কোতোয়লি দরজা

স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিনই এপথে যাতায়াত করেন হাজারো মানুষ। আসে যায় ট্রাক। ধুলো উড়িয়ে দানবীয় ট্রাকগুলো কিংবা পায়ে পায়ে হেঁটে চলা মানুষের দল এদেশ থেকে ওদেশে যেতে আসতে অতিক্রম করে এক ইতিহাসের দরজা। সে দরজার বিলুপ্ত স্থাপনার বুক চিরে দিয়ে আজ হয়তো দিব্যি আমরা বাংলাদেশ থেকে ভারতে কিংবা উল্টোদিকে ছুটছি। আজ যেমন দুদেশের সীমান্তরক্ষী আর সরকারি রাজস্ব আদায়কারীরা এর দুপাশে কড়া কড়া চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন, ঠিক তেমনই আজ থেকে ৮০০ বছর আগে এখানে পাহারা দিতেন গৌড় নগরীর কোতোয়ালরা। আর সে কারণেই এর নাম দেয়া হয়েছিলো কোতোয়ালি দরওয়াজা। আজও এর অবশিষ্টাংশ দাঁড়িয়ে আছে সোনামসজিদ-মহদিপুর সীমান্তের ভারত অংশে। বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে স্পষ্ট তা দেখা যায়। এই পুরাকীর্তি নিয়ে আমাদের আগ্রহ খুব কম থাকলেও ব্রিটিশদের আর্কাইভে গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষিত হয়েছে এই স্থাপনার কথা। লিখেছেন সুখেন্দু সান্যাল। ছবি তুলেছেন অজিত কুমার মাঝি শাহাবুদ্দিন মোমিন

দেখুন তো, চিনতে পারছেন কি না? কী, কষ্ট হচ্ছে বুঝি? তা তো হবারই কথা। ৮০০ বছর আগের এক নগরী তো আর যে সে ব্যাপার না! আর এই মানচিত্র তো মোটামুটি দুশ বছরের বেশি সময় আগে করা। আচ্ছা, নদীটাকে তো বুঝতে পারছেন, না কি? এই নদী হলো গঙ্গা। মানে, ভারত-ভাগ হবার মতো যে নদীর নামটাও দুভাগ হয়ে একপারে গঙ্গা, আরেক পারে পদ্মা হয়ে গেছে, এ সেই গঙ্গা।

তো মোদ্দাকথা এই যে, সেই গঙ্গা থুড়ি পদ্মার কোলে ৮০০ বছর আগে, বলা যায়, এক সভ্যতাই গড়ে উঠেছিলো। যে সভ্যতা বাঙলার আদি নিদর্শন, বাঙলার গর্ব। যে সময় আজকের পশ্চিমীরা হয় লুটেরা, না হয় বণিক হয়ে দিন কাটাতেন। বলছি গৌড়ের কথা। সেই যে প্রাচীন বাংলার রাজধানী, সেই গৌড়। এই মানচিত্রটি টমাস ফিসার ১৮১১ সালে তৈরি করেন।

কিন্তু এককালের সেই লুটেরা কিংবা সুযোগসন্ধানী বণিকেরা আধুনিক সভ্যতার নেতৃত্বে কেন? কারণ হলো, তারা ইতিহাসটাকে সংরক্ষণ করেছে। আর বাধ্যতামূলকভাবেই সেই ইতিহাসের আলোকে নিজেদের ভবিষ্যৎ সাজিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, তাদের সব থেকে বড় উপনিবেশের ইতিহাস তারা কোনোভাবেই দৃষ্টির আড়াল করেনি। ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির খরচে উইলিয়াম ড্যানিয়েল ১৭৮৬ থেকে ১৭৯৪ সাল অবধি পুরো বাংলা ঘুরে দেখেন তার ভাইপোকে নিয়ে। আর আঁকেন সেইসব ধ্বংসপ্রায় স্থাপনার চিত্র, যা বাংলার ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে ‍যুগে যুগে। আর তা করতে গিয়ে গৌড়ের জন্য আলাদা বরাদ্দই রাখতে হয়েছিলো, আজ যেসব চিত্র ও তথ্য ব্রিটিশ আর্কাইভে স্থান পেয়েছে। সেই সময়টায় কোতোয়ালি দরওয়াজার ছবিও তিনি আঁকেন।

ব্রিটিশ চিত্রকরদের কাজ সেটাই শেষ নয়। এরপর হেনরি ক্রেইটন আসেন ভারতবর্ষে। তিনি গৌড় ও পুন্ড্র ঘুরে আঁকেন সব স্থাপনার ছবি। ১৮১৭ সালে তিনি কোতোয়ালি দারওয়াজার এই ছবিটি আঁকেন।

