।। লুৎফর রহমান রিটন ।।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিখ্যাত অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ির’ স্বপ্নদ্রষ্টার নাম কী? সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এ অনুষ্ঠানটির পরিকল্পক কে ছিলেন? কার উদ্যোগে বিটিভিতে প্রতিযোগিতামূলক এ অনুষ্ঠানটির সম্প্রচার শুরু হয়েছিল? এই তিনটি প্রশ্নের একটাই মিথ্যা উত্তর—প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

জোট সরকারের শাসনামলে (২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত) পাঁচটি বছর ধরে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে বিএনপি অবিরাম মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে বিটিভির নতুন কুঁড়ি অনুষ্ঠানের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং পরিকল্পক হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে নতুন কুঁড়ির স্বপ্নদ্রষ্টা কিংবা পরিকল্পক ছিলেন না জিয়াউর রহমান। বিএনপির সেই পাঁচ বছরের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীসহ জ্ঞানপাপী কিছু সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে অহেতুক গৌরবসিক্ত করার নির্লজ্জ অপচেষ্টা চালিয়েছেন অপরের কৃতিত্ব ছিনতাই করে!

একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করা যাক–

‘প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া শিশুদের স্মরণ করিয়ে দেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শিশুদের মেধা ও প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে নতুন কুঁড়ি চালু করেছিলেন।’ (দৈনিক যুগান্তর, ২০ জানুয়ারি ২০০৩)

জোট সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে প্রতিবছর(২০০১ থেকে ২০০৬) ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ টেলিভিশনের নতুন কুঁড়ির পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এ মিথ্যাচারটি করা হয়েছে। বিএনপিপন্থি লেখক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীরাও জিয়াউর রহমানের জন্ম কিংবা মৃত্যু দিবসে জিয়া স্মরণে প্রকাশিত তাদের রচনায় একই কাণ্ড করেছেন প্রতি বছর। দেশের প্রথমসারির একাধিক দৈনিকে প্রকৃত সত্য উল্লেখ করে আমি নিজে এ বিষয়ে লেখালেখি করেছি তখন। আমার কোনো লেখাকেই বিএনপিপন্থি কোনো লেখক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী চ্যালেঞ্জ করেননি এবং আমি নিশ্চিত এই লেখাটিকে এবং আমাকে চ্যালেঞ্জ করবেন না তারা বরাবরের মতো এবারও, বোধগম্য কারণেই। সাংবাদিক বোরহান আহমেদ (বর্তমানে প্রয়াত) ‘শহীদ জিয়াকে ঘিরে বেদনার্ত কিছু স্মৃতি’ শিরোনামে দৈনিক জনকণ্ঠে পরপর তিন বছর (৩০ মে, ২০০২-২০০৩-২০০৪) লিখেছেন ‘টিভিতে শিশুশিল্পীদের জন্য চালু করেছিলেন নতুন কুঁড়ি। তাদের জন্য শিশু একাডেমী করেছিলেন। তাদের বিনোদনের জন্য করেছিলেন শিশুপার্ক।’ (দৈনিক জনকণ্ঠ, ৩০ মে, ২০০৪)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, জোট সরকারের আমলে সাহিত্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত ডক্টর সাঈদ-উর-রহমান ‘জিয়াউর রহমানের শিশুপ্রীতি’ শিরোনামে লিখেছেন—’শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য তিনি বেশী কাজ করার সুযোগ পাননি। শিশু একাডেমী, শিশুপার্ক, টিভিতে নতুন কুঁড়ি কর্মসূচী, শিশুমন্ত্রণালয় প্রভৃতির নামই আমরা শুধু জানি।’ (দৈনিক আজকের কাগজ, ৩০ মে, ২০০৩)

জোট সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়কমন্ত্রী (বর্তমানে প্রয়াত) বেগম খুরশিদ জাহান হক নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ঠিকানাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে (২৪ মে, ২০০২) বলেছিলেন–‘প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম শিশুদের প্রতিভা ও মানসিক বিকাশের কথা চিন্তা করেছিলেন। তিনি তৈরি করেছিলেন শিশু একাডেমী, চালু করেছিলেন নতুন কুঁড়ি। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই যে, আজকের শিশুদের সার্বিক উন্নয়নের যে চিন্তা-ভাবনা সারাবিশ্বে করা হচ্ছে, সে চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন আমাদের নেতা জিয়াউর রহমান বহু আগেই। এবং আমি মনে করি জাতিসংঘ ১৯৯০ সালে যে চিন্তা করেছে, ১৯৭৬ সালে সেই চিন্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান করেছিলেন।’

