।। ঘরে বাইরে ডেস্ক ।।

‘পুন্ড্র’ জনপদের অন্যতম প্রাচীন জনপদ হিসেবে ঠাকুরমান্দার ঐতিহাসিক পরিচিতি রয়েছে। পাল আমলের বিভিন্ন প্রত্ন নিদর্শন এই জনপদ থেকে আবিস্কৃত হয়। বরেন্দ্র জাদুঘরে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে ওইসব সম্পদ। জনপদটিতে রয়েছে হিন্দু তীর্থের প্রাচীন রঘুনাথ জিউ মন্দির। মন্দিরটিকে ঘিরে প্রতিবছর চৈত্র মাসে রাম নবমীর মেলা বসে। তখন ৯ দিন ব্যাপী হিন্দু পুণ্যার্থীসহ লাখো মানুষের ঢল নামে এই জনপদে। জনপদটি নওগাঁর মান্দা উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক। প্রাচীন এই জনপদের নামেই মান্দা উপজেলার নাম পরিচয় হয়। ইংরেজ আমলে মান্দা থানা পুলিশ স্টেশনও ছিল এখানেই।

ভৌগোলিক অবস্থান: মান্দা উপজেলা সদর প্রসাদপুর থেকে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ঐতিহাসিক ঠাকুরমান্দা জনপদ। আত্রাই নদীর অন্যতম শাখা শিবনদ ও বিলমান্দার পশ্চিম তীরে জনপদটির অবস্থান। বর্ষাকালে শিবনদের পূর্ব তীরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে দাঁড়ালে জনপদটি অথৈ পানিতে ভাসা একটি দ্বীপ বলে মনে হয়। জনপদটি নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে, নওগাঁ জেলা শহর থেকে ৪০ ও রাজশাহী থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ‘রাজখাড়া’ জমিদারি স্টেটের কাচারি বাড়ির ভগ্নাবশেষ এখনো কালের সাক্ষী হয়ে আছে রঘুনাথ মন্দিরের পাশে।

রঘুনাথ মন্দিরের নির্মাণকাল নির্মাতা: ইতিহাসবিদদের তথ্যমতে ১৭৮০ সালে নাটোরের রাণী ভবানী মন্দিরটি নির্মাণ করেন। জনপদটি নবাব আমলে স্বাধীন বঙ্গ জনপদের অন্তর্গত ছিল। দিনাজপুরের রাজা উদয় নারায়ন এ অঞ্চলের করদ রাজা ছিলেন। কিন্তু কর না দিলে রাজা উদয় নারায়নের সঙ্গে নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ যুদ্ধে লিপ্ত হন। যুদ্ধে উদয় নারায়ন পরাজিত হন। মুর্শিদ কুলি খাঁ অঞ্চলটি মুক্ত করে রাণী ভবানীর হাতে তুলে দেন। রাণী ভবানী অনেকবার এই জনপদে আসেন বলেও ইতিহাসবিদরা দাবি করেন। হিন্দু তীর্থের ঠাকুরমান্দাতে তিনিই নির্মাণ করেছিলেন রঘুনাথ মন্দিরটি। শাহী স্থাপত্য শিল্পের অন্যতম নিদর্শন কুসুম্বা মসজিদ থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে স্থাপিত এই মন্দির।

মন্দিরকে ঘিরে কিংবদন্তি: কিংবদন্তি আছে, মান্দার বিল খননের সময় পাওয়া গিয়েছিল রাম, লক্ষণ, সীতা ও রামভক্ত হনুমানের বিগ্রহ। প্রাপ্ত বিগ্রহ স্থাপন করে পুজা-অর্চনা শুরু করা হয়েছিল। কথিত আছে জনপদটিতে বাস করতেন দরিদ্র এক অন্ধ ব্রাহ্মণ। তিনি রামভক্ত ছিলেন। তিনি বিলে স্নান করতে নামলে কাঠের বিগ্রহগুলো ভাসতে ভাসতে তার শরীরে স্পর্শ করে। তিনি প্রণাম করে মূর্তিগুলো মাথায় ও কোলে নিয়ে বাড়ি ফেরেন। পরে সেগুলো বাড়িতে স্থাপন করে তিনিই প্রথম পূজা করেন। প্রতিদিন তিনবার করে পূজা করতেন তিনি। পূজাকালে একদিন হঠাৎ করেই দৃষ্টি ফিরে পান। তার সংসারে স্বচ্ছলতাও ফিরে আসে। তখন থেকেই এই রঘুনাথ বিগ্রহের অলৌকিত্বের কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বাড়তে থাকে ভক্তদের ভিড়।

