চন্দ্রগর্ভ

লবণ বিহনে

গভীর রাত। কলাবউ এর ঘোমটার মতো ক্ষীণ হতে শুরু করেছে চন্দ্রকলার আলো। রসপিঠার মতো সিক্ত হতে হতে দ্বি-প্রহর অতিক্রান্ত সে রাতের। ঠিক যেন গঙ্গা—করতোয়ার মাঝামাঝি।

পাল রাজাদের জনক ভূ সে। অসমতল এবং অত্যধিক উঁচু—নিচু এক জনপদ। অনুচ্চ পাহাড়ের পাদদেশে অকারণ আলো আঁধারিতে এদিকটা কেমন যেন গা ছমছম করা অচেনা মনে হয়। থেমে থেমে একেকটা পাখির ডাক কানে আসে। ডাক নয়, সুর যেন। মন ভেঙে যায় মেয়েটির। অগ্নিমুখো ধেয়ে যেতে ইচ্ছে করে তার অকৈতব ব্যথায়।

আলগোছে দরোজা খুলে নাতিশীতোষ্ণ হাওয়ার মতো ছায়াঘেরা অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যায় যুবতী মেয়েটি তখন। তার কটাক্ষ বাণে চাঁদের কলা খানখান হয়ে হয়ে যায়। ভেঙে পড়ে নীরবতা। ঐ দৃষ্টির সামনে কারো প্রাণে বাঁচা দায়। নদীর স্রোতের ইচ্ছে করে ক্ষণেক দাঁড়িয়ে তার সাথে একটু হেসে কথা বলে যেতে। তাই তো কলবাহিনী কল কল বেগে বয়ে চলে।

তরুণীর অঙ্গের বসন এতটাই দিশেহারা যে তাকে যতই আঁটসাট করে বেঁধে রাখে ততই বেপেরোয়া হয়ে খসে পড়তে চায়। পাখিসব মধুর মধুর কথায় সর্বদাই তোষণ করে তাকে। সরু কোমর জুড়ে পরনের শাড়ি দুই প্যাঁচ দিয়ে এমন শক্তভাবে বাঁধা, যেন তার নিতম্ব জোড়া ভীষণ রকম ভারী দেখায় আর বেসামাল হয়ে ছুটে যেতে চায় দিক হারিয়ে। তার হাঁটার গতিতে ঠমকে ঠমকে লাবণ্য কটাক্ষ হানলেও সে আজ একা। বড্ড একা! সে মোটেই উপেক্ষিতা নয়। তাকে দেখলে সূর্যকিরণও বশীভূত হয়। কিন্তু তার একটাই দুঃখ, আজও তার সে আসেনি। দুই চোখ সিক্ত হয় তার। রাতের নিস্তব্ধতা নিথর করে দেয় তাকে। চাঁদের আলোর ফাঁকে, পাতার মাঝে দুঃখ জাগানিয়া পাখিটিকে দেখে সে বলে ওঠে, ‘তুমিই আমায় কাঁদালে বন্ধু?’ নদীর দিকে তাকিয়ে দেখে, জলে পূর্ণ সেও। গাছের দিকে তাকিয়ে দেখে, সেও পাতা, ফুল আর ফলে পূর্ণ। কিন্তু তার এ পূর্ণতাকে ধারণ করার কেউ কি নেই! এ কথা ভেবে ভেবে অন্তরে আগুন জ্বলে তার।

বঙ্গ-ভারত-বরেন্দ্রীর অন্তর্গত রামাবতীর এই মাটিতে সুস্বাদু বেগুন ফলে। লবণ বিহনে কোনো স্বাদ নেই তার। বড্ড আলুনি লাগে। তবে কি সেও পড়ে থাকা লবণহীন বেগুনটির মতো অগতি? মনের ভিতরে একটা অগ্নিকুণ্ড জ্বলে আর নেভে। অঙ্গজুড়ে সে অগ্নিকুণ্ডের শিখা ওঠানামা করে। মাঝে মাঝে অঘাটায় মরতে ইচ্ছে করে তার। কিন্তু কোথায় সে অজানা আনন্দ! কোথায় সে অচেনা অখণ্ড? বড্ড অকাজেই দিনগুলো যাচ্ছে যেন অকারণ।

