চন্দ্রগর্ভ

।। আমিরুল ইসলাম কনক ।।

কথার ভেতর কথা

পদ্মাবতীর মন ভালো নেই। কোকিলের ডাক তার মনে আগুন ধরিয়ে দেয়। কে যেন তার কাছে বিদ্যুতের আলো নিয়ে আসে। ঠিক যেন বিদ্যুৎ নয়, আগুন। সে আগুন ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। কখনো স্বপ্নের ঘোরে কে যেন পাথরে পাথরের কাঠি দিয়ে কিংবা কাঠের কাঠি দিয়ে কাঠের তৈরি নরম গোলাকার ছিদ্রে ঘর্ষণ করে আগুন জ্বালায়। এক দুই তিন আরও অসংখ্যবার। ভীষণ ভীষণ ঘুম পায় তখন। দু’চোখের পাতা ক্লান্তি সুখে ভরে যায় তখন। বড্ড কাঁদতে ইচ্ছা করে তখন। কেন আকাশের প্রতি মাটির এই আকুতি? কেন মেঘেদের এই গর্জন? আকাশ ভেঙে মাটিতে পড়লেই কি সব জ্বালা জুড়িয়ে যায়? কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখর শ্রেণিতে যখন পাগলপারা মেঘেরা উড়ে উড়ে দুলে দুলে এসে আছড়ে পড়ে, তখন তারা কি প্রশান্তিতে দু’চোখের পাতা বন্ধ করে? স্বপ্নের মতো কে যেন আসে। তাকে আক্রমণ করে প্রমত্ত এক দৈত্য। ভীষণ তীব্রতায় ছুটে আসা বিপুলাকার দৈত্য সে। অতি দ্রুত বেগে পলায়নপর সেও তখন অন্ধকার থেকে আলোয়, আবার আলো পেরিয়ে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যায়। দৈত্যটি পিছু পিছু তাকে ধাওয়া করে। অনুসরণকারী দৈত্যের হাত থেকে আপনাকে রক্ষার জন্যে পথে পথে একটি করে পাথর ফেলছে আর এগিয়ে চলেছে সে। সেই পাথর ভীষণ বিরাটাকার ধারণ করে দৈত্যকে বাধাগ্রস্ত করছে। কখনো পদ্মাবতীর কল্পনার সেই ছেলেটি সাগরের তলদেশে কখনো বা পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করে। পরক্ষণে পদ্মাবতী নিজেকে সেই কুমারের পাশেই দেখতে পায় যেন। কখনো তারা এক সাথে পলায়নপর দৈত্যের হাত থেকে মুক্তির প্রাণান্ত চেষ্টায় রূপ পরিবর্তন করেছে, কখনো ছেলেটি পুরোহিত পদ্মাবতী মন্দির, কখনো সে পাখি পদ্মাবতী নীড়। ভীষণ মন খারাপ করে পদ্মাবতীর। চোখ বন্ধ করলে হিজিবিজি রঙ আর রূপের সমাবেশ। লাল, সবুজ, হলুদ, নীল, সাদা, কালচে নীল, ফ্যাকাশে লাল, সবুজে নীলের মাঝামাঝি সব রঙ আর প্রজাপতি জোনাকিরা উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে যায়। কখনো মাছরাঙ্গা ভীষণ বেগে উড়ে এসে গর্তে লুকায় নদীর কিনারে, বালুচরে। কখনো রঙ বেরঙের ছুরি, লাঠি, বৃক্ষ, ছাতা, পেন্সিল, শাবল ছুটে চলে প্রবল বেগে, যেন আকাশ থেকে উল্কাবৃষ্টির মতো পড়ছে তারা। নিজেও স্থির থাকতে পারেন না পদ্মাবতী তখন। কখনো স্রোতস্বিনী নদীর মতো ছুটে চলেন তিনি। স্বপ্নের ঘোরেই নিজেকে নাম না জানা রঙের পার্বত্য গুহা বলে মনে হয়। কখনো রঙিন বোতল, সুদৃশ্য গৃহ, প্রাসাদের দরজা, গহনাপাত্র, ছায়াঘেরা আলো আঁধারিতে পাখি ডাকা উদ্যান অথবা সদ্য প্রস্ফূটিত ফুল হিসেবে দেখতে পায় নিজেকে। কে যেন সমুদ্র সাঁতরে তার কাছে ছুটে আসে প্রবল প্রবলতর বেগে।

