠোঁটে, ২০২১, বিজয়ীর ৫০-এ একদিন সে কী ভাববে? মধুমতী-গড়াই-পদ্মা-তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রে আর পানি নেই, সেতু হয়েছে। দীর্ঘতর পদ্মাসেতু। চোখ আটকে যায়—কী এক লগি-নৌকোর জীবন ছিল একদা! সেখানে চোখ-ধাঁধানো ব্রিজ। টনটনে রাস্তা। সরসর করে সরীসৃপ সরে যায়। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এখন দিনের যাত্রা। নন স্টপ। রেমিট্যান্সে ভরপুর। বিশ্ববিদ্যালয়-মার্কা সাইনবোর্ড ভরা সব কোণাকাঞ্ছি। থানায় থানা যত্রতত্র। সাংবাদিক অনেক। প্রিন্টিং আর ইলেকট্রনিক মিডিয়া। পূর্ব-পশ্চিম ঘুচে গেছে। কাজ কাজ আর কাজ। প্রচুর বাড়িঘরদালানপ্রাসাদ। মেয়েরা কাজে নেমে গেছে। বেরিয়ে এসেছে তারা তাক থেকে। প্রবাসীরা টাকার সাথে সম্মানও আনছে। প্রজন্ম খাটে। জেনারেশন ঝুঁকেছে পড়াশোনার দিকে। বলা হচ্ছে ‘চতুর্থ বিপ্লব’। কোনাটো অসত্য নয়। গত ৫০ বছরে দানা বাঁধা সব সত্য। উন্নয়ন তবে কি এই? প্রশ্নের পীঠে বলি, রাষ্ট্র ৫০ বছরে কতোটা শক্তিশালী? রাষ্ট্রের অবকাঠামো কী কী কাজ করছে? এই রাষ্ট্র কি একজন ন্যায়শীল বিচারক বানাতে সামর্থ্য? মেধাবী মানসম্মত শিক্ষা নতুন প্রজন্ম কী পাচ্ছে? জ্ঞানভিত্তিক সমাজ? বিশেষজ্ঞ-নির্ভর উন্নয়ন কাঠামো? প্রযুক্তি-শিক্ষিত জনগোষ্ঠী? কারা সেতু বানাল? দেশি প্রেডাক্ট কতোগুলি? রপ্তানী-খতিয়ান? আদমজী-পাটকল-চিনিকল-কাগজকল? প্রশ্নগুলো ৫০ কে সম্মুখে রেখে। প্রশ্নের বিবরণ বাড়ানোর প্রয়োজন নেই, কারণ অযুত প্রশ্ন তো অনেকের জানা। রাষ্ট্রটি তো মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়। ভাষাভিত্তিক তার চেতনা। ভাষারইবা কি অবস্থা? মাতৃভাষা তো মানুষের মুখ! তার কি পরিণতি? ভাষার রাজনীতির ভেতরে তা কী গড়ে উঠছে। ভাষার রাজনীতি মানে সংখ্যালঘুর অধিকার মেনে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বীকৃতি। সেখানে আছে গণ-সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ—যার ভেতরে আষ্ঠেপৃষ্ঠে গড়ে উঠেছে আর্থনীতিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রগতি। কেন্দ্র যার ভাষা। এই প্রগতি বর্তমান গোলকায়নে কি মিথ্যে হয়ে যায়নি? আমরা কী পেরেছি? চীন পারে, জাপান পারে, বৃটিশরা ল্যাঙ্গুয়েজ বাণিজ্য করে আর বিপরীতে আমরা কি প্রতিক্রিয়াশীলতার তীক্ষ্ন হইনি? অবাধ প্রযুক্তির প্রবাহে যথেচ্ছা যখন অধিকৃত, বিচিত্র উপাদানের অন্ধিতে তা যখন ক্রিয়াশীল—তখন প্রতিক্রিয়াশীলতার তৎপরতা রীতিকে মেনেই তো অব্যাহত থাকে। যার সুযোগ নেয় ক্ষমতাবানরা। সুযোগের বিপরীতে যা ঘটে তার উপকার কেউ যে নেয় না তা নয়। কিন্তু সেখানে গোড়ার বন্ধনটা দৃঢ় হওয়া দরকার হয়ে পড়ে না কি! সেটি না হলে যে সংকট তৈরি হয়, তা প্রতিক্রিয়াশীলদের পাতে পড়ে। যেটি ঘটছে, প্রতিনিয়ত, অতিরিক্ত করে। ফলে, ভালো-মন্দ যাই ঘটুক, যুগের হাওয়াটা এখন বেশ চলতি। চলা এবং বাঁচা—এমন দায় এখন মানুষের। অন্তত, প্রতিযোগিতা আছে। নানারকম প্রতিযোগিতা। লক্ষ্য আগে যাওয়া, যে কোনো প্রকারে। সেখানে ছাড় নেই, কাউকে। এই ছাড় না দেওয়াটা, সম্মান-অসম্মান, ছোট-বড়-ভালো-মন্দ মানছে না। আগে যেতেই হবে। এগুনোর প্রবণতা থেকে, যায় যাক প্রাণ, দৃশ্যমানতা জরুরি। সেখানে ব্যক্তি আর রাষ্ট্র একমতোন। যেমন: নদীতে নৌকো না চলুক, ব্রিজ হবে; ব্রিজ মানেই ‘উন্নয়ন’। পুকুরে পানি না থাক, হ্যাচারি করে মাছ কর। হাউসে মাছ আবাদ করাটা উন্নয়ন। রাস্তা একবছরে চারবার ঠিক হচ্ছে, ফোরলেন সিক্সলেনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে—সেটা বছরের পর বছর গড়াক, উন্নয়ন তো! এলিভেটর, মেট্রো হচ্ছে—যতোই খারাপ লাগুক—মেনে নিয়ে উন্নয়নের ঢেকুর তো উঠছে! ঢাকা ঢাকাতে না থাক, ডিসেন্ট্রালাইজ না হোক, বুড়িগঙ্গা নিভে যাক, সব ভরাট করে হাউজিং-প্লট বরাদ্দ হতেই থাক—সবই উন্নয়ন। এক ঘণ্টা যদি ছয় ঘণ্টা হয়—হোক, লাইনে থাকো—উন্নয়ন।  চাহিদা মিটলেই উন্নয়ন। এ উন্নয়ন ঘটেছে বেশুমার—৫০ বছরে। কিন্তু যা টেকেনি—তা সবুজ; টিকছে না নদী, নদীপথের জীবন তৈরি না হয়ে ঝুঁকির পথে স্থলচলাচলের কাজ বেড়েছে, দ্বিগুণ জমাখরচে। অর্থাৎ ব্যয় করে ঝুঁকি আর অনিরাপত্তা কেনা হয়েছে। এর মূলে আছে দুর্নীতি আর অশুভ প্রতিযোগিতা। সেখানে, অন্যায় ও অনীতির সমাজ গড়ে উঠেছে। ফলে, বিজ্ঞানমনস্ক ও কার্যকর সমাজের সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। লোভ বেড়েছে। ধর্মান্ধতা, বৈরিতা, পরচর্চা, আনুগত্যের ‘ধর্মীয়’ আচরণ ব্যাপক বেড়েছে। ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা ও উগ্রতা ব্যাপক। সবকিছুই আনুষ্ঠানিকতার নামান্তর, লোক দেখানো, স্বার্থ লোটানো। ফলে যে কোনো ধরনের অনুকম্পা ও তোষামোদের প্রবণতা কমেশই অহরহরূপে বেড়েছে। ভুঁইফোঁড় সংস্কৃতিতে, অস্থির ও অস্বস্তি, ভয়, কৃত্রিমতা বেশি। আনুষ্ঠানিকতাও তীব্র। ধর্মান্ধরা ধর্মকে ব্যবহার করছে নানা কাজে। সবকিছুর নামে প্রতিক্রিয়াশীলতার সংস্কৃতি এভাবেই ‘পৌরাণিক’ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এটা কী ভাঙতে হবে না? ভাঙতেই হবে। আর ভাঙার জন্য, অভিঘাত প্রয়োজন। হতাশা বা সাহসের অভাব থাকলে হবে না। হতাশা যেমন হতাশা বাড়ায় সাহসের অভাব তেমনি সাহস কমায়।

