লঙ্গেওয়ালার লড়াই

।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

লঙ্গেওয়ালা। রাজশাহী থেকে অন্তত আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরের এক ছোট্ট সীমান্ত শহর। ভারতের এই শহরটি রাজস্থানের জয়সলমিরে অবস্থিত। কী? শুনেছেন নাম? হয়তো শুনেছেন কিংবা শোনেননি। কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী লড়াই হয়েছিলো ১৯৭১ সালে।

আমাদের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ এ কারণেই যে, এই যুদ্ধে পাকিস্তানীরা জিততে পারলেই ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজেদের ভূমিকা সঙ্কুচিত করতে বাধ্য হতো। এর বাইরে, আসলে এই যুদ্ধটা পাকিস্তানীরা বাধিয়েছিলোই এই কারণে যে, ভারত যেনো তার নিজের সীমান্ত নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ নিয়ে মাথা ঘামাতে না পারে।

তারিখটি ছিলো ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর। খুব সংক্ষেপে এর আগের সপ্তাহের চিত্র ছিলো এমন- ২২ নভেম্বর, পুরোদমে যুদ্ধ শুরুর দশ দিন আগে আন্তর্জাতিক সীমানার কাছে ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তি বাহিনীর অবস্থান আক্রমণ করে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর এফ-৬৪ স্যাব্রে জেট। বয়রার যুদ্ধে চারটি পাকিস্তানি স্যাব্রেকে গুলি করে নামায় ভারতীয় ফল্যান্ড ন্যাট। ৩ ডিসেম্বর ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর আগে শ্রীনগর, আম্বালা, সিরসা, হালওয়াড়া ও যোধপুরে বিমানবাহিনীর স্থাপনার উপর পাকিস্তান বিমানবাহিনী অপারেশন চেঙ্গিজ খান নামে কয়েকটি প্রাকযুদ্ধ হানা চালায়। কিন্তু ভারতীয় বিমানবাহিনীর সুচতুর কৌশলের কাছে তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।

এরপর আসে সেই উল্লেখযোগ্য দিন। ১৯৭১-এর স্থলযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী রাজস্থান সীমান্তের একটি ছোট্ট অথচ গুরুত্বপূর্ণ চৌকি দখল করতে গিয়ে মুখে পরাজয়ের চুনকালি মেখে এবং বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে পশ্চাৎপসরণে বাধ্য হয়। পাকিস্তানের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ লঙ্গেওয়ালা সীমান্ত চৌকি দখলে নিয়ে সহজেই রাজস্থানের জয়সলমীর ও আশপাশের শহরগুলোসহ এক বিশাল ভূখণ্ড দখল করা যাতে পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে ভারতের সাথে দর-কষাকষিতে সুবিধাজনক স্থানে থাকা যায়। কিন্তু ভাগ্য পাকিস্তানকে সাহায্য করেনি।

পাকিস্তান ৪ ডিসেম্বর রাতের আঁধারে লঙ্গেওয়ালা দখলে অভিযান শুরু করে। পাকিস্তানি কমান্ডাররা শুরু থেকেই একের পর ভুল করায় এ অভিযান সম্ভাব্য বিজয়ের পরিবর্তে মর্মান্তিক ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সবচেয়ে বড় ভুল তারা যেটা করেছিলেন তা হলো ভারতীয় বিমান সমর্থনের বিষয়টি তারা বিবেচনাতেই আনেনি। তারপর থর মরুভূমি অঞ্চলের বালিময় মাটি যে ট্যাংক, আর্মার্ড কারসহ অন্যান্য সামরিক যানবাহন চলাচলের কতটা উপযোগী, সে বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য ছিল না।

পাকিস্তান এ অভিযানে ২টি ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড ও ২টি আর্মার্ড রেজিমেন্ট মোতায়েন করে। এদিকে লঙ্গেওয়ালা চৌকিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ভারতীয়রা সেখানে আগেই মেজর কে এস চাঁদপুরীর নেতৃত্বে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি মোতায়েন করে। অন্য দিকে গোটা সীমান্ত চৌকি এলাকা তিন পর্বের কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা ছিল যা পাকিস্তানি সৈন্যদের জানা ছিল না। মেজর চাঁদপুরীর নিয়োজিত স্কাউট টিম পাকিস্তানি সেনাদের এগিয়ে আসার খবর যথাসময়ে তাকে জানায়। অন্যদিকে সীমান্ত এলাকায় টহলরত ভারতীয় সেনা গোয়েন্দা বিমানও বিষয়টি নিশ্চিত করে। চাঁদপুরী পুরো বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে জরুরি সাহায্য পাঠানোর অনুরোধ জানান। কিন্তু তাকে জানানো হয় যে অন্যূন ৬ ঘণ্টার আগে কোনো সাহায্য পাঠানো যাবে না।