পদ্মাবতীর খুউব ইচ্ছে করে সে ছুটে আসা দেখতে। সে ছুটে আসুক, আরও দ্রুত বেগে ছুটে আসুক। হঠাৎ কে যেন রঙ ছড়িয়ে দেয়। লাল। নীল সমুদ্র ভেদ করে একটি নদী, তীব্র স্রোতঃস্বলা সুরসতী সে নদী। সিঁদুরের স্রোত। আটকে দিল তাকে। ছেলেটি সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে, কিছুতেই সিঁদুরের স্রোত পার হয়ে কাছে আসতে পারছে না। ভীষণ মন খারাপ করে পদ্মাবতীর। পদ্মাবতীকে দেখে বহির্ভাগ অলঙ্কৃত কোনো ভাস্কর্য বলে ভ্রম হওয়াই স্বাভবিক। দেহ বল্লরীতে আর্দ্র শাড়ির আচ্ছাদন দেখা গেলেও তা আর্দ্র নয়। শিল্পীর রঙ আর কারুকার্যের বিশেষ দক্ষতায় বরেন্দ্রী রেশম শাড়ির রঙ হয়েছে আর্দ্র। সুক্ষ্ম অলঙ্কার সজ্জায় তাকে করে তুলেছে গুপ্ত যুগের শিল্পকলার কোনো এক নিদর্শন যেন। পাল যুগে এসে তা হয়ে উঠেছে জীবন্ত মানবী। পরিধেয় শাড়িখানা শুধু তার দেহের অবয়বকে আবৃতই করেনি, শরীরের ভাঁজে ভাঁজে লুকায়িত সৌন্দর্য আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। কাজেই তাকে দেখে নগ্ন বলে ভ্রম হলেও শরীরের কোনো প্রতঙ্গ দেখা সহজ নয়। রেশমের শাড়িতে তার দৈহিক লাবণ্য ছাপিয়ে সৌন্দর্যটুকুই ঠিকরে বেরোয়, যেমনটি হীরক খণ্ড থেকে বিচ্ছুরিত আলো সহজেই ধন্দ লাগায়। রেশম শাড়িটিও ধন্য নিখুঁত দেহের অবয়বে, কমনীয় খাঁজে খাঁজে নিজেকে জড়িয়ে। এ দৃশ্য যেমন তারুণ্য মাখা, তেমনি সজীবতায় মোড়ানো। যখন সে বিছানায় ঘুমিয়ে থাকে, মনে হয় এ যেন মায়াদেবীর স্বপ্ন শয়ন। পদ্মাবতী অর্ধশায়িতা, আলো আঁধারি নগ্নতায় ভরা যৌবনের দৈহিক সৌকর্যের সাথে বিস্ফারিত নয়ন যুগল, ডান পায়ের ওপর বাম পা কিছুটা উঠে থাকা শয্যাভঙ্গিতে মায়াবতী এক আবেশ যেন।

ঠিক দশম দিন পূর্ণ হলো। সত্যকান্তকে কিছুতেই বুঝ মানানো যায় না। উদয়াচলের কথামতো মালিনী রাজকন্যা পদ্মাবতীর প্রাসাদে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। এবার একটাই অনুরোধ ‘বলতে হবে রাজকুমার আর তার বন্ধু, শুধু একটিবার সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেছেন।’ মালিনীকে দেখা মাত্রই পদ্মাবতী ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন। আজকের ফুলসাজি চমৎকার, অনিন্দ্য আর অসম্ভব সুন্দর হয়েছে।

