চন্দ্রগর্ভ

।। আমিরুল ইসলাম কনক ।।

আশাভঙ্গ

কুমার সত্যকান্ত এবং উদয়াচল মালিনীর ঘরে বাস করে। কখনো নগর ঘুরতে বের হয়। কখনো মন্দির ঘুরে দেখে। কখনো বাগানে হাঁটতে হাঁটতে চিন্তা করে, কী করে রাজকন্যা পদ্মাবতীর সাথে যোগাযোগ করা যায়। একদিন নগর ঘুরতে গিয়েই তারা জানতে পারলো যে কুমার চন্দ্রগর্ভ তথা সাধক আচার্য, অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান নামক জ্ঞান তাপস মোহমুক্তির নেশায় বিহার থেকে বিহারে ঘুরছেন। কর্ণপুরের রাজা তাকে নিজ রাজ্যে আমন্ত্রণ জানালেও তিনি বিনয়ের সঙ্গে সময়াভাবে তাতে সাড়া না দিয়ে তীর্থে তীর্থে মানুষের মাঝে অহিংসার বাণী প্রচার কাজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

একদিন নগর প্রদক্ষিণ করতে করতে একদম বাইরে চলে এসেছেন দুই বন্ধু। পাশে ঘন ঝোপঘেরা একটি বাড়ি। বাড়ির অভ্যন্তরে যত্রতত্র পড়ে আছে অসমাপ্ত মূর্তি, কাঠামো, গাছের ডাল, ধাতব খণ্ড, ধাতুগলানোর পাত্র, চুল্লি, পা থরের চাঙর, হাতুড়ি, ছেনি, করাত, কুঠার, মাটির স্তূপ এবং শিল্প তৈরির নানাবিধ উপকরণ। মূর্তিগুলোর কোনোটি অর্ধনির্মিত, কোনোটি রঙ করা হয়নি, কোনোটি পরিপূর্ণ। একজন মাঝ-বয়সী শিল্পী নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। নাম প্রদোষ গুপ্ত কিংকর। কোনো কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ করার সময়টিও নেই যেন তার। একটি চৌপায়ার ওপর কাঁসার জলপাত্র, গোটা দুই মাটির সানকি, কাঠের বারকোশ, রঙের হাঁড়ি, অনেকগুলো তুলি ব্যতীত আর তেমন কোনো উপকরণ চোখে পড়ে না। নিস্তব্ধ বাড়িতে দ্বিতীয় কোনো জন মনিষ্যির দেখাও মেলে না।

এ অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর পোড়ামাটি শিল্পের ধারাবাহিকতা এখনো লক্ষ্য করা যায়। মৌর্য সম্রাট মহামতি অশোকের যুগের খোদাই কর্মের ধারাবাহিকতার চিহ্নও কোনো কোনো শিল্পীর কাজের মাঝে পাওয়া যায়। মাঝবয়সী এই শিল্পী দীর্ঘদিন চুনারে অবস্থান করেছিলেন এবং তিনি অশোকের প্রতিষ্ঠিত শিল্পশালাও নিজ চোখে দেখেছিলেন। কবে অশোকের যুগ পেরিয়ে গেছে, কিন্তু হাজারো বছরের পুরনো সেই স্মৃতি থেকে প্রেরণা নিতে তিনি মাঝে-মধ্যেই বিহারের পাটালীপুত্র ভ্রমণে যান।

বাংলা অঞ্চলে যারা খ্রিস্টীয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দীর শিল্পধারাকে অক্ষুণ্ন রেখেছেন তাদের মধ্যে এই শিল্পী প্রধান স্থানীয়। গঙ্গা-যমুনার অন্যান্য ধারার মতো বরেন্দ্রী শিল্পধারাও এখানে সমান্তরাল গতিতে এগিয়ে চলেছে। গাঙ্গেয় উপত্যকার উচ্চ এবং নিম্ন এলাকার শিল্পকর্মে নারী দেহসৌষ্ঠবের আকৃতি নিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষার যেন রীতিমত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। তাছাড়া খোদাই চিত্রের বিকাশ এখানে তুলনামূলক কম লক্ষ্য করা গেলেও উত্তর ভারতীয় রীতির প্রভাব খুব বেশি। তুলনামূলকভাবে পরে এখানে খোদাই শিল্পচর্চা শুরু হয়েছিল। তাছাড়া এই শিল্পী কাঠ এবং হাড়ের ওপর খোদাইয়ের চর্চাও রপ্ত করেছেন। সংগৃহীত বেশ কিছু শিল্পকর্ম দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়।

