নুসরাত নুসিন

।। নুসরাত নুসিন ।।

এতকাল গেল, বৈষম্য তবু দূর হলো না। মানুষকে মানুষ হিসেবে একসূত্রে গাঁথা গেল না। পুরুষ আরো বেশি পুরুষ হয়ে উঠলো, নারী আরো বেশি নারী হয়ে বাঁচল। নারী ও পুরুষের ব্যবধান অটুট রইল। পুরাতন অভ্যাস ও ধ্যানধারণা থেকে নারীকে মুক্তি দেয়া গেল না। সমাজে পুরুষের ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি একরকম, নারীর ক্ষেত্রে আরেকরকম। পৃথক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কোনো একক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করা গেল না। এখন কথা হচ্ছে, এই আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে কারা? কেন?

‘কেউটে সাপের ঝাপি’ এই শব্দবন্ধনীটি সিকানদার আবু জাফরের ‘বাংলা ছাড়’ কাব্য থেকে নিয়েছি। কবিতাটি অনেকের পড়া। তবু সারমর্ম বলি, স্বাধীনতার বিপক্ষে একদল আছেন, যারা সুযোগ পেলেই বিরোধীতা করে বসেন। বিষ উদগীরণ করতে থাকেন। কবি শেষমেষ তাদের বাংলা ছাড়তে বলেছেন। কবিতাটির কয়েকটি লাইন আমার খুব প্রিয়। লাইনগুলো যেকোনো শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের প্রিয় হওয়ার কথা।

”রক্তচোখের আগুন মেখে ঝলসে যাওয়া আমার বছরগুলো
আজকে যখন হাতের মুঠোয় কণ্ঠনালীর খুন পিয়াসী ছুরি
কাজ কি তবে বুকের কাছে আগলে রেখে কেউটে সাপের ঝাপি
আমার হাতেই নিলাম আমার নির্ভরতার চাবি
তুমি আমার আকাশ থেকে সরাও তোমার ছায়া”

এই লেখাটি রাজশাহীর সার্কিট হাউজের সামনের রাস্তায় বন্ধুর সঙ্গে বসে তরুণীর ধূমপান ও কতিপয় লোকের বাধাদান—এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখা। তবু লেখাটি শুধু ধূমপান নিয়ে থাকবে না, লেখাটি ধূমপানকে কেন্দ্র করে সমস্যার আরো গহ্বরে ঢুকতে চাইবে, বাধাদানকারী ওইসব সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানসিকতাকে বুঝতে চাইবে, নারী ও পুরুষ উভয় প্রসঙ্গেই কেন একইরকম দৃষ্টিভঙ্গি নয়—তা নিয়ে ভাবতে চাইবে। একটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর, থেমে যাওয়ার পরও যা বাকি থাকে, তাহলো কতকগুলো প্রশ্ন। এই প্রশ্নরাই আরো প্রশ্নের দিকে, ভাবনার দিকে, গভীরে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

নারীর কোনো একটি সমস্যা নিয়ে ভাবতে গিয়ে দেখা যায়, আরো অসংখ্য সমস্যা সুতানালি সাপের মত ছড়িয়ে রয়েছে গভীরে। কিছু সমস্যা আছে যেগুলো দেখা যায়। বোঝা যায়, অনুভব করা যায়। কিন্তু আরো সমস্যা আছে। যেগুলো দেখা যায় না। সহজে বোঝা যায় না। সমস্যার সেইসব অদৃশ্য ভয়াবহতাকে আমরা বুঝতে পারি না।
কিছুদিন আগে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক তরুণী তার বন্ধুসহ ধূমপান করলে, একদল লোক মেয়েটিকে ধূমপান করতে নিষেধ করে। “আপনি মেয়ে বলেই আপনাকে নিষেধ করছি” বলতে শোনা যায়। মেয়েটিকে সেখান থেকে উঠে যেতে বাধ্য করা হয় এই বলে, তার কারণে পাড়ার মেয়েরা নষ্ট হয়ে যেতে পারে!

