চন্দ্রগর্ভ

।। আমিরুল ইসলাম কনক ।।

গৃহত্যাগ

কুমার চন্দ্রগর্ভের ভাবান্তর দেখে মহারাজা কল্যাণশধী আর রানী প্রভাবতী ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন। তারা কিছুতেই মানতে পারছেন না যে কুমার চন্দ্রগর্ভ ভিক্ষুধর্মে দীক্ষা নিয়ে বৈরাগ্যের জীবন বেছে নিক।

প্রভাবতী: “হায় আমার কুমার! ভিক্ষু হয়ে, দুগ্ধ ফেনিল কোমল শয্যা ত্যাগ করে তৃণশয্যায় শয়ন করবে, কৃচ্ছ্র সাধনা দ্বারা কংকালসার করবে সোনার বরণ দেহ, এ করুণ দৃশ্য আমি সইবো কী করে?” মায়ের মনের করুণ আর্তি নিজ সন্তানকে বুকে ফিরে পাওয়া। কিন্তু মায়ের মন জানে পুত্র তার যে প্রতিজ্ঞা একবার করে, তা আর পরিবর্তন হয় না। কাজেই আশু পুত্র হারানোর ব্যথায় মায়ের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো:

‘ঐ ওরে বিধি কি জানি লিখিলি কপালে/ নীলমনি হায়রে গোপালহারা হলাম আমি/ এভাবে যার হয়নি পুত্র যে জন আছে বলো/ ওহে পুত্র ছেড়ে গেলো কানতে জনম গেলো/ কারবা আমি ছিঁড়েছিলাম ভরা ক্ষেতের বাইন/ সেতো মোরে দিয়েছিল পুত্রশোকের গাইন/ কারবা আমি ছিঁড়েছিলাম খণ্ড কলার পাতা/ সেই তো মোরে দিয়েছিল পুত্রশোকের ব্যথা।’ কুমারের সংকল্পের কথা শুনে মহারাজ ও মহারানি আঁতকে উঠলেন। সন্ন্যাস গ্রহণের সংকল্প ত্যাগ করতে তারা করুণ মিনতি জানালেন। কুমার সে অনুরোধ সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন। সে রাতে ভরা পূর্ণিমা ছিলো। প্রবল জোয়ারের বাঁধভাঙা ঢেউ যেন সবকিছু ধুইয়ে দিলো। সেই সাথে মায়ার বাঁধনও। স্রোতের টানে হারিয়ে গেলো সংসারের মায়া। সবার অলক্ষ্যে চন্দ্রগর্ভ গৃহত্যাগ করলেন। হাঁটতে হাঁটতে তিনি কৃষ্ণ গিরির মহাভিক্ষু রাহুল গুপ্তের সামনে গিয়ে উপস্থিত হলেন। অবনত মস্তকে গুরুপদ বন্দনা করলেন।

চন্দ্রগর্ভ: ‘প্রভু, অধমকে দীক্ষা দিন। জ্ঞানসমুদ্রের অজানা মহাসমুদ্র মন্থন করে অমৃত সুধা পান করতে আমার প্রাণ যে বড়োই ব্যাকুল। মহামতি সিদ্ধার্থের সাধনার পথ ধরে মুক্তি প্রার্থনা করছি আমি। আমাকে সঠিক পথের সন্ধান দিন।’

রাহুলগুপ্ত চন্দ্রগর্ভের কান্তিময় মুখশ্রী দেখে মুগ্ধ হলেন। এমন দীপ্ত মুখ তিনি আগে কখনোই দেখেননি। প্রতিভার এমন স্ফূরণ ইতোপূর্বে আর কারও মাঝে দেখা যায়নি। জ্ঞান সমুদ্র মন্থন করার এমন ক্ষুধাও দ্বিতীয় কারো মাঝে লক্ষ করা যায়নি। দিব্যকান্তিময় কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন তার সামনে দণ্ডায়মান। তার শিখর চূড়া থেকে স্বর্ণোজ্জ্বল আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছিলো এবং সে আভায় বরেন্দ্রভূমি যেন আলোর সমুদ্রে ভাসছিলো। স্বয়ং সূর্যদেব যেন নেমে এসে সে শিখায় কনকাঞ্জলি নিবেদন করছে। আর তার দ্যুতি যেন ব্রহ্মাণ্ডের অজ্ঞতারূপ বরফ গলিয়ে স্রোতস্বিনী বইয়ে চলেছে।