বুকটা টনটন করে ওঠে অগণ ব্যথায়। এক অকূল সমুদ্র সাঁতরে ওপারে যেতে ইচ্ছে করে তার। থাকতে চায় না মন আর অপারি হয়ে। মেয়েটির মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা। পোঁ পোঁ শব্দে শকট হাঁকিয়ে আসছে সে। খড় বোঝাই শকট। মোষের গলায় বাঁধা ঘণ্টি থেকে ছন্দের তাল সব দিকে মোহাচ্ছন্ন করে চলেছে। হাতের পাণ্টিতে রূপার ঘুঙুর বাঁধা; যখন তা সপাং সপাং শব্দে মোষেদের পিঠে পড়ছে, তখন যেন রথের গতিতে এগিয়ে চলেছে শকট। যেন মালবিকার দেশে স্বর্গের পারিজাত উদ্যান থেকে আসছে সে। থেকে থেকে কুয়াশার মতো মনে হয় চারিদিক। দুই পাশের বাড়ি-ঘর, গাছ-পালা ধুলোর ধোঁয়াশায় দেখা যায় না। চাকার ক্যাঁচর ক্যাঁচর শব্দে কান পাতা দায়।

আঙিনায় দাঁড়িয়ে ছিলো মেয়েটি। আচমকাই শকট খাদে পড়ে যায়। অপরাধবোধ জাগ্রত হলো মেয়েটির মনেও। সে কি তারই দিকে তাকিয়ে খাদে ফেলে দিয়েছে শকট? ছেলেটির পরনে ছিলো ছোটো ধুতি, মাঝখানটা কোমরে জড়িয়ে দুইপ্রান্ত টেনে পেছনে কাছা দেয়া। নাভির দুই-তিন ইঞ্চি নিচে কোটিবন্ধের মতো কাপড় দিয়ে বাঁধা, আর গাঁটটি ছিলো ঠিক নাভির নিচেই। হতে পারে ধুতির একটি প্রান্ত টেনে কাছা দেয়া ছিলো। নয়তো ভাঁজ করে সামনের দিকে কোঁচার মতো ঝুলিয়ে দেয়া ছিলো। মেয়েটির পরনের শাড়ি পায়ের কবজি পর্যন্ত ঝুলানো; কোমরে এক বা একাধিক প্যাঁচ দিয়ে অধোবাস রচনা করা। কপালে ছিলো কাজলের টিপ, পায়ে লাক্ষারসের আলতা, ঠোঁটে সিঁদুর এবং দেহ ও মুখমণ্ডলে চন্দন, মৃগনাভী আর জাফরান। ছেলেটির লম্বা নখ ছিলো এবং নখে ছিলো রং লাগানো। মেয়েটি চোখে কাজল। কখনো ঠোঁটে লাক্ষারসের আলতা এবং খোপায় গুঁজে দিতো গাঁদা ফুল।

দিন যায়, রাত আসে। তারপর এ পথে অনেক ধুলো উড়েছে। অনেক শকট খাদে পড়েছে। তৃতীয় বিগ্রহপালের মৃত্যু পরবর্তী কিছু কাল পরেই পাল সাম্রাজ্য ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো। একের পর এক বৈদেশিক আক্রমণ, বিশৃঙ্খলা এবং ষড়যন্ত্র। রাজা যায় রাজা আসে। রাজশক্তির ক্ষয় অথবা বৃদ্ধি কোনোটিই কৃষক অথবা খেটে খাওয়া প্রাকৃত সমাজের ব্রাত্য মানুষকে প্রভাবিত করে না। এ অঞ্চলের উচ্চকোটির লোক হতে আরম্ভ করে নিম্নকোটির প্রাকৃতজন পর্যন্ত সকলেরই প্রধান খাদ্যবস্তু ভাত। ‘হাড়িত ভাত নাহি, নিতি আবেশি’ এটা বাঙালি জীবনের সবচেয়ে বড়ো সত্য সেদিন। কলাপাতায় মোড়ানো গরম ভাত, গাওয়া ঘি আর মৌরালা মাছের ঝোল তাদের কাছে যেন পরমান্ন। এমন কি নলিতা শাকও পরমান্নের কাঙ্ক্ষিত একটি ব্যঞ্জন।