আমি কয়েকদিন ধরে ভাবছি, জনসম্মুখে অপমানিত ওই তরুণীর মানসিক অবস্থার কথা। তার দারুণভাবে অপমানিত হওয়ার পরের অবস্থা নিয়ে। দারুণভাবে অপমানিত কারণ একটি মেয়েকে যখন জনসম্মুখে খারাপ বলে সাব্যস্ত করা হয় এবং বলা হয়, তোমার কারণে আর মেয়েরা নষ্ট হয়ে যেতে পারে তখন সে চিহ্নিত হয়ে যায় খারাপ মেয়ের প্রতিনিধিত্বকারী বা প্রতীক হিসেবে। ভাবছি, এখন মেয়েটি সারাজীবন এই অপমানের পাথরভার কীভাবে বহন করবে! আমি বলছি না, মেয়েটি এ আঘাত সামলে নিতে পারবে না। অবশ্যই পারবে। কেননা সে সাহসী ও স্বাভাবিক। সাহসী ও স্বাভাবিক এই কারণে, যে সে জেনে গেছে বৈষম্য কী এবং এই সমাজ কীভাবে তা ধারণ করে। সেখানে সে কী-রূপে নিজেকে ব্যালান্স করবে, কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করবে, সর্বোপরি এইসব ট্যাবু ভাঙার জন্য যে সবার আগে তাকে স্বাভাবিক থাকতে হবে—সেটা মেয়েটি দেখাতে পেরেছিল। মেয়েটির কথা বলা, পোশাক, প্রকাশ—সবই তার ভদ্রতাকেই প্রকাশ করেছে।

এখন বলা যাক, সিগারেট কী? এটি খেলে কী হয়? সিগারেট কোনো ঐশী বা ধর্মপ্রদত্ত মহামূল্যবান বস্তু কি না? অস্পৃশ্য বা গোপন কোনো বিষয় কি না? যা দেখা বা স্পর্শ করা মহাপাপ? এর কোনোটাই না। সিগারেট হলো নিকোটিনে ভরা সাধারণ কাগজে মোড়ানো বস্তু। যেটা দীর্ঘদিন খেলে শরীরের ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা ক্যান্সার হয়। পুরুষ ও নারী উভয়েরই হতে পারে। আবার প্রতিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। তবু লোকে খায়। পুরুষেরা যেমন খান, নারীরাও খান। প্রাচীনকাল থেকেই নারীদের তামাক, বিড়ি খাওয়ার ইতিহাস মেলে। সব পুরুষ যেমন ধূমপান করেন না, তেমনি সব নারীও নয়। কিন্তু বিড়ি বা সিগারেট এ সমাজের খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য। সমাজে যে দৃশ্য ঘরে-বাইরে বেশি চোখে পড়বে, তাহলো ধূমপানের চিত্র। তারপরও, এটা কেউ খেলে তার প্রতি খুব অস্বাভাবিক দৃষ্টি দিয়ে তাকাচ্ছি কেন? নারীর ধূমপানকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখছি না কেন?

ধূমপানের মত এরকম একটি স্বাভাবিক ও ক্ষুদ্র কারণে একটি মেয়েকে খারাপ বলে চিহ্নিত করা এবং তার কারণে আরো অনেকে খারাপ হতে পারে, এই মন্তব্য খুবই অন্যায় ও উদ্দেশ্যমূলক। কেন উদ্দেশ্যমূলক তা খুলে বলা দরকার। এজন্য আমাদের সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওর জনতার বাক্যগুলির দিকে নজর দিতে হবে, একটু উল্টে দিতে হবে। মেয়েটি খারাপ, কারণ মেয়েটি প্রথা ভেঙেছে। প্রথা ভাঙছে মানে মেয়েটি এগিয়ে যাবে। মেয়েটি এগিয়ে গেলে আরো মেয়ের জন্য সে আদর্শ হবে। এভাবে সমাজে মেয়েরা এগিয়ে গেলে, পরিবারে ও বাইরে বাধাদানকারীরা তাদের কর্তৃত্ব হারাবে। ফলে মেয়েদের কতিপয় আচরণ বা লক্ষণ একপক্ষের কাছে ভয়ের কারণ হয়ে ওঠে। ভয় পায় কারণ, ওইসব মেয়ে ক্ষমতার সাইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