কোতওয়ালী দরজাকে গৌড়-এর সিংহ দ্বার বলা হয়। প্রাচীন গৌড়ের উপনগরী থেকে মূল রাজধানীতে প্রবেশের একটিমাত্র মূল ফটক ছিলো এটি। নগর পুলিশের ফারসি প্রতিশব্দ ‘কোতওয়াল’-এর অনুকরণে এই দরজার নামকরণ করা হয়েছে। এখানে নগরপুলিশ (কোতওয়াল) গৌড় নগরীর দক্ষিণ দেয়াল রক্ষা করার কাজে নিয়োজিত থাকতেন।

বাংলাদেশের সীমানা থেকে কোতোয়ালি দরওয়াজা

বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার সোনামসজিদে বালিয়াদীঘি ডানে রেখে সোজা উত্তর পশ্চিমে ভারত সীমানার মধ্যে অবস্থিত কোতোয়ালি দরজা। এটি সীমান্তের জিরো লাইন থেকে দেখা যায়।

স্বাভাবিকভাবেই বর্তমান ভারতের মালদা থেকে বাংলাদেশে আসার পথে শেষ সীমানা হিসেবে থাকে এই কোতোয়ালি দরজা। ইতিহাস বলছে, রাজা শশাঙ্ক থেকে দেবপালের আমল পর্যন্ত ছিল গৌড়ের স্বর্ণযুগ। পঞ্চদশ শতাব্দীর স্থাপত্যগুলি এখনও সেখানে মাথা উঁচু করে রয়েছে। বাংলার এককালীন রাজধানী অবিভক্ত বাংলায় গৌড়় ছিল বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। শশাঙ্কের রাজধানী হিসেবে গৌড়ের যে গল্প আমরা ইতিহাস বইয়ে পড়েছি, তার অস্তিত্ব এখন নেই কিন্তু মুসলমান শাসকরা গৌড় অধিকার করার পরেও বাংলার রাজধানী গৌড়েই থেকে গিয়েছিল তার একাধিক নিদর্শন রয়ে গেছে আজও। 

এমনকি মালদহ জেলার নামকরণ হয়েছে এই জেলার আদি বাসিন্দা ‘মলদ’ নামের কৌমগোষ্ঠীর নাম থেকে। অন্য আরেক মতে ফার্সি শব্দ ‘মাল’ এবং বাংলা শব্দ ‘দহ’- এই শব্দদ্বয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে মালদহ। ফার্সি শব্দ ‘মাল’- এর অর্থ ধনসম্পদ। পাণিনি তার লেখায় এই অঞ্চলের নাম লিখেছিলেন ‘গৌড়পুরা’। প্রাচীন জনপদের উল্লেখ রয়েছে একাধিক পৌরাণিক কাহিনি ও গ্রন্থে৷ পুণ্ড্রনগর ছিল মৌর্য সাম্রাজ্যের একটি বিভাগীয় সদর দফতর৷

ভারতের সীমানা থেকে কোতোয়ালি দরওয়াজা

বগুড়া জেলার মহাস্থানগড় থেকে উদ্ধারকৃত ব্রাহ্মীলিপিতে খোদাই করা এক শিলালেখ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে গৌড় ও পুণ্ড্রবর্ধন অঞ্চল পুর্বে মৌর্য সাম্রাজ্যের অংশ ছিল৷ সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর প্রায় তিন দশক যাবৎ কর্ণসুবর্ণের রাজা ছিলেন গৌড়রাজ শশাঙ্ক। তিনি স্বাধীনভাবে শাসন করেন গৌড়৷ পরে ধীরে ধীরে পাল সাম্রাজ্যের দখলে আসে তা৷ পালরাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক। তদের আমলে গড়ে ওঠে একাধিক বৌদ্ধবিহার৷ পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্থান ঘটে সেন বংশের৷ সেনরাজারা আবার হিন্দুধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন৷ রাজা লক্ষ্মণ সেনের সময় গৌড়ের নাম হয় লক্ষ্মণাবতী৷ পরে মোগলদের দখলে আসে গৌড়। সম্রাট হুমায়ুন এখানকার আমের স্বাদে তৃপ্ত হয়ে এই অঞ্চলের নাম দেন জান্নাতাবাদ৷