মহীপাল তখন প্রাসাদ মন্ত্রকদের পরামর্শে আপন ভাই দ্বিতীয় শূরপাল এবং রাম পালকে বন্দী করে গরাদখানায় রাখলেন। এভাবে পাঁচটি বছর অতিবাহিত হলো। রামাবতী তখন বিদ্রোহের আগুনে জ্বলছে। পাল সাম্রাজ্যের সামন্তগণ সরাসরি সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছেন—বুদ্ধের পথও তখন বহু দল—উপদলে বিভক্ত, নানা মতবাদ সৃষ্টিতে বিভাজিত। বুদ্ধ বোধিসত্ত্ব তখন দেবতার রূপে সুপ্রতিষ্ঠিত। বুদ্ধের জীবনাদর্শের সাধনার স্থান দখল করে নিচ্ছে একের পর এক পূজা-আর্চা। অসংখ্য দেবতা-উপদেবতার আবির্ভাব। বুদ্ধ-প্রদর্শিত সাধনমার্গ তখন যেন পরিত্যক্ত প্রায়। পূজার্চনার আধিক্যে বোধি-জ্ঞান, নির্বাণ-মুক্তির কঠোর সাধনার পথও বাধাগ্রস্ত। কম্বোজেরা বাংলা ও বরেন্দ্রের অংশবিশেষ দখলে নিয়েছেন। তার কিছুকাল পরেই ঠিক নিভে যাওয়ার আগে দপ করে জ্বলে ওঠার মতো প্রথম মহীপাল কম্বোজদের হাত থেকে পিতৃভূমির হৃৎগৌরব উদ্ধার করতে সমর্থ হন। জীবহত্যা মহাপাপ এবং কঠোরভাবে ‘মৎস্যশিকার ও হত্যা’ নিষেধাজ্ঞার কারণে উদ্ভুত কৈবর্ত ও সামন্ত বিদ্রোহের ফলস্বরূপ রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় বিশৃঙ্খলার মাঝে দ্বিতীয় মহীপাল নিহত হলেন। সামন্তগণ কৈবর্ত নায়ক দিব্যকে রাজা হিসেবে ঘোষণা করলেন। দিব্যর পরে রুদ্রোক। রুদ্রোকের পরে ভীম। আরও কিছুকাল পরে রামপাল দিব্যর ভাইপো ভীমকে হত্যা করে বরেন্দ্রের সিংহাসন পুনরুদ্ধার ও পাল সাম্রাজ্যের অধীন করেন। ইতোমধ্যে যা হবার তা হয়ে গেছে।