সুতরাং ৫০র যুদ্ধজয়ী স্মৃতিকাতর ওই জনই যে—সে এখন তীব্র অভিঘাতের প্রেরণা নিয়ে হাজির। এখন ব্যক্তি উদ্যোগে অনেক ভালো কাজ হয়। প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ব্যক্তি উদ্যোগগুলো শুভ-ভূমিকায় আছে। প্রতিষ্ঠান পারছে না। ভেঙে গেছে তা। রাষ্ট্রায়ত্ত সব ভেঙে গেছে। বলেছি চিনিকল নেই, পেপারমিল নেই, পাটকল নেই—বিপরীতে আছে বেক্সিমকো, স্কয়ার, প্রাণ প্রভৃতি ‘সম্মতি উৎপাদনে’র সংস্থা। এরা কর্পোরেট। বিশ্বজুড়ে রুপার্ট মারডক, আম্বানিদের পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রুপ-সংস্থা রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে একটা তাঁবেদার অবকাঠামো তৈরি করেছে। রাষ্ট্র তাতে ফাঁপা, শূন্য। এসবের বিরোধীতা করে লক্ষ্য অর্জিত হয় না। পরিবর্তনটা মানবের স্বার্থে হোক, সর্বরকম মানুষের জন্য বিশেষজ্ঞভিত্তিক কার্যকর পরিকল্পনার উন্নয়ন কাঠামোভিত্তিক গড়ে উঠুক। বিজ্ঞানের উপযোগ হোক—মানুষের কাজে লাগুক, সংস্কৃতি সতেজ জীবনের ফুয়েল দিক, বিশ্ববিদ্যার জ্ঞান গৃহীত হোক—হিপোক্রেসি নয়, দেশপ্রেম হোক দেশের স্বার্থে— সর্বজান্তারা যেন সর্বনাশ না করে (করেই চলছে) — সেটা এই ৫০ এও আমরা কি বুঝব না! কোনোকিছুই ‘বোঝা’ যেন না হয়, পরিকল্পনা ২০৪১ পরিষ্কার হোক, সব সেক্টরের বিশেষজ্ঞরা মর্জিমাফিক জ্ঞান দিক—সবটাই যেন দেশের স্বার্থে, গর্বিত জাতির উপলব্ধিতে হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় হয়—তবেই কাঙ্ক্ষিত কিছু হতে পারে। সেই শুরুটা হোক এখনই, অগ্রসরমানতার অংশটুকু চলমান রেখে।