১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দের পর মুসলিম সাম্রাজ্যের পতন ঘটে ও ব্রিটিশসহ কোচ রাজবংশের প্রভাব বাড়তে থাকে৷ ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজ সরকার শাসনভার গ্রহণ করে ও তাঁরা মহানন্দা নদীর দক্ষিণ পাড়ে স্থিত হয়ে কুঠী নির্মান শুরু করে ৷ প্রথমদিকে ব্রিটিশরা নীলচাষ , পরিবহন, ব্যবসার কিছু কেন্দ্র ও  কিছু সরকারি দফতর চালু করে ৷ উইলিয়াম ক্যারি সেই দায়িত্ব নেন৷ এদিকে দিনের পর দিন গৌড়ের পুরোনো খ্যাতি ও ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে থাকে। আর সেগুলোর স্মৃতি ধরে রাখতেই ব্রিটিশরা একের পর এক তাদের চিত্রশিল্পীদের দিয়ে এসব স্থাপনার চিত্রকর্ম আঁকার কাজ শুরু করে।

ঐতিহাসিক এই স্থাপনার নির্মাণকাল নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে ঐতিহাসিক ও পুরাতাত্ত্বিকদের মধ্যে।

জেনারেল ক্যানিং হ্যামের মতে, সুলতান আলাউদ্দীন খিলজীর মৃত্যুর পর গৌড় লক্ষ্মণাবতীতে দিল্লির আধিপত্য কায়েমের সময় নগর রক্ষা প্রাচীরের অভ্যন্তরে এ বিশালাকার তোরণটি নির্মিত হয়। এ মত সমর্থন করলে তোরণটি সম্ভবত ১২২৯ খ্রিষ্টাব্দ, অর্থ্যাৎ ৬২৭ হিজরি সনের কিছু পর নির্মিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

ড. দানির মতে বাংলার সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলের প্রথমার্ধে পাণ্ডুয়া হতে গৌড়ে রাজধানী স্থানান্তর হওয়ার পর রাজধানীর নগর দ্বার হিসেবে এটি নির্মিত হয়। এম আবিদ আলী খানের মতে, ফটকটি গৌড়ের প্রাপ্ত সর্ব প্রাচীন মুসলিম লিপির (১২৩৪ খ্রিষ্টাব্দ) সুলতান ইলতুতমিশ ও আলাউদ্দীন খিলজীর মৃত্যুর (১৩১৫ খ্রিষ্টাব্দ) মধ্যবর্তী কোনো সময়কার।

নির্মাণশৈলি দেখলে এর প্রবেশপথের মধ্যবর্তী খিলানের উচ্চতা ৯.১৫ মিটার এবং প্রস্থ ৫.১০ মিটার। প্রবেশপথের পূর্ব ও পশ্চিমদিকের সচ্ছিদ্র প্রাচীর রয়েছে। এ ছিদ্রগুলি দিয়ে শত্রুর ওপর গুলি বা তীর ছোড়া হতো। এটির ৩০ ফুট উঁচু ও ১৬ ফুট ৯ ইঞ্চি প্রশস্ত একটি খিলান পথ ছিলো। কোতয়ালী দরজার মধ্যবর্তী রাস্তা ১৭ ফুট ও ৪ ইঞ্চি। বর্তমানে খিলান ভেঙ্গে পড়েছে। এটা সম্পূর্ণরূপে গৌড়িয়া ইটের তৈরি।

নগর রক্ষা দুর্গের ফটকগুলোর স্থাপত্য রীতির চেয়ে এ ফটকটির স্থাপত্য রীতি অনেক পূর্বের। ভিতরে ও বাইরে প্রতিটি সম্মুখভাগে ৬ ফুট ব্যাস বিশিষ্ট দু’টি করে মোট চারটি অর্ধবৃত্তাকার বুরুজ রয়েছে। বুরুজগুলোর প্রতি পার্শ্বে অলংকৃত স্তম্ভের উপর স্থাপিত সুচালো খিলানযুক্ত গভীর কুলাঙ্গী রয়েছে। এ তোরণ অভ্যন্তরে সশস্ত্র পুহরীদের আবাস কক্ষগুলি বিভিন্ন প্রকার নকশাযুক্ত কারুকাজ ও পোড়া মাটির অলংকরণে সুসজ্জিত।

মজার ব্যাপার হলো, প্রাচীন গৌড়ের সীমানার মধ্যে আরও তিনটি দরজার হদিস মেলে- দাখিল দরজা, লুকোচুরি দরজা ও গুমতি দরজা। পরে কোনো একদিন এসব দরজা নিয়ে কথা বলা যাবে।

Berger Weather Coat