গা ছমছমে বনভূমি নওগাঁর আলতাদীঘি। অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর চারপাশ। যেন এ গহীন অরণ্যে একবার ঢুকলে বেরুতে চান না কেউ। আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান নিয়ে লিখেছেন অরিন্দম মাহমুদ

ওগাঁ ধামইরহাটের উপজেলা সদর থেকে ভ্যান অথবা ইজিবাইকে করে উত্তরে মাত্র ৫ কি.মি. দূরেই আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যানকে কেন্দ্র করে প্রকৃতির গর্ভে গড়ে উঠেছে সুবিশাল শালবন। আর সু-বিস্তৃত দীঘির উত্তর পাড়েই তারকাঁটায় ঘেরা ভারতের সীমান্ত ফাঁড়ি, বনের ভেতরে আঁকাবাঁকা পথের ধারেই কারুকার্যখচিত উইপোঁকার ঢিবি, যেন স্বর্গীয় দেবদূত এসে নিজ হাতে বানিয়েছে, আর বাহারী জংলী গাছের লতাপাতায় মোড়ানো প্রকৃতির আশীর্বাদে দাঁড়িয়ে আছে অগণিত শালগাছ। একটু এগিয়ে যেতেই মেঘেরা হারিয়ে যায় শালগাছের আড়ালে, যেন হঠাৎ করে নেমে আসে অন্ধকার আর তখনই শিউরে ওঠে গায়ের লোম। দূর থেকে চোখে পরে জংলী ফুল, অচেনা ফুলের ঘ্রাণে জেগে ওঠে প্রেম। নাম না জানা অচেনা পাখি আর কোকিলের ডাকে নিমিষেই যেন নেমে আসে বসন্ত। গহীন অরণ্যের আঁকাবাঁকা পিচঢালা পথের ধারে নেমে আসে সন্ধ্যা। যেতে যেতে খানিকটা পথ এগোতেই শালপাতার মড়মড় শব্দে মনে পড়ে ছোটবেলায় দাদা দাদির ঘুমপাড়ানির গল্পের বাঘ মামার কথা, একবার ভেবে দেখুন তখন আপনার বুকের ভেতরে কি হতে পারে, বলছিলাম শালবনে ঘেরা প্রাচীন ইতিহাসে সমৃদ্ধ আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যানের কথা।

কথিত আছে, আনুমানিক ১৪০০ সালে এ অঞ্চলে রাজত্ব করতেন রাজা বিশ্বনাথ জগদ্দল। তখন রাজার রাজত্বকালেই একবার প্রজাসাধারণের খাবার পানির প্রকট সংকট দেখা দেয়। মাঠ ঘাট শুকিয়ে চৌচির হওয়ায় আবাদি জমিতে ফসল ফলানো হয়ে ওঠে অসম্ভব। হঠাৎ একদিন রানী স্বপ্নের মাঝে দেখলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না পা ফেটে রক্ত বের হবে ততক্ষণ তিনি হাঁটতে থাকবেন এবং যেখানে গিয়ে পা ফেটে রক্ত বের হবে ততদূর পর্যন্ত একটি দীঘি খনন করে দিলেই সেই দীঘি পানিতে পরিপূর্ণ হবে তাতেই পানির প্রকট অভাব থেকে মুক্তি পাবে প্রজাসাধারণ।

সকালে ঘুম থেকে উঠে রানী রাজার কাছে তার স্বপ্ন অনুযায়ী একটি দীঘি খননের দাবি জানালে রাজা চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে পড়েন। একদিন প্রেম পূজারী রাজা রানীর দাবি মেনে নিতে বাধ্য হলেন এবং একটি দীঘি খনন করে দিতে রানীর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। প্রজাদের দুঃখ দুর্দশা দূর করার জন্য রানী স্বপ্ন অনুযায়ী হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলেন। সঙ্গে ছিল রানীর পাইক পেয়াদা, লোক লস্কর। একদিন রানী হাঁটতে শুরু করলেন, তিনি হাঁটছেন তো হাঁটছেন বহুদূর হাঁটার পরও রানী থামছিলেন না, এভাবে রানী হাঁটতে থাকলে পায়ে কষ্ট পাবেন ভেবে রাজা রানীকে দাঁড়াতে বলেন, কথা না শুনেই প্রজাদের পানির কথাভেবে রানী হাঁটতেই থাকেন। রানীর কষ্টের কথা ভেবে রাজা মন্ত্রী এবং উপস্থিত পাইক-পেয়াদাদের নিয়ে রানীকে আটকানোর কৌশল বের করলেন, পাইক-পেয়াদারা রাজাকে বললেন, রানীমার পায়ে আলতা না ঢেলে দিলে তিনি কখনোই থামবেন না। তখন রাজার হুকুমে তাদের একজন মন্ত্রী রানীর পায়ে আলতা ঢেলে দিলেন আর চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘রানী মা, আপনার পা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। একথা শুনে রানী তাঁর পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখেন সত্যিই তো পা থেকে রক্ত ঝরছে, আলতাকে রক্ত ভেবে রানী সেখানেই বসে পড়েন, প্রেম পূজারী রাজা বিশ্বনাথ জগদ্দল ওই স্থান পর্যন্ত একটি দীঘি খনন করে দিলেন। এরপর অলৌকিকভাবে মুহূর্তেই বিশুদ্ধ পানিতে ভরে ওঠে দীঘি। লোকমুখে কথিত আছে রানীর পায়ে আলতা ঢেলে দেয়ায় সেই থেকে রাজা বিশ্বনাথ জগদ্দল, দীঘিটি আলতাদীঘি নামে নামকরণ করেন।

প্রায় ২৬৪.১২ হেক্টর এই বনভূমির ঠিক মাঝখানে রয়েছে ৪৩ একর আয়তনের বিশাল দীঘি। দীঘির স্বচ্ছ পানিতে ফুটে থাকা হাজারো পদ্মফুল যেকোনো ভ্রমণপিপাসু মানুষকে বিমোহিত করবে। প্রতি বছর শীত যখন জেঁকে বসে, তখন ভারত সীমান্ত ঘেষা এই দীঘিতে বিভিন্ন প্রজাতির নাম না জানা অতিথি পাখি এসে দীঘির নির্মল পানিতে দাপিয়ে বেড়ায়, ডাহুক, পানকৌড়ির কলকাকলি আর তাদের চঞ্চল উড়াউড়িতে প্রাণ প্রাচুর্যে মুগ্ধ হয় যেকোনো বয়সের মানুষের হৃদয়।

২০১১ সালে পবম-বন-শা-২-৪৮-২০১০-৩৭৮ নম্বরে প্রাঞ্জাপনমূলে ‘আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান’ ঘোষণা করা হয়। নওগাঁ জেলা শহর থেকে প্রায় ৬১ কিলোমিটার উত্তর ভারতীয় সীমান্তের কোল ঘেঁষে এবং জয়পুরহাট জেলা শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার পশ্চিমে এ জাতীয় উদ্যানের অবস্থান। নওগাঁ জেলার সর্ববৃহৎ এই দীঘির মোট আয়তন ৫৫৪৬ একর (পাড়সহ) যার দৈর্ঘ্য ১.২০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ০.২০ কিলোমিটার। দীঘির পাড়ের আয়তন ১২.২১ একরের মালিকানা বন বিভাগের এবং ৬১৩ একর ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত। উল্লেখ্য, শুধু আলতাদীঘির জলাশয়ের আয়তন ৪২.৮১ একর। দীঘির উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমপাড়ে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের অপূর্ব বাগান। অপরদিকে দক্ষিণ পাশে মইশড় ও পশ্চিমে দাদনপুরে রয়েছে গহীন শালবন।

বৌদ্ধ যুগের এ দীঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান’। শালবন এবং বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদে পরিপূর্ণ ২৬৪.১২ হেক্টর জমির এই বনভূমিটি ২০১১ সালের ২৪ ডিসেম্বর প্রশাসনের নজরে আসে। প্রাচীন ঐতিহ্যগত ইতিহাস পর্যালোচনায় এর গুরুত্ব অপরিসীম হয়ে ওঠে, আর একারণেই আলতাদীঘিকে ২০১১ সালে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। দীঘির পাড় ঘেষে বেড়ে ওঠা সুবিশাল শালবনে সারি সারি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, বানর ছানার গাছে গাছে লাফানো আর জানা অজানা হাজারো পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে চারিদিক। বনের ভেতর দিয়ে পিচঢালা রাস্তা এঁকেবেঁকে চলেছে গন্তব্যে, রাস্তার দু’পাশে সারি সারি শালগাছ, শুকনো শাল পাতার ফাঁকে বেড়ে ওঠা উইপোঁকার বড় বড় ঢিবি যা সত্যিই বিস্ময়কর। রাতের আঁধারকে আলোকিত করে যখন চাঁদের রুপালি আলো দীঘির শান্ত পানিতে পড়ে তখন সেই আলোয় ছোট বড় মাছেরা খেলায় মেতে ওঠে, অপরদিকে শেয়াল, বেজি আর বনবিড়ালের আনাগোনায় নতুন রূপে আবিষ্কার হয় রাতের আলতাদীঘি।

এ বনাঞ্চল সৌন্দর্যময় এক ঐতিহাসিক নিদর্শনে প্রকৃতির আশীর্বাদ। বনের মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক দীঘি যার দৈর্ঘ্য প্রায় এক কিলোমিটার। দীঘির পূর্ব-পশ্চিম এবং দক্ষিণে গহীন শালবন। আলতাদীঘির উত্তর ধারের বেশ কিছু অংশ ভারতে পড়েছে। এর ফলে দর্শনার্থী ও পর্যটকদের ভারতের কাঁটাতারের বেড়া ও দু’দেশের আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার দেখার সৌভাগ্য হবে।

বনবিট কর্মকর্তা আবদুল মান্নান বলেন, জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পর ধামইরহাট উপজেলা সদর থেকে শালবন বনাঞ্চল ও আলতাদীঘি পর্যন্ত পাকা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে বাস, মাইক্রোবাস, ভটভটি ও রিকশা-ভ্যান যোগে ধামইরহাট থেকে আলতাদীঘি পর্যন্ত চার-পাঁচ কিলোমিটার পথ অনায়াসে পাড়ি জমানো সম্ভব। প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা শালবাগানে বন বিভাগের উদ্যোগে ইতোমধ্যে ঔষধিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা, বাঁশ ও বেত লাগিয়ে বন্যপ্রাণী ও পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এ বনাঞ্চলে অজগর, হুনুমান, বানর, গন্ধগোকুল, বেজি, সজারু, মেছোবাঘ, বনবিড়াল, শেয়ালসহ প্রায় ২০ প্রজাতির পাখি অবমুক্ত করা হয়েছে। এক দিকে পর্যটক ও দর্শকদের আনন্দ ও বিনোদন যেমন বেড়েছে তেমনি এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজার রাখার জন্য এ বনাঞ্চল যথেষ্ট অবদান রাখছে।

Berger Weather Coat