উৎসব মোসাদ্দেক

।। উৎসব মোসাদ্দেক ।।

প্রয়াত বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে তোষা পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন হয়েছিল ২০১০ সালে। সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া পাটের দুটি প্রধান জাতের মধ্যে একটি হচ্ছে তোষা। মাকসুদুল আলমের দল ২০১২ সালে পাটের জন্য ক্ষতিকর একধরনের ছত্রাকের জীবনরহস্য উন্মোচন করায় উন্নত পাটের জাত উদ্ভাবনের দিকে এক ধাপ এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে সেই বিজ্ঞানীর নেতৃত্বেই আরেকটি জাত দেশি বা সাদা পাটের জীবনরহস্য উন্মোচিত হয়। এসব সাফল্য পাট খাতের পুনর্জাগরণের সহায়তা করবে বলে সরকারের তরফ থেকে ফলাও করে জানানো হয়েছিলো। কিন্তু তার ফলাফল কী দাঁড়ালো? লোকসানের অজুহাতে পাটকল বন্ধ ঘোষণা, প্রতিবাদ-গ্রেফতার, আর গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মধ্য দিয়ে শেষ হবার পথে সরকারি পাটকলের অধ্যায়।

অথচ, ‘বেসরকারি খাতে পাটকলের সংখ্যা জুট স্পিনিং মিলসহ সব মিলিয়ে ২২২টি। সবগুলোই চলছে ভালো। সরকারের পক্ষ থেকে ২০ শতাংশ রফতানি প্রণোদনা পেয়ে খুবই খুশি বেসরকারি পাটকল মালিকরা। কিন্তু সরকারি পাটকলগুলোতে এর কোনও প্রতিফলন নেই।’ সরকারি পাটকল এরচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়ে মুনাফা দেখাতে পারছে না, অনেক টাকা লোকসান দিচ্ছে প্রতিমাসে।

লোকসান কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আটটি কারণ জানা যাচ্ছে। সেগুলো- “অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক দলাদলি, সময়মতো কাঁচাপাট কিনতে ব্যর্থ হওয়া, পাটের গুণগত মান ভালো না হওয়া, বেশি জনবল, সিবিএ’র দৌরাত্ম, পুরাতন যন্ত্রপাতি, নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি – এই আট কারণে লাভের মুখ দেখছে না সরকারি পাটকলগুলো।”

তাহলে দায় সরকারি পাটকলের, শ্রমিকের নাকি ব্যবস্থাপনার? সমস্যাটা কোথায়? আবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “এত হতাশ হবার কী আছে? আর আমি লোকসান লোকাসন করবো কেন? এমন একটা পণ্য যার কিছুই ফেলা যায় না সেটা কেন লোকসান হবে? আমরা লোকসান শুনতে চাই না। লাভজনক কীভাবে করা যায়, কীভাবে করতে হবে সেটা দেখতে হবে। কৃষিপণ্য হিসেবে পাটজাত পণ্য প্রণোদনা পেতে পারে।” (বিবিসি বাংলা, ১১  জুলাই ২০২০)

সরকার প্রধান চাওয়ার পরও আটটি সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছে না? এগুলো কি সমাধান অযোগ্য? ওপরে যে আট কারণের কথা জানা যায়, তার একটিও সমাধান-অযোগ্য বলে মনে হয় না। তাহলে? নাকি খোদ সরকার কোনো সিন্ডিকেটের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে? নাকি শুধুই পাটমন্ত্রীর সমস্যা?

পাটমন্ত্রীর অদক্ষতা বা যোগ্যতার অভাব থাকলে তাকে সরিয়ে দেয়া যেতেই পারে। প্রয়োজনে তার চেয়ে যোগ্য কাউকে সে পদে আনা যেতো। কেন সে ব্যবস্থা নেয়া হলো না? মন্ত্রীর ব্যর্থতা কি ঢাকা দেয়া হলো? সরকার প্রধানের অত্যন্ত আগ্রহ থাকার পরও পাটকল আধুনিক করা গেলো না কেন? সরকার যদি সরকারি পাটকল লাভজনক করতে না পারেন ১০ বছরে তাহলে তারা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কীভাবে চালাচ্ছেন? সারা দেশটার প্রতিচ্ছবিও পাটকলগুলোর মতোই। তবুও খটকা থেকে যায়!