সংবিত ফিরে পেয়ে রাহুলগুপ্ত দেখলেন, রাজপুত্র হয়েও কুমার ভিক্ষা পাত্র হাতে। গৈরিক বসনের সাথে স্বর্গের এ যেন যুগল সন্ধি। বিস্মিত হলো নগরবাসী, শ্রদ্ধায় মাথা নত করলো পথচারীগণ। রাহুলগুপ্ত যথারীতি শিষ্যকে শ্রামণ্য ধর্মে দীক্ষা দিলেন। সেই সাথে নব দীক্ষিত শিষ্যের নামও রাখা হলো নতুন করে। গুরু প্রদত্ত নতুন নাম হলো গুহ্য-জ্ঞানবজ্র। গুরু সহজেই একথা ভেবে গর্বিত হলেন যে অসাধারণ শক্তিধর এ শিষ্য বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন শাস্ত্রের গুহ্যতত্ত্ব অধিঙ্গম করার জন্য অতি উত্তম পাত্র। প্রথমেই শিক্ষা দেওয়া হলো গুহ্য ত্রি-শিক্ষা। অতি অল্পদিনের মধ্যেই গুরু প্রদত্ত গুহ্য ত্রি-শিক্ষা সফলতার সাথে আয়ত্ব করে সবাইকে বিস্মিত করলেন চন্দ্রগর্ভ। শিষ্যের এই সফলতা দেখে রাহুলজী একথা ভেবে মুগ্ধ হলেন যে তার দেওয়া গুহ্য-জ্ঞানবজ্র নাম যেন সার্থক হয়েছে। কিন্তু তার জ্ঞান সাধনার যে স্পৃহা তা যেন আরও বেড়েই চললো। নিজের সমস্ত বিদ্যা শিষ্যকে দান করে পণ্ডিতজি তৃপ্তির হাসি হাসলেন। দূর হিমালয়ের শিখরকে যেমন কোনো কিছু দিয়েই ঢেকে রাখা যায় না, চন্দ্রগর্ভকেও তেমনি আটকে রাখা যায় না। জগৎ ও জীবনকে জানার ও বোঝার যে তৃষ্ণা শিষ্যের মাঝে, তা নিবৃত্ত করার আশীর্বাদ করে নিজেকেই ধন্য করলেন গুরুজী। গুরুগৃহ হতে বিদায় নিয়ে জ্ঞান সায়রের তীর ধরে অজানার পথে পাড়ি জমালেন চন্দ্রগর্ভ। গেরুয়া বসন, ভিক্ষার পাত্র আর জ্ঞান পিপাসাকে সঙ্গী করে পথ চলতে শুরু করলেন চন্দ্রগর্ভ। এবারে তিনি গেলেন সোজা ওদন্তপুর বিহার। পালরাজত্বের সোনালী দিনে বৌদ্ধ ধর্ম যখন উন্নতির চরম সীমায়, তখন বিহার রাজ্যে অবস্থিত এ মহাবিহার জ্ঞানচর্চায় আন্তর্জাতিক বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়েছিলো।

অনেকটা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলেই এর পাঠদান, গবেষণা, শিল্প-সাহিত্য, সমাজতত্ত্ব, চিকিৎসাশাস্ত্র, বাস্তুবিদ্যা ও ধর্মদর্শন চর্চা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এর বিশালাকৃতির গ্রন্থাগার। তিব্বতের প্রথম বিহারটি তৈরি হয়েছিল এই বিহারের অনুকরণেই। সে সময় ওদন্তপুর বিহারে স্থাপত্যকলার বিকাশ ঘটেছিল। বিশেষ করে বীতপাল ও ধীমান উদ্ভুত ধারার ব্রোঞ্জ, পাথর খোদাই ও চিত্রাঙ্কন প্রণালী বাংলা-বিহার অঞ্চলের বিদ্যার্থীদের খুব ভালোভাবে শেখানো হতো। পোড়ামাটি ও কালো পাথরেই বেশিরভাগ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হতো। নানা ভঙ্গি ও মুদ্রায় মানুষের মুখ ও শরীরের মূর্তি নির্মাণই ছিলো ভাস্কর্যের প্রধান বিষয়বস্তু। মাটির তৈরি নানা শিল্পের চর্চাও তখন বিহার প্রাচীর অতিক্রম করে নগর সভ্যতা এবং লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। লোকালয়ে নির্মিত মূর্তি ও চিত্রসমূহে দেবদেবীর পরিবর্তে বিষয়বস্তুরূপে সাধারণ মানুষের মুখ ও জীবনযাত্রাই প্রাধান্য পেতে শুরু করলো যেন এখান থেকেই।

