জঙ্গি উত্থানের জন্য বিএনপিকে দায়ী করেছিলেন আবু হেনা

।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

২০০৪ সালের এপ্রিল থেকে তার নির্বাচনী এলাকাতেই আবির্ভাব ঘটে বাংলাদেশের ভয়ঙ্করতম এক জঙ্গি নেতার। সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই রাজশাহীর বাগমারা থেকেই শুরু করে তার ত্রাসের রাজত্ব। আর বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সেই আমলে ওই আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন আবু হেনা।

বাংলাভাই, শায়খ আবদুর রহমান ও তাদের বাহিনীর হাতে একের পর এক হত্যা আর নির্যাতন দেশ বিদেশের সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়ে ওঠে। তারপরেও দীর্ঘ সময় তাদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো সেই সময় সরকারপ্রধান নিজে বলেছিলেন, ‘বাংলাভাই মিডিয়ার সৃষ্টি’। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ২০০৫ সালে রাজশাহীর পর্যটন মোটেলের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলন করেন আবু হেনা। সেদিন তিনি বাংলাভাই ও জঙ্গিবাদের উত্থানের জন্য সরাসরি সরকারি দলের নেতাদের একটি অংশকে দায়ী করেন।

শনিবার (১৪ নভেম্বর) ঢাকায় করোনাক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যুবরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গিবাদের উত্থানের সেই সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী বিদায় নিলেন।

সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক প্রত্যক্ষ সহায়তা ও সমর্থন দিয়ে বাংলাভাইকে বাগমারা এলাকায় উত্থানের পথ তৈরি করে দিয়েছেন। আবু হেনা সেদিন বলেছিলেন, ‘এভাবে প্রকাশ্যে দিনে দুপুরে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কোনো জঙ্গি যত বড়ই হোক না কেন, প্রশাসনের সহায়তা ছাড়া যাকে তাকে তুলে নিয়ে মেরে ফেলতে পারে না। যখন এসব একের পর এক ঘটতে থাকে, তখন বুঝতে হবে এর পেছনে বড় কোনো শক্তি আছে।’

সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে আবু হেনা দাবি করেছিলেন, বাংলাভাই ও জঙ্গিদের উত্থানের পর তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন। কিন্তু ব্যারিস্টার আমিনুল হকসহ আরও কিছু বিএনপি নেতার প্রশ্রয়ের কারণে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

আবু হেনা এই সংবাদ সম্মেলনের পর ফিরে যান যান ঢাকায়। আর সেদিনই তাকে দল থেকে বহিস্কার করে বিএনপি। ফলে কয়েকদিনের জন্য তিনি প্রকাশ্যে আসা ছেড়ে দেন। এ অবস্থার মধ্যেই ঢাকায় একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও একটি ইংরেজি পত্রিকা পৃথকভাবে তার সাক্ষাৎকার নেয়। সেখানে আবু হেনা আরও বড় বিপদের কথা বলেছিলেন। সেদিন তিনি বলেন, ‘বিএনপি যদি এখনও এর (জঙ্গিবাদের ‍উত্থান) বিপদ না বুঝে থাকে, তাহলে আগামী দিনে চরম মূল্য দিতে হবে।’ সেই সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেছিলেন যে, শুধু তিনি একা নন, বিএনপির আরও অন্তত ১০০জন সংসদ সদস্য জঙ্গি ইস্যুতে তার মতো একই মনোভাব পোষণ করেন।

এরপর সেবছরই তাকে দল ও প্রশাসনের ব্যাপক চাপের মুখে দেশ ছাড়তে হয়। এক এগারোর সময়ে আবু হেনাকে সংস্কারপন্থি হিসেবে দেখে থাকেন দলটির অনেক নেতা। ২০০৯ সালের নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন চাননি। কিন্তু পরে তাকে ফিরিয়ে নেয়ায় ২০১৮ সালে দলের মনোনয়ন পেয়ে অংশ নেন নির্বাচনে। যদিও এবার মাঝপথে তিনি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। যাবার আগে সংবাদ মাধ্যমে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আর রাজনীতিতে ফিরছি না। এলাকায় আসবো, তবে রাজনীতি নয়।’

পরবর্তীতে গ্রেফতারের পর আদালতে সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলাভাইয়ের দেয়া জবানবন্দিতে আবু হেনার সেই অভিযোগের সত্যতা মেলে। জবানবন্দিতে বলা হয়, সর্বহারা নিধন অভিযানের শুরুতে রাজশাহী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শীষ মোহাম্মদের বাসায় তাদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ঐ বৈঠকে তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের সঙ্গে বাংলা ভাইয়ের মোবাইল ফোনে কথোপকথন হয়। সর্বহারা নিধন অভিযান চলাকালে ব্যারিস্টার আমিনুল হক ছাড়াও তৎকালীন ভূমি উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, গৃহায়ন ও পূর্ত প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির, সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফা, শামছুদ্দিন প্রামাণিক ও ডা. ছালেক চৌধুরী এবং রাজশাহী সিটি মেয়র মিজানুর রহমান মিনুর সঙ্গে সার্বক্ষণিক মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হতো। 

জবানবন্দিতে বাংলা ভাই আরো বলেন, প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবিরের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হওয়ার সময় তিনি বহুবার তার বাড়িতে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। অভিযান চলাকালে সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফা জেএমবির তহবিলে ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। এ টাকা তিনি পুঠিয়া থানার ওসির মাধ্যমে তার কাছে পৌঁছে দেন। তৎকালীন ভূমি উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর নাটোরের বাসায় তার সঙ্গে বাংলা ভাইয়ের অন্তত ১০ মিনিট বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় উপমন্ত্রী তাকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। বাগমারা অভিযান চলাকালে তৎকালীন রাজশাহী সিটির মেয়র মিজানুর রহমান মিনু তাকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। বাগমারা এলাকার সংসদ সদস্য আবু হেনা জেএমবির অভিযানের বিরোধিতা করেন। পরে এলাকার জনসাধারণের চাপে তিনি তার ভাতিজাকে জেএমবির অপারেশনে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেন বলে সেই জবানবন্দিতে জানিয়েছিলো বাংলাভাই।

আবু হেনা সরকারি আমলা হিসেবে কর্মজীবনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন পদে চাকরি করেন। যুগ্মসচিব হিসেবে চাকরিজীবন থেকে অবসর নিয়ে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। প্রথমে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইলেও তাতে ব্যর্থ হয়ে ১৯৯৬ সালে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য হন। ২০০১ সালেও তিনি সাংসদ ছিলেন।

Berger Weather Coat