মালাগুলো অসাধারণ এবং ফুলগুলোও অনেক বেশি সজীব। রাজকুমারীকে আজ খুব বেশি প্রাণবন্ত লাগছে। এই সুযোগেই কথাটি বলা উচিত। ‘রাজকুমার আর তার বন্ধু শুধু একটিবার দেখা করতে চায়’। কথাটি বলা মাত্রই পদ্মাবতী রেগে লাল। প্রচণ্ডভাবে মালিনীকে মারপিট করে আহত করলেন। মারপিট করার পর প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়লেন নিজেও। এবার তিন আঙুলে লাল রঙের খুন-খারাবি চিহ্ন মালিনীর কপালে এঁকে দিলেন। ‘যাও, তোমার কপালে আজ খুনরাঙা চিহ্ন এঁকে দিলাম। আজও এই চিহ্ন তাদেরকে অবশ্যই দেখাবে। আরও মনে রাখবে যদি কখনো এই প্রস্তাব আমার কাছে নিয়ে আসো, সেদিন তোমাকে আমি হত্যা করে তোমার রক্ত দিয়ে স্নানাগারের দেয়াল গাত্রে ছায়াচিত্রের জলছবিতে কর্ণপুরের জীবনগাথা আঁকব।’ মালিনী কাঁদতে কাঁদতে পথ চলছেন আর নিজের কপালকেই দুষছেন। উদয়াচলকে সব কথা খুলে বলার পরে কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। সত্যকান্ত সব কথা শুনে নিরাশ হলেন। ‘চলো, বন্ধু আমরা নিজ দেশে ফিরে যাই, এখানে আর কোনো আশা নেই। মহারাজা শুনলে শূলে চরাবেন অথবা উঁচু পাহাড় থেকে ফলে দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবেন। বেঘোরে প্রাণ হারানোর চাইতে চলো নিজ রাজ্যে ফিরে যাই।’ কিন্তু, উদয়াচল অবাক হয়ে ভাবছে যে রাজকুমারী ইচ্ছে করলে রাজার কাছে বিচার দিয়ে তাদেরকে বিপদে ফেলতে পারতেন; নয়তো মালিনীর পরিণতি আরও খারাপ হতে পারতো। কিন্তু, রাজকন্যা কাউকেই কিছুই বলেননি।

অতএব, চিন্তার কোনো কারণ নেই।

‘বন্ধু, তোমার প্রথম তিনটি কথা সত্য প্রমাণিত হলেও শেষের কথাটি সত্য হলো না।’ সত্যকান্ত বলছেন।

উদয়াচল বলছেন, ‘শেষের কথাটিও সত্য।’

‘কী করে, বুঝলে?’

‘ভালোভাবে চিন্তা করে দেখো না।’

‘বুঝলাম না।’

‘মালিনীর দিকে দেখো।’

‘তার কপালে তো খুনরাঙা মৃত্যু চিহ্ন।’

‘আর, কী দেখলে?’

‘তিনটি চিহ্ন, তিনটি আঙুলে আঁকা।’

‘কী, বুঝলে?’

‘এরপর মৃত্যু অনিবার্য।’

‘মরতে কি চাও?’

সত্যকান্ত এবার কোনো কথা বলে না।…

‘কেন মরতে চাও না? এক মরণে দু‘জন মরতে চাও না?’

‘সে সুযোগ পেলাম কোথায়?’

‘যদি সুযোগ করে দেই?’

‘কখন? কীভাবে?’

‘ঠিক তিন দিন। তিন দিন পরে।’

‘তিন দিন পরে কেন?’

‘পদ্মাবতী এখন সিঁদুরের বাঁধ দিয়েছে।’

‘সিঁদুরের বাঁধ মানে?’

‘স্রোতকে আটকে দেবার জন্য বাঁধ।’

‘বাঁধ কেন?’

‘নীল সাগরে বইছে এখন রক্ত নদী।’

‘রক্ত নদী আবার কী?’

‘সুরসতীর স্রোতস্বীনিতে এখন জোয়ারের ভীষণ স্রোত বইছে, তাই মহানন্দায় অপ্সরীরা স্বর্গ থেকে নেমে এসে সিঁদুরের বাঁধ দিয়েছে।’

‘স্রোতস্বিনী মানে?’

‘স্রোতস্বিনী মানে স্রোতধারা, কারো সাধ্যি নেই সে স্রোতধারা অতিক্রম করার।’

‘তোমার কথার মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘বুঝতে চাইলেই বোঝা যায়।’

‘কী করে বুঝলে?’