বিহার-সংগম

বাংলায় তখন কৃষিই প্রধান জীবিকা। প্রধান খাদ্যশস্য ধান, এ ছাড়া আখ, আম, নারকেল, বাঁশ প্রভৃতি জমিতে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হতো বলে খাদ্যাভাব তেমন একটা দেখা দিত না। গাছে গাছে প্রচুর চূতফল (আম) ফলতো এবং জলাশয়ে সহজেই মাছ পাওয়া যেত। লবণাক্ত পানিতে ব্যবহারযোগ্য লবণ সহজলভ্য ছিলো। এছাড়া কাঁঠাল, খেজুর, কলা, গুয়া, পান ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হতো। কৃষকেরা বাড়ির আঙিনায় লবঙ্গ, দারুচিনি, সুপারি ও লবঙ্গের চাষ করতেন। প্রচুর পরিমাণে তুলা উপাদিত হতো বলে বাইরে থেকে কোনো বস্ত্র আমদানি করতে হতো না। কৃষকেরা নিজ উদ্যোগেই তুঁতগাছের চাষ করতেন বলে রেশমের গুটি সংগ্রহে, বিশেষ করে পরিবারের মেয়েরা অত্যন্ত পটু ছিলেন। মেদিনীপুর থেকে যে লবণ উৎপাদিত হতো তা দিয়ে বাঞ্ছিত চাহিদা পূরণ করে ভারতবর্ষের বাইরেও রফতানি করা হতো। বাঁকুড়া, বীরভূম ও রাঢ়দেশের বনাঞ্চলের খনি থেকে সংগৃহীত লোহা ও ইস্পাত থেকে ফলা, তরবারি, শিরোস্ত্রাণ, লৌহজালিকার বর্ম তৈরি করায় কর্মকারেরা সিদ্ধহস্ত ছিলেন। শিরোস্ত্রাণ তৈরিতে তামার চাহিদা ছিলো খুব বেশি। সুবর্ণরেখা অঞ্চলের খনি থেকে প্রাপ্ত তামার খুব সুনাম ছিলো। খনিজ লোহাকে গালাবার প্রণালীও কর্মকারদের খুব ভালো ভাবেই জানা ছিলো। পুণ্ড্র এবং ত্রিপুরার খনি থেকে প্রাপ্ত সোনার মান খুব ভালো হওয়ায় এ অঞ্চলে স্বর্ণশিল্পেরও বিকাশ ঘটেছিলো। এছাড়া গঙ্গার মোহনায় যে মুক্তা পাওয়া যেত, তা দিয়ে মূল্যবান অলস্কারাদি তৈরি করা হতো।