ফলে মেয়েটির জোর গতিতে হেঁটে যাওয়া, জিন্স পরা, ওড়না না নেয়া, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, বন্ধু থাকা—সবই নিন্দা ও ভ্রুকুটির কারণ হয়ে ওঠে। অথচ এ সমস্তই স্বাভাবিক প্রকাশ। খুবই স্বাভাবিক বিষয়। এই স্বাভাবিক ও ক্ষুদ্র বিষয়গুলোকেই আমরা অনেক বৃহৎ করে তুলি। এগিয়ে যাওয়ার জন্য যে যৌথ সহযোগিতা ও বোঝাপড়া দরকার তা থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করি। সমালোচনা করি। এড়িয়ে যেতে বা উপেক্ষা করতে চেষ্টা করি।

এখন এই মেয়েটির দিকে আগবাড়িয়ে তেড়ে গেল যারা, তারা বুঝতেই পারলো না, এই আগবাড়িয়ে তেড়ে যাওয়া, গালিগালাজ, হুমকি-ধামকির মত অসৌজন্য পরিস্থিতি তৈরি করাটা একটা চূড়ান্ত অভদ্রতা। মেয়েটি যে পিতৃতন্ত্রের চূড়ান্ত অভদ্রতার শিকার, তা মেয়েটির চোখের অসহায়ত্বের দিকে একটু তাকালেই বোঝা যায়। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সমাজে একটি পক্ষ সামাজিক মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে কোথাও কোথাও এই অভদ্রতা আর সহিংসতাকেই ধারণ করে। এটা ধারণ করে তারা মগজে। একটি মেয়ে যে ওড়না পরেনি, তো কি হয়েছে—তার দিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে হবে কেন? রিকশায় হুড তুলেনি বলে বিশেষভাবে লক্ষ্য করতে হবে কেন? মেয়েটি বন্ধুর সঙ্গে বসে ধূমপান করছে বলেই তেড়ে যেতে হবে কেন? সবটাই আসলে দুঃখজনক! অভদ্রতা! একটা স্বাভাবিক বিষয়কে অস্বাভাবিক করে দেখা। মগজে এইরকম বিভেদ আর সহিংসতা থাকলে সমাজের কোথায় সংগতি আর শান্তি থাকে, তা নিয়ে প্রশ্ন আসে।

সমস্যা আসলে অনেক। বাধা অনেক। বাধা যে কত প্রকার ও কত গভীরে তার সীমানা তা ভুক্তভোগীরাই জানে। সবচেয়ে দূরের মানুষটি থেকে সবচেয়ে কাছের মানুষটিও চেতনে-অবচেতনে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। কারো কারো ধরনটা ভিন্ন। কখনো ভালোবাসা আর ভালোর নামে ছুরি চালিয়ে দেয় মনে। আমরা বুঝতেও চাই না, এই ভালো, ভালো হচ্ছে কি না! এই মোড়লিপনা মেয়েটির আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে যাচ্ছে কি না। কিংবা মেয়েটি সত্যিই এসব চায় কি না। যদি কাউকে ভিতর থেকে বুঝতে না চাই, তাহলে বলবো, কিসে মেয়েটির ভালো, কিসে মন্দ তা নির্ধারণ করার যোগ্যতা সে নিজেই অর্জন করুক। কোনো মোড়লগিরি, আগবাড়িয়ে তাকে বিরক্ত করা কেন? জীবন যার, সেই সবচেয়ে ভালো বোঝে, কিসে তার ভালো, আনন্দ, মন্দ।