এ অবস্থায় তাকে চৌকি ছেড়ে চলে আসা অথবা প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে বলা হয়। মেজর চাঁদপুরী তার সৈন্যদের নিয়ে লড়াই শুরু করেন। সারারাত লড়াই করেও পাকিস্তানি সৈন্যরা চৌকিটি দখল করতে ব্যর্থ হয়। পরদিন ভারতীয় বিমানবাহিনীর আক্রমণে গোটা পাকিস্তানি বাহিনী ভীষণ অসহায় হয়ে পড়ে। তারা পাল্টা কোনো বিমান সমর্থন পায়নি। নরম বালির মধ্যে আটকা পড়ে পাকিস্তানি ট্যাংক ও সামরিক যান। সেগুলো ধ্বংস হয় অথবা আটক হয়। অবশিষ্ট সৈন্য, ট্যাংক ও সামরিক যান পশ্চাৎপসরণ করে।

আন্তর্জাতিক সামরিক পড়ুয়াদের এই যুদ্ধের ইতিহাস ও কৌশল পড়ানো হয়ে থাকে। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কোনো যুদ্ধে এত ট্যাংক বা সামরিক যানবাহন ধ্বংসের ঘটনা ঘটেনি। পাশাপাশি এই যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের কারণেই বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের লড়াইয়ে ভারত আরও শক্তি নিয়োগ করে।

সেই লড়াইয়ের ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে এবার। আর সেই সময়েই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সেই যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করলেন দীপাবলির দিনে। রীতি অনুযায়ী এবারও দেশটির প্রধানমন্ত্রী তাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে দীপাবলি উদযাপন করেন। এবার সেটি তিনি করেছেন সেই লঙ্গেওয়ালাতেই।

সদ্যই সীমান্তে ভারত-পাকিস্তান লড়াইয়ের আঁচ লাগা সময়ে দীপাবলির ভাষণে নরেন্দ্র মোদী টেনে আনেন ৫০ বছর আগের সেই লড়াইকে। তিনি বলেন, ‘এটা সেই সময় ছিল যখন পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের নিরাপরাধ নাগরিকদের ওপর অত্যাচার করছিল, জুলুম করছিল, হত্যা করছিল। মা-বোনেদের উপর অমানুষিক অত্যাচার করছিল। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর এই কুকীর্তি, সারা পৃথিবীতে পাকিস্তানের ঘৃণিত চেহারার মুখোশ খুলে দিয়েছিল।’

সেই সময় পাকিস্তানের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোদি বলেন, ‘পাকিস্তানের ভয়ঙ্কর রূপ বিশ্বের সামনে প্রকাশ পাচ্ছিল। এসব কিছু থেকে বিশ্বের নজর সরানোর জন্য পাকিস্তান আমাদের দেশের (ভারতের) পশ্চিম সীমান্তে হামলা করে। পাকিস্তান ভেবেছিল ভারতের পশ্চিম সীমান্তে হামলা করে বিশ্বকে ভারত এই করেছে, সেই করেছে বলে কান্না জুড়ে দেবে, আর তাতে বাংলাদেশে তাদের সমস্ত পাপ ধুয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের সৈনিকরা তাদেরকে যে উপযুক্ত জবাব দিয়েছিল, তাতে পাকিস্তানকে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছিল।’

মোদি বলেন, ‘এখন যখন ১৯৭১ সালের যুদ্ধের এবং লঙ্গেওয়ালার যুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তি হতে চলেছে, কয়েক সপ্তা পরেই আমরা এর ৫০ বছর, এই গৌরবপূর্ণ সোনালী অধ্যায়ের সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করব। সেই প্রেক্ষিতে আজ আমার এখানে আসার ইচ্ছে হয়েছে।’

মোদি আরো বলেন, ‘গোটা দেশ এই বীরেদের বিজয়গাথা শুনে নিজেদের গৌরবান্বিত অনুভব করবেন। তাঁদের সাহস বাড়বে, নতুন এবং আগামী প্রজন্ম এই পরাক্রম থেকে প্রেরণা নেয়ার জন্য এটি তাঁদের জীবনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দেবে।’

Berger Weather Coat

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.