মহাসাংঘিক আচার্য শীলরক্ষিত তখন ওদন্তপুর বিহারের প্রধান মহাধ্যক্ষ। চন্দ্রগর্ভ ওদন্তপুর বিহারের সুখ্যাতি শুনে জ্ঞানতৃষ্ণা নিবারণের পিপাসা নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। শীলরক্ষিত তাকে দীক্ষা দিলেন। প্রতিভাধর এ শিষ্যকে দীক্ষা দিতে গিয়ে মুগ্ধ হলেন সংঘগুরু। তার দীপ্ত কান্তিতে যেন ধন্য হলো ওদন্তপুর বিহার। সম্পূর্ণ নতুনরূপে দীক্ষা দিয়ে শিষ্যের উপাধি রাখা হলো ‘দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান।’ জ্ঞান জ্যোতির আধার বা অতীশ দীপঙ্কর শধীজ্ঞান। যেন অলৌকিক শক্তির জাদু ছোঁয়ায় মাত্র দু’বছরের মাথায় গুরু প্রদত্ত সকল শিক্ষা তিনি রপ্ত করলেন। তাঁর যশোগাঁথা ছড়িয়ে পড়লো দেশ দেশান্তরে। তার মতো জ্ঞানানুরাগী, তাপস ও পণ্ডিত তৎকালে ভূ-ভারতে দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না। তিনি ভাবলেন শুধু আক্ষরিক জ্ঞানার্জনই প্রকৃত জ্ঞানার্জন নয়, ধ্যান ও চর্যার দ্বারা সে জ্ঞানের সার হৃদয়াঙ্গম করে মনের স্থিরতার মাঝে বিরাজিত সুপ্ত বোধিসত্ত্বকে জাগ্রত করেই প্রকৃত জ্ঞানসমুদ্রে অবগাহন করা সম্ভব। আর জ্ঞানের সাথে কর্মের যোগ হলে তবেই প্রকৃত জ্ঞানের সাধনা। কিন্তু, তাকে কে দেবে সে শিক্ষা? তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন। জানতে পারলেন মগধের মহাচার্য ধর্মরক্ষিতের কথা। তিনি তখন জগদ্বিখ্যাত বয়সের ভারে ন্যূব্জ জ্ঞান আচার্য। জ্ঞান সাধনাই তাঁর একমাত্র সত্যধর্ম উপলব্ধির বাহন। সাধনার মধ্যদিয়ে ধ্যানমার্গের উচ্চশিখরে আরোহণ করতে পারলে, তবেই প্রকৃত সত্যকে পাওয়া যাবে বলে নিজের জীবনে তিনি তা উপলব্ধি করেন। বোধিসত্ত্বের দীক্ষা নেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে গেলেন চন্দ্রগর্ভ। তখন তার বয়স একত্রিশ। বোধিসত্ত্বের মৌলিক বিষয়, অনুষঙ্গ, বিধি, আচার, সাধনার স্তর, পরিধি, ধ্যানকৌশল, সম্মোহন, মন্ত্রগুপ্তি, দৈহিক কৃচ্ছ্রসাধনা, শরীরতত্ত্ব, শ্বাসনিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি যখন একে একে রপ্ত করতে লাগলেন; তখন তাঁর মনের মধুভাণ্ডার যেন কানায় কানায় পূর্ণ হতে শুরু করেছে। অল্পদিনের মধ্যেই ধর্ম রক্ষিত প্রদত্ত সকল শিক্ষা তিনি সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হলেন। শিষ্যের এ উন্নতি দেখে আচার্য ধর্মরক্ষিত মুগ্ধ হলেন। এমন শিষ্যের গুরু হতে পেরে নিজেই ধন্য হলেন ধর্মরক্ষিত। মাত্র কয়েক মাসে তিনি সমস্তবিদ্যার ভাণ্ড উজার করে শিষ্যের মাঝে বিলিয়ে দিলেন। শিষ্য চন্দ্রগর্ভের সাফল্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি তাকে ভিক্ষুধর্মের শ্রেষ্ঠ ধর্মপাল অভিধায় ভূষিত করলেন।

আত্মমুক্তির নেশায় প্রকৃতির ভাণ্ডারে ভাণ্ডারে তৃষ্ণার্ত মৃগের ন্যায় ছুটে বেড়াতে লাগলেন চন্দ্রগর্ভ। মগধের এক বিহার থেকে অন্য বিহারে তার অবিরাম চলা। এ যেন জঙ্গম তীর্থরাজের বিহার সঙ্গম। মদির নেশায় তার এ পথচলা। মধুকরের মতো যখন যার কাছে যে জ্ঞানের সন্ধান পেলেন তাই আকণ্ঠ পান করতে লাগলেন। স্তরে স্তরে হৃদয়ভাণ্ডে সে জ্ঞান জমা হতে থাকলো। মনভাণ্ডারের বহিঃস্তর ও মধ্যস্তর তখন কানায় কানায় পূর্ণ। তবুও অনুভব করলেন যে অভ্যন্তরে যেন শূন্যতা। আরও অনুভব করলেন জাগতিক লোভ লালসা অন্তঃমনের কুঠুরিতে জমা হতে হতে এক সময় বিবেকের পথ বন্ধ করে দেয়। তখন বন্দী বিবেক কার্যক্ষমতা হারাতে হারাতে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন পরিচর্যার অভাবে বিবেকের রাস্তা সরু হতে হতে মানব মনের ওপর যে প্রভাব ফেলে, তখন সে যন্ত্রণাকর অভিজ্ঞতা লাভ করে। সেই যন্ত্রণার ধাক্কা শরীরকেও আক্রান্ত করে বলে সে তখন দিশেহারা হয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে জগৎ-সংসারকে দুষতে থাকে। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য বিবেক চলাচলের পথকে উন্মুক্ত করে দিতে হয়। এই উন্মুক্তকরণে ধ্যান-সাধনার কোনো বিকল্প নেই। এর ফলে হৃদয় থেকে যে রস জারিত হয়, তা বিবেক চলাচলের সরু পথকে প্রসারিত করে দিয়ে মোহমুক্তি লাভ করতে সহযোগিতা করে এবং সিদ্ধি লাভ হয়।

চলবে…