চির অনন্তের পথে অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। রোববার ভারতীয় সময় ১২টা ১৫ মিনিটে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে অভিনেতা, আবৃত্তিকার, কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। ১২টা ১৫ মিনিটে তাঁর মৃত্যুর ঘোষণা দেয়া হয়। হাসপাতালের ৪১ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে চলে গেলেন তিনি। তার মৃত্যুতে শোকাহত পুরো বাংলা সিনেমার জগৎ। বাংলাদেশে বসে এই অভিনেতার জন্য চোখের পানি ফেলছেন আরেক কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় সৌমিত্রের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। এ বিষয়ে নানা স্মৃতিচারণ করলেন ববিতা। উত্তরকালের পক্ষে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মাসুম আওয়াল

আপনি নিশ্চয় শুনেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর নেই

ববিতা: বর্ষীয়মান অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অসুস্থ হওয়ার সংবাদ শোনার পর থেকেই মনটা ভীষণ অস্থির হয়ে ছিল। প্রায় একটা মাস তার জন্য আশঙ্কায় কাটিয়েছি। শুধু আমি না, সারা বাংলার শিল্পীরা তাকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। বেশ যত্নের সঙ্গেই তার চিকিৎসা চলছিল। ভেবেছিলাম তাকে আরও কিছু দিন আমাদের মাঝে পাবো। অবশেষে আজ তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। এ মুহূর্তে আসলে কিছু বলার ভাষা নেই আমার।

শুধু কলকাতার বাংলা সিনেমা নয়, পুরো বাংলা সিনেমার অভিভাবক ছিলেন তিনি। ছিলেন অভিনয় জগতের বিশাল এক বটবৃক্ষ। যার তলায় বর্তমান বাংলা সিনেমার জগৎ বিরাজ করছে।

সত্যজিৎ রায়ের অশনি সংকেতে অভিনয় করেছিলেন আপনারা সেই সময়ে টুকরো কিছু স্মৃতি জানতে চাই।

ববিতা: তাঁর সঙ্গে আমার অসংখ্য স্মৃতি। খুব অল্প বয়সে তাঁর সঙ্গে এই সিনেমাটিতে অভিনয় করতে গিয়েছিলাম। এত বড় একজন অভিনেতার সঙ্গে অভিনয় করছি। শুরুতে খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম। না জানি কেমন তিনি! কিন্তু দেখলাম উনি একজন মাটির মানুষ। এত আপন করে নিয়েছিলেন যে আমার মোটেও মনে হয়নি আমি একজন বিদেশি অভিনেতার সঙ্গে অভিনয় করছি।

শুটিংয়ের ফাঁকে আমাকে নিয়ে চলতো হাসি-ঠাট্টা। শুটিংয়ের বিরতিতে তাকে এক্সারসাইজ করতে দেখতাম। কবিতা আবৃত্তি করতে দেখতাম। সবাইকে মাতিয়ে রাখতে পারতেন তিনি।

আপনারা তো অনেক ফেস্টিভ্যালেও একসঙ্গে গেছেন?

ববিতা: হ্যাঁ। অশনি সংকেত সফল হওয়ার পরে আমরা একসঙ্গে বার্লিন ফেস্টিভ্যালে জার্মানিতে গিয়েছি। সেখানে আমাদের পুরস্কৃত করা হলো। কী অপূর্ব সেই দিনগুলোর অভিজ্ঞতা।

আপনার সঙ্গে শেষ কবে দেখা হয়েছিলো সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের?

ববিতা: আমি যখনই কোলকাতা যেতাম তখনই তার খোঁজখবর নিতাম।  তাঁকে ফোন করতাম। অনেক কথা হতো। আমাকে বলতেন, ‘এই ববিতা শুনলাম, তুমি প্রচুর পুরস্কার পাচ্ছ আজকাল। তুমি অনেক সিনেমা করছো। তোমার প্রশংসা শুনতে পাচ্ছি।’ আমি বলতাম, ‘এই তো চলছে দাদা’। উনি বলতেন, ‘তুমি যখন অশনি সংকেত ছবিতে অভিনয় করেছো তখনই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, তুমি একদিন অনেক বড় অভিনেত্রী হবে।  তোমার মধ্যে সেই ব্যাপারটা ছিল।

কো আর্টিস্ট হিসেব সৌমিত্রকে নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

ববিতা: আমি যখনই শট দিতাম তখনই উনি মানিক দার ক্যামেরার পাশে দাঁড়িয়ে আমার অভিনয় দেখতেন। তার বিচক্ষণতা দেখে খুব ভালো লাগতো। এতো বড়মাপের একজন অভিনেতা ছিলেন তিনি। অল্প কথায় সেটা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। তার গুণের কথা সবাই জানেন।

সৌমিত্র অনেকবার ঢাকাতেও এসেছেন তখন আপনার সঙ্গে দেখা হতো?

ববিতা: মনে পড়ে সোমিত্র দা একবার ঢাকায় আসলেন। তাকে দেখে আমি ভুলেই গেছি আশেপাশে অনেক লোক আছে। আমি দরজা থেকে ছুটি গিয়ে বাচ্চা শিশুর মতো সৌমিত্র দা বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। বারবার বলছিলাম, সৌমিত্র দা… সৌমিত্র দা কেমন আছেন? মোট কথা সৌমিত্র দার সঙ্গে আমার এক ধরনের আত্মার সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। উনি অনেক ব্যস্ত ছিলেন, আমিও এদিকে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের দেখা অনেক কম হতো। কিন্তু যখনই আলাপ হতো, মনে হতো কতকাল ধরে আমাদের যোগাযোগ।

তার কাছ থেকে পাওয়া কোনো নির্দেশনার কথা মনে পড়ে?

ববিতা: সত্যজিৎ বাবুর সিনেমায় যারা অভিনয় করে, তাদের ব্যাপারগুলোই তো আলাদা। মনে পড়ে আমি একটা শট দিচ্ছি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। ডায়ালগ বলছি। আমার যাতে সুবিধে হয় উনি আমার পাশে দাঁড়িয়ে উনার ডায়ালগ বলে যাচ্ছেন, আমি আমার উত্তর বলে যাচ্ছি। এই জিনিসগুলো কিন্তু সহজে কেউ করে না। এই সহযোগিতাগুলো কখনই ভোলার নয়। সত্যজিত রায়ের ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় সৌমিত্র দার কারণেই হয় তো খুব সাবলিলভাবে আমি অভিনয় করতে পেরেছিলাম।

সব শেষে কী বলতে চান?

ববিতা: জীবনের শেষ বেলায় এসেও নিয়মিত অভিনয় করে গেছেন তিনি। অসুস্থ হওয়ার কিছু দিন আগেও তিনি একটি সিনেমার শুটিং করেছেন। উনি যে এ জগৎটা কতো ভালোবাসতেন। সবাই জানেন সত্যজিৎ রায়ের খুব প্রিয় একজন শিল্পী ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তার অধিকাংশ সিনেমায় অভিনয় করেছেন। তাকে পছন্দই করবেন না কেন, এমন ভদ্র মার্জিত মানুষ ও ভালো অভিনেতা খুব কমই হন। শেষে এটুকুই বলতে পারি আমরা এক বটবৃক্ষকে হারালাম।

Berger Weather Coat