উৎসব মোসাদ্দেক

।। উৎসব মোসাদ্দেক ।।

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) বাংলাদেশে সরকারি মালিকানাধীন একটি কর্পোরেশন, যা চিনি উৎপাদনের দায়িত্বে নিযুক্ত। এটি বাংলাদেশ সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। সরকার কর্তৃক নিয়োজিত ১জন চেয়ারম্যান এবং ৫জন পরিচালক নিয়ে গঠিত বোর্ডের মাধ্যমে করপোরেশনটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে বাংলাদেশ সুগার মিলস করপোরেশন গঠিত হয়। পরে সুগার মিলস করপোরেশন ও বাংলাদেশ ফুড অ্যান্ড অ্যালাইড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন-দুটি একীভূত হয়ে বিএসএফআইসি গঠিত হয়েছে। তখন সংস্থাটির অধীনে ছিল ৭২টি প্রতিষ্ঠান। পরে আরও চারটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়।

তবে বিভিন্ন সময় ৫৯টি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে করপোরেশনের অধীনে ১৫টি চিনিকল, একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা ও তিনটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শ্রমিকদের ভাষ্য অনুয়ায়ী, দীর্ঘমেয়াদি যড়যন্ত্রের ফলে ৬টি চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার শংকা আছে। এরই মধ্যে চিনিকল বন্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলনও শুরু হয়েছে। অবশ্য শিল্পপ্রতিমন্ত্রীর দাবি, কোনও মিল বন্ধের পরিকল্পনা নেই সরকারের। তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, আখ মাড়াই বন্ধ করা হলো কেন? কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হচ্ছে বিপুল লোকসান ঠেকাতে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে! তবে আখচাষীদের টাকা দেয়া হবে। শ্রমিক কর্মচারীদের বকেয়া বেতনও দেয়া হবে। শ্রমিকদের বন্ধ হওয়া চিনিকলের পার্শ্ববর্তী মিলে বদলি করা হবে। আবার ৬০০কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগ করোনার কারনে আটকে আছে। সরকারি ভাষ্য বেশ সুন্দর। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই ছয়টি বন্ধ হলে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য কর্পোরেশনের বেহাত হয়ে বেসরকারি হওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়াবে ৬৫টি।

এরা চারটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলো। তারমানে এক সময় লাভজনক ছিলো। তারপর এমন এক পথে পরিচালনা চলতে থাকে যে একের পর এক প্রতিষ্ঠান বেসরকারি হয়ে যাচ্ছে। বরং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর ঠিক আগ মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় লাভজনক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫০ হলে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারতো। কিন্তু এতো কিছু কি আমাদের “ব্যস্থাপকরা” ভাবার সুযোগ পান? কর্পোরেশন বলছে আধুনিকায়ন করে, পরিশোধনাগার বসিয়ে পুনরায় চালু করা হবে। যদিও এই ভাষ্যে আস্থা নেই এমনকি শ্রমিকদেরও।

২০১৪ সাল থেকে ৮০টাকায় উৎপাদিত চিনি ৪০টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। যখন আপনাদের এই ভীষণ লোকসান শুরু হয়েছে তারপর থেকে ছয়টা অর্থবছরের পর বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু কেন তখনই আর্থিক ক্ষতির কারণ অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়নি? ধারাবাহিকভাবে কেন আপনাদের একটার পর একটা মিল বেসরকারি মালিকানায় চলে যাচ্ছে?

কর্পোরেশন বলছে, দুইটি প্রতিষ্ঠান রিফাইনারি মেশিন বসিয়ে কাঁচা (র) চিনি আমদানি করে অল্প দামে বিক্রি করায় কর্পোরেশনের ডিলাররা চিনি উত্তোলন করছেন না। ফলে কয়েকশ কোটি টাকার চিনি পরে আছে। তো, আপনারা এতোদিন রিফাইনারি ইন্সটলেশন করেন নাই কেন? চিনিকলের ভেতর ডেসটিলেশন প্লান্ট, রিফাইনারি মেশিন কেন বসানো হলো না?

আপনারা বিরাট ঋণ নিয়েছিলেন সরকারের কাছ থেকে। সেই টাকা কী করেছেন? আখ কিনেছেন, শ্রমিকদের বেতন দিয়েছেন, মেশিন মেরামত করেছেন। তো, একটা কারখানা উৎপাদনে থাকলে এইসব খরচ আর ঋণ তো থাকবেই। চিনি বিক্রয়ের অর্থে ঋণ পরিশোধ করেন নাই কেন? কর্পোরেশন আর্থিক ক্ষতি বা অনিয়মের কোনো মূল্যায়ন করেছে? করলে সেটার ফলাফল কী? লোকসানের যে সকল কারণ আপনারা বিভিন্ন সময় মিডিয়ায় বলেছেন তার একটিও সন্তোষজনক না। তথ্যগুলো একখানে করে একটা অনুমান করা যায়, বিপুল দুর্নীতি ও লুটপাটের পর এখন কার্যত মিলের জমি নামকাওয়াস্তে ভাড়া দিচ্ছেন বা বিদেশি মালিকানায় ছেড়ে দিচ্ছেন। শিল্প উন্নয়নের, জাতীয় সক্ষমতা বিকাশে আপনাদের পরিকল্পনা নেই। বাংলাদেশের অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালে এই চিত্র লক্ষ্য করা যায়, যার পোশাকি নাম পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ। মানে জনগনের সম্পদ আপনারা ব্যক্তিমালিকানায় দিয়ে দিচ্ছেন।

