যমুনা ব্যাংক আবরার মাজহার

।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

যমুনা ব্যাংকের রাজশাহী শাখা থেকে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে সাবেক দুই ব্যাংকরের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর যোগসাজশে ১০ কোটি ৭৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

২০১৩ সালের আগে কয়েক বছরে একের পর এক পৃথক ৮টি জালিয়াতির ঘটনা ঘটে ব্যাংকটিতে। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে সবগুলো ঘটনায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সম্প্রতি একটি মামলার রায়ে ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপক আবরার হোসেন খান ও সিনিয়র অফিসার মাজহারুল ইসলামকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৭০ লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও ১ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। তাদের বিরুদ্ধে আরও ৭টি মামলা বিচারাধীন। চাকরিচ্যুত এই দুই কর্মকর্তাকে ঘটনার পর থেকে গ্রেফতার করা যায়নি। ফলে এখনও মামলায় তাদের পলাতক হিসেবে ধরা হচ্ছে।

ব্যাংক, দুদক ও আদালত সূত্রে জানা যায়, বিচারাধীন ৭টি মামলায় এই দুই সাবেক ব্যাংকারের সঙ্গে জাল কাগজপত্রে ঋণগ্রহীতা ব্যবসায়ীদের আসামী করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন রিপন হাজি, রিপা এন্টারপ্রাইজের রবিউল ইসলাম, স্বাধীন এন্টারপ্রাইজ ও খাজা তারেক।

সূত্র মতে, প্রতিটি ঘটনায় ব্যবসায়ীদের নামে জাল কাগজপত্র তৈরি করে ব্যাংকে দাখিল করে ঋণ পাইয়ে দেয়া হয়েছে। তদন্তে জানা গেছে, ওই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাবেক দুই ব্যাংকারের পারিবারিক সম্পর্কও ছিলো। সেই সুবাদে ঋণের টাকা তুলে নিজেদের মধ্যে বাটোয়ারা করে নেন তারা। এমনকি ঢাকায় একসঙ্গে ফ্ল্যাট কেনার তথ্যও উঠে এসেছে তদন্তে।

এক ঋণগ্রহীতার আত্মহত্যা

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে রাজশাহীর দাপুটে ব্যবসায়ী ছিলেন খন্দকার মাইনুল ইসলাম। বিএনপির নগর কমিটির সহ সভাপতি হিসেবে রাজনীতি করতেন চুটিয়ে। প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার ছিলেন। আবার জেলা ক্রীড়া সংস্থার নেতৃত্বেও ছিলেন অনেকদিন। রাজশাহীতে তো বটেই, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় সব ঠিকাদারী কাজ করতেন তিনি। পরে তিনি জেলা বিএনপির সহ সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন।

ব্যাংক ও দুদক সূত্রে জানা যায়, প্রভাবশালী এই ব্যবসায়ী নিয়মিত লেনদেন করতেন যমুনা ব্যাংকে। সুবাদে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে ব্যাংকটির তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক আবরার ও সিনিয়র অফিসার মাজহারের সঙ্গে। সেই সূত্র ধরে খন্দকার মাইনুলের নামে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়।

সূত্র জানায়, এই ঋণটি গ্রহণের ক্ষেত্রে যে কাগজপত্র দাখিল করা হয়, তাতে দেখানো হয়, খন্দকার মাইনুল গোপালগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি ঠিকাদারি কাজ সম্পন্ন করছেন। সেই কাজের বিপরীতেই এই ঋণ। কিন্তু ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী যে অ্যাসাইনমেন্ট লেটার (সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতর থেকে অর্থের নিশ্চিতকরণপত্র) দাখিল করার কথা, সেখানেই নেয়া হয় জালিয়াতির আশ্রয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সই জাল করে সেই কাগজটি দাখিল করে ঋণ তুলে নেয়া হয়।

২০১৩ সালে বোয়ালিয়া থানায় এই ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। পরে তদন্ত শেষে দুদক ২০১৭ সালে চার্জশিট দাখিল করে। তবে তার আগেই ২০১৬ সালের ১৬ নভেম্বর নগরীর হোসেনীগঞ্জে নিজ বাড়িতে পাওয়া যায় খন্দকার মাইনুলের গুলিবিদ্ধ মরদেহ। পুলিশ ও পরিবারের লোকজন জানিয়েছিলেন, ঋণের চাপে জর্জরিত অবস্থায় তিনি আত্মহত্যা করেন। ফলে ‍দুদকের চার্জশিটে মামলা থেকে তার নাম বাদ দেয়া হয়।

দুবছরে ৮ মামলা

২০১৩ ও ২০১৪ এই দুই বছরে যমুনা ব্যাংক রাজশাহী শাখায় ঋণ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের মোট ৮টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে খন্দকার মাইনুলেরটিসহ ৭টি মামলা দায়ের হয় ২০১৩ সালে। ২০১৪ সালে দায়ের করা হয় একটি মামলা। সবগুলোই আদালতে বিচারাধীন।

রায় হয়ে যাওয়া মামলাটির বাইরে আরও যে ৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, সেগুলোর আত্মসাৎকৃত অর্থের পরিমাণ ক্রমানুসারে ২ কোটি ৩৭ লাখ ৫০ হাজার, ৩ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার, ১ কোটি ১ লাখ, ৪৪ লাখ ৫০ হাজার, ১ কোটি ৪৩ লাখ, ৬৬ লাখ ও ৩৬ লাখ টাকা।

মামলাগুলোর বিচার কাজ শিগগির শেষ হবে বলে আশা করছেন দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট শহিদুল ইসলাম খোকন।

Berger Weather Coat