পাঠক লক্ষ করুন, আমাদের দেশে (জাতিসংঘ বা সারাবিশ্বের কথা বাদ দিন) শিশুদের প্রতিভা ও মানসিক বিকাশের বিষয়টি প্রথম চিন্তা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া! শিশুসংগঠন মুকুল ফৌজ নয়, খেলাঘর নয়, কচি-কাঁচার মেলাও নয়! রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই নন, হাবীবুর রহমান ভাইয়া নন, বাগবান ভাই মোহাম্মদ মোদাব্বেরও নন! ওঁরা কেউ নন কেবলই প্রেসিডেন্ট জিয়া!

ফিরে আসি নতুন কুঁড়িতে। টিভির যে মেধাবী প্রযোজকের অসামান্য সাংগঠনিক তৎপরতায় নতুন কুঁড়ি অনুষ্ঠানটি দেশব্যাপী তুমুল আলোড়ন তুলেছিল তার নাম কাজী কাইয়ূম। কাজী কাইয়ূম গত হয়েছেন ২০০২ সালে। এ রচনাটি লেখার সময় কাইয়ূম ভাইকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধায়। ৮০-র দশকে এবং ৯০-র দশকের শুরুর কয়েক বছর নতুন কুঁড়ি টিম-এ আমিও কাজ করেছি কাইয়ূম ভাইয়ের সঙ্গে। কোনোদিন তিনি আমাকে একবারও বলেননি জিয়াউর রহমানের কথা। কাজী কাইয়ুমের নতুন কুঁড়ির টিম-এ আমরা অনেকেই যুক্ত ছিলাম প্রবলভাবে। যেমন, ফরিদুর রেজা সাগর। আমি ছিলাম স্ক্রিপ্ট রাইটার। টেলপে আমার নাম যেতো গ্রন্থনা/লুৎফর রহমান রিটন। মাঝে মধ্যে নির্দেশনার টেলপটিও থাকতো আমার নামেই।

নতুন কুঁড়ি যে প্রেসিডেন্ট জিয়ার পরিকল্পনার ফসল একথা কাইয়ূম ভাই কোনোদিন বলেননি। যেমন বলেননি আমাদের মন্টু ভাই অর্থাৎ বিটিভির অনন্যসাধারণ মেধাবী পুরুষ প্রখ্যাত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারও। মন্টু ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা বরাবরই আন্তরিক ও ঘনিষ্ঠ। এই বিষয়ে বহুবার বিস্তারিত কথা বলেছি আমি তাঁর সঙ্গে। আমার জানামতে, নতুন কুঁড়ির স্বপ্নদ্রষ্টা বা পরিকল্পক একজনই আর তিনি হচ্ছেন মুস্তাফা মনোয়ার। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ‘তোমাদের প্রিয়’ (তুষার আবদুল্লাহ ও জাবির মাহমুদ সম্পাদিত) নামের সংকলন গ্রন্থে প্রশ্নোত্তরে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার বলছেন—’নতুন কুঁড়ির কথাতো তোমরা সবাই জান। সবাইকে তোমাদের প্রতিভার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ‘৬৯ (ঊনসত্তর) সালে টেলিভিশনে আমি তোমাদের জন্য এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করি। প্রথমবার শুধু ঢাকার বন্ধুদের নিয়ে ৮/৯টি বিষয়ের ওপর প্রতিযোগিতা হয়। প্রথমবার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয় সরাসরি। রেকর্ডিং-এর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। আমার বাবা কবি গোলাম মুস্তাফার ‘নতুন কুঁড়ি’ কবিতার নামে অনুষ্ঠানের নাম রাখা হয়। নতুন কুঁড়ির শুরুতে যে গানটি শোন, সেটিই নতুন কুঁড়ি কবিতা। পরে ’\’৭৪ (চুয়াত্তর)-এ ১২টি বিষয় নিয়ে সারা বাংলাদেশের বন্ধুদের একত্রিত করে নতুন কুঁড়ির আয়োজন করা হয়।’ (তোমাদের প্রিয়জন, সময় প্রকাশন, পৃষ্ঠা ৩১)

পাঠক লক্ষ করুন, মুস্তাফা মনোয়ারের হাত ধরে নতুন কুঁড়ি ১৯৬৯-এ যাত্রা শুরু করা থেকে ১৯৭৪-এ বিস্তার লাভ করা পর্যন্ত জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় অনুপস্থিত। তিনি তো এলেন ১৯৭৫-এর পট পরিবর্তনের পর, খন্দকার মুশতাককে সামনে রেখে, ধিরে ধিরে। তাহলে?