কারণ, আজ থেকে বছর তিনেক আগেও প্রধানমন্ত্রী বলেন, “উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে পাটকে অবহেলা করেছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। বর্তমান সরকার পাটের সেই হারানো গৌরব ফিরিয়ে এনেছে। বিশ্ববাজারে পাটের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ১৯৯১ সালে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের পরামর্শে পাটকলগুলো বন্ধ করে দিয়েছিলো বিএনপি। বাংলাদেশে বিএনপি সরকার টাকা নিয়েছে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে পাটকল বন্ধ করার জন্য। আর ভারত টাকা পেয়েছে নতুন পাট কল তৈরির জন্য। এভাবে আমাদের পাটকলগুলো তারা একে-একে বন্ধ করে দেয়।” (সময় টিভি, ২০১৭, জাতীয় পাট দিবস উপলক্ষে কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশনে পাটজাত পণ্য মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতা)

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, তাহলে পাটকল কেন বন্ধ করা হচ্ছে? আওয়ামী লীগ সরকার তো স্বাধীনতার বিপক্ষের নয় বরং মুক্তিযুদ্ধের চ্যাম্পিয়ন শক্তি। আপনারা কার পরামর্শে পাটকল বন্ধ করছেন? জানা যাচ্ছে, সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংস্কার করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে চালু করবে।

বাহ, দারুন না? এখন জনগণের টাকায় সংস্কার করে বেসরকারি (পড়ুন, জায়ান্ট ব্যবসায়ীদের) মালিকানায় তুলে দেয়া হবে! তখন আর অব্যবস্থাপনা থাকবে না! লোকসানও হবে না! কারণ অব্যবস্থাপনা/লোকসানের নাম বদল করে দেয়া হবে চুক্তির মাধ্যমে (যেমন বিদ্যুতের ক্ষেত্রে “ক্যাপাসিটি চার্জ” নামে) অন্য কোনো টার্মে বা নামে জনগণের পয়সার মচ্ছব চলবে। জিডিপি’র বাড়ন্ত সংখ্যা দেখাবে সরকার আর মানুষের চোখ হতাশায় নিস্প্রভ হতে থাকবে দিনের পর দিন।

প্রকৃতপক্ষে, ব্যক্তি মালিকানায় জাতীয় সম্পদ তুলে দেয়ার লক্ষ্যে এতো  আয়োজন। লোকসান দেখিয়ে শ্রমিকদের ওপর দায় চাপিয়ে বন্ধ করো, তারপর ভাগবাটোয়ারা করো। যদিও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামজুড়ে এই পাট ও পাটকল ইস্যু বিরাট ভূমিকা রেখেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ৬ দফার সেই সংগ্রামের লগ্নে নারায়ণগঞ্জ পাটকলে বিশাল সমাবেশে বক্তৃতা করেছিলেন। তুলে ধরেছিলেন এই পাট নিয়ে পাকিস্তানিদের চক্রান্তের কথা। যার ফলাফল ছিল, এরপরেই বঙ্গবন্ধু জেলে গেলেন আর শ্রমিকদের ওপর খড়্গহস্ত হলো রাষ্ট্রীয় বাহিনী। ৭০ সালের নির্বাচনেও পাট ও পাটকল রক্ষা ছিলো আওয়ামী লীগের অন্যতম এক নির্বাচনী অঙ্গীকার।

অথচ তারই দল সরকারে থাকার পরও আজ পাট নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সেই দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্ব পাচ্ছে না। লোকসানের সেই পুরনো অসত্য বয়ানের আশ্রয় নিয়ে সরকারি পাটকলগুলোকে আজ কাদের স্বার্থে পিপিপির মাধ্যমে চালানোর কথা বলা হচ্ছে- সে সত্য যেমন জনগণের জানা প্রয়োজন, তেমনই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদেরও এ নিয়ে ভাবা জরুরি।

উৎসব মোসাদ্দেক একজন রাজনৈতিক কর্মী

Berger Weather Coat