চারিদিকে সবুজের চাদরে ঢাকা মেঘালয়। মেঘেদের লুকোচুরিতে হারিয়ে যেতে পারে আপনার মন। ‘প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড’ খ্যাত সাজানো গোছানো শিলং আপনাকে নিয়ে যাবে এক ভিন্নজগতে। লিখেছেন ফাতিমা জাহান

ভারতের মেঘালয় রাজ্যে যখন পৌঁছলাম তখন আশানুরূপভাবেই হালকা বর্ষণ আমাকে অভিনন্দন জানালো। হ্যাঁ, আমি পৃথিবীর সর্বোচ্চ বৃষ্টিবহুল স্থানেই এসে পড়েছি। এই তো সেই মেঘের আলয় যেখানে মেঘেরা লুকোচুরি খেলে।

আসাম হয়ে মেঘালয় পৌঁছেছি, খুব বেশি পথ নয়। গোহাটি থেকে সড়কপথে দু’ঘণ্টার মত লেগেছে। ঠিক করলাম প্রথম দিন শিলং শহর মানে মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী চষে বেড়াব।

শিলং শহরটা এত সুন্দর আর গোছানো যে মনে হয় বিদেশের কোনো ছোট্ট গ্রামে এসে পৌঁছেছি। এ কারণেই বোধহয় ইংরেজরা তাদের শাসনামলে শিলংকে ‘প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড’ খেতাবে ভূষিত করেছিল। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, সুশৃঙ্খল যানবাহন, সুগঠিত পথঘাট সহজেই পথিকের মন ভুলিয়ে দেবে। শিলংয়ে আমার প্রথম গন্তব্যস্থল ‘শিলং পিক’ যেখান থেকে পুরো শহর দেখা যায়। আমি লাগেজ হোটেলে রেখে ট্যাক্সি নিয়ে ছুটলাম শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে আরও উঁচু থেকে শহর দেখার উদ্দেশ্যে।

শিলং পিকে গিয়ে দেখি চারদিকে শুধু বৃষ্টি আর মেঘের ঘনঘটা। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর মেঘে মাখামাখি হয়ে দেখলাম শিলং শহরের সৌন্দর্য।

এরপর গেলাম ‘ক্যাপ্টেন উইলিয়ামসন সাংমা স্টেট মিউজিয়াম’ ও ‘ডন বসকো ইনডিজিনাস মিউজিয়াম’ এ। এ মিউজিয়াম দুটোতে মেঘালয় রাজ্যের প্রায় সব নৃ গোষ্ঠী যেমন খাসী, গারোদের জীবনধারণ, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, জীবিকা নির্বাহের উপায় ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা মিলবে।

এরপর দেখতে গেলাম ‘শিলং গলফ কোর্স’ বা গলফ খেলার মাঠ দেখতে যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটা পৃথিবীর উচ্চতম এবং দীর্ঘতম গলফ কোর্সগুলোর মধ্যে একটি। ভৌগলিক কারণে সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল এবং প্রাকৃতিকভাবে এর সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে চারদিকে সবুজের সমারোহ।

দুপুরের দিকে বৃষ্টি থেমে দিনটা ফর্সা হয়ে গেল। তাই পরবর্তী গন্তব্যস্থল ‘এলিফ্যান্ট ফল।’ মেঘালয় রাজ্যে কিছুদূর পর পরই জলপ্রপাতের সন্ধান মিলবে। যেন সবুজের গা বেয়ে বয়ে চলেছে রাশি রাশি মণিমুক্তা!