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাকে ছিনতাই করা হয়েছে। বিএনপিপন্থিরা জিয়াউর রহমানকে বলেন—’স্বাধীনতার ঘোষক’। এদিকে আবার মুস্তাফা মনোয়ারের ব্রেন চাইল্ড নতুন কুঁড়িকে ছিনতাই করে বলা হচ্ছে—’জিয়াউর রহমান নতুন কুঁড়ি চালু করেছিলেন’!

সম্প্রতি হাতে আসা ‘জাতীয় টেলিভিশন শিশুশিল্পী পুরস্কার ২০০৩’ (সম্পাদক আলী ইমাম, প্রকাশক বাংলাদেশ টেলিভিশনের পক্ষে পিয়ার মোহাম্মদ) নামের একটি স্মরণিকায় দেখতে পাচ্ছি বিএনপিপন্থিদের সঙ্গে সুর মেলাচ্ছেন বিটিভির কতিপয় কর্মকর্তাও! ইতিহাস বিকৃতিতে শামিল হচ্ছেন বিটিভির একদল জ্ঞানপাপী প্রযোজক কর্মকর্তাও। ১৯ জানুয়ারি ২০০৪-এ নতুন কুঁড়ির পুরস্কার বিতরণী উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় বিটিভির তৎকালীন উপমহাপরিচালক মাহবুবুল আলম জানাচ্ছেন—’বাংলাদেশের সব শিশুরাই যেন তাদের প্রতিভা বিকাশের পথ খুঁজে পায় তার জন্যই নতুন কুঁড়ি নামের এই স্বাগত সুবর্ণ তোরণ নির্মাণ করেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্টপ্রতি জিয়াউর রহমান।’

তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আবু তাহের জানাচ্ছেন—’…এই উপলব্ধিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রবর্তন করেন জাতীয় টেলিভিশন শিশুশিল্পী পুরস্কার প্রতিযোগিতা নতুন কুঁড়ি।’

তৎকালীন পরিচালক (আন্তর্জাতিক) ও বিটিভির নতুন কুঁড়ির প্রধান সমন্বয়কারী আলী ইমাম বলছেন—’শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি চমৎকার উদ্যোগ হলো ‘নতুন কুঁড়ি’। তৎকালীন পরিচালক (ডিজাইন) শিল্পী আবদুল মান্নান বলছেন—’সে সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একান্ত ইচ্ছায় এই শিশু প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান শুরু হয়।’

ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ আর জ্ঞানপাপী বুদ্ধিজীবীদের কথা না হয় বাদই দিলাম কিন্তু বিটিভির কর্মকর্তারা কীভাবে অস্বীকার করবেন মুস্তাফা মনোয়ারকে? ওদের কী সামান্যতম লজ্জাবোধও নেই! উত্তর হচ্ছে–নেই।

অপরের কৃতিত্ব ছিনতাই করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে কতকাল গ্লোরিফাই করা যাবে? ইতিহাস সাক্ষী, সমসাময়িককালের পোষমানা লেখক-বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা রচিত মিথ্যা ইতিহাস—একদিন নিক্ষিপ্ত হয় ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই। ইতিহাসের গ্রহণ-বর্জন প্রক্রিয়াটি খুবই নির্মম-নিষ্ঠুর-নির্দলীয় এবং নিরপেক্ষ। ইতিহাস কখনোই মিথ্যাকে সত্য হিসেবে ধারণ করে না। ‘নতুন কুঁড়ি’র ক্ষেত্রেও ইতিহাস তার চিরকালের ঐতিহাসিক ভূমিকাটিই পালন করবে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে আর যা-ই হোক ‘নতুন কুঁড়ির’ স্বপ্নদ্রষ্টা বা পরিকল্পক হিশেবে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না।

রচনাকাল/ মে ২০০৫–মে ২০১৪

[ পুনশ্চঃ এই লেখাটা প্রথম লিখেছিলাম ২০০৫ সালে। পরে রচনাটা পুনর্বিন্যাস করেছিলাম ২০১৪ সালে। সম্পাদক আবেদ খানকে দিয়েছিলাম তাঁর সম্পাদিত তৎকালীন দৈনিকটিতে প্রকাশের জন্যে। তিনি এটা প্রকাশে অপারগতা প্রকাশ করলে দিয়েছিলাম নাঈমুল ইসলাম খানকে। তিনি দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার প্রথম পাতায় খুব গুরুত্ব দিয়ে লেখাটা প্রকাশ করেছিলেন। ]