‘সংবাদ পাঠিয়েছে।’

‘কাকে সংবাদ পাঠিয়েছে?’

‘তোমাকে সংবাদ পাঠিয়েছে।’

‘কার মাধ্যমে সংবাদ পাঠিয়েছে?’

‘মালিনীর মাধ্যমে সংবাদ পাঠিয়েছে।’

‘কিন্তু, মালিনী যে বলছে অন্য কথা।’

‘ঐ অন্য কথার মধ্যেই সংবাদ আছে, আছে ভেতরের কথা।’

‘কী সংবাদ আছে?’

‘তিন দিন পরে।’

তিব্বতের হাতছানি

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় মৌসুমি আবহাওয়ার কারণে জলবায়ু মোটামুটি উষ্ণ ও আর্দ্র। উত্তরে হিমালয় এবং দক্ষিণে সমুদ্র। দক্ষিণ অংশের জলবায়ু অপেক্ষাকৃত শুষ্ক। মৌসুমি অঞ্চল হিসেবে বরেন্দ্র অঞ্চলে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত এই ছয় ঋতু নিজস্ব ফলমূল, শস্যভাণ্ডার ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ইত্যাদি ঋতুবৈচিত্র্য নিয়ে আবির্ভূত হয়। বায়ুপ্রবাহ, বায়ুর চাপ, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, তাপমাত্রার তারতম্য ইত্যাদি কারণে এ অঞ্চলে সাধারণত ফাল্গুন-চৈত্র-বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মৌসুমি পূর্বকাল, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্র-আশ্বিন মৌসুমি কাল, আশ্বিন-কার্তিক-অগ্রহায়ন মৌসুমি উত্তরকাল, অগ্রহায়ন-পৌষ-মাঘ-ফাল্গুন শীতকাল। এ অঞ্চলের নদ-নদী, বিশাল উন্মুক্ত প্রান্তর, পাথার, হাওর বেষ্টিত ভূখণ্ড দুঃখ সুখের উন্মুক্ত ভূমি। এর মাধ্যমেই প্রাকৃতজনেরা বিহারকেন্দ্রিক প্রার্থনা ও জনজীবনের শ্রম মহিমাগাথা প্রকাশ করেন। এ অঞ্চলে প্রধানত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগ-শোক, মহামারী প্রভৃতি দৈবদুর্বিপাকের কারণে অতীন্দ্রিয়বাদের বিকাশ ঘটেছে কৃষক সমাজে।

তিব্বতে তখন রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একের পর এক বিহার এবং সংঘারাম প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। বুদ্ধের বাণী সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বোধগম্য করে তোলার জন্য বিহারগুলোতে গড়ে উঠল গ্রন্থকেন্দ্র, অনুবাদকেন্দ্র এবং গবেষণা বিভাগ। শত শত গ্রন্থ যেমন গ্রন্থকেন্দ্রগুলোতে শোভা পেল তেমনি তিব্বতী ভাষার ব্যাপক চর্চাও শুরু হলো। যেহেতু বঙ্গ-ভারতীয় পণ্ডিতদের রচনাসমূহ বৌদ্ধ ধর্ম আলোচনার জন্য তখন একমাত্র এবং প্রধান অবলম্বন। কাজেই, বরেন্দ্র এবং কাশ্মীর থেকে রচিত ধর্মগ্রন্থাদি আত্মস্থ করার স্বার্থেই তিব্বতীয়দেরকে বাংলার ভাষা আয়ত্ত করতে হয়। তাছাড়া তিব্বতীয় ভাষায় তখন বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কিত গ্রন্থাদির খুব অভাব ছিল। তখন তিব্বতীয় লিপিতে তারা পুঁথিসমূহ লিখিত রূপ দিতে সক্ষম হলেন। এমনকি ভারত এবং কাশ্মীরে এসে তারা বৌদ্ধ ধর্ম এবং ভাষা শিক্ষা নিতে শুরু করলেন।

তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশের জন্য তারা ইতোমধ্যে বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনের পণ্ডিত ভিক্ষু শান্ত রক্ষিত এবং ভিক্ষু পদ্মসম্ভবকে তৎকালীন ভারতবর্ষ থেকে নিয়ে এসেছেন। তিব্বত সরকার তখন দেশের মেধাবী সন্তানদেরকে ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং দর্শন শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছেন, একই সাথে পৃথিবীখ্যাত দার্শনিক, লেখক এবং ধর্মবেত্তাদেরকে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নিজ দেশে নিয়ে আসছেন। শত শত যুবক তখন ধর্ম এবং দর্শনের শিক্ষা নিয়ে দেশময় ছড়িয়ে পড়েছেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে বুদ্ধের অহিংস বাণীর আদর্শ দীক্ষায় দীক্ষিত করে তারা একটি সুন্দর সমাজ গঠনে এগিয়ে চলেছেন। ম-ঞ্-হ-রি-স রাজ্যের রাজা যে-শে-ও ছিলেন বুদ্ধ অনুগত প্রাণ। বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার, প্রসার এবং প্রতিষ্ঠায় তিনি তার পুরো জীবন ব্যয় করেছিলেন। বিশেষ করে ধর্মের সাথে কুসংস্কারের মিশ্রণকে দূর করতে তিনি সচেষ্ট ছিলেন। নিরীশ্বরবাদী সমাজমনষ্ক অহিংসবাদের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি একের পর এক সংঘ গড়ে তোলেন। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি বাছাই করা সুদর্শন, জ্ঞানানুরাগী, পরিশ্রমী, কষ্টসহিষ্ণু এবং মেধাবী একুশজন যুবককে ভিক্ষুধর্মে দীক্ষা দান করেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন যে এই যুবকেরাই চীন-তিব্বতে বুদ্ধের অহিংস আলোকিত সমাজ গড়বে। কাজেই তাদেরকে যথোপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। একমাত্র সুশিক্ষা ছাড়া এই উদ্দেশ্য কিছুতেই সফল হবে না। একটানা দশ বছর তাদেরকে বুদ্ধ আদর্শ এবং সমাজ চিন্তা শিক্ষা দেওয়া হলো। জে-শে-ও চিন্তা করলেন ভবিষ্যৎ তিব্বতে যারা আলো ছড়াবেন এবং অন্ধকার পৃথিবীকে যারা আলোকিত করবেন তাদের জন্য এই শিক্ষা যথেষ্ট নয়। কাজেই তাদের উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করলেন। বৌদ্ধধর্মের বিবিধ শাখা-প্রশাখা সম্পর্কে বিস্তারিত এবং সূক্ষ্মতিসূক্ষ্ম জ্ঞানার্জনের জন্য তিনি তাদেরকে পৃথিবীর ভূ-স্বর্গ খ্যাত কাশ্মীরে পাঠানোর ইচ্ছা পোষণ করলেন। কাশ্মীরে তখন বুদ্ধের বাণীর সফল প্রয়োগ হয়েছে। রত্নবজ্রের ন্যায় মহর্ষি পণ্ডিতগণ তখন কাশ্মীরে জ্ঞানের আলো বিচ্ছুরিত করছেন। তাঁর প্রজ্ঞা এবং দার্শনিকসুলভ ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হয়ে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে শিক্ষার্থীগণ দীক্ষা নিতে আসেন। তিব্বত থেকে কাশ্মীরের যোগাযোগের কোনো রাস্তা ছিল না সেকালে। তিব্বতের তুষার ঘেরা গিড়িপথ অতিক্রম করে হিমালয়ের পাদদেশ বয়ে চলা ছিল অত্যধিক কষ্টকর। ভোট দেশীয় একুশজন যুবক তুষার আবৃত পিচ্ছিল পথ পায়ে হেঁটে কাশ্মীরে পৌঁছে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিলেন। যেন এমন একটি দেশকেই তারা স্বপ্নে দেখেছিলেন।