এই যে সহিংস ঘটনাটি মেয়েটির সঙ্গে ঘটলো, সে সাহসী বলে কি তার ভেতরে এর কোনো প্রভাব পড়বে না? অবশ্যই পড়বে। খুব নৃশংসভাবেই পড়বে। প্রথমত, সমাজের বিদ্যমান মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষগুলোকে সে ভুল চোখে দেখবে, শত্রু হিসেবে দেখবে, সুবিধাভোগকারী, অন্যায়কারী, কুসংস্কারান্ধ ও মুর্খ হিসেবে জানবে। দ্বিতীয়ত, তার ভিতরে ভয় তৈরি হবে। সংশয় ও অনিরাপত্তাবোধ তৈরি হবে। যেহেতু তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রেমিক কিংবা স্বামীটি ওই সামাজিক মূল্যবোধেরই অংশ, ফলে সে সবসময়ই সংশয় ও অনিরাপত্তাবোধে ভুগবে।

ভিডিওতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল, “ধর্ষণ তো হবেই”—কেন ধর্ষণ হবে? কারণ কি ধূমপান? ধূমপানের কারণে কি কেউ ধর্ষণের যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারেন? এতদিন শুনেছি, পর্দা যথাযথ না করলে, ওড়না না নিলে ধর্ষণ তো হবেই। এখন যুক্ত হলো, ধূমপান করলেই সে ধর্ষণের যোগ্য। ভাবতেও খারাপ লাগে যে, এসব করলে মেয়েটির সামাজিক মর্যাদা আর থাকে না। মানে তাকে ভোগের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এই মেয়েটিকে বউ হিসেবে আর ভাবা যায় না। তবে প্রেমিকা হিসেবে তাকে ভাবা যেতে পারে। কল্পনায় তাকে ঘিরে চমৎকার ভোগের আয়োজন সাজানো যেতে পারে। মদের আসরে মেয়েটি যুক্ত থাকলে দারুণ ব্যাপার হতে পারে। কিছু না হলেও প্রলাপের ছলে অন্ততঃ খোশগল্পে, যৌনগল্পে মজে ওঠা যাবে!

অভদ্রতা কতরকমভাবে মগজে!

মেয়েটি সবই বোঝে। সূক্ষ্মভাবেই বোঝে। বোঝে বলেই একসময় সে নিজেকে পৃথক করে ফেলে। কেন পৃথক করে ফেলে? একটি আলাদা দুনিয়ায় কেন সে বাঁচবে?
আমরা এইসব অসম্মান, আঘাত সবই বুঝি কিন্তু অনুভব করার চেষ্টা করি না। ফলে সহজেই নারীকে অসম্মান করা যায়। আঘাত বা উপেক্ষা করা যায়। বুঝলে হয়ত এইসব স্বাভাবিক অধিকার পেতে নারীকে কোনো বাধাই পেরোতে হত না। আমাদের মানসিক গড়নই আমাদের মধ্যে অসমতার বীজ বপন করে।

এজন্য দরকার সবার আগে নারীর প্রতি মানুষ হিসেবে সম্মান প্রদর্শন। সমাজে নারীর প্রতি আরোপিত কুসংস্কারগুলো সংস্কার করা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো মনে প্রবেশ করিয়ে যুক্তিবোধ, মুক্তবোধ জাগ্রত করা। আমাদের শিক্ষার যে দৈন্যদশা, সেখানে যে পরিমাণ মানুষকে বোঝালে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে, তাদেরকে বোঝানো, আমরা সবাই একটি ভ্রান্ত বিশ্বাস ব্যবস্থার শিকার। নারী এগিয়ে গেলে এই সমাজটাই আসলে উপকৃত হবে সবচেয়ে বেশি।

নুসরাত নুসিন রাজশাহীতে বসবাসরত একজন কবি ও সাংবাদিক