এক পর্যায়ে এ কথা পৌঁছে নাটোরের রাণী ভবানীর কানে। তিনি ঠাকুরমান্দায় পৌঁছে মন্দিরের জীর্ণতা দেখে নিজেই মন্দির তৈরি করে দেন। সেই প্রাচীনকাল থেকে আজো মন্দিরটির এই অলৌকিকত্বে বিশ্বাস করে হিন্দু তথা অন্যান্য সম্প্রদায়ের অনেকেই। প্রতিবছর রাম নবমী পূজার দিনে জন্মান্ধ শিশুদের আনা হয় এখানে। হিন্দু সম্প্রদায় ছাড়াও অন্য সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ তাদের প্রতিবন্ধী সন্তানদের নিয়ে আসেন এই মন্দিরে। মানত করেন তাঁরা। কিংবদন্তি রয়েছে, প্রতিবন্ধীরা ভালো হয়ে ফিরেন এই রামমন্দির থেকে। অনেকে স্বর্ণের চোখসহ নানা রকম ভোগ দান করেন। যারা দৃষ্টি ফিরে পান, কথিত আছে তারা প্রতিবছরই আসেন মানত করতে।

প্রাচীন এই মন্দিরে ‘মানদা দেবী’ নামে এক সেবায়েত ছিলেন বলেও শোনা যায়। তাকে নিয়েও রয়েছে কিংবদন্তির কথা। জানা যায়, মানদা দেবী কোনো দৃষ্টি প্রতিবন্ধীকে স্পর্শ করলে তিনি দৃষ্টি ফিরে পেতেন। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, কিংবদন্তির এই ‘মানদা’ দেবীর নামেই এই জনপদের নাম ‘মান্দা’ হয়ে থাকতে পারে। তবে ‘মান্দা জনপদ’ হিসেবে জনপদটি পরিচিত হলেও বাস্তবে এখানে মান্দা নামে কোনো গ্রাম বা মৌজা নেই।

মন্দিরের ধর্মানুষ্ঠান: প্রতিবছর চৈত্র মাসে রামের জন্ম তিথিতে মন্দিরে বিশেষ পূজা-অর্চনার আয়োজন করা হয়ে থাকে। ৯ দিন ধরে চলে এ পূজা-অর্চনা। তখন সারাদেশ এমনকি ভারত থেকেও আসেন হিন্দু পুণ্যার্থীরা। গঙ্গাস্নান করে তারা পূজা দেন। সকল ধর্ম-বর্ণের লাখো মানুষের ঢল নামে এ উৎসবকে ঘিরে।

পুণ্যার্থীরা একসময় মন্দিরের চারপাশের বিল ও শিব নদীতে গঙ্গাস্নান করে ভেজা কাপড়ে বিল থেকে পদ্মপাতা তুলে মাথায় দিয়ে মন্দিরে যেত ঠাকুর দর্শন করতে। ভক্তরা আজো সেই রীতি-নীতি মানতে চান। কিন্তু চৈত্রের নদী ও বিলে এখন আর পানি থাকে না। তাই মন্দির সংলগ্ন পুকুরে স্নান করে ভেজা কাপড়ে পূজা দিয়ে থাকেন। কেউ কেউ আবার দুর্লভ পদ্মপাতা সংগ্রহ করে তা মাথায় দিয়ে তার ওপর মাটির পাতিল বোঝাই ভোগের মিষ্টান্ন নিয়ে দীর্ঘ লাইন ধরে প্রভুর চরণে নিবেদন করে থাকেন। অনেকে সপ্তাব্যাপী মন্দিরের পাশের মাঠে তাঁবু গেড়েও অবস্থান করেন। অনেকে থাকেন ৯ দিন ধরে। ভক্তবৃন্দের ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে রাতে পদাবলি কীর্তনেরও আসর বসানো হয়।

মন্দিরটিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রাম নবমীর উৎসব অঞ্চলের বাসিন্দাদের সার্বজনীন উৎসব হয়ে উঠেছে।