নূরুননবী শান্ত

।। নূরুননবী শান্ত ।।

শত শত মানুষ মিলে একজন দুর্বল মানুষকে হত্যা করে হিংস্র উল্লাসে আগুনে পুড়িয়ে ফেলার পৈশাচিক ঘটনা কিছুতেই মেনে নেবার মতো স্বাভাবিক নয়। অথচ, ঘটনাটিকে গুরুত্ব সহকারে না নেওয়ার প্রবণতা এই সমাজে আমাদের দেখতে হচ্ছে।

ভাবা যায়, কয়েক শত মানুষের মাথায় খুন চেপে গেল একজন মানুষকে হত্যা করার জন্য! সমাজে যদি একজনমাত্র ব্যক্তি খুনি হিসেবে চিহ্নিত হন, তো তাতেই আমরা ভয় পাই। হ্যাঁ, আমরা মুখে ‘খুনি ব্যক্তি ঘৃণ্য’ বলি বটে, কিন্তু বাস্তব সমাজে একজন খুনির প্রকাশ্য অবস্থান আমাদের মনে ভয়ানক ভয়ের সঞ্চার করে। এইজন্য ভয় যে, খুন করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি সমাজে স্বাভাবিকভাবে অবস্থান করতে সক্ষম হলে সে অনায়াসে আরেকটি খুন করার সাহস পাবে। সেই খুনের শিকার এই সমাজের একজন বাসিন্দা হিসেবে আমিও হতে পারি। আপনিও হতে পারেন। এমনকি, সংশ্লিষ্ট সমাজের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিটিও হতে পারেন স্বাধীন খুনির পরের টার্গেট। সুতরাং, সাম্প্রতিক কয়েকশত ব্যক্তি মিলে নিতান্ত নির্দোষ একজন ব্যক্তিকে কেবলই সন্দেহবশত খুন করার ঘটনাকে আমাদের সমাজের ভেতরে প্রবল এক খুনি সমাজ সক্রিয় থাকার জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়।

যে রাষ্ট্রের আইনে, ধর্মে, সামাজিক বিশ্বাসে এখনো খুন করা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পাপ হিসেবে গণ্য, সেই রাষ্ট্রে সেই পাপ বুড়িমারী-পাটগ্রামের কয়েকশত মানুষ একসাথে মিলে করলো। এ ঘটনার আগ পর্যন্ত বিশ্বাস করতাম, পাপাকর্ম করলে বা পাপীপাত্রই অনুশোচনায় বিদ্ধ হয়। কিন্তু দেখা গেলো এই ক্রমবর্ধমান সহিংস সমষ্টি খুন করার পর অনুতপ্ত তো হলোই না, বরং আদিম উল্লাসে-আনন্দে খুনের শিকার ব্যক্তির মৃতদেহ প্রকাশ্যে পুড়িয়ে ফেলে পোড়া দেহ-অতিরিক্ত হাড় লাঠি দিয়ে ওলোট-পালোট করলো।

এই একমাসে আরও কয়েকটি ছোট ছোট ঘটনা ঘটার সময়েই এ ঘটনাটি ঘটলো। যেমন, ফেসবুকে মহানবী হজরত মোহাম্মদকে (সা.) নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগের কারণে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) এক শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ সংক্রান্ত এক মামলার রায়ে আদালত পিরোজপুরের এক দর্জিকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তিথি সরকার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছেন, এমন অভিযোগে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাময়িক বহিষ্কার করেছে; গত ২৫ অক্টোবরের পর থেকে মেয়েটি নিখোঁজ। যেদিন রেলওয়ে শহর পার্বতীপুরে দিপ্তী রাণী দাস নামের এক কিশোরীকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার জন্য পার্বতীপুর রেলওয়ে থানা পুলিশ গ্রেফতার করেছে এবং পার্বতীপুর মডেল থানার এসআই বাদী হয়ে দিপ্তীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে, সেদিন অন্যদিকে, রংপুর থেকে লালমনিরহাট জেলার বুড়িমারীতে কাজে কিংবা বেড়াতে গিয়ে রংপুরের অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত সহিদুন্নবী জুয়েল মসজিদে নামাজ পড়তে প্রবেশ করে কোরানের অবমাননা করেছেন এই সন্দেহের কারণে খুন হয়েছেন।

ঠিক পরের দিনই সাপ্তাহিক ‘সাম্প্রতিক দেশকাল’ এর খবরে জানা যাচ্ছে যে, কোরান অবমাননার ঘটনাটি গুজব ছিলো; এবং, তখনো কোথাও কোন অনুশোনার আওয়াজ ওঠেনি। অর্থাৎ, কোরান অবমাননার ঘটনাটি সবাই এতবেশি বিশ্বাস করেছে যে তার অর্ধেকও একে গুজব হিসেবে মানতে রাজি হয়নি। মানলে নিশ্চয় প্রতিক্রিয়া হতো। তাই, অপরাধীদের অনুশোচনার প্রশ্নই আসে না। তবে, আফসোসের ক্রন্দন ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। এত নিষ্ঠুরতাও সম্ভব! তাও আবার শত শত মানুষ একজোট হয়ে। একজন খুনি সমাজে থাকলেই তো একাধিক ব্যক্তির খুন হবার ঝুঁকি সমাজে বিরাজ করে, সেখানে শত শত খুনির জোট থাকা মানে শত-সহস্র মানুষ খুন হয়ে যাবার ঝুঁকির আছে এই সমাজে। এইভাবে খুনি ব্যক্তিদের সমষ্টিতে পরিণত হওয়া এবং খুন করার অপরাধকে উল্লাসের উসিলা করে তোলার ঘটনা প্রচার মাধ্যমে স্থান না পাওয়া, বৃহত্তর সমাজকে সচকিত হতে না দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। বলা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ।

সহিদুন্নবী জুয়েল আমার বন্ধু ছিলেন। আমাকে ছোটভাইয়ের মতোই আদর করতেন। রংপুরে একই পাড়ায় আমাদের বাড়ি। রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজে আমি ওনার সহকর্মী ছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঠাগার বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছিলেন। ধার্মিক ছিলেন তিনি। যখন যেখানে যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, নামাজের সময় হলে তিনি নামাজ পড়তেন। গত জানুয়ারিতেও রংপুরে ওনার বাসার সামনে আড্ডা দিলাম। চাকরি থেকে অবসর নিতে বাধ্য হয়েছেন, বলেছিলেন তিনি। আমার ওনাকে কিছুটা হতাশ সত্ত্বেও অত্যন্ত স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। পরে জানতে পারলাম, এক দুই সন্তানের পিতা হিসেবে বেকার হয়ে পড়ার কারণে জীবন-যাপনে অনিশ্চয়তাজনিত চাপ তাকে মানসিক সংকটে ফেলে। চিকিৎসাও নিচ্ছিলেন। কীভাবে তিনি রংপুর টু বুড়িমারী গেলেন তাও এক প্রশ্ন। তবে, এমন একজন ব্যক্তিকে সন্দেহবশত সমষ্টিগতভাবে আক্রমণ করার ঘটনা মোকাবেলা করার জন্য রাষ্ট্র যে একেবারেই প্রস্তুত নয়, তা প্রায় প্রশ্নহীন বাস্তবতা হয়ে ফুটে উঠলো।

কোনো ব্যক্তি অপরাধী হয়ে থাকলেও বিচার করার দায়িত্ব যেকোনো দাপুটে সমাজ যখন নিজেই নিয়ে নিতে পারে, তখন এটা না বুঝে উপায় থাকে না যে, রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার উপর সমাজের এক শক্তিশালী অংশের একরত্তি ভরসা নেই। পুলিশকে ধাওয়া করার ক্ষমতা রাখে এই সমাজ। র‌্যাব এ সমাজ মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়। অপরাধকর্ম সম্পন্ন করার পরও ভীড় করে উল্লাস করতে থাকা জমায়েতকে কেবল ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার ক্ষমতাটুকু হয়তো রাখে জনগণের রক্ষাকর্তা আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো। কোন সিস্টেমই কাজ করছে না আসলে। বিমূর্ত অনুভূতির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সমাজের অপরাধ প্রতিকারের কোনো প্রচেষ্টাই লক্ষণীয় নয়।

এই রকম দুর্বৃত্ত শক্তি মোকাবেলা করার মাধ্যমে সমাজে সংহতি, সম্প্রীতি, সহিষ্ণুতা, এবং আইন প্রতিষ্ঠা করা ও বজায় রাখাই তো রাষ্ট্রের কাজ। আমাদের এই রাষ্ট্রে সেই কাজগুলো দৃশ্যমান নয় বলেই সহিংসতার বিস্তার ঘটছে। মানুষ হত্যা করে মৃতদেহ পুড়িয়ে উল্লাস করার মতো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটা এরকম প্রেক্ষাপটে সম্ভব। মানুষ আর মানুষ চেনে না! ভবিষ্যতে আরও চিনবে না। বহুসংখ্যক মানুষ মিলে খুন করার মতো অপরাধ করাকে বিজয়ের উল্লাস হিসেবে উদযাপন যেহেতু করা যায়, সেহেতু, সমর্থন পেলে তো আরও হত্যাকাণ্ড ঘটতেই পারে। দেখাই যাচ্ছে, মানুষ ব্যক্তি হিসেবে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। চোখের সামনে মানুষ ধমক খাচ্ছে, সামান্য উসিলায় পিটুনি খাচ্ছে, হেয় করা হচ্ছে যাকে-তাকে, হত্যা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমা পাওয়া যাচ্ছে। এসবের ফাঁক গলে একটা অন্ধ মারমুখি গোষ্ঠী পরিসরে পরিধিতে বেড়েই চলেছে। মানুষ ধ্বংসের শেষ সীমায় পৌঁছেছে। হত্যা করতে গিয়ে নাম নিচ্ছে পবিত্র ধর্মগ্রন্থের। এভাবে এরা কোরানকে ছোট করে। এরাই ধর্মের প্রকৃত শত্রু। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিপদ।

এই সমাজের আরও কিছু বৈশিষ্ট্য প্রকট। এরকম সমাজে মানুষ হাজি সেলিম বা তার পুত্রের মতো দুর্বত্তদের ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি তৈরি করে। এই সমাজের মানুষেরা নদীদখলকারীদের সমাজে থাকার সহজ অনুমোদন দেয়। এরা ঘুষখোর ব্যক্তিদের সালাম দেয়, ধর্ষিত ব্যক্তিকে বাধ্য করে ধর্ষকের সাথে সমঝোতা করতে। এই সমাজের লোকেরা মিথ্যা মামলাকারীদের কোনদিন সামান্য তিরস্কারও করে না। এরা মাস্তানকে সমঝে চলে। ঋণখেলাপীকে সালাম দেয়। সামান্য পিয়ন বা ড্রাইভারের চাকরির জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা হাসিমুখে ঘুষ দেয়। পরনিন্দাকারীর সাথে আত্মীয়তা বজায় রাখে, স্বজনপ্রীতি চর্চাকারীদের সাথে চা খায়, চেয়ারকে পুজা করে, অস্ত্রধারীদের পথ ছেড়ে দেয়;… অবশ্য যদি কাউকে ভিন্নচিন্তা ও আচরণের কারণে সন্দেহ হয়, তাকে তারা কিছুতেই বরদাস্ত করে না। পরিস্কার দেখা যাচ্ছে, এই সহিংস সমষ্টি নিজেদের আত্মা উপড়ে ফেলতে দ্বিধা করবে না। হাসতে হাসতে কাটবে নিজের মস্তক। তারপর এমন একটা কিছুর নামে স্লোগান দেবে যাতে ভয়ে সবাই মুখ বুজে সয়ে নিতে বাধ্য হয়। এ বড় অন্তঃসারশূন্য সময়। আইয়ামে জাহেলিয়াতের চেয়েও বেশি অনাচার-প্রবণ। একে প্রতিরোধ করার দৃষ্টান্ত এখুনি স্থাপন না করলে এরপর তারা প্রকাশ্যে চড়াও হবে সিস্টেমের পিঠের উপর।

ভাইরাল হওয়া ভিডিও তদন্তে আমলে যেহেতু নেওয়া হয়েছে, এর মাধ্যমে হত্যায় মদদদানকারী, হত্যায় অংশগ্রহণকারী ও হত্যাদৃশ্যে উল্লসিত অপরাধিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে আমরা আশা করি। সরকার ও প্রশাসন এ ধরনের হত্যাকাণ্ড প্রবণতার প্রতি ‘শূন্য সহনশীলতা’ প্রদর্শন করবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার সহিদুন্নবী জুয়েলের সন্তানদের ও তার উপর নির্ভরশীল প্রত্যেক ব্যক্তির মানসম্মত জীবনের দায়িত্ব সরকারকে গ্রহণ করতে হবে।

নূরুননবী শান্ত একজন বাংলাদেশি গল্পকার ও অনুবাদক।

Berger Weather Coat