শুধু এই ৬টি চিনিকল নয়, কর্পোরেশনের পূর্বের ৫৯টি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকলের ক্ষেত্রেও সত্য। আপনারা যারা দেশে বিপুল বিরাট উন্নয়নের, সামাজিক জীবনমানের উন্নয়নের প্রধান বাধা হিসেবে “মৌলবাদী, ধর্মান্ধ, উগ্র সাম্প্রদায়িকশক্তি, বঙ্গবন্ধুর খুনি জিয়া, তার সেনাপ্রধান ও পরবর্তীতে স্বৈরাচার এরশাদকে প্রধান বাধা” হিসেবে দেখেন তারাও জানেন ‘৯২ পরবর্তী জাতীয় রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলাম, এরশাদকে নিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলই জোট করার চেষ্টা করেছে, সফলও হয়েছে। তারচেয়ে বড় বিষয় জিয়া থেকে শেখ হাসিনা সকল সরকারের সময় প্রচুর সরকারি প্রতিষ্ঠান দলীয় ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। এর সাথে মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার নিবিড় সম্পর্ক আছে। উক্ত রাজনৈতিক দলগুলো শুধু ক্ষমতার লোভে “পাকিস্তানি” ধারাবাহিকতার সামরিক  বেসামরিক আমলাতন্ত্র, বিচারবিভাগ, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গড়ে তুলতে দেয়নি। সংবাদমাধ্যম দেশে শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি। আমাদের বুদ্ধিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মহিরুহ হতে পারেনি, শাসকদের ইচ্ছায় “বনসাইয়ে” পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ ন্যূনতম জবাবদিহিতার বালাই নাই। নাগরিকের কথা বলার, চলাফেরার স্বাধীনতা নাই। ফলে রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাত থেকে আমলাতন্ত্রের, ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদদের হাতে চলে গেছে। তাই প্রবীন রাজনীতিবদরা মন্ত্রণালয়ে, দলে ব্রাত্য। ফলে জনগণও নেতৃত্বশূন্য হয়ে পরেছেন। চিন্তাশূন্য হয়ে পরেছেন। জনগণ নেতৃত্বশূন্য, আর্থিক ও জীবনের নিরাপত্তাহীনতার ভুগতে থাকলে রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। সামাজিক সংহতি নষ্ট হয়। কীভাবে হয় সেই উদাহরণ খুঁজতে বেশি পেছনে ফিরে যেতে হবে না। লালমনিরহাটের পাটগ্রামে দেখা গেলো ইউনিয়নের সর্বোচ্চ নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা “উত্তেজিতজনতার” হাত থেকে একজন মানুষকে রক্ষা করতে পারলেন না। এটাকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা না করে, শুধু “ধর্মের“ সমস্যা, উস্কানি হিসেবে বিবেচনা করলে শুধু আমাদের নয়, এই রক্তের বিনিময়ে পাওয়া রাষ্ট্রেরও ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পরবে।

অথচ এইসব নিয়ে, পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ কনসার্ন বলে তাদের কর্মকাণ্ডে প্রতীয়মান হয় না। বিজয়ের মাসেই, ১১মাসের বেতনের দাবির আন্দোলনে দমন-পীড়ন চালিয়েছে পুলিশ-সরকার-রাষ্ট্র। এই নাতিদীর্ঘ আলোচনার পর এই রাষ্ট্রের কাঠামো, পরিচালনা পদ্ধতি যে এখনও জনমুখী হয়নি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বরং আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানীর কাছে স্বাধীনতার অর্থ ছিলো রাষ্ট্রকে জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং সমাজের বৈষম্য দূর করা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের বিভিন্ন ভাষণও সেই একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে আসে। অথচ তাদের সেইসব কথা ও কর্ম ফেলে রেখে আজ আমরা কোন পথে চলেছি? এই পথ কি মুক্তিযুদ্ধের পথ? অবশ্যই না। আজ স্বাধীনতার ৫০ বছরের মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের সেই পথযাত্রার উপায় খুঁজতে হবে। তবেই মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

উৎসব মোসাদ্দেক একজন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মী

Berger Weather Coat