মেঘালয়ে দ্বিতীয় দিন ট্যাক্সি নিয়ে ছুটলাম পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল স্থান চেরাপুঞ্জি, স্থানীয় মানুষ তাকে বলে সোহরা। শিলং থেকে ৫৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। যথারীতি সেদিনটাও ঘন বর্ষণে মুখর ছিল। আমার মূল আকর্ষণ ছিল ‘ডবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ’ দেখা। হ্যাঁ ঠিক পড়েছেন রুট ব্রিজ, যা জীবন্ত বৃক্ষের শিকড় দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়েছে। নংরিয়াট গ্রামের এই রুট ব্রিজে যেতে হলে ২৫০০ সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামতে হয়। ঘন জংগলে পথ হারাবার সম্ভাবনা শতভাগ। তাই ট্যাক্সিচালক বললেন একজন গাইড সাথে করে নিয়ে যেতে। গাইড হিসেবে পেলাম সে গ্রামের ছেলে ফিলযকে। বয়স ১৯/২০। অনার্স পড়ছে, চমৎকার ইংরেজি বলে। উল্লেখ্য মেঘালয়ে মোটামুটি সবাই কমবেশি ইংরেজি বলতে পারে। ছাতা মাথায়, রেইনকোট পড়ে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে নিচে নামতে নামতে ফিলযের সাথে গল্প করলাম। এ গ্রামে সর্বমোট ১৬টি পরিবার থাকে, সবাই খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। কিছুদূর নেমে একটা ছোট গীর্জাও দেখলাম উপাসনার জন্য আর ঘন জংগলের ফাঁকে ফাঁকে দু’একটা বাঁশের উঁচু ঘর। বৃষ্টির প্রকোপ বাড়ছিল তাই ছাতা মাথায় পাহাড় বেয়ে নামা যাচ্ছিল না। ছাতা বন্ধ করে পথ চলা শুরু হলো। খানিকদূর গিয়ে রেইনকোটকেও অসহনীয় লাগল কারণ এটা থাকা সত্ত্বেও বৃষ্টির জলে কাকভেজা অবস্থা। পথ যে আরও বাকি! শুধু বৃষ্টিই নয়, চারদিকের প্রকৃতি যেন সব প্রসাধন আর অলংকার পরে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

ডবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ, চেরাপঞ্জি

পিচ্ছিল পাহাড়ি সিঁড়ি আর পথ বেয়ে, জলে ভিজে আড়াই ঘণ্টা পর প্রথমে পৌছোলাম ‘সিংগল রুট ব্রিজ’ এ। গাছের শিকড় দিয়ে তৈরি সেতু যা বিশাল জলপ্রপাতের ওপরে ঝুলে আছে। গ্রামবাসীকে এপাশ থেকে ওপাশে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমিও পিচ্ছিল শিকড়ের সেতু দিয়ে জীবনে প্রথমবার পার হলাম, পড়ে যাবার ভয় হয়নি তবে বিশাল জলরাশির গর্জন আর জনশূন্যতায় এক ধরনের শিহরণ অনুভব করেছিলাম। এরপর আবার চড়াই উতরাই পেরিয়ে দ্বিতীয় সেতু মানে ডবল ডেকার দেখার আগে যে বস্তুটি পার হতে হয়েছিল তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। কয়েকটি মাত্র লোহার রডের তৈরি সেতু এবং নিচে যথারীতি গর্জনশীল, ফুলেফেঁপে ওঠা জলপ্রপাতের অবাধ্য জল। এক পা এদিক ওদিক তো শুকনো পাতার মত আমি জলের সাথে উধাও। গাইড ফিলযকে বললাম, ‘ভাই ফিলয এ সেতু পার হতে গিয়ে কি কেউ পিছলে যায়?’ নির্লিপ্তভাবে সে বলল, খুব কম। কয়েকবার ঢোক গিলে চললুম সেই দু তিন রডের পিচ্ছিল সেতু পার হতে। পার হয়ে দিলাম দৌড় কিন্তু ভারী বর্ষায় কত দ্রুতই বা যাওয়া যায়! শেষমেশ পৌঁছে গেলাম বহুল প্রতিক্ষিত ‘ডবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ’ এ। দু পাশে দুটো পাহাড়, মাঝখানে জলপ্রপাত আর সংযোগস্থল এই শিকড়ের সেতু। সত্যি জগতে কত যে আশ্চর্যজনক ব্যাপার-স্যাপার আছে নিজ চোখে না দেখলে বোঝা যায় না। গাছের শিকড় দিয়ে তৈরি সেতু তাও আবার দোতলা। আহা মনোরম!

এবার ফেরার পালা আড়াই হাজার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার যাত্রাটাও ছিল অসাধারণ অভিজ্ঞতায় ঠাসা। পথে গ্রামের এক খাসি পরিবারে চা খেতে খেতে আড্ডা আর তারও আগে আরও খানিক দূরে পাহাড় চড়তে চড়তে আরো গ্রামবাসীর সাথে আলাপ। এই পথ যদি শেষ না হতো!