যুদ্ধজয়ী ফিরে এসে দেখুক ৫০ এ—যা দুঃখ, ক্রমশই তা কেটে যাচ্ছে—সম্মুখের ২৫ বছরের, ২০৪১র অগ্রযাত্রা নিয়ে। কাজটুকু শুরু হয়েছে, এ বছরই। নামমাত্র নয়, লোকদেখানো নয়, বিশেষায়িতভিত্তিক পরিচ্ছন্ন পরিসেবায়। সকলেই সবকিছু পাক। পেতেই হবে।

মুক্তিযুদ্ধের পর রথযাত্রায় এখন যদি দ্বিতীয় প্রজন্মকে ধরি তবে তৃতীয় প্রজন্ম অধিকতর সুস্থ হোক, তারা যেন ব্রেইনড্রেন না হয়, ব্রেনটা এ দেশেই কাজে লাগাক; বাইরের পরিশ্রম, এখানেই দিক, পরিবেশটা পেলে তো দেবেই— পরিবেশ চাই, সমাজ চাই, সংস্কৃতিটা চাই; তাহলে কেউ বাইরে যাবে না, কেন যাবে—নিজের সুখটা কে না চায়! কিন্তু পরিবেশটা তো দিতে হবে এবং তা দেবার জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর কাজটা অবশ্যই করতে হবে। ব্যক্তি উদ্যোগে তা সহজ নয়, দরকার সামষ্টিক জাগরণ, রাষ্ট্রও সে শক্তিটি তৈরি করুক। প্রতিটি ব্যক্তিকে ইনভলব করুক। জায়গা যেমন পড়ে থাকবে না ব্যক্তিও তেমনি বেকার থাকবে না।

যুদ্ধজয়ী এই ৫০ এ এসে, এখন একদিন অন্তত এই সত্যটা বাস্তবিক জেনে শান্তিতে থাকুক। দেখুব সব বাস্তবে পরিণত হয়েছে। সেই একত্রিত স্লোগান সত্যে পরিণত হয়েছে। জয় হোক বাংলার।

৫০ সেটি বলুক এখন, এখন এই একদিনটি হোক আগামীর বাস্তব প্রতিশ্রুতি।

শহীদ ইকবাল: অধ্যাপক ও কথাসাহিত্যিক