বাংলা জুড়ে অন্ধকার, সেই সাথে ভারতবর্ষেও।

বজ্রযোগিনী ও রামাবতী

এরও শতবর্ষ আগের ঘটনা।

রামাবতী তখন পাল সম্রাজ্যের প্রধান কেন্দ্র। বাংলা ও বিহার সম্রাজ্যের প্রধানতম ভূখণ্ড হিসেবে তৎকালে ভূ-ভারতের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। রামাবতী, পুণ্ড্র, সোমপুর, জগদ্দল, বিক্রমণিপুর, মুঙ্গের, তাম্রলিপ্তি ও পাটালীপুত্র পাল সম্রাজ্যের উল্লেখযোগ্য নগর হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। পাটালীপুত্র তখনো মগধের রাজধানী। মহামতি অশোকের অতীতের সুবিশাল মগধ সাম্রাজ্যের স্মৃতি ধারণ করে মগধ তখন পাল সাম্রাজ্যের অধীন হয়েছে। বাংলা ও বিহারের কিয়দংশ নিয়ে গঠিত বিক্রমণিপুর পরগনা উক্ত মগধ রাজ্যের শাসনাধীন একটি করদ রাজ্য হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে তখন। পরবর্তীকালে এটি বিক্রমপুর নামেই সমধিক পরিচিতি লাভ করে। এর সাতাশটি পাড়া ছিলো।

এই পরগনায় চার বর্গমাইল আয়তনের বজ্রযোগিনী ছিলো সর্বাধিক ঐশ্বর্যময় এবং দৃষ্টিনন্দিত লোকালয়। এর পাশ দিয়ে বয়ে যেতো সুশীতল জলধারা। শ্যামল বনানী আর ছায়াঘেরা এ জনপদে বাস করতেন মহারাজ কল্যাণশ্রী ও রানি প্রভাবতী। সামন্ত রাজা হিসেবে চন্দ্রবংশীয় এই মহারাজ পাল সাম্রাজ্যে যেমন আস্থাভাজন ছিলেন, তেমনি পাণ্ডিত্যের কারণে ছিলেন শ্রদ্ধেয় সর্বজন আচার্য। প্রজাপ্রীতি আর ধর্ম-দর্শন চর্চাতেই তার দিনের অধিক সময় ব্যয় হয়।

এক চাঁদনী রাতে বজ্রযোগিনী যেন আলোর মেলায় ভাসছে। ক্ষীণস্রোতা নদীর দুইপারজুড়ে থাকা ফসলের মাঠ আলোর ঝালরে ঢাকা পড়েছিলো সে রাতে। সবুজ বনানী ভেদ করে সে আলো মহারাজ কল্যাণশ্রী আর রানি প্রভাবতীর প্রাসাদকে ঢেকে দিলো। ৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের এই রাতেই মহারানি প্রভাবতীর কোলজুড়ে এলো যেন এক দেবশিশু। তার আলোয় টিলাময় সবকিছু রূপালী রাজ্যে পরিণত হলো। মহারাজ সন্তানের নাম রাখলেন চন্দ্রগর্ভ।