উল্লেখ্য মেঘালয়ে মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়। পরিবারের পুরুষরা বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বসবাস করে, সন্তানেরা মায়ের পদবী লাভ করে। নারী পুরুষ সবাই কমবেশি সব কাজ করে। পুরুষরা রান্না, সন্তানপালনসহ অন্যান্য গৃহস্থালি কাজেও পারদর্শী। এও শুনলাম যে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি যাবার সময় পুত্ররা কেঁদেকেটে একসা হয়ে তবেই মাতৃগৃহ ত্যাগ করে।

বনের পথ ধরে চলার সময় দেখা মিলল কত না নাম না জানা বুনো গোলাপ, অর্কিডের মত অজস্র ফুলের।

ট্যাক্সি করে ছুটলাম চেরাপুঞ্জির কিছু বিখ্যাত জলপ্রপাত দেখার উদ্দেশ্যে। প্রথমে পথে পড়ল ‘সেভেন সিস্টারস ফল’। সাতটি জলপ্রপাত পাশাপাশি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে একে অন্যের সুখ দুঃখের সাথী হয়ে।

ডাওকি, তামাবিল সীমান্ত

‘মোসমাই ফল’ এর বৈশিষ্ট্য হলো তা বিশ্বের চতুর্থ উচ্চ জলপ্রপাত। যখন বিকেল গড়াতে চলল আর তখন পৌঁছোলাম ‘নহকালিকাই ফলস’ এ। একেকটা জলপ্রপাতের রয়েছে একেক রকমের ইতিহাস ও রোমাঞ্চকর গল্প।

রাতটা চেরাপুঞ্জি শহরে কাটালাম। সন্ধ্যেবেলায় ঠা-ায় হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে ঘুরে বেড়ালাম স্থানীয় বাজারে। চাখলাম কমলালেবু দিয়ে তৈরি মধু আর স্থানীয় উপাদেয় সব খাবার। স্থানীয় খাবার খুব স্বাস্থ্যসম্মত হয় কারণ তা রাঁধতে বনজ ঔষধি গাছপালা আর মসলা ব্যবহার করা হয়।

পরদিন আরেক দফা পাহাড় চড়ার জন্য পুরো দিন ঘুরে বেড়ালাম ‘ডেভিড স্কট ট্রেইল’ এ। ১৬ কিলোমিটার এ পাহাড়ি পথে এক পাহাড় থেকে অপর প্রান্তে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। জন বিবর্জিত এ পাহাড়ি এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক উপলব্ধ নয়। তাই হারিয়ে যাবার আদর্শ স্থান এটি। রাতে তাঁবু খাটিয়ে থাকলাম নক্ষত্রখচিত আকাশের নিচে, হিম ধরা ঠা-ায়। বৃষ্টি না থাকায় আবহাওয়া ছিল উপভোগ্য। বিদ্যুৎ নেই, কোনও ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র ব্যবহার করতে পারছিলাম না। সে কারণে আনন্দও কম ছিল না। ঝিঁঝিঁ আর জোনাকিপোকাদের সাম্রাজ্যে রাত্রিযাপন।

মেঘালয় রাজ্যে শেষ দিনে ভ্রমণ করলাম পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম ‘মাওলিনং।’ এ গ্রামে ধূমপান করা ও যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা নিষেধ। ছবির মত সুন্দর আর পরিচ্ছন্ন গ্রাম দেখলে শুধু মনে হয় এখানেই থেকে যাই।

পরবর্তী গন্তব্যস্থল ‘ডাওকি লেক’ যা ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত। শীতকালে এই লেকের জল এতই স্বচ্ছ হয়ে যায় যে নিচের সকল উদ্ভিদ প্রতীয়মান হয়। ডাওকিতে নৌকা ভ্রমণ করা যায়। ও পাশে বাংলাদেশের তামাবিল আর এপাশে ডাওকি যেন পাহাড়, ঝরনা, নদীর এক মিলনমেলা।

ভ্রমণ শেষে ফিরে এলাম নিজ দেশে, ডাওকি-তামাবিল সীমান্ত হয়ে। সাথে নিয়ে আসলাম মন ভোলানো অসাধারণ কিছু স্মৃতি।