এর জল, এর বায়ু, এর আকাশ বৃক্ষলতা নদী যেন চুম্বকের মতো টানলো তাদের। সবকিছু যেন রত্নবজ্র মহর্ষির অমিয় ব্যক্তিত্বের ন্যায় বিরাজিত। এত সুস্বাদু আর বৈচিত্র্যময় ফল পৃথিবীর আর কোথাও নেই। মহারাজ যে-শে-ও লিখিত পত্রখানা পাঠ করে দার্শনিক রত্নবজ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে তরুণদের দিকে তাকিয়ে একবার মৃদু হাসলেন। সে সময় কাশ্মীরে বেশকিছু গৌড়ীয় তথা বাঙালি বিদ্যাথীর্ও অধ্যয়ন করতেন। স্বভাব সরল নিরীহ বাঙালিদের সাথে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের বন্ধুতা গড়ে ওঠে। বাঙালি পণ্ডিত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অতীশ সম্পর্কে তারা তখনই শুনেছিলেন। শ্রীজ্ঞান সম্পর্কে শুনতে শুনতেই বাংলা সম্পর্কেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন তারা। বাঙালিরা ছিলেন ক্ষীণ দেহ ও কঙ্কালসার মাত্র। কিন্তু কিছুদিন প্রবাস যাপনের পরই কাশ্মীরের জল-হাওয়ায় এরা বেশ মেদযুক্ত ও শক্তিশালী হয়ে উঠতেন। তিব্বতীয় এবং বাঙালিরা একত্রে প্রাঞ্জলভাষ্য, তর্ক মীমাংসা সমস্তশাস্ত্রই অধ্যয়ন করতেন। বাঙালিরা ময়ুরপঙ্খী জুতো পড়তেন এবং হাঁটবার সময় তাদের জুতোয় মচমচ শব্দ হতো। তাদের সুবেশ সুবিন্যস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখতেন ভোট বিদ্যার্থীরা।

গুরুর কাছে দীর্ঘদিন অধ্যয়ন করার পর বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অনেক আনন্দমাখা সুখের স্মৃতি নিয়ে ভোট বিদ্যার্থীরা দেশে ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলেন। তুহিনে ঘেরা তিব্বত তাদেরকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সূর্যের আলোক শিখায় ভাসছে তিব্বত। ঝলমল করছে তার উপত্যকা। সোনার ছেলেরা ফিরেই জ্ঞানের আলোয় ভরিয়ে তুলবে অন্ধকার তিব্বতের প্রত্যন্ত উপত্যকা। যথাসময়ে গুরুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তারা স্বদেশের দিকে পা বাড়ালেন। কাশ্মীরের সীমা অতিক্রম করার পূর্ব মুহুর্তে তারা একবার পেছন ফিরে তাকালেন। সারি সারি সবুজের উপত্যকার মাঝে বন্ধুদের মুখগুলো জেগে উঠে হঠাৎ মিলিয়ে গেলো। মনে পড়লো গুরুজীর মুখ, বাঙালি বন্ধু আর দ্বারপণ্ডিতদের কথা। পাহাড়ের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ফলবিথীগুলো যেন তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। নানান রঙের ফুলগুলি বাতাসে দুলে দুলে উঠে বলছে, বিদায়, বন্ধ! বিদায়। শিশিরস্নাত প্রকৃতির দু’চোখে শীতল অশ্রু। এ জীবনে আর দেখা হবে না বন্ধু।

ক্রমশই কাশ্মীরের সীমানা দূর দিগন্তে মিলিয়ে গেলো। রাত শেষ হয়ে সূর্য ওঠে। প্রখর তাপে বরফ গলে ক্লান্ত হতে হতে লাল আভা ছড়িয়ে হারিয়ে গেলো অন্ধকারে। পথের ধারে বৃক্ষ তলে কোনো রকম শয্যা বিছিয়ে রাত কাটিয়ে, ফলাহার করে, নতুন সূর্যকে প্রণাম করে বুদ্ধবাণী জপতে জপতে পুনরায় পথ চলা। এভাবে একেকটি দিন এবং রাত পার হয়ে যায়। উঁচুনিচুপথ। কাঁটাবৃক্ষ আর বিষাক্ত সাপের খোলস মাঝে মধ্যেই চোখে পড়ে। চোখের সামনে দিয়ে আস্ত সাপ ফণা উঁচু করে চলে যায়। জীবহত্যা ধর্মনিষিদ্ধ।

এক সন্ধ্যায় ফলাহার শেষে ক্লান্ত শরীরে শয্যা রচনা করতে গিয়ে একজন পায়ের সাথে শীতল কুণ্ডলীর স্পর্শ অনুভব করেন। কিছু ভেবে ওঠার আগেই অপর পায়ের চাপ লাগে। হিস্স করে একটা শব্দ হয়। একজন কাছে এগিয়ে যেতেই আর একবার। আর একজন এগিয়ে গিয়ে কিছু ভেবে ওঠার আগেই আর একবার শব্দ হলো। সে রাতে একই সময়ে এভাবে পর পর সাতটি দেহ লুটিয়ে পড়ল। সঙ্গীদের দেহ সৎকারের কোনো ব্যবস্থ না থাকায় মন্ত্রজপ প্রার্থনা শেষ করে, চোখ মুছতে মুছতে শয্যা গুটিয়ে কিছুদূর এগিয়ে যেতেই রাত শেষ হয়ে গেলো। না ঘুমিয়ে ক্লান্ত শরীরে অনাহারে পথ চলতে গিয়ে দ্বিপ্রহরের কিছু পরে বমি করতে করতে দেহ রাখলেন আরও দুইজন। এভাবে কয়েক দিনের মধ্যে ১৯ জন ভিক্ষু প্রাণ হারালেন। অবশিষ্ট রইল আর দুই। দুই বন্ধুপথ চলেন নিঃশব্দে। কেউ কারো মুখের দিকে তাকাতে পারেন না। সোনার অঙ্গ পুড়ে কালি হয়ে গেছে। কাশ্মীরের হাওয়ায় বেড়ে ওঠা শরীরের এই দুর্দশা। শীর্ণ দেহের এই শ্রীহীন দশা আর বন্ধু হারানোর দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে তারা যখন তিব্বতে পৌঁছলেন, তখন দুটি কঙ্কাল যেন আলোময় তিব্বতে কয়লার মতো চিকচিক করছে।

বিশ্রাম ও সুশ্রুষার পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে পরদিন মহারাজকে সব কথা খুলে বললেন তারা। মহারাজ সব কিছু শুনে বিষণ্ন হলেন। তাঁর প্রাণ কেঁদে উঠল। এ অভাবনীয় ক্ষতি কিছুতেই পূরণ হবার নয়। মহারাজের দু’চোখে এখন শুধুই অন্ধকার। তিনি দেশে বৌদ্ধ ধর্মের দুর্দিন দেখছেন। তার চোখের সামনে হারিয়ে গেলো সব স্বপ্ন। মহারাজের দুঃখ-ভারাক্রান্ত মুখ দেখে প্রত্যাগত দুজন ভিক্ষু এই বলে তাকে আশ্বস্ত করলেন যে বাঙালি বন্ধু এবং বিহারের গুরুজীর মুখে তারা অতীশ দীপঙ্কর শধীজ্ঞান নামক একজন জগৎবিখ্যাত পণ্ডিতের কথা শুনেছেন। তিনি এখন বিক্রমশীল মহাবিহারে অবস্থান করছেন। তাকে নিজ দেশে নিয়ে আসতে পারলেই মহারাজের স্বপ্ন সফল হবে। মহাচার্য দীপঙ্করের নাম শুনেই মহারাজ যে-শে-ও যেন আশার আলো দেখতে পেলেন। সাক্ষাৎ সত্য সূর্যকে এদেশে নিয়ে আসতে পারলেই সকল অন্ধকার কাটিয়ে পৃথিবীকে আলো দেখাবে তিব্বত। বুদ্ধবাণীর জয়রথ ছড়িয়ে পড়বে দুনিয়াব্যাপী। মহারাজ তখন ভাবতে লাগলেন কী উপায়ে মহামতিকে এদেশে নিয়ে আসা যায়। মহারাজ অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগলেন। মন্ত্রণাসভা ডাকলেন।

চলবে…