শিশুকাল থেকেই চন্দ্রের উপযুক্ত শিক্ষার প্রতি মহারাজা কল্যাণশ্রী আর রানি প্রভাবতী গভীর মনোযোগী হলেন। বিক্রমশীল বিহারের পণ্ডিত আচার্য জেতারির নিকট চন্দ্রের হাতেখড়ি হলো। তারা দেবীর অনুসারী জেতারি প্রথম দর্শনেই চন্দ্রগর্ভকে দেখে বিমুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন— ‘কালে এ বালক জ্ঞানে-গুণে পরিপূর্ণ হয়ে পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় জগৎকে আলোকিত করবে।’ গুরুগৃহে চন্দ্রগর্ভকে যা শিক্ষা দেওয়া হতো তা তিনি অত্যন্ত যত্নের সাথে আয়ত্তে নিতেন। চন্দ্রগর্ভের ন্যায় অধ্যাবসায়ী, মনোযোগী, জ্ঞানপিপাসু ছাত্র জেতারির দ্বিতীয়টি ছিলো না। মাত্র একুশ বছর বয়সেই জেতারির নিকট তিনি দর্শনের সকল শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। রাজকুমার ক্রমান্বয়ে স্থবিরবাদ, মহাযান বৌদ্ধধর্ম, যোগাচার, ভেষজ বিদ্যা, কারিগরি, শিল্পকলা এমনকি তীর্থংকরদের ধর্ম ও সংস্কৃত ভাষা পুরোপুরি রপ্ত করেন। জেতারির নিকট এ যুগের একজন বাঙালি দার্শনিক শ্রীধরভট্টের নামও প্রথম জানতে পারেন চন্দ্রগর্ভ। শ্রীধরভট্টের বিখ্যাত ‘ন্যায়কন্দলী’ নামক আকর গ্রন্থ ভারতবর্ষের অধিকসংখ্যক মহাবিহারেই পাঠ্য। শ্রীধরভট্টের পিতার নাম বলদেব, মাতার নাম অব্বোকা এবং গ্রামের নাম ভুরশূট যা রাঢ় অঞ্চলের দক্ষিণ প্রান্তে অনেকটা বর্ধমানের কাছাকাছি অবস্থিত। শ্রীধরভট্ট ন্যায়কন্দলী রচনার মাধ্যমে ন্যায়-বৈশেষিক মতের ওপর আস্তিক্যবাদের প্রতিষ্ঠা করে প্রখ্যাত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে শ্রীধরভট্টের মতাদর্শের সাথে ভিন্নতা প্রকাশ করলেও; তার অন্যান্য রচনা ‘অদ্বয়-সিদ্ধি’, ‘তত্ত্ব-সংবাদিনী’, ‘তত্ত্ব-প্রবোধ’ এবং ‘সংগ্রহ-টীকা’ প্রভৃতি বেশ দক্ষতার সাথেই আয়ত্ত করেছিলেন চন্দ্রগর্ভ। গ্রন্থসমূহে বেদান্ত এবং মীমাংসা বিষয়ক তথ্যাদি আলোচিত হয়েছিল, যা কুমার সিদ্ধার্থের দৃষ্টিকে সুপ্রসারিত করতে সহায়ক হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে তিনি সেকালের অপর একজন লেখক ভবদেব ভট্টেরও পরিচয় লাভ করেন, যিনি জীমূতবাহনের সমসাময়িক ছিলেন। তার সমগ্র রচনাই প্রায় কণ্ঠস্থ করেন কুমার। পাশাপাশি অনিরুদ্ধ ভট্টের সমস্ত রচনাও পুরোপুরি অধ্যয়ন করেন। জানা যায়, অনিরুদ্ধ ভট্ট যিনি ভবদেব ভট্টের মতোই কুমারিলের গ্রন্থে বিশেষ বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। বাঙালির একাধিক মীমাংসা গ্রন্থের অস্তিত্বের কথা জানা গেলেও পরবর্তীকালে ভবদেব প্রণীত ‘তৌতাতিত-মত-তিলক’ ব্যতীত আর কোনোটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।

বরেন্দ্রের রাজধানী রামাবতী নগরীর উপকণ্ঠে সে সময় রাজা সূর্যকান্তি এবং রানি বিভাবতী বাস করতেন। রাজ্যে সুখ-শান্তি স্বচ্ছন্দ্যের কোনো অভাব ছিলো না। কিন্তু রাজার মনে স্বস্তি ছিলো না। রানী বিভাবতীও তারা দেবীর উপাসনায় সমস্ত দিন কাটিয়ে দিতেন। পূজার থালা তারা দেবীর চরণতলে রেখেই আভূমি প্রণাম করতে করতে ঘুমিয়ে পড়তেন কখনো। সিঁথির সিঁদুরে লেপ্টে যেতো দেবীর চরণভূমি। প্রতিবছরই রানির কোল ভরে আসতো শ্বেত পাথরের ন্যায় কান্তিময় পুত্র, কিন্তু মাতৃ বুকে ঠোঁট লাগানোর আগেই সে রাজপুত্র দেবালয়ে তারাদেবীর কোলে ফিরে যেতো। এভাবে সাত সাতটি বছর কেটে গেলো।

বিক্রমশালী বিহারের আচার্য পণ্ডিত জেতারির পরামর্শক্রমে রাজা সে বছর মহাসমারোহে তারাদেবীর পূজার আয়োজন করেন। বরেন্দ্রী সোমপুর বিহারের সকল পণ্ডিত, তার্কিক, শাস্ত্রজ্ঞ, দ্বারপণ্ডিত এমনকি মহা আচার্যকেও মহা-উপঢৌকন সমেত রাজসিক সেবা প্রদান করা হলো। যথাসময়ে রানি সন্তান ধারণ করলেন। একই তিথিতে মন্ত্রী গজদন্তের মহিষী ঊষাবতীরও গর্ভসঞ্চার হলো।

লোককবি গেয়ে ওঠেন ‘সোমে দাঁড়া মঙ্গেলে নাভি বুধবারে বুক/ বিষ্যুদবারে গড়ছে ছেলের পৃষ্ঠ আর মুখ/ শুক্কুরবারে গড়ছে ছেলের সুখের দু’টি আঁখি/ শনিবারে গড়ছে ছেলের সোনাই দমের কান/ রবিবারে গড়ছে ছেলের রবিযোগের মাথা/ থাপিত করিয়া জান বসাইল তথা/ হাড়ে মাংসে সব গইঠে করল সারা…হাড়ে মাংসে জোড়া/ একও মাসের কালে কেহ জানে বা না জানে/ দুইও মাসের কালে লোকের কানে কানে/ তিনও মাসের কালে লহু দলা দলা/ চাইরও মাসের কালে হাড়ে সঞ্চে জোড়া/ পঞ্চ মাসের কালে পঞ্চ ফুলও ফোঁটে/ ছয়ও মাসের কালে ইজক ফুলও ওঠে/ সাতও মাসের কালে সাধ খাইতে মূল/ অষ্ট মাসের কালে অষ্ট অলংকার/ নয়ও মাসের কালে নমে গুণে তিথি/ দশও মাস দশদিন ছেলের পূর্ণ হয়্যা গেলো।’

আচার্য জেতারি পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্রই ঐ তিথিতে জন্মগ্রহণকারী অন্য কোনো সন্তানের সাথে বদল করে নিলে তবেই মা এবং ছেলের আয়ুষ্কাল নিশ্চিত এবং নিরাপদ হবে।’ রাজা এবং মন্ত্রী উক্ত পারামর্শমতে রানি বিভাবতীর ছেলেকে দিলেন ঊষাবতীর কোলে এবং ঊষাবতীর ছেলেকে দিলেন বিভাবতীর কোলে।

এভাবে রাজার ঘরে মন্ত্রীর ছেলে এবং মন্ত্রীর ঘরে রাজার ছেলে বেড়ে উঠতে লাগল। রাজার ছেলে সত্যকান্ত এবং মন্ত্রীর ছেলে উদয়াচলের মধ্যে খুব সখ্য। তারা একত্রে গুরুগৃহে বিদ্যাশিক্ষা করে, অস্ত্রচালনা, শিকার, শিল্প-ভাস্কর্য ও সংগীত সাধনা করে। রাজার ছেলে মন্ত্রীর ঘরে মানুষ হলেও তার চলন-বলন, মেধা এবং সামাজিকতা রাজকুমারসুলভ। হাতি শিকার ও ভ্রমণ তাদের নেশা।

দুই বন্ধু একদিন ঘোড়া ছুটিয়ে শিকারে বের হলো। ক্রমে রামাবতী থেকে পূর্ব দিকে যেতে যেতে সমুদ্রের ন্যায় বিশাল একাধিক নদী পার হয়ে তারা নিজ রাজ্য, এমনকি বরেন্দ্রের শেষ সীমানা অতিক্রম করে উত্তর দিকে চলতে শুরু করলো। সমস্ত রাত পথচলে ভোর হয়ে এলো। পাল সাম্রাজ্যের অজানা শেষ সীমানা দিগন্তের ওপারে যেন তাদের গন্তব্য। কোথাও সমতল, কোথাও গিরিপথ। কোনো লোকালয় চোখে পড়ে না। শুধু বন আর বন। মাঝে মাঝে পাহাড়ি ঝরনার কলকল শব্দ শোনা যায়। পাশে একটি খরস্রোতা নদী। স্বচ্ছ জলের নিচে রাশি রাশি সাদা পাথর। সূর্যের আলো পড়ে পাথরগুলো চকচক করে ওঠে। উপর থেকে মনে হয় যেন পাথরের স্রোত। নদীর পার ধরে দুই ক্রোশ চলার পর ডান দিকে একটি ঝরনার সামনে ঘোড়া থামালো তারা। ঝরনা ধারা আকণ্ঠ পান করে স্নিগ্ধ ঘাসের ওপর বসে পড়লো। ঘোড়া দুটি প্রাণের আঁশ মিটিয়ে সবুজ ঘাস আর সুপেয় ঝরনাধারা পান করলো।

গাছে গাছে ফল সংগ্রহ করে দুই বন্ধু পরিতৃপ্তির আহার করলো। ঝরনাধারাসমূহ মিলিত হয়েছে একটি বৃহদাকার হ্রদের সাথে। হ্রদের জলরাশিতে চোখ রাখলে প্রাণ জুড়ায়। হ্রদের ক্ষুদ্র শৈলশ্রেণিতে পূর্বকালে অপরাধীদের নির্বাসনে দেওয়া হতো। উল্লেখিত শৈলশ্রেণিতে প্রচুর সুমিষ্ট আনারস আর কমলালেবু পাওয়া যায়। হ্রদে পাওয়া যায় প্রচুর মাছ। অধিবাসীগণ মাংসভোজী নয়, পচা ও শুঁটকি মাছ তাদের পরম আদরের খাদ্য। পাহাড়ের দলে ছোটো ছোটো ঘরগুলো যখন বাতাসে ভেসে বেড়ায়—সেই দৃশ্য দেখতে বড়োই মনোরম! দলের ওপর খুঁটিপুঁতে গৃহনির্মাণ খুব কঠিন নয়, অথচ প্রচণ্ড ঝড়ের ঝাঁপটায়ও ঘরগুলো পড়ে যায় না। হ্রদের সুগভীর নির্মল জলরাশির বুকে রাজহাঁস, চক্রবাক প্রভৃতি জলচর পাখি জলকেলিতে মত্ত; ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শৈলনিকরে বিহঙ্গমাদির সুললিত কলধ্বনি কানে আসে। এমনই রমণীয় দৃশ্যে বিমোহিত হয়ে গেলো কুমারদ্বয়।

সুবিশাল হ্রদটির অনতিদূরেই একটি খাড়াপথ বিস্তৃত পাহাড়ের কোল ঘেঁষে লোকালয়ের দিকে চলে গেছে। কিছু পথ চলতেই সামনে পড়লো একটি নগরদূর্গ মতো সমতল ভূমি। জলবায়ু অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর। বর্ষা, শরৎ, শীত এবং বসন্ত ঋতুই এখানে বিশেষ অনুভব করা যায়। ফাল্গুনের শেষ হতে জৈষ্ঠ্যের প্রথম পর্যন্ত বসন্তের পূর্ণভাব বিরাজমান। এখানে গ্রীষ্মের উষ্ণতা তেমন নেই। এখন বসন্তকাল। পর্বত, বন, প্রান্তরের ফলপুষ্প তরুলতায় ভ্রমরাদির মধুর ঝঙ্কারে, বিহঙ্গকুলের কলধ্বনিতে পুষ্পসৌরভবাহী পবনের মৃদুমন্দ সঞ্চরণে এলাকাটি যেন স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে। দীঘি, জলাশয়, হ্রদসমূহ কমল-কুমুদ প্রভৃতি জলপুষ্পরাশির অপূর্ব শোভায় শোভিত। রাজ্যের উপত্যকায় অনেক পথ আছে। এ পথগুলো দিয়েই বাণিজ্যিক কার্যাদি চলে। কিন্তু সর্বত্রই পাথুরে কাঁচাপথ। উপত্যকায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নদী-বিল প্রভৃতি থাকায় বহুদূর বিস্তৃত রাস্তা তেমন চোখে পড়ে না।

একটু ডানে গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কিছুদুর অগ্রসর হওয়ার পরে একটা দুর্গের মতো চোখে পড়লো। এর চারপাশে পায়ে চলা পথ। একটি উঁচু সিঁড়ি নিচে থেকে তীর্যকভাবে দুর্গের প্রাচীর বরাবর উঠে ভেতরের দিকে ডান থেকে বায়ে এবং মাঝখান দিয়ে পুনরায় ভেতরের ভূমিকে স্পর্শ করেছে। ডানদিকে কিছুদুর অগ্রসর হলেই একটি সুড়ঙ্গের মতো। সুড়ঙ্গের সামনে একটি মার্বেল পাথরে বাঁধানো চত্বর। চত্বর ঘিরে বিবিধ ফুলের কেয়ারি। পশ্চিম দিকে একটি দেব মন্দির। মন্দিরের গায়ে পাথরের দেব মূর্তির অলঙ্করণ ও পোড়ামাটির ফলক। অগণিত পোড়ামাটির ফলক ও পাথরের দেবমূর্তিগুলোর সূক্ষ্ম বৈচিত্র্যমুখী কারুকাজ, দেহসজ্জা, রমণীয় বসন ও ভূষণ, গহনার অলস্করণ মন্দিরের প্রায় চার ফুট প্রশস্ত দেয়ালগাত্র জুড়ে শোভিত। দক্ষিণ এবং পশ্চিমে দু’টি প্রবেশপথ। পশ্চিমের পথটি প্রাসাদের দিকে চলে গেছে। পুবের পথটি বৃত্তাকার সিঁড়ি অতিক্রম করে নিচের দিকে একটা কাচঘরের সাথে যুক্ত হয়েছে। কাচঘরের সামনে যেতেই ভুল ভাঙলো তাদের। আসলে এটি কোনো দুর্গ নয়। এটি একটি বিপুলাকার দীঘি।

দীঘির স্বচ্ছজলে স্নানরতা এক ষোড়শী। তার সকল পরিচ্ছদ কাচঘরে রাখা। পরনে কাঁচুলি আর নাভির নিম্নাংশ থেকে পা অবধি জলে নিমজ্জিত। রাজপুত্র সত্যকান্ত পলক ফেলতে পারছে না। মন্ত্রীপুত্র উদয়াচল পেছন ফিরে নিচে নেমে, সিঁড়িতে বসে ফুল পাখি আর নয়নাভিরাম প্রকৃতি দেখতে শুরু করলো। রাজকন্যা জলের উপরে রাজপুত্র সত্যকান্তের ছায়া দেখে মৃদু হাসলো, তাতেই দীঘির জলে ঢেউ খেলে গেলো। আর তার ছায়া কাচের ঘরে গিয়ে পড়লো। সেখানে একটি দীঘল আয়না ছিলো। স্নান শেষে রাজকন্যা আয়নার সামনে পোশাক পরিবর্তন করে। স্নানরতা রাজকন্যার প্রতিচ্ছবি এই আয়নার ওপরেই পড়ে। আজ রাজকন্যার বয়স ষোলো বছর পূর্ণ হলো এবং জলের ছায়ায় প্রথম যুগল ছবি দেখা দিলো। কাচঘরের আয়নায় সে ছবি পারদে স্থায়ীভাবে আঁকা হয়ে গেলো। রাজকন্যার কর্ণে কর্ণকুণ্ড, গলায় কণ্ঠহার, হাতে হীরের অঙ্গুরীয় ও বলয়, কটিদেশে মেখলা, পায়ে মল এবং মণিমুক্তার আভরণ জঙ্ঘাদেশে।

চলবে…