উদয়: বন্ধু, লক্ষ্য করেছো, ভাষ্কর্যটিতে পোশাক ও অলষ্কারের সমন্বয়? প্রতিটি মূর্তিই শুধু সৌন্দর্য বিকাশের মাধ্যমে আকর্ষণীয়ই হয়ে ওঠেনি, অধিকন্তু তাদের দেহবল্লরীকেও কত নিখুঁতভাবেই না ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মানবদেহের মূল আকৃতি এখানে এতটাই অটুট রয়েছে যে দেহের নানা অঙ্গের নিজ নিজ ভঙ্গির তুলনায় পোশাক ও অলষ্কার কিছুতেই মুখ্য হয়ে ওঠেনি।

সত্য: হ্যাঁ বন্ধু, তুমি কি আরও লক্ষ্য করেছো, এই শিল্পী জীবন্ত মানবমূর্তির পাশাপাশি প্রকৃতির উপাদানকে শিল্পের বিষয় এবং আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মানবমূর্তির এই সৌন্দর্য যেন লতা ও পদ্ম মৃণালের যোগে অধিক শোভামণ্ডিত হয়ে উঠেছে। 

উদয়: এই শিল্পীর কাজের একটি দিক লক্ষণীয়, প্রকৃতিই তার সৌন্দর্য চর্চার একমাত্র অনুষঙ্গ। নানা ধরনের তরু-লতা এবং পশু-পাখির অংশবিশেষ থেকে আহৃত সৌন্দর্যকে উপমা করে মানব শরীরের নানা আঙ্গিক উপস্থাপনই তার শিল্পচর্চার প্রধান বিষয়। এখানে লক্ষণীয় যে নারী মূর্তিগুলির মুখ ডিম্বাকৃতির, ধনুকের ন্যায় কপাল, ভ্রুযুগল ঠিক যেন কচি নিমপাতা। আর চোখ দুটোকে মনে হচ্ছে যেন পদ্মফুল। পদ্ম পাপড়ির ন্যায় ঘিরে আছে চোখের পাতাগুলো। খঞ্জনা পাখির ন্যায় তার চাহনি, বুকটা যেন হরিণ শাবকের হৃদয় দিয়ে গঠিত। ঠিক যেন তোমার পদ্মাবতীর মতো।

পদ্মাবতীর কথা স্মরণে সত্যকান্ত কিছুটা সলাজ অস্থিরতা বোধ করলো। আড়ষ্টতায় শিল্প-সৌন্দর্য দেখার মনোযোগ তার উবে গেলো।

বাধ্য হয়ে উদয়াচল এবার পদ্মাবতী বন্দনা শুরু করলো।

উদয়: তোমার পদ্মাবতীরও নাক তিল ফুলের মতো, অধরোষ্ঠ সদ্য পাঁকা লাল তেলাকুচা ফলের মতো, স্তনজোড়া ঠিক যেন বিক্রমশীল বিহার চূড়া, কোমর ক্রমশ ক্ষীণ, অনেকটা ধোপিনীদের কাপড় ধোওয়ার কাঠের পিঁড়ি যেমনটি পুকুরঘাটে ঠেস দিয়ে রাখা হয়, কাঁধ গজতুণ্ডের ন্যায়, দুই বাহু এবং ঊরু ঠিক যেন কলাগাছের গুড়ি। মাথার কেশরাজি যেন মেঘালয় পর্বতশ্রেণি। যখন তারা কাঁধের ওপর ঢেউ খেলে যায়, ঠিক মনে হয় যেনবা কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর দিয়ে মেঘেরা লুটোপুটি খেয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে।

পদ্মাবতীর এমন বর্ণনা শুনে সত্যকান্তকে চঞ্চল দেখালো, কিছুতেই স্থির রাখা যায় না তাকে। দুই কুমারকেই অতি দ্রুত শিল্পী গৃহত্যাগ করে মালিনীগৃহে ফিরে আসতে হলো। আজ একটা উপায় বের করতেই হবে। মালিনীর মাধ্যমে রাজকন্যার সাথে যোগাযোগ করতেই হবে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো, দুপুর গড়িয়ে বিকেল। মালিনী এখনও আসেননি। প্রতীক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে সত্যকান্ত অধৈর্য। মালিনীকে আজ সবিনয় অনুরোধ করবে। আজ সবকিছু খুলে না বলা পর্যন্ত অন্ন স্পর্শ করবে না বলে প্রতিজ্ঞা সত্যকান্তের। অনেক বুঝিয়ে উদয়াচল আশ্বস্ত করলো যে পদ্মাবতীর সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা আজই হবে। যেকোনো উপায়েই হোক না কেন তার কথা পদ্মাবতীর কাছে পৌঁছনো হবে। কুমারের ভালোবাসার কথা পদ্মাবতীকে অবহিত না করা পর্যন্ত উদয়াচলও অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগলো।

সন্ধ্যার কিছু আগে মালিনী ঘরে ফিরলেন। রাজকুমারীর জন্য বেছে বেছে ফুলের মালা গাঁথলেন। কুমার সত্যকান্তের পছন্দের বেশকিছু ফুলের মালাও গাঁথা হলো। আজকের ফুলসাজি অসাধারণ এবং দৃষ্টিনন্দিত। বাগানের সেরা পুষ্পরাজিই সংগৃহীত হয়েছে। উদয়াচল বিভিন্ন কৌশলে মালিনীকে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। মালিনী কিছুতেই কুমার সত্যকান্তের ভালোলাগার কথা রাজকন্যা রাজ্যশ্রী পদ্মাবতীকে বলতে রাজি নন। এ কথা বলার সাথে সাথেই রাজকন্যা তাকে শাস্তি দিতে পারেন, এমনকি রাজ আদেশে তার মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। তাকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হতে পারে। ওদন্তপুর বিহারপুরীতে অধ্যয়নরত একমাত্র পুত্র জয়দেবকে হত্যা করে তাকে নির্বংশ করা হতে পারে।

এমন অনেক অজানা আশঙ্কাই মালিনীকে তাড়িত করে ফিরছে। উদয়াচলও কম যান না। নাছোরবান্দা সে। মালিনীকে ‘মা’ সম্বোধন করে পুত্র স্নেহের ব্যাকুলতা জাগিয়ে তোলেন তার মনে। সত্যকান্তের পক্ষ থেকে এক হাজার বরেন্দ্রী সোনার কড়ি উপহার দিলেন। মালিনীকে অনুরোধ করলো, ‘তুমি শুধু একটা কথা বলতে পারবে পদ্মাবতীকে? শুধু এ কথাটি বলবে যে, বিগত কয়েকদিন আগে যে দু’টি কুমার দীঘির পাড়ে বসেছিল; তারা আপনার সাথে কথা বলতে চায়।’ বেচারী মালিনী উপরোধে সম্মত হলেন। স্নান ঘরের দিকে যাওয়ার পথে রাজকন্যা পদ্মাবতীকে সে কথাটি বললেন। বেচারী দরিদ্রা মালিনী! একথা শ্রবণ করা মাত্রই পদ্মাবতী তার পা থেকে চটি খুলে বেদম প্রহার করলেন। প্রহার করেই ক্ষান্তি দিলেন না, তার গালে মুখে চুনকালিও মেখে দিলেন। তার গালে রাজকন্যার হাতের দশটি আঙুলের ছাপ স্পষ্টরূপে দেখা দিলো।

পদ্মাবতী: যাও, এই মুখটি তাদেরকে অবশ্যই দেখাবে, কিছুতেই মুছে ফেলবে না। আর কখনো যদি এহেন প্রস্তাব নিয়ে আসো, সেদিন তোমার ভাগ্যে যা ঘটবে, তা আজ আর বলবো না।

মালিনী কাঁদতে কাঁদতে তাদের কাছে গেলেন। বিস্তারিত শোনার পরে সত্য বললো, ‘বন্ধু, তোমার তিনটি কথা সত্য হলো, কিন্তু শেষের কথাটি সত্য হলো না। তার চেয়ে চলো, আমরা এদেশ ছেড়ে নিজ দেশে চলে যাই।’

উদয় বললো, ‘বন্ধু, সবুরে মেওয়া ফলে। আর ঠিক দশদিন পরে আমরা দেখা করবো।’

এক, দুই, তিন করে এক সপ্তাহ কেটে গেলো। রাজকুমার সত্যকান্তের আর তর সইছে না। তার চিত্ত বড়োই চঞ্চল। খাওয়া নেই, ঘুম নেই। কথাও নেই মুখে। হাসি নেই কোনো। দেখতে দেখতে দশম দিন এলো। উদয়াচল এবার মালিনীর হাত ধরে অনুনয় বিনয় করলো। সেই সাথে সত্যকান্তের পক্ষ থেকে দুই হাজার সোনার কড়ি উপহার দিলো।

সুবর্ণদ্বীপ

কোনো এক সোনালি সকাল। সকলেরই চোখে ভাসছে সুবর্ণ দ্বীপের আলো ঝলমল শোভিত রূপ। সর্বসাকূল্যে ১২৫ জন অনুগামীসহ শ্রীজ্ঞান অতীশ যাত্রা করলেন। সুবর্ণদ্বীপ যেন এক অলকাপুরী। মহাচার্য চন্দ্রকীর্তির সুবর্ণ দ্বীপ। সকালে শিশুদের ঘুম ভাঙে বুদ্ধবাণীর অমৃত সুধা পাবণে। দ্বীপবাসীদের মনে বাণ ডেকেছে আলোকচ্ছটার বিচ্ছুরণে। মানুষের অন্তর থেকে দূর হয়ে গেছে সব অন্ধকার। সবদিকে বুদ্ধবাণীর মধুমাখা স্রোতধারা। কল কল বেগে সে ধারা মানুষের অন্তরকে বিকশিত করছে। সহযাত্রীদের চোখে-মুখে কল্পনায় সুশোভিত সুবর্ণদ্বীপ। সামনে সীমাহীন নীল সাগর। কিছু দূরে তাকালে শুধুই কুয়াশাসম। দিন যায় রাত যায়। দিনের শেষে পশ্চিম আকাশে একটি লাল সূর্য ঝুপ করে ডুবে যায়। সমুদ্রের নীল জলরাশির ওপর লাল রঙের খেলা দেখতে দেখতে রাতের নিস্তব্ধতা এসে গ্রাস করে সবকিছু। পালতোলা নিঃসঙ্গ জাহাজটি তখন একাকী নীরবে এগিয়ে চলে অন্ধকার সমুদ্র সাঁতরে। সন্ধ্যাতারা দীপশিখা হয়ে পথ দেখায় কখনো। কোনো বাতিঘর নেই। এমনকি কোনো ডুবোচর বা দ্বীপও চোখে পড়ে না। দিন অথবা রাতের কোনো লেখাজোখা নেই। সহযাত্রী ভিক্ষুগণ অপেক্ষায় থাকেন আবার কখন পূর্ণচন্দ্র দেখা যাবে? একটি পূর্ণচন্দ্র দেখা দিলে ধারণা করা হয় একটি মাস যেন অতিক্রান্ত হলো।

শ্রীজ্ঞানের কঠোর নির্দেশ ছিল পূর্ণিমার চাঁদ দেখার অপেক্ষায় কেউ যেন সাধনার একটি মুহুর্তও হেলায় না হারায়। এ কারণে শাস্ত্র অধ্যয়ন আর সাধনায় কীভাবে দিনরাত কেটে যেত, তা কেউ বুঝতেই পারতেন না। সমস্ত দিন আলো দান করে অস্তমিত সূর্য নীল সমুদ্রের বুকে লাল থালার ন্যায় যখন মিলিয়ে যেত, তখন শ্রীজ্ঞান ভিক্ষুদেরকে খুব মনোযোগের সাথে তা পর্যবেক্ষণ করতে বলতেন। প্রতিদিনের সূর্যকে সাধনার আদর্শরূপে দেখে ভিক্ষুগণ পঠন-পাঠন করতেন। সমুদ্রের বিশালতা, পরিব্যাপ্তি, প্রাণোচ্ছলতা আর শান্ত রূপের মাঝে জীবনের পরিধি ও অর্থ খুঁজে যেন মানব জীবনের তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ মহাসমুদ্র রূপই দেখতে পেলেন। সারেঙদের সাথে কথা বলে যখন জানা যেত একটি পূর্ণচন্দ্র দেখা দিয়েছে; তখন নিশ্চিন্ত হওয়া যেত একটি মাস অতিক্রান্ত হলো। এভাবে সমুদ্রের বুকে মোট ১৪টি পূর্ণচন্দ্রের দেখা মিললো। সুদীর্ঘ ১৪টি পূর্ণিমা শেষে জাহাজ গন্তব্যে পৌঁছালো।

বন্দরে বেশকিছু জাহাজের দেখা পাওয়া গেলো। এ সকল জাহাজ সুগন্ধি, মসলা, মূল্যবান পাথর এবং স্বর্ণ নিয়ে বাংলার বন্দরে পৌছে আর লবণ, চিনি, গুড় ও রেশম নিয়ে বন্দর ছাড়ে। বণিকেরা স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে বঙ্গদেশীয় কড়ি নেওয়ার পরিবর্তে দেশীয় কৃষিজাত পণ্য আর কাঁসা পিতলের তৈরি বাসন-কোসন এবং অস্ত্রশস্ত্র নিতেই বেশি পছন্দ করেন।

শ্রীজ্ঞানের খুব মনে পড়ছে দেশের কথা। বঙ্গ জনপদ থেকে দিনে দিনে স্বর্ণমুদ্রার চল যেন উঠেই যাচ্ছে। প্রচলিত রূপা ও তামার মুদ্রার সংখ্যাও দিন দিন কমে আসছে। বিদেশি বণিকদের স্বর্ণমুদ্রার বিপরীতে যে পরিমাণ কৃষিপণ্য দেওয়া হয় তাতে, কৃষকের বড়োই লোকসান হয়। তাছাড়া জাহাজ নির্মাণ শিল্পের যে অগ্রগতি, তাতেও ভাঁটা পড়ার আশস্কা রয়েছে। বিদেশিরা সস্তায় জাহাজ নিয়ে যে স্বর্ণমুদ্রা দেয় তাও তুলনায় অতি সামান্যই। তবে কি মুদ্রা সঙ্কটের কারণেই বহির্বাণিজ্যে পিছিয়ে যাবে বাংলা? বাংলার দ্রাক্ষমা নামক স্বর্ণমুদ্রার মান খুব ভালো নয়। খাত বেশি হওয়ার কারণে তুলনামূলক হারে দাম কমে যাচ্ছে এবং সরবরাহে সঙ্কট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রৌপ্য আমদানির মাত্রাও কমে যাচ্ছে। আজ আর স্বর্ণমুদ্রা বিনিময়ে আগের মতো বণিকদের আগ্রহ দেখা যায় না। তারা কম মূল্যে বেশি পণ্য নিয়ে অধিক মূল্যে কম পণ্য দিতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন। তাছাড়া তাম্রলিপ্তির পতনের পর থেকে সপ্তগ্রাম বন্দরকে ঘিরে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তার অনেকাংশ পূরণ হলেও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বড়ো রকমের পার্থক্য দেখা দিয়েছে। নগরে ছিন্নবস্ত্র পরিহিত দরিদ্র লোকের সংখ্যা এবং পল্লীতে ভাঙা কুটির ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে কী চির উর্বর বঙ্গভূমিতেও কৃষির দুর্দিন সমুপস্থিত হবে একদিন! বরেন্দ্রী বাংলার সমৃদ্ধি ও নাগরিক জীবনের পতন রোধ করা কি অসাধ্য? রাজ সঙ্কট এবং মতভেদের কারণে সকলে মিলে যে পেছন দৌড়; তার শেষ নেই, মানুষের দুর্ভোগেরও শেষ থাকবে না!

বরেন্দ্রী লোকালয়, নগর, কুটিরগুলোতেও ভয়াবহ রূপ চোখে দেখেছেন আচার্য শ্রীজ্ঞান। অভাব। নগরে আজকাল দলছুট দেহজীবী মেয়েদের ভীড় বাড়ছে। কৃষকেরা ফসল চাষের জমি তৈরি করতে যেভাবে বনভূমি পরিষ্কার করছে, হয়তো একদিন বরেন্দ্রভূমিতে বন আর দেখাই যাবে না। চাষের জায়গা বদল করতে করতে সমতলভূমি ছেড়ে তারা যেমন পাহাড় কাটতে শুরু করেছেন, তাতে ভবিষ্যতে হয়তো আর কোনো পাহাড়ের চিহ্নই চোখে পড়বে না এ অঞ্চলে। বঙ্গ ভূখণ্ডের কথা ভাবতে ভাবতে অন্যমনষ্ক হয়ে গেলেন আচার্য শ্রীজ্ঞান অতীশ। পৃথিবীর সবচেয়ে অল্পবয়সী আর উঁচু হিমালয় পর্বতশ্রেণি আমাদের উত্তরের রাজ্যগুলির কোল ঘেঁষে সমস্ত ভূমিজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন। এই হিমালয়ের উপর নির্ভর করে উত্তরখণ্ডের তাপ, চাপ, বায়ুপ্রবাহ এবং দৈনন্দিন অবস্থা। শুধু তাই নয় রাজ্যগুলি যেন নিয়ন্ত্রণও করছে হিমালয়। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, তার অদূরেই ভারত মহাসাগর এবং আরব সাগর।

সীমাহীন নীলাভ সাগরের বুক থেকে জলরাশি বাষ্পের আকারে মেঘ হয়ে আকাশের বুকে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে বাতাসে ভর করে আমাদের জনপদের উপর দিয়ে উত্তরে গিয়ে হিমালয়ে ধাক্কা খায়। ফলে উত্তর খণ্ডের সবগুলো রাজ্যেই প্রচুর বৃষ্টিস্নাত হয়। উত্তরে আসা প্রায় সকল মেঘ হিমালয়ে জমা হয় এবং বরফে রূপ নেয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে যখন সূর্যের তাপ সরাসরি পড়ে, তখন হিমালয়ের বরফ গলতে শুরু করে। বরফ গলা জল তখন নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। পদ্মা, মেঘনা এবং ব্রহ্মপুত্র এই তিনটি প্রধান নদীই বঙ্গভূমি দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে হিমালয়ের বরফ গলা জলস্রোতে প্লাবিত হয়ে যায় সমগ্র জনপদ। ভয়াবহ বন্যায় যখন সবকিছু ডুবে যায়, তখন লোকেদের কুটির ভেঙে পড়ে, নগরজুড়ে নিরন্ন মানুষের ভিড় আর ক্ষুধায় চারিদিকে হাহাকার ধ্বনি শোনা যায়। কিন্তু এই প্লাবন বয়ে আনে পলি। শস্যবতী মৃত্তিকাকে যেন অধিক ঊর্বরা করে। তখন চাষের জন্য জমি নির্বাচনের ধুম পড়ে যায়। অতীশ একবার ভাবলেন হিমালয় বড্ড খেয়ালি; কখনো কখনো যেমন অভিশাপের বন্যায় ভাসিয়ে দেয়, আবার আশীর্বাদের পরশও বুলিয়ে দেয়।

হিমালয় বরেন্দ্র জনপদের জন্য আশীর্বাদ। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ থেকে শুরু করে আষাঢ়-শ্রাবণ, ভাদ্র-আশ্বিন মাস পর্যন্ত মৌসুমী বায়ু দ্বারা বাহিত মেঘমালা হিমালয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়। এর ফলে মাটি স্নিগ্ধ হয়, ঊর্বরা হয়। আর এই আবহাওয়া বরেন্দ্রের মানুষের মনকেও তৈরি করে দেয়। লক্ষ্যে অথবা অলক্ষ্যে এ অঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী যেন হিমালয়। কিছুটা বিচলিত আর আচ্ছন্ন দেখা যায় শ্রীজ্ঞানকে। শিষ্যদের সশব্দ কলহাস্যে তার ধ্যান ভাঙলো। সুদীর্ঘ ১৪ মাসের অপেক্ষার পর সশিষ্যে সুবর্ণ দ্বীপের দ্বার প্রান্তে আজ। এই সেই সুবর্ণদ্বীপ। মহাচার্য চন্দ্রকীর্তি আপন শিষ্যরূপে বরণ করে নিলেন। শ্রীজ্ঞানের বিদ্যাচর্চা শুরু হলো। অসাধারণ পাণ্ডিত্য আর গুণের অধিকারী চন্দ্রকীর্তিকে দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলো শ্রীজ্ঞানের। মহামতি আচার্যও মুগ্ধ হলেন। এ যেন সূর্য সঙ্গম। অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী শ্রীজ্ঞান তৃষ্ণার্তের ন্যায় বিদ্যাভ্যাসে মনোনিবেশ করলেন। আপন বিদ্যার কোনো বাহুল্য না দেখিয়ে মনোযোগী ছাত্রের ন্যায় বুদ্ধ প্রচারিত ধর্মবাণী ও দর্শনের জটিল বিষয়সমূহের শিক্ষায় মনোসংযোগ করলেন। তার মগ্নতা, স্থিরতা, সহজবিশ্লেষণ, অনুসন্ধিৎসা, মিতভাষ, গুরুভক্তি এবং জ্ঞানানুরাগ মুগ্ধ করে আচার্যকে।

শিগগির তার জ্ঞান ভাণ্ডারে সঞ্চিত হলো ‘অভিসময়ালঙ্কার’ এবং ‘বোধিচর্যাবতার’ এর ন্যায় সারবস্তু গ্রন্থমালার আকর জ্ঞানরাজি। মহাচার্যও যেন শিষ্য ভাণ্ডে উজার করে দিলেন অধিগত সকল বিদ্যা। এক যুগব্যাপী ধর্ম-দর্শন চর্চার পাশাপাশি এর সারতত্ত্বকে হৃদয়ঙ্গম করার মানসে যোগাভ্যাস শিক্ষাকে আরও পাকাপোক্ত করে নিলেন। এক যুগের জ্ঞান সাধনায় তার হৃদয়ের প্রতিটি কোষ পরিপূর্ণ। তিনি এ জ্ঞানের প্রতিফলন নিজ মাতৃভূমিতে দেখতে চাইলেন। তিনি বড়ই চঞ্চল হয়ে উঠলেন। এ শিক্ষার বীজ নিজ দেশে বপন করার ইচ্ছায় তিনি গুরুপদে বন্দনা করে বিদায় চাইলেন। মহাচার্য একটিবার শিষ্যের মুখপানে চাইলেন। তারপর মৃদু হেসে শিষ্যের জন্য গর্ব অনুভব করলেন। স্বদেশের অভিমুখে শিষ্যবৃন্দকে নিয়ে পুনরায় যাত্রা করলেন শ্রীজ্ঞান। পুনরায় জাহাজ চলতে শুরু করলো। তার মনে পড়ে গেলো স্বদেশের কথা। অর্জিত জ্ঞানের আলোক আভায় তাকে স্বদেশের পতন রদ করতেই হবে। জাহাজ নোঙর করলো সিংহল দ্বীপে। অনেক দিনের বাসনা ছিল সিংহল আগমনের। এখানেই অনুরাধাপুর, যার মাটি ছুঁয়ে আছে মহামতি বুদ্ধের স্মৃতিস্মারক দন্তধাতব, মহান সম্রাট অশোকের পুত্র-কন্যা অর্হৎ মহেন্দ্র ও সংঘমিত্রার স্মৃতি বিজরিত পদস্পর্শ ধন্য  স্থানসমূহ। পবিত্র স্থানসমূহ দর্শন করে তার অন্তরদেশ প্রশান্তিতে ভরে গেলো। কিছুদিন অবস্থান করার পর পুনরায় স্বদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন।

১০২৩ খ্রিষ্টাব্দ। মগধবাসী তাকে এক নজর দেখার জন্য বড়োই উদগ্রীব। অসাধারণ পাণ্ডিত্য আর অপূর্ব সাধন শক্তির অধিকারী সপ্রতিভ মুখমণ্ডল দর্শন করে মগধবাসী ভক্তি অঞ্জলি নিবেদন করলেন। পাদমূলে অঞ্জলি নিবেদন করলেন মগধের প্রখ্যাত পণ্ডিতকুল। তার গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হলো ‘বজ্রাসন মহাবোধি বিহারে’। সংঘের সর্বোচ্চ উপাধি ‘ধর্মপাল’ বলে অভিহিত করা হলো মহাজ্ঞানাচার্য মহামতি অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানকে। অল্পকালের মধ্যেই তার যশোগাঁথা দেশ দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়লো। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বোধি জ্ঞান লাভের জন্য শিক্ষার্থীরা তার শরণাগত